ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

‘আপনি থাকছেন স্যার!’ লাইনটি ভারতের কলকাতার মীরাক্কেল অনুষ্ঠানের জনপ্রিয় শ্লোক বা লাইন হিসেবে ব্যবহার করা হয় বা হতো। যখন কোন অংশগ্রহণকারী ভালো পারফর্ম করে থাকতেন, তখন সে শ্লোক আওড়াতেন মীরাক্কেল এর উপস্থাপক মীর। হালের ‘স্যার’ ডাকা নিয়ে আমাদের অনলাইন জগতে জল কম ঘোলা হয়নি। অথচ, মীরাক্কেলে যে কাউকে স্যার ডাকা হতো। হোকনা কৌতুকচ্ছলে!

এবার কাজের কথায় আসি। এ দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর প্রেসিডেন্ট ভাবা হয় আমেরিকার প্রেসিডেন্টকে। তাকে সে দেশের লোকেরা ডাকে মি. প্রেসিডেন্ট বলে। আমি বলছিনা যে, আমরাও আমাদের প্রেসিডেন্টকে মি. প্রেসিডেন্ট ডাকতে শুরু করে দেই। তবে শুনেছি অনেকেই নাকি এখনোও ভাই ডাকে (ভুল হলে স্যরি)। আর আগের প্রেসিডেন্ট (মরহুম জিল্লুর রহমান) এর সাথে এতো এতো সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ছবি দেখেছি! আমাদের দেশের জল-হাওরের মানুষ একটু অন্যরকম সরলই বটে। আর, আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীও শুনেছি ‘আপা ডাক পছন্দ করেন’। যদিও অনুষ্ঠানে ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী’ ডাক প্রটোকলের ব্যাপার, যেমন করে মাননীয় প্রেসিডেন্ট বা অন্যান্য মাননীয়। তার মানে মি. প্রেসিডেন্ট ডাকা আমাদের সংস্কৃতি নয়। আমাদের সংস্কৃতি ভিন্ন।

কোন এক হাসপাতালে এক মহিলা ডাক্তারকে এক রোগী ভুল করে ‘সিস্টার’ ডাকায় চরম হেনস্তা হতে হয়েছিলো। রোগী হয়তো হাসপাতালের সংস্কৃতি জানতেন না। আমাদের দেশে প্রশাসনে সামরিক/আধা-সামরিক/সিভিল প্রশাসন রয়েছে। সামরিক/আধা-সামরিক প্রশাসনের প্রায় সবাই কোন না কোন ভাবে স্যার ডাক শুনে অভ্যস্ত অধস্তনের কাছ থেকে অথবা ভয়ে সাধারণ জনগণের কাছ থেকে। আমরা ভয় পেতে পছন্দ করি, অথবা ভয় পাওয়াতে পছন্দ করি। কিন্তু সিভিল প্রশাসনকে মানুষ তোয়াজ করে স্বার্থে, ভয়ে নয়। কিন্তু সেখানেও স্যার/ম্যাডাম! আধা-সামরিক বা সামরিক বাহিনীতে কোন ম্যাডাম নাই! সবাই স্যার। যদি স্যার ডাকা না থেকে আব্বা/আম্মা ডাক থাকতো তবে হয়তো সবাই আব্বা হতো। জানিনা, কোনদিন ঘরেও বাবা-মা একই ডাক প্রচলন করার রেওয়াজ কোন আধুনিক পরিবার শুরু না করে দেয়। আর আমরাতো অনুকরণ করার জাতি, অবাঞ্চিত বিষয়ের।

আমি অনেক ছাত্র নেতাকে মোবাইলে অপর প্রান্তে ‘অমুক ভাই (ডিসি/এসপি) কেমন আছেন?’ বলতে শুনেছি। সেটাও কিন্তু পাওয়ার, ক্ষমতা। সবাই ক্ষমতাকে তোয়াজ করে, পূজা করে।

আমি যখন অনার্সে পড়ি তখন আমার এক স্যার বলেছিলেন, “অমুক নেতা লোক ভালোনা। খুবই উগ্র আর বেয়াদব। অমুক অফিসারকে গতকাল তুই তুকারি করেছে (আমি সংক্ষেপে লিখছি)। এটা কীভাবে সম্ভব? সব ক্ষমতা! কিছুদিন আগে কোন এক ম্যাজিস্ট্রেট তার ঘরে মোবাইল কোর্ট বসিয়ে এক সাবেক সিভিল সার্জনকে সাজা দেন, সেটাও ক্ষমতা। পরে শুনেছি, আদালতে কড়জোড়ে ক্ষমা প্রার্থনা করে মুক্তি পেয়েছেন। আর আদালত তাদের ভবিষ্যতে এমন কোন পদে পদায়ন করতে নিষেধ করেছেন, যেসব পদে পদায়িত হলে এমন ক্ষমতার অপব্যবহার করা যায়। তবে ক্ষমতা যে সব ক্ষেত্রে চলেনা তা-ও আদালত দেখিয়ে দিলো।

vC3K2Okt

আমার খুব প্রিয় একটি হিন্দী সিনেমা আছে, ‘জলি এলএলবি’। যেখানে অভিনেতা জজ সাহেব বলেছিলেন, “আজোও মানুষ বিচার বিভাগের প্রতি আস্থা রাখে, আর কোন কারণে আদালতের দারস্থ হতে হলে বলে, তোমার সাথে আমার আদালতে দেখা হবে।” সেজন্য, আমিও আদালতের প্রতি আস্থা রাখি আর ভাবি, কোনদিন আদালত স্ব-প্রণোদিত হয়ে এ বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা দিবেন। আদালত রায় যাই দিক না কেন, স্যার ডাক কিন্তু থাকবেই। আমরা আমাদের শিক্ষকদের স্যার ডাকবো (অন্যান্য দেশে টিচার/কলকাতায় মাস্টার মশাই ডাকে)। আমরা নেতাদের স্যার ডাকবো, ভয় পেলে কাঁধে বন্দুক ঝুলানো যে কাউকে স্যার ডাকবো, আমরা পাড়ার ছাত্রনেতাদের স্যার ডাকবো, ডিসি অফিসের পিয়নকেও কাজ হাসিল হবার আগ পর্যন্ত স্যার ডাকবো। ধমক খেলেই স্যার ডাকবো, আর ক্ষমতা পেলে নাম ধরে ডাকবো, তুই তুকারি করবো। কিংবা কোন এক সাহসী মেয়ের মতো “জজ সাহেব আমার কিছু কথা ছিলো” বলে সাহসী হবো। আমরা ভালোবেসে অনেককেই স্যার ডাকবো।  সুতরাং আপনি থাকছেন ‘স্যার’।