ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার, হুমায়ূন আহমেদ স্মরণে

জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদ ইন্তেকাল করেছেন। ইন্তেকাল মানে এই জগত ছেড়ে অন্য জগতে গেছেন। এই জগতে ৬৪ বছর ছিলেন। তাঁর কর্মের দৌলতে লাখো লাখো মানুষ যারা বাংলা ভাষায় কথা বলেন, তারা তাঁর গল্প উপন্যাস পড়ে, নাটক চলচ্চিত্র দেখে, তাঁর অনেকটা অকালে চলে যাওয়াতে শোকাভিভূত হয়েছেন। বাংলা ভাষায় কথা বলেন এমন আরো লাখো লাখো মানুষ পাওয়া যাবে যারা হুমায়ুন আহমেদ কে জানেন না এবং আশি নব্বই বছরের জীবন যাপন শেষে মারা যাবার পূর্ব পর্যন্তও জানবেন না লোকটি কে ছিল। কিছু বিষয়ে জানাজানি বা বুঝাবুঝি হওয়ার একটা লেবেল এখানে পরিস্কার। ই=এমসি স্কয়ারের ফায়দা পাচ্ছে এমন মিলিয়নজ মানুষ এই দুনিয়ার আলবার্ট আইনস্টাইন কে জানে না। এইরম জানা অজানার পরিপ্রেক্ষিত সভ্যতার যুগে যুগে থাকে। তবে সদ্য প্রয়াত হুমায়ুন আহমেদকে বাংলা ভাষার লাখো লাখো মানুষ ভালোবাসে না- এমন তথ্য নিশ্চিত পাওয়া যাবে না।ইতোমধ্যে কিছু পন্ডিত এবং অপন্ডিত কর্তৃক লিখিত হুমায়ুন আহমেদ কোন মাপের লেখক বিষয়ে রচনা বর্তমান লেখকের নজরে পড়েছে। অতি ভক্তির ব্যাপারটাও দেখা গেছে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে নীচের কথাগুলো পেশ করা হচ্ছে।

অ.
‘বাজারি সাহিত্য’ ‘সিরিয়াস সাহিত্য’ ‘সস্তা সাহিত্য’ ‘দামী সাহিত্য’ ইত্যাকার লেবেল যোগ করে কিছু কথা প্রায়শ দেখা যায়। ‘সিরিয়াস সাহিত্য’ হিসাবে যা চিহ্নিত হয়, সেই পাঠবস্তুকেও ‘ধোলাই’ দিতে দেখা যায়। তার মানে এই ক্ষেত্রে ‘ধোলাই’ জিনিসটার মা বাপ নাই। হুমায়ুন আহমেদ নাকি বেশি ‘বাজারি সাহিত্য’ লিখেছেন মর্মে তর্ক তোহমত সাহিত্যের বাজারে দেখা যায়। প্রশ্ন জাগে, ‘অ-বাজারি সাহিত্য’ রূপে কোনো মাল সাহিত্যের বাজারে পাওয়া যায় কি না? যদি পাওয়া যায় সেটা ‘অ-বাজারি সাহিত্য’ হয় কেমনে? এবং প্রশ্ন জাগে, ‘অ-বাজারি সাহিত্য’ যা চিহ্নিত হয়, তা কি ‘এ্যাবসলিউট ভ্যল্যুলেসনেস’ (absolute valuelessness) এর বাইরে থাকা চির অমর অজর অক্ষয় অব্যয় কোনো আজব চিজ? সাহিত্য শিল্প অর্থ ব্যবস্থার বাইরের কিছু নয়।

আ.
বারো মাসে অনেক ঘাটতে ঘাটতে বারো পৃষ্ঠা লিখতে পারলেই ‘সিরিয়াস সাহিত্য’ হয়, নইলে দ্রুত গতিতে আসে কেবল ‘বাজারি সাহিত্য’ এমন কথা বাজারে ছাড়বার পেছনে মতলব আছে বুঝতে হবে। ওই ‘সিরিয়াস সাহিত্যে’র আবার ‘এ্যাবসলিউট ভ্যালিউ’ ধরবার কোনো মাপকাঠি নাই। বুঝবার বিষয় হলো ক্লাসিক কখন ধরা দেয় তা সঠিকভাবে বলা সম্ভব না। এ ব্যাপারে একটু বিশদ কথা পরে আসছে।হুমায়ুন আহমেদ দুরন্ত গতিতে বইয়ের পর বই, নাটকের পর নাটক ইত্যাদি লিখেছেন। জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অমন দুর্বার গতিতে একটার পর একটা কবিতা গান গল্প প্রবন্ধ ইত্যাদি লিখেছেন। নজরুলের রচনাকে ব্যঙাইতেন মোহিতলাল মজুমদার, সজনী কান্ত, গোলাম মোস্তফা প্রমূখেরা। (হুমায়ুন আহমেদের কিছু বই হালকা স্বাদের বর্তমান লেখকও জানেন। কিন্তু তাঁর কাজের নানামূখী গুণসম্পন্ন ম্যাগনেটিজম প্রবল যুগ নিয়ন্ত্রণকারী তা মানতে হয় এবং এই গুণ এই সময়ের সাহিত্যাঙ্গনের জন্যে খুব বড় মাপের কিছু।)

ই.
সব মিলিয়ে যুগে যুগে শিল্প সাহিত্য আসে নানা রূপে ‘ফ্রেশ এ্যাকসেস টু রিয়েলিটি’ দেবার জন্যেই। ‘স্টাইল অব এ্যাক্সপ্রেশন’ কোনো স্থির সংগাবন্দী থাকে না। পুরাতন প্রেম নতুন হয় কারণ সে-প্রেম চিরকালিন। নব নব রূপে ফোটে, ঘ্রাণ ছড়ায় আকৃষ্ট করে, সমাদৃত নিদিষ্ট সময় পর্যন্ত। কিছু থাকে অপেক্ষাকৃত বেশি সময় পর্যন্ত। বিশ হাজার বছর আগে পৃথিবীতে শিল্প চর্চা ছিল না- এ কথা প্রমানসহ বলা সম্ভব না। বিশ হাজার বছর আগে শিল্পের স্বরূপ কেমন ছিল তাও বলবার সাধ্য নাই। বিশ হাজার বছর পর ‘আধুনিক শিল্পের গৌরব’ অক্ষুন্ন অমর অক্ষয় থাকবে – তা নিশ্চিত বলা যাবে না। মোহানজোদাড়ো হরপ্পা ব্যবিলনীয় মায়া সভ্যতার ছিটেফোটা জানে মাত্র প্রত্নতাত্বিক গবেষণার দৌলতে। সিংহভাগই জানবার সম্ভাবনা নাই। তাহলে নানা প্রকার ইজম আর শিল্পের বড়াই বহন করে কত দূর যেতে পারে মানুষ! যুগে যুগে চর্চার ফাঁকে ফাঁকে কিছু নতুন সত্যের ঝিলিক দেখা যায়।

ঈ.
A little knowledge that acts is worth infinitely more than much knowledge that is idle. -Khalil Gibranহ্যাঁ, আমাদের হুমায়ুন আহমেদ’র বেশি বইয়ে সামান্য নলেজ পাওয়া যাবে, কিন্তু ওই সামান্য নলেজ আনন্দরস যুগিয়েছে অসামান্য। হুমায়ুন পাঠকদের প্রধান কথা- ‘মন ভালো করে দেয় তাঁর বই।’
খলিল জিবরানের আরেকটা কথা হলো, “Half of what I say is meaningless; but I say it so that the other half may reach you.” এমন হয়। সাহিত্য শিল্প বানাবার ক্ষেত্রে অজস্র মিনিংলেস থাকে মাঝে মধ্যে সঙ্গে থাকা বাদবাকীর মিনিংয়ের জন্যেই। শেইক্সপিয়র যা লিখেছেন তার সবটুকু মহামুল্যবান মহাসুন্দর বিবেচনা করাটাই মহাভুল। ক্লাসিক সাহিত্য-শিল্পের একটা নির্দিষ্ট ওজন আছে। ক্লাসিকের প্রেমরস আর অক্লাসিকের প্রেমরস এক না।কিন্তু ক্লাসিক চেতনা যদি সমালোচকের চিন্তার ভেতরে এলিট ভাব নিয়ে আসে যা বুর্যোয়া চিন্তারই অন্য রূপ, তাহলে বুঝে নেয়া সহজ যে, প্রলেতারিয়েতের পক্ষে থাকা সমালোচক স্বেচ্ছায় অথবা তার নিজের অজান্তে অন্য রূপে বুর্যোয়া ধারণার তাবেদারি করছে। তাই ‘সিরিয়াস সাহিত্যে’র পক্ষে কথা বলার সময় ‘ক্লাসিকের রাজনীতির’ শিকার হতে হয় কি না সতর্ক রাখতে হয়। ক্লাসিক নিজে রাজনীতি করে না। ক্লাসিককে ব্যবহার করে উদ্ভট রাজনীতি করা হয়। ক্লাসিক কারো কাছে ধীর গতিতে আসতে পারে, কারো কাছে আলোর গতির চাইতে বেশি গতিতে এসে ধরা দিতে পারে। ক্লাসিকের স্বভাবটাই এমন। ক্লাসিকের মতিগতি ধরা যায় না। হুমায়ুন আহমেদ বিস্ময়কর আনপ্রিডিক্টেবল। তার সমগ্র সাহিত্য কর্মে ক্লাসিক আর অক্লাসিকের সম্পর্ক বিষয়ক একটা বিনির্মাণ চিন্তা ধরবার সুযোগও আছে।

উ.
হুমায়ুন আহমেদ নিজস্ব একটা রাজনীতি চিন্তা লালন করতেন। দেশের দলীয় রাজনীতির কাছে নিজেকে বিক্রি করেন নি। কোনো রাজনৈতিক দলের তোতাপাখি বা নিবেদিত প্রাণ চামচা হয়ে জোরপূর্বক জনপ্রিয়তা এবং উন্নতির বিদঘুটে স্বপ্নেও ছিলেন না। যদিও তাঁর জীবন চর্চার সময়টাতে দেশের রাজনৈতিক বিভাজন এবং ‘রাজনীতি ছাড়া জীবন অচল’ ধারণার স্রোতে ভেসে গেছে বহু উজ্জল প্রতিভা। এ ব্যাপারে আরেকটু ধোয়া মোছা কথা এভাবে বলা যায়, দলীয় রাজনীতির ধান্ধাবাজি আর ব্যক্তির নিজস্ব পছন্দে চলতে থাকার চেতনাকে সমুন্নত রাখতে পারবার সুযোগ পাওয়া এক নয়। হ্যাঁ, দলীয় রাজনীতি মানেই পাইকারিভাবে খারাপ কিছু না। দলের ভেতরে খারাবি বহুত কিন্তু কিছু ব্যক্তি আন্তরিক ও সহজ, এমনও হয়। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে একটা কৃত্রিম বাস্তবতা এমন যে, অমুকের শোক সভায় বা তমুক নেতার জানাযায় না গেলে অন্য নেতৃবৃন্দের অপ্রিয় হওয়া বা দলের প্রতি আনুগত্য নেই ধরে নেয়ার একটা ব্যাপার আছে। তাই অনিচ্ছা সত্বেও লোক দেখানো দরদ বা কান্নার ভঙ্গি করে।কিন্তু হুমায়ুন আহমেদের জন্যে বিশাল ভালোবাসার স্রোত কোনো রাজনৈতিক অঙ্গিকারের কারণে নয়। মধ্যাহ্নের প্রখর রোদ উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ ভালোবাসার টানে ফুল হাতে ভেজা চোখে এসেছে শহীদ মিনারে প্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে। আর লাখো লাখো মানুষ দেশের ভেতরে বাইরে টেলিভিশনের সামনে শোকাভিভূত হৃদয় নিয়ে লাগাতার চার দিন হুমায়ুন আহমেদ বিষয়ক খবর দেখেছেন। ভালোবাসাবোধের অমন বিশালতা কোনো শিল্পী-সাহিত্যিকের জন্যে সব সময় আসে না কোনো জনপদে। কখনো কখনো আসে কর্মের দৌলতে। তিনি নিজে দৌলতবান হয়েছেন, বিপূল সংখ্যক মানুষের হৃদয় জয় করেছেন, দেশের সাহিত্য সংস্কৃতিকে দৌলতবান করেছেন। এবং রোদ বৃস্টি জোছনার সাথে সখ্যতা রেখেও এই অঞ্চলের মধ্যবিত্ত শ্রেণীকে বিশেষভাবে উপলব্ধিতে আনার মাধ্যমে তিনি যে-সব কাজ সম্পন্ন করেছেন, তা দল মত ধর্ম নির্বিশেষে এই অঞ্চলের লাখো লাখো মানুষকে স্পর্শ করেছে।

ঊ.
দ্বিতীয় বিয়ের কারণে একটা পারিবারিক ভালোবাসার সংকট এসেছিল হুমায়ুন পরিবারে। এ নিয়ে মিডিয়াতে নানান কথা শোনা গেছে। একেবারে তলিয়ে দেখলে হয়তো কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা অসম্ভব। ধরায় সকল প্রাণ শান্তি খোঁজে। হয়তো ভুল কারো আছে। জানা গেছে, হুমায়ুন আহমেদের প্রথম স্ত্রী গুলতেকিন মৃত্যু সংবাদ পেয়ে বিষাদগ্রস্ত হয়েছেন, কেঁদেছেন। গুলতেকিনের তরফের সন্তানেরা ব্যকুল হয়ে ছুটে এসেছেন বিমান বন্দর। বাবার মৃতদেহ আসছে। এমিরেটস এয়ারলাইনের বিমান থেকে লাশ বের হলো, হুমায়ুন আহমেদের আদরের কন্যা শীলা আহমেদের মর্মস্পর্শী কান্না, এতো বিশাল দুঃখরস এনেছিল যেনো সমগ্র বাংলাদেশ কাঁদছে! আহারে এতো মায়ার বাবা আসছেন লাশ হয়ে! লাখো লাখো টিভি দর্শককে স্পর্শ করেছে প্রিয় মেয়ের মায়া প্রিয় বাবার জন্যে! ‘আগুনের পরশমণি’তে অভিনয় করেছিল ফেরেশতার মতো ছোট্ট মেয়ে শীলা। সন্তানদের সাথে অকৃত্রিম ভালোবাসার সম্পর্ক ছিলো কথাশিল্পী হুমায়ুন আহমেদের।
ভালোবাসা নিজেই এক সর্বপ্লাবি শক্তি। স্বতঃস্ফুর্তভাবে ভালোবাসা প্রকাশ পেলে তা রাজনৈতিক শক্তির চাইতেও প্রবল হয়।

ঋ.
জনপ্রিয় কাউকে নিয়ে কোনো জনপদে কিছু অতিরিক্ত ভক্তি প্রকাশ পায়। অতিরিক্ত যে অতিরিক্ত তাও প্রকাশ পায়। কথাশিল্পী ও নাট্যকার হুমায়ুন আহমেদের কিছু বই খুব ভালো হওয়ার কারণে বা তাঁর জনপ্রিয়তার প্রশংসা করার অর্থ এই নয় যে, বঙ্কিম চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে শুরু করে মানিক বন্দোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ হাসান আজিজুল হক প্রমুখকে ডুবিয়ে ফেলা। তারা তাদের জায়গায় অমিলন আছেন। হুমায়ুন আহমেদ কেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজের মতো বা তারাশংকরের মতো লিখলেন না- এমন প্রশ্ন রাখবার কোনো মানে হয় না। এবং কোনো দর্শনের ভেতর দিয়ে কেবল দেখে কারো শিল্প-সাহিত্যের বিবেচনা করাও হাস্যকর। সৃষ্টি বৈচিত্রের পঠনে এক সত্য এই যে, যার যা হবার কথা সে তা-ই হয, হয়ে যায়। কেউ চেয়ে হয়, কেউ না-চেয়ে হয়, আসল হাকিকত নাগালের বাইরে।

—————————————————————-
রচনাটি বাংলানিউজ২৪ডটকম’র শিল্প ও সাহিত্য পাতায় প্রকাশিত।