ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

ব্যক্তি মানুষ, সামস্টিক মানুষ। ব্যক্তি মানুষের পছন্দ অপছন্দের ভিন্নতার কারণে একা ছুটতে থাকে সে জীবনের পথে পথে। ব্যক্তি মানুষের মধ্যে সামষ্টিক মানুষের ঐক্যের দরদ ক্রিয়াশীল থাকা সত্বেও ব্যক্তিক সীমাবদ্ধতার কারণে সমষ্টির সাথে যুক্ত থেকেও একা। দলবন্দী হয়েও একা। আবার একা থাকবার বিপদ থেকে বাঁচবার জন্যে অবলম্বন খোঁজে সম্মিলিত থাকবার মধ্যে।

বড় মাপের কবি, কথাশিল্পী, চিত্রশিল্পী, চিন্তাবিদ, ধর্মপণ্ডিত, রাজনীতিবিদ প্রমুখের কাছ থেকে সাধারণ মানুষেরা বিদঘুটে বিভেদ, বৈষম্য, রেষারেষি আশা করে না। ভালোবাসা আশা করে, প্রশান্তি আশা করে, সংকট উত্তরণের উপায় আশা করে, বস্তুনিষ্ঠ সমাধান আশা করে।

কবি-শিল্পী, বিজ্ঞানী, দার্শনিক, ডাক্তার-বৈদ্য, এই ধরণের বিশেষ মেধাবী কর্মবীর যারা, এবং বহুবিধ গানের পাখি, এরা সবাই সমাজে চালু থাকা রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সাথে কতোটা মনেপ্রাণে সম্পর্কযুক্ত অথবা যুক্ত থাকাটা মূখ্য বিবেচনায় এনে, কোনো একটা রাজনৈতিক দলের ধারণা বন্দী হয়ে, ওই কর্মবীরদের বিরুদ্ধে বিষাক্ত কথা রচনার প্রয়োজন আছে কী? মানুষের জীবনে রাজনীতি আছে এবং নাই ব্যাপারটা দেখা যাক।

বাংলাদেশের জাতীয় পাখি দোয়েল কি কোনো রাজনৈতিক দলের গান গায়? দোয়েল কেন কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থ সংশ্লিষ্ট অঙ্গিকারের প্রশস্তি গাইবে? আবার সকলের জন্যেই দোয়েলের বংশ পরম্পরা বিদ্যমান এমন বুঝে নেয়ার যথেষ্ট কারণ আছে। তাহলে দোয়েলের নৈতিক অবস্থান কী (দোয়েল প্রতীক বিবেচনায় রেখে)? কোনো রাজনৈতিক দলের পোষা পাখি হলো না বলে দোয়েল কি নীতিহীন? দোয়েল যে-কারণে দোয়েল, ওই কারণের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় কী দোয়েলের নৈতিক অবস্থান থাকবার ব্যাপারটি?

পৃথিবীর মানচিত্র রাজনৈতিক যেটি, ওটাতে দেশের পরিচয়, সীমানাসহ, উল্লেখ থাকে। পৃথিবীর জাতি-রাষ্ট্র গুলোর অর্থনীতি দুর্বল থাকার কারণে, এবং যাদের সবল, তাদের সবল হওয়ার কারণে ‘সার্বভৌমত্ব’ যথাযথ অবস্থায় নেই। সার্বভৌমত্বের ধারণার উপর প্রায়শই খবরদারী করে ক্রেতা এবং বিক্রেতার নির্ভরতা। জাতিসংঘ নামের প্রতিষ্ঠানটি কিছুদিন আগে একটি ‘নতুন জাতি’র জন্ম ঘোষণা দিয়েছে। সেই ‘নতুন জাতি’র দেশটির নাম ‘দক্ষিণ সুদান’। সাতাশ বছর গৃহযুদ্ধ শেষে ‘মুক্তি’ পেয়েছে দক্ষিণ সুদানের মানুষ। তো, এই ধরণের মুক্তি, এই ধরণের জাতীয়তার বিশুদ্ধ পরিচয়টা কী? দেশভিত্তিক না ভাষাভিত্তিক না রাজনীতিভিত্তিক? নাকি ধর্মভিত্তিক কিংবা নৃগোষ্ঠী ভিত্তিক? অর্থনৈতিক চাতুর্য্য ভিত্তিক?

রাজনৈতিক পৃথিবীর দেশগুলোর নৈতিকতা কিংবা সার্বভৌমত্ব পর্যুদস্ত হয় কেন অর্থনৈতিক ধারণাদের কাছে? গরীব দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব কচুপাতার পানির মতো কেন? তলিয়ে দেখা দরকার। হোয়াইট হাউসের আশির্বাদ পেতে সবাই প্রকাশ্যে এবং গোপনে ধর্ণা দ্যায় কেন? বুঝা দরকার। সকল প্রকার জাতীয়তাবাদী চেতনা প্রাচুর্য্যের তৃষ্ণার কাছে আত্মসমর্পণ করে কেন? জানা দরকার। ব্যবসা ধারণার কুদরতিও তো কম না। ব্যবসার উছিলায় ‘বৈরী সম্পর্কের’ দগদগে বিতৃষ্ণাও উবে যায় কেন?

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বানানোর কিংবা শনাক্তকরণের গুরুদায়িত্ব(?) যারা পালন করেন রাস্ট্র এবং আন্তঃরাস্ট্রিয় প্রেক্ষাপটে, তারা কি বুঝতে পারেন, এই কর্ম করণে নিজেরাই নিজেদের ‘টার্মিনেটর’ হয়ে যান? এও সত্য, পলিটিক্সই পলিটিক্সের টার্মিনেটর। এর তাত্পর্য কী? তাত্পর্য নাই এমন নয়। রাজনীতি আছে ছিলো থাকবে। রাজনীতির সুবিধা অসুবিধা দুই-ই আছে। রাজনীতির দৌলতে বিরোধ থামানো এবং বিরোধ লাগানো হয়। জান মাল রক্ষা করা হয়, লুটও করা হয়। রাজনীতি অসহায়কে অবলম্বন দ্যায়, রাজনীতি অসহায়কে আরো অসহায় করে।

রাজনীতি মানুষের মনোজগতের একটা স্তরে থাকে এবং জীবনের কাজ-কামের সাথে জড়িয়ে থাকে। কুরুক্ষেত্রে রাজনীতি, কারবালায়ও রাজনীতি, ভ্যাটিকানেও রাজনীতি। ঘরে রাজনীতি বাইরে রাজনীতি। রাজনৈতিক শত্রুতার কারণে প্রেরীত পুরুষ মসিহ কয়েকজন সাথী নিয়ে গভীর জঙ্গলে আত্মগোপন ও বিপর্যস্ত। রাজনীতির দুশমনি একের পর এক ধেয়ে আসার কারণে নবীকেও যুদ্ধের ময়দানে রক্তাক্ত হতে হয়! ভাই বিভীষণের কারণে রাবণ লংকাচ্যুত হওয়াতেও রাজনীতির ইশারা। ব্রিটিশ তাড়ানোর জন্যও রাজনীতি করতে হয়েছে। ভারত মুক্ত হওয়া, পাকিস্তান বাংলাদেশ জন্ম দেয়ার জন্যও রাজনীতি করতে হযেছে। কিন্তু ভালোবাসার সংগীত শুনে, কবিতা পড়ে, চিত্রশিল্পের দিকে তাকিয়ে সাইকোথেরাপী নেয়ার সময়, অথবা প্রিয়জনের জন্য গভীর গোপনে অশ্রুভেজা হওয়ার মধ্যে কি রাজনীতি আছে? দিন রাত পরিশ্রম করে আপেক্ষিক তত্ব বের করে আনার জন্য আইনস্টাইনকে রাজনীতির পাঠ নিতে হয় নি।

কার্ল মার্কস, হেগেল, ক্যান্ট এবং এই মর্যাদার ব্যক্তিদেরকে কিছু মানুষ গালি দ্যায় রাজনৈতিক ভ্রান্ত ধারণার ভিতর দিয়ে তাদেরকে দেখার কারণে। স্টিফেন হকিংকে নিয়ে রাজনীতিঅলারা টানাটানি করেন। হকিং নিজেও ‘মাল কামানো’ এবং জগতবাসীকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্যে কসমোলজির হাইপোথিসিসকে রাজনীতির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে মানুষের নৃত্য দেখেন। বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘ, বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার প্রধানেরা রাজনীতির চালের সাথে একমত হয়ে চিয়ার্স বিনিময় করেন। ভারতের পাকিস্তানের মুসলমানেরা কাশ্মিরের মুসলমানদের জন্যে যতোটা দরদ জাহির করে, ফিলিস্তিন বা আফ্রিকার বিপন্ন মুসলমানদের জন্যে ততোটা উদ্বেগ প্রকাশ করে না কেন? রাজনীতির হিসাবে ভুল হবে বলে? জায়েন্ট বহুজাতিক কোম্পানি এ্যাক্সনমোবিল আরব উপসাগরের তেল নিয়ে তেলেসমাতি কব্জায় রাখতে রাখতে ক্যাসপিয়ান সাগর তলার বিশাল তেল ভান্ডার নিয়ন্ত্রণ করবার ব্যবস্থা ইতোমধ্যেই করে ফেলেছে রাজনীতির কারণেই। আফ্রিকা মহাদেশের মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ অনাহারে অর্ধাহারে থাকতে থাকতে জ্বরাগ্রস্ত হচ্ছে বছরের পর বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতির কারণে। আফ্রিকার সোনা, হিরা, প্লাটিনাম, তেল কারা নিয়ে যাচ্ছে নির্বিচারে? আফ্রিকার সম্পদে কি আফ্রিকার অভাব দূর করা যায় না? যায়।
তবু রাজনীতিই জগতের একমাত্র বাস্তবতা নয়। রাজনীতির চিন্তায় না-ডুবে অগণন কাজ মানুষ করে চলছে যুগ যুগ ধরে।

সাবএটোমিক পার্টিকল এর আচরণ বুঝার জন্য কোয়ান্টাম লিপ উদ্ভাবক ম্যাক্স প্লাংক, হেইসেনবার্গ, শ্রোয়েডিংগার কোন রাজনীতির মতাবলম্বি ছিলেন তা জানার প্রয়োজন নেই। ই=এমসি স্কয়ার এর ফায়দা লুটবার জন্য আইনস্টাইন কোন ধর্মের মানুষ তা নিয়ে গবেষণা বা গলাবাজি করার দরকার নেই। কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন প্রমুখ বিজ্ঞানীর বড় পরিচয়, তারা বিজ্ঞানী। লিওনার্দ দা ভিঞ্চি’র মোনালিসার বিস্ময় দেখতে, বিথুভেন’র সিম্ফনিতে ডুব দিতে, গ্যায়টের ‘ফাউস্ট’ আত্মস্ত করার সময়, কিংবা মিল্টন অধ্যয়ন করার সময়, উনারা কোন ধর্মের, তাঁদের সমকালে কোন রাজনীতির সাথে ছিলেন, কেন আমলা ছিলেন, কেন রাজকবি ছিলেন, তা নিয়ে মাথা ঘামানোতে উপকার নেই। আমাদের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর জীবদ্দশায় ব্রিটিশ রাজনীতি বা ভাষার রাজনীতির ব্যাপারে যে-সব মত দিয়েছিলেন (যেমন, নিখিল ভারতের রাষ্ট্রভাষা হিন্দি করার পক্ষে মত দেয়া, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা, ভারতীয় জাতিয়তাবাদে সমর্থন দান ইত্যাদি) ওগুলোকে সামনে এনে, তাঁর শিল্প ভাবনাকে এবং রবীন্দ্রনাথে গানে কবিতায় প্রস্ফুটিত স্কুল অব উইজডমকে ছোট করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ,শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী প্রমুখের বড় পরিচয়, তাঁরা উজ্জলতর কবি, শব্দকারিগর, শব্দশিল্পী। তাঁদের ত্রুটি-বিচ্যুতির চাইতে অধিক ওজন তাঁদের সৃজনশীল কাজগুলোর নয় কী? কারো প্রতি প্রচন্ড ঘৃণা আর কাউকে দেবতার আসনে বসিয়ে পারসনালিটি কাল্ট করার কোনো মানে আছে কী?

জিন্নাহ আর নেহেরু’র জিদাজিদিতে ধর্মকে ব্যবহার করে ভারত ভাগ করে পাকিস্তানকে আলাদা করা হলো। পাকিস্তানের শাসকেরা, যারা, পূর্ব পাকিস্তানের মানুষদের অধিকার বঞ্চিত করলো, শোষণ করলো, ক্ষমতাবলে নাস্তানাবুদ করতে চাইলো, তারা কোনো ধর্মাবলম্বি মানুষ না। ওরা ধর্ম ব্যবসায়ী। একাত্তুরে স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় ওইসব ধর্মব্যবসায়ীর পক্ষে যারা ছিলো, তারাও ইচ্ছাকৃত ধর্মব্যবসায়ী অথবা ভুল ব্যাখ্যাসম্বলিত ধর্ম চেতনার আবেগে ডুবে ছিলো। জিন্নাহ’র টু নেশন থিওরীর কেন্দ্রীয় চিন্তায় ধর্মভিত্তিক জাতীয়তার চেতনা। এই চেতনার দোহাই দিয়ে ক্ষমতাবান হওয়ার সুযোগ হাত ছাড়া করে নি জিন্নাহ। অথচ ব্যক্তি জিন্নাহতে ইসলাম অনুসরণ খুব কম ছিলো। আর টু নেশন থিওরী কী ইবনে আরাবী, রুমী, সাদী, হাফিজ, ইকবাল, ও কাজী নজরুল ইসলাম প্রমূখ কর্তৃক বিন্যাসিত ‘সকলেরে ভালোবাসিবার’ ধারণা থেকে উত্কৃষ্ট বা প্রয়োজনীয়?

দেখা গেছে, আরোপিত কিংবা আচ্ছাদিত রাজনৈতিক অঙ্গিকারের ধারণাসমষ্টির ভেতর দিয়ে দেখে মানুষের তত্পরতার বিচার করলে তা খন্ডিত, পক্ষপাতদুষ্ট হয়। মানুষের রাজনৈতিক পরিচয়টা একমাত্র পরিচয় নয়। মানুষে রাজনীতি আছে আবার নাইও। এ্যারিষ্টটলের মানুষ রাজনৈতিক প্রাণী হলেও অলমোস্ট সকল সভ্য মানুষ ‘পলিটিক্স অব লাভ’ করতে জানে। ভালোবাসবার রাজনীতি যাতে প্রতিপক্ষের প্রতি প্রেমশুন্য না-হয়, সেদিকে চেতনা জেগে থাকলে, মানুষের সংকটের পরিমান কমে আসবার আশা করা যায়। অতঃপর মানুষের ভালোবাসার জয় হোক। ‘ভাবের দেশে চল রে মানুষ ধ্যানের দেশে চল…..মন রঙে প্রেম তরঙ্গে দিলের কপাট খোলো….’

***
৮/০৭/২০১১
ইউএই