ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

তাত্পর্যের দাবী রাখে এমন গল্পাংশের গল্পটি পৃথিবী পৃষ্ঠে মুদ্রিত। আমি তারে একটা ভাষা বিবৃতির আদল দেই।

তার আগে বলি, ভয়ংকর দৈত্য টাইফুনের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্যে সোনালী যৌবনের দেবী আফ্রোদিতি মাছ রূপ ধারণ করেছিলেন। এবং Vishnu transformed himself into a fish (Matsya) to save the world from a great flood. In this form, he guided king Manu’s boat to safety. সে থাক। অযুত বৈশিষ্ট্যের মাছ আছে জলের গভীরে। মাছেদের মধ্যে এক প্রকার মাছ আছে স্রোতের বিরুদ্ধে লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটবার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যা হয় হবে ওরা লাফাবেই তাদের স্বপ্ন মোতাবেক। এই গল্পে সালমন মাছেদের স্রোতের বিরুদ্ধে চলার প্রবণতার কথা বলবো। হতে পারে এই প্রবণতাই তাদের নিয়তি।

আর হ্যাঁ অন্যতম তথ্য এই যে, মানুষের আসলে একটি গল্প বলার ক্ষমতা নেই। গল্পাংশকে গল্প বলি আমরা। যেমন, বনের অংশকে বন বলি, দেশের অংশকে দেশ বলি, সময়ের অংশকে একটা নির্দিষ্ট সময় বলি। গল্প তো একটিই, জগতমন্ডলের গল্প। তার ভেতর ইউনিভার্স নয়, অমনিভার্স। এর ভেতরে সকল প্রসঙ্গ গ্রন্থিত। হয়তো এভাবে বলতে পারি, এক টুকরো তাত্পর্যের গল্প। কিংবা একটি প্রসঙ্গের কণাতে স্ফুট চিত্রের গল্প।

সালমন মাছেদের আত্মসম্মানবোধ প্রখর। তাদের চলাফেরাতে এক প্রকারের অহং বিদ্যমান। আপনি বলতে পারেন তা এক ধরণের এ্যালিটিজম। উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অববাহিকায় তারা প্রধানত থাকে। তাদের জন্মস্থান ভূপৃষ্ঠের উত্তর গোলার্ধ। সালমন মাছের শরীরের খোশবু অসাধারণ। ওরা মিঠা পানিতে জন্মে, সমুদ্রে গিয়ে কিছু কাল কাটায় এবং সঙ্গম প্রজননের জন্যে ফিরে আসে আবার সেই নির্দিষ্ট জায়গায় যেখানে তারা জন্মেছিলো। সবাই ফিরে আসে না, কেউ কেউ। যারা ফিরে আসে না, তাদের কি হয়, তারই বয়ান দেবো এখানে।

সবুজ উপত্যকার তলদেশে নদী আকারের জল প্রণালী উত্তর গোলার্ধের কোনো এক দেশের। অগভীর জলাধার। নদীর মতো দেখালেও নদী নয়। স্তরে স্তরে প্রবল বেগে পানি নামছে নীচের দিকে কিছুটা জলপ্রপাতের মতোই। বাদামী রঙের কয়েকটি ভালুক টের পেলো, তারা ক্ষুধার্ত এখন। মাছ খেতে হবে। অনেক স্বাদের মাছ সালমন খাবে। টুকটুক লাল শরীর সুঘ্রাণযুক্ত মাছ। স্রোতের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে ভালুকেরা।

ভালুকেরা জানে, এই স্রোতের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তাদেরকে মজার খাবার খেতে হবে। এই আধা মিটার উচ্চতার স্রোত এমন নয় যে, ভালুকদের জীবন বিপন্ন হবে এতে। দেখা যাচ্ছে, একটা নিশ্চিন্ত ভাব তাদের চোখে মুখে। তারা জানে, এখানে কিছুক্ষণ দাঁড়ালেই তাদের মুখের উপর লাফিয়ে এসে পড়বে স্বেচ্ছায় মজার খাবার।

ওদিকে মাঝারি আকারের এক পাল সালমন তাদের ট্রেডিশন মোতাবেক স্রোতের বিপরীত দিকে লাফিয়ে লাফিয়ে মিঠা পানি থেকে সমুদ্রের পানিতে যাওয়ার কার্যক্রম শুরু করেছে। বলা যায়, ইতোমধ্যে কয়েকটি পর্যায় অতিক্রম সম্পন্ন করেছে।
মাছগুলো বেশ আনন্দেই লাফ দ্যায় সমুদ্রে যাবার স্বপ্ন মাথায় নিয়ে। কিন্তু এটুক তাদের বুঝে নেবার সাধ্য নেই যে, তাদের কেউ কেউ এভাবে আনন্দে লাফ দিয়ে সরাসরি ধরা দিচ্ছে ভালুকের মুখের হা-তে। ভালুক খপ করে কামড়ে ধরে পায়ের নীচে ফেলে সালমনের মাথা খেতে শুরু করে প্রথমেই। মাথা খায় এবং একই সাথে মাথার স্বপ্নও খায়। সালমনদের কেউ কেউ অবশ্য কয়েকবার লাফ দিয়েও ভালুকের মুখে পড়ে না, তার গন্তব্যের ছুটতে পারে মহানন্দে। কেউ কেউ অনিচ্ছাকৃত আঘাত লাগায় ভালুকের নাকের উপর। আঘার খুব সামান্যই লাগে ভালুকের। এবং মাছ ফিরে আসে সেই যায়গায় যেখান থেকে লাফ দিয়েছিলো। স্রোতের বিপরীতে যাবার জন্যে লাফ দেবার পাশাপাশি তাদেরকে সতর্ক থাকতে হয় যাতে স্রোত নীচের দিকে দূরে নিয়ে না যায়। কেউ কেউ ভালুকের খাবার হয় না এই কারণে যে, তখন ভালুক থাকে না স্রোতের মুখে। জীবনের সময়ের একটা ক্ষুদ্রাংশের ব্যবহার করে ভালুক ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্যে স্রোতের মুখে আসে। আর স্রোতের মুখে আসলেও সকল সালমনের মাথা ও স্বপ্ন মজা করে খাওয়ার সাধ্য নাই ভালুকের।

মাছের অনেক প্রতীকি অর্থ আছে। একটি হলো, দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এবং জীবন প্রবাহ। এবং উল্লেখ করা মন্দ নয় যে, পৃথিবীপৃষ্ঠের শতকরা একাত্তুর (৭১) ভাগ সমুদ্রবেষ্টিত। যেটুক মাটি আছে তাতেও রয়েছে নদী হাওর হৃদ পুকুর দীঘি ঝিল ইত্যাকার মিঠা পানির স্থান। সমুদ্রে আছে মাছ বহুবিধ এবং মিঠা পানিতেও আছে মত্স অযুত প্রকারের। পৃথিবীতে মাছদের জন্যে যতোখানি জায়গা বরাদ্দ ততোখানি জায়গা মানুষের জন্যেও নাই! মাছদের মধ্যে প্রেমিক অ-প্রেমিক, খুনি, সন্ত্রাসী, এ্যালিট অ-এ্যালিট, জাতীয়তাবাদী অ-জাতীয়তাবাদী এবং অজস্র রঙ চরিত্রের মাছ আছে।

ভালুকদেরও অনেক প্রকার প্রতীকি অর্থ আছে। ওরাও মূল্যবান। বাদামী ভালুক শক্তির প্রতীক জার্মানি ও ফিনল্যান্ডের জাতীয় পশু। এই বাদামী ভালুকই সালমন খায় আনন্দে।
কিন্তু ভালুক কি কারণে ভালুক এবং সালমন কি কারণে সালমন আমি জানি না। আমি ভাবছি, ভালুকেরা আসলেই কি সালমন মাছদের খাচ্ছে, না কি ভালুকেরা ভালুকদেরই খাচ্ছে! আমি বরং গল্পাংশের গল্পের ইতি টানি এখানে কারণ ২৪ ঘন্টায় এক দিন হিসেব করলেও ১০/১২/১৩ ঘন্টা পর সূর্য অস্ত গেলে দিনের অংশকেই আমরা রাত বলি, বলতে হয় বলে। মূলতঃ গল্পের কোনো ইতি নাই। আপনারা বন্ধুগণ যারা এই গল্পাংশ পাঠ করলেন, পাঠক থেকে পাঠকে সম্প্রসারিত আপনারা একটি আমোদিত দীর্ঘশ্বাস উপহার দিতে পারেন বিস্তারিত নীল আকাশকে।

-সারওয়ার চৌধুরী
ইউএই
১৪ আগস্ট, ২০০১১