ক্যাটেগরিঃ চিন্তা-দর্শন

আমার চাকুরি জীবনের প্রথম নিয়োগ ছিলো মৌলভীবাজার জেলায়। হ্যামিলিনের মতো উৎপাত না হলেও প্রতিদিন অনেক ইঁদুরের চেঁচামেচি আমার ঘুম হরণ করতো। আমি মেঝেতে ঘুমাতাম। আমার বিছানার চারপাশে ইঁদুর মহাশয়েরা অবাধ বিচরণ করতেন। মাঝে মাঝে ঘুম থেকে মধ্যরাতে উঠে রান্নাঘরে গিয়ে ওদের নিশিভ্রমণ দেখতাম; আর আমায় দেখে তিনারা থোড়াই কেয়ার করতেন। একদিন আর সহ্য করতে না পেরে রান্নাঘরে ঝাঁটা উঠিয়ে বেদম পিঠিয়ে একজনকে অক্কা পাওয়ালাম।

ঝাঁটা দিয়ে ইঁদুর নিধন! বুঝতেই পারছেন ইঁদুরের সংখ্যা! সে রাতে আর ঘুমাতে পারিনি, গভীর রাতে প্রাণ হরণের কষ্টে! জীবনে প্রথম ইঁদুর মেরেছিলাম। ভয়ে ছিলাম- এঁরা না আবার দলবদ্ধ হয়ে প্রতিশোধ নিয়ে নেয়। কিন্তু না! সেটা ঘটেনি। তারা এরপর আরো এসেছে, কিন্তু আমায় আলাদা আক্রমণ করেনি। আমিও আর মারিনি! তারা দলবদ্ধ হয়ে খাবার লুট করে বটে, কিংবা কুটকুট করে কামড়ায় বেশি, এ ভিন্ন অন্য কিছু নয়।

 

 

বই পড়ার বদৌলতে জেনেছিলাম, ইঁদুরের দাঁত খুব বাড়ে এবং তারা তার বাড়ন্ত রোধে অনবরত কুটকুট করে কামড়াতে থাকে। সুতরাং, খাবার লুটের দোষ বাদ দিলে কুটকুট করে কামড়ানোর জন্য তাদের আর দোষারোপ করা যাবেনা বলে সিদ্ধান্ত নিলাম। আর কোনোদিন ইঁদুর মারিনি। গতকাল একটা ইঁদুর মারতে না পেরে ছোট ভাই সেটাকে শেষমেশ জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে আসে! কি নরম দিল আমাদের দুই সহোদরের!

এবার আমার নিজ জেলায় বদলি। মাসের ১৫-১৬ দিন শহরে থাকি, আর বাকি দিন বাড়ি চলে যাই, যতোই রাত হোক, আবার সকালে আসি। হোটেলে থাকার কারণ হলো ব্যক্তিগত সুবিধা-অসুবিধা এবং থাকার খরচ। মেসের ভাড়া আর সুনামগঞ্জের পুরান বাসস্ট্যান্ডের ‘কাসেম রেস্ট হাউসের’ ভাড়া সমান সমান, দৈনিক ১০০ টাকা। যদিও বাথরুম আর টয়লেট গণ-সুবিধা সম্বলিত। কিন্তু কষ্ট হচ্ছে ছারপোকা! যে পোকা সহ্য করতে না পেরে সিলেটে ঘুমানোর খাট জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। সেই পোকারা এখন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী!

 

ছারপোকা কামড়ালে নিতে হয় কিছু ব্যবস্থা

ইউটিউব, গুগল করে প্রতিদিন হোটেল ম্যানেজারের সাথে ছারপোকা মারার প্ল্যান করি। কাজ হয়না! তাই রাতে বাতি জ্বালিয়ে ঘুমাই। খাট দেয়াল হতে দূরে সরিয়ে রাখি। বালিশের পোকাগুলি যখন ঘারে বা শরীরে আসে তখন মেয়েদের মাথা থেকে উকুন ধরে আনার মতো করে তাদের ধরে ফেলি আর রাম-ঢলা দেবার পর রক্ত দেখে উল্লাস করি, যদিও বজ্জাত গন্ধ খারাপ লাগে। কিছু পোকা দেয়াল বেয়ে নামার সময় পত্রিকার পাতা ছিড়ে ডলা দেই, কিন্তু রক্ত বের হয়না। কারণ, তারা ক্ষুধার্ত ছিলো। তাদের নিজেদের রক্ত লাল নয় মনে হয়! কালো, ভীষণ কালো। ভয় পাই, রাতে দলবেঁধে না হানা দেয়। তবুও ক্ষুধার্ত ছারপোকা মারতে খারাপ লাগে।

ছারপোকারা তাদের মতো হানা দেয়, রক্ত খেয়ে যায়। কিন্তু, ক্ষুধার্ত পোকাগুলো কালো রক্ত বইয়ে ইহলোক ত্যাগ করায় আমি উল্লাসিত হতে পারিনা। মাঝে মাঝে ক্ষুধার্ত ছারপোকা মারতেও খারাপ লাগে আমার। হয়তো আমার মতো আরোও অনেকের খারাপ লাগে। কিন্তু, আমি বা আমরা প্রতিনিয়ত মার খেয়ে যাচ্ছি। কারা মারছে তাদের নাম বলে কি লাভ! আমার এখন কোন মুখোশও নাই, আবার মুখোশ লাগালে নাম পাবো কাপুরুষ, কিংবা সাহস দেখালেও নিয়ে যাবে চ্যাংদোলা করে। আমি বা আমরা মার খেয়ে যাচ্ছি প্রতিদিন, সমাজে-রাষ্ট্রে। বড় শক্তিরা আমাদের নিত্যদিন পিষে যাচ্ছে, মারছে অনবরত, তাদের বিরুদ্ধে তো তেমন আওয়াজ তুলতে পারিনা। সে তুলনায় ক্ষুধার্ত ইঁদুর-ছাড়পোকারা কত ক্ষুদ্র! তাদের ওপর খড়গহস্ত হতে তো খরাপ লাগবেই।