ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

Language is the home of the Being. – Heidegger

একটি ভাষার ভেতরে অনেক উপভাষা বা স্থানিক ভাষা থাকে। ভাষাপন্ডিতগণ বলেন, একটি ভাষা হল, অনেক উপভাষার (ডায়ালেক্ট) সমন্বয়। উপভাষা হল, ব্যক্তি মানুষের ভাষিক বিকাশের নির্দিষ্ট স্থরে থাকা ভাষাজ্ঞান বা স্বভাষা (ইডিআলেক্ট)। এই স্বভাষার কারণেই এক ভাষাভূক্ত মিলিয়নজ মানুষ মিলিয়নজ স্টাইলে কথা বলে এবং লিখে। এই কারণে এক ভাষার ভেতরেও থাকে ‘ভেতরের বিচিত্রতা’ (ইনটারনাল ভেরিয়েশন)। থাকে পদযোজনা বা কথা গঠনরীতি আর রূপতত্বের বিচিত্রতা। একই বিষয়ে দুই জন মানুষের কথা বলা ও রচনাতে ব্যবধান আসে। থাকে অর্থঘটিত বিচিত্রতা (সিম্যানটিক ভেরিয়েশন)। বিলাতে “knocked up” এর অর্থ ‘rouse from sleep’, আর আমেরিকার নিউইয়র্কে “knocked up” অর্থ দেয় “to make pregnant”।

মানুষের বিপদ জ্ঞানের হিসাবে মোতাবেক, যে-সব ঘটনাকে বিপদ জ্ঞান করে সে-সব ঘটনা, সব ধরণের রাস্তার মোড়ে মোড়ে অথবা রাস্তার কোথাও-না-কোথাও সতর্কতা সত্বেও বহু রকমের বিপদের সম্ভাবনা থাকেই। আসলে কোনো বিপদই বিপদ নয় সেই পাঠ আমরা নিতে পারি।

কথা ঠিক, বাংলাদেশের লেখা ও কথায় তৎসম শব্দের ব্যবহার কমছে দিনে দিনে। ফলে এই অঞ্চলের প্রধান ভাষার যোগাযোগ ক্ষমতা বাড়ছে। এখানকার ভাষাতে অনায়াসে ইংরেজি আরবী, অন্যান্য ভাষার শব্দ এবং এই দেশের নানা আঞ্চলিক ডায়ালেক্ট ও ইডিয়ালেক্টের শব্দ আসছে। নতুন নতুন সিনটেক্স আসছে। নানা নীরিক্ষাও জারি আছে।ইংরেজ আগমনের আমলে পশ্চিম বঙের তদানিন্তন সুতানটি গ্রাম (১৬৯৮-এ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী দখলে নেয়) এলাকার ভাষা সমগ্র বাংলায় প্রভাব রেখেছিল। ১৭৭৩-এ কোম্পানী কোলকাতাকে কোম্পানী ভারতের রাজধানী করবার ফলে উপমহাদেশের প্রাণ কেন্দ্র হয় কোলকাতা। বাংলা সাহিত্যের উন্মেষ বিকাশ কোলকাতা থেকেই। কিন্তু এখন স্বাভাবিক নিয়মেই কোলকাতার ভাষা সেই ডমিন্যান্ট ফোর্স আকারে নেই। বাংলাদেশের রেডিও টেলিভিশন সংবাদপত্র ইত্যাদি মাধ্যমে বাংলা ভাষার প্রমিত চলিত ভাষার আদলে যে-রূপটি প্রকাশ পায় এখন, এই রূপটির রীতিতে ঐতিহাসিক কারণে পশ্চিম বঙের সুতানটির প্রভাব থাকলেও যথেষ্ট ভিন্ন। ভিন্নতা আসছে বাংলাদেশের নানা উপভাষা, স্বভাষা ও পৃথিবীর অন্যান্য ভাষার শব্দের যোগে একটি ভাষার ক্রম পরিবর্তনের ধারার আলোকে।বাংলা ভাষা বর্তমান ভারত দেশটির শুধু পশ্চিম বঙেই নয়। উড়িষ্যা রাজ্যের অনেকাংশে, বিহারের কিয়দংশে, ত্রিপুরাতে, আসামের সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের সিলেটের লাগোয়া জেলাগুলিতে বাংলা ভাষায় কথা বলেন।

সিলেটের ভাষা সেই প্রাচীন নাগরীর আদলে এখন নেই। সিলেট বিভাগের শহরগুলোর ‘শিক্ষিত’ মানুষের ভাষাতে বাংলা শব্দ অবিকল ব্যবহার হয়। পৃথিবীর সকল দেশের ভাষা উপভাষা স্বভাষা ক্রমাগত পরিবর্তনশীল।ঢাকা ও কোলকাতার ভিন্ন ভাষারূপের কারণে দুই তরফে কোনো ধরণের কমপ্লেক্সে ভোগবার মানে হয় না। যাদের মধ্যে দেখা যায় এমন, তারা ভিন্ন-ভাষারূপ-চেতনার ফোঁসফাস করেন কূপমন্ডকতার কারণে। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। ভারত একটি স্বাধীন দেশ। ভৌগলিক আকারে ভারত বড়, বাংলাদেশ ছোট। একে অন্যের প্রতিবেশি সত্বেও দুই দেশের আলাদা কূটনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে। ‘দেশপ্রেম’র সাথে দেশ কর্তৃক আরোপিত বিবিধ বিধি নিষেধ দেশের জনগণকে মানতে হয়। নানা ধরণের ফারাক সত্বেও দুই বাংলার বিশুদ্ধ শিল্প সাহিত্য দুই বাংলাতেই যথেষ্ট জনপ্রিয়। বিশুদ্ধ শিল্প সাহিত্য রোদ বৃষ্টি জোছনার মতন হয় বলে হয়তো এমন হয়। হ্যাঁ, কিছু জনপ্রিয়তা আছে স্রেফ বিশেষ পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে।
সুমন সেনগুপ্ত কোলকাতার ‘দেশ’ এর ১৭ মার্চ ২০১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন একটি প্রবন্ধ শ্রীচৈতন্যের জীবন ধর্ম ও দর্শন বিষয়ে। রচনাটি বেশ সমৃদ্ধ। কিন্তু রচনার ভেতরে এক জাগায় লিখেছেন, ”ইসলামী শাসনের উৎপীড়নে বহু মানুষ (প্রধানত হিন্দু বৌদ্ধ) ধর্মান্তরীত হতে শুরু করে।” এই বাক্যে অসত্য এবং ইসলাম ধর্মের উপর বিদ্বেষ প্রকাশ করেছেন সুমন সেনগুপ্ত।
ইসলামের নবী মুহম্মদ সঃ প্রবর্তিত ‘ইসলামী শাসন’ এই উপমহাদেশে কখনো কোথাও কায়েম হয় নাই। আর ব্যক্তি বিশেষ বা গোষ্ঠী বিশেষের দ্বারা চালুকৃত খন্ডিত নিয়ম কানুন ইসলামের পরিপূর্ণতা কভার করে না। মুঘল বাদশাহ আলমগীর কোরআনের হাফেজ, একজন উত্তম বিচারক বাদশাহ ছিলেন। কিন্তু রাজ্যে ইসলামী শাসন ছিল না। হিন্দু ধর্মবলম্বিগণ তাঁকে ভালোবাসতেন তাঁর অপক্ষপাতদুষ্ট বিচারের কারণে। একবার তিনি তাঁর সেনাপতিকে কতল করতে উদ্যত হয়েছিলেন এই কারণে যে, সেনাপতি তার ক্ষমতার প্রভাব দেখিয়ে ব্রাহ্মন সুন্দরীকে জোরপূর্বক বিয়ে করতে চেয়েছিল। বাদশাহ সে বিয়ে হতে দেন নি এবং ব্রাহ্মণ কন্যার পিতার সাথে বুক মিলিয়ে বলেছিলেন- ”ভাই ইহা তো আমার প্রতি আপনার ঋণ নয়; বরং মহান দায়িত্ব।” দেখা গেছে, কিছু সংখ্যক লেখক বক্তা এই অঞ্চলের হিন্দু নাম পরিচয়ের এবং মুসলিম নাম পরিচয়ের, তারা ইসলাম ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মের বিরুদ্ধে নিজেদের মনগড়া দলিল দিয়ে, ধর্ম দুটির বিরুদ্ধে বিষোদগার করে নানা কথা প্রসঙ্গে নিজেদেরকে ‘বুদ্ধিজীবি’ বানিয়ে তোলেন। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কারো জন্যে কল্যাণকর নয়। দেখা গেছে ধর্মটির মূল টেক্সটের মর্ম সম্পর্কে বিন্দু জ্ঞান নাই অথচ কোনো ধর্ম ব্যবসায়ির বা অজ্ঞ ধার্মিকের আচরণকে ধরে পাইকারীভাবে ধর্মটির বিরুদ্ধে কটু কথা বলেন এবং লিখেন।

ভাষার ভিন্নতাতে আবার আসি। ইয়েমেনের আরবি, সৌদি আরবের আরবি, কাতার, কুয়েত, আমিরাতের আরবি, সিরিয়া ইরাক লেবাননের আরবি, তিউনিসিয়া, মরক্কো, সুদান মিশর প্রভৃতি দেশের আরবি, সবই আরবি, কিন্তু বিস্তর ব্যবধান আছে। এখন তো সকল আরব দেশ ভিত্তিক একই ভাষার আলাদা আলাদা ভাষা পরিচয় তৈরী হয়েছে। দামেস্কের মানুষ ‘শ্যামি লেহজা’ বা শ্যাম দেশের স্টাইলে বলে আমিরাতি দোস্তের সাথে কথা। আমিরাতি দোস্ত তার আমিরাতি কায়দায় বলতে থাকে। তারা পরস্পর বোঝে। কিছু না-বুঝলে জিগ্যেস করে ওই শব্দটার মানে কি। রেডিও টিভিতে দামেস্ক ও ইয়েমেন প্রভাবিত আরবী ব্যবহৃত হলেও নানা আরব দেশের স্টাইল অব এ্যাক্সপ্রেশন আলাদা টের পাওয়া যায়। মিশরের নাটক আর বাগদাদের নাটকের ভাষাভঙ্গি আলাদা। অস্ট্রীয় জর্মন আর জার্মানীর জর্মন এক রূপের না।

এই সব ব্যবধান আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পালাবদলের ধারায় হয়ে আসছে।এরি মধ্যে ভারতের কলকাতার আর বাংলাদেশের ঢাকাকে কেন্দ্র করে নানা কারণে দুই ভিন্ন বাঙালি ইন্টেলিজেনসিয়া দেখা যায়। ঢাকা স্বাধীন দেশের রাজধানী হওয়াতে বাঙালি ইনটেলিজেনসিয়ার এই অংশের ভাষা-শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির শক্তি রওনক বেশি। বাংলাদেশের কবিতা আর পশ্চিম বঙের কবিতার আলাদা পরিচয় ধীরে ধীরে পরিস্কার হতে থাকছে। এই হতে থাকবার ব্যাপারটার মধ্যে বিভেদ চিন্তা দেখবার কিছু নাই। বরং এই ব্যবধানের মধ্যে নানা রূপ সুন্দর না-দেখে বিভেদ চিন্তার দিকে যাওয়াটাই দোষের।আর ভাষা ও দেশভিত্তিক জাতীয়তা যাতে ‘উগ্র জাতীয়তাবাদ’ এর দিকে না যায় সেদিকে জগতের সকল মানুষের সুচেতনা প্রবাহ যেন থাকে, সে-আশা আমরা রাখতে পারি, যাতে ভাষার বাড়িতে আরামে থাকি সামষ্টিক মানুষের চেতনাকে সামনে রেখে।

স্বত্ত্ব সংরক্ষিত
সারওয়ার চৌধুরী
১৩ জুন ২০১২ইউএই