ক্যাটেগরিঃ মুক্তমঞ্চ

 

দোয়েল তোমাকে ম্যাগপাই রবিন জানি আর ম্যাগপাই রবিন তোমাকে দোয়েল জানি। হতে পারে তোমার প্রতিটি শিসে লাল সবুজের প্রাণ পল্লবিত…

সকল প্রাণীদের (মাইক্রোঅর্গেনিজম এবং প্লান্টস) অস্তিত্ব বিবর্তনের জরিয়ায় প্রকাশ হওয়ার সাথে সাথে এটুকুও ঘোষণা হয় যে, তারা সকলেই জগতের পাঠক পাঠিকা। ওরা All living things have an ability to acquire materials and energy. সকল ছোট বড় প্রাণ প্রশ্নোত্তর চর্চাতে সুসংবদ্ধভাবে শামিল মনোযোগ সহকারে। তাদের কাছে রয়েছে ক্রমবর্ধনশীল তথ্য ভান্ডার (genetic information) কবিতা, কবিতার শব্দদের অন্য নাম এ্যানার্জি। যে-এ্যানার্জি ভাষার শব্দের বাক্যের ভেতর থেকে বের হয়ে আসে। সামগ্রিকভাবে ভাষাকেও বোধ হয় এ্যানার্জির অন্য প্রকার ইউনিসেল বলা যায়। কাউন্সেলর বা সাইকোথেরাপিস্ট ভাষার এ্যানার্জিকে কাজে লাগাতে পারছেন। বড় কবি হয়তো নিজেও জানেন না তাঁর ভাষার অধিকাংশ শব্দ বাক্যেরা বিস্ময়কর থেরাপিউটিক। তাঁর শব্দেরা দ্যায় অনিন্দ্য টাচ অব হিলিং।

তো বলি, ওই জগতের পাঠক পাঠিকাদের কেউ কেউ আক্ষরিক অর্থের চক্ষুহীন। তারা চোখহীন অথচ চক্ষুষ্মান প্রকৃতির সংসারে। এই পঠনে নকল কথা নয়, আসল কথা বলা যায়, পাঠ করবার ক্ষমতাযোগ্য প্রাণীদের মধ্যে মানুষ পাঠকের বিচার বিবেচনা ধর্তব্য। সাহিত্যের পাঠকও পাঠক, সাহিত্য যিনি পাঠ করেন না, তিনিও পাঠক। (সাহিত্য পাঠ করেন না এমন কেউ নেই; সংগার ধারণাবন্দী বোধ বিন্যাসে পক্ষপাতদুষ্ট শনাক্তকরণ ধরা হয়, অমুক সাহিত্যের পাঠক আর তমুক সাহিত্যের পাঠক না।) যে-শিয়ালটি ছাগল সন্তান খেয়ে এসে গর্তের ভেতর তার বাচ্চাদেরকে দুধ পান করায়, সেও কবিতার পাঠক। যে-বাজপাখি আকাশে ভাসমান অবস্থা থেকে নাদুস নুদুস শিয়ালটিকে কতল করে আকাশে উঠিয়ে নিয়ে দিগন্তে হারিয়ে গেলো, সেও কবিতা পাঠ করে। তো, কবিতার পাঠক মূল পঠন নয়, কিঞ্চিত শাখা বিস্তার মাত্র।

সাহিত্যে শিল্পে সামগ্রিকভাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ, কবিদের অবস্থান শীর্ষে অথবা অধিকতর গহনে। কবিদের মধ্যে বড় ছোট এবং বিভিন্ন ধরণের, (বহুবিধ গানের পাখিদের সমতুল হয়তোবা)শনাক্ত করবার সুযোগ আছে। দ্রষ্টা কবি আর অ-দ্রষ্টা কবি এক না। চোখের অধিকারি কাউকে দেখক বলা যায়, কিন্তু দ্রষ্টা বলতে হলে তালাশি হিসাবে আবির্ভূত হয়েছেন কি না দেখতে হয়। কোনো এক জঘন্য অন্যায়কারির প্রত্যক্ষদর্শি কবি যদি তার কবিতায় দন্ডদানের আবেদন রচনা করেন সুন্দর রুপকের সজ্জা দিয়ে অন্যায়কারির কর্মের পেছনের তালাশ না-নিয়ে, তাহলে তিনি দ্রষ্টা কবি’র রঙে রঞ্জিত হন নাই বুঝবার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। দ্রষ্টা কবিকে ‘অন্যায়কারি’র ভেতর বাহির পাঠ করবার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হয়। দ্রষ্টা কবিকে নিজের অজ্ঞতা পাঠ করবার ক্ষমতাবান হতে হয়। ফলে তিনি দন্ডদাতা বিচারককে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারবার সামর্থ রাখেন। কেননা তিনি অর্থের অর্থে ডুব দিতে জানেন। পাঠশালার মাস্টার, উচ্চবিদ্যালয়ের মাস্টার, মহাবিদ্যালয়ের মাস্টার, বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টার; ওরা সকলেই মাস্টার কিন্তু মাস্টারে মাস্টারে প্রভেদ আছে। ব্যতিক্রম হলো, কখনো কখনো পাঠশালার মাস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারকে ছাড়িয়ে যান, যখন যান তখন তিনি আর পাঠশালার মাস্টার থাকেন না, লোকসমাজ তাকে পাঠশালার মাস্টার হিসাবে জানা সত্বেও।

বড় কবি’র বহুবিধ রঙ-পরিচয় নিয়ে কিঞ্চিত পাঠ বুঝাবুঝি করা যায় ভাবছি।
রাজনীতির প্যাঁচের ভেতরে শ্রদ্ধা মহব্বতের সাথে আটকে রেখে বড় কবি বড় কবি প্রচার প্রপাগান্ডা সমাজ-ক্ষেতে চাষ দিলেও যে-কর্মফল সাধিত হয়, তা হলো, অমন প্যাঁচপনার ভেতর থেকে বড় কবি আদৌ বের হয় না। মারপিট দিয়ে বা মাইর-বঞ্চনার সাংঘাতিক ভয় ধরিয়ে দিয়ে ক্রন্দন করানো আর হৃদয়ছোঁয়া ভালোবাসার তাগিদে শাদা অর্কিডের মতন কাঁদতে থাকা সময়ে সময়ে, এক ব্যাপার নয় কিছুতেই। যে-সব শব্দেরা বেদনানন্দ দেবার ক্ষমতা রাখে, তাদেরকে ইচ্ছাকৃতভাবে যেমন খুশি তেমন রচনা করা যায় না বোধ হয়। অনির্বচনীয় কিছু থাকে ওরা রচিত হবার পেছনে; হতে পারে এই কারণে যাহাতে দুঃখ তাহাতে সুখ সমান্তরালে বিভাসিত প্রায় নিশ্চিত। বচনের কারিশমা পেরিয়ে মহাত্মা কবি যেখানে খুঁজতে থাকেন আরো আরো স্বপ্নকণাদের অর্থবহুল সংসার, সেখানে যেতে পারবার সামর্থ সন্ধান করি।

আমরা আরো কিছুটা আরোহন বা অবরোহন করি যদি,(নামা ওঠা সমার্থক বিবেচনায় এই অর্থে যে, গহীনে নামতে পারার মানে দাঁড়ায় শীর্ষে থাকা চিন্তা স্পর্শ করবার প্রয়াস, আকাশ উপরে শুধু না, আকাশ নীচের দিকেও। আকাশে নামা যায়, উঠাও যায়। কি চমত্কার হে! যাহাতে নামি তাহাতে উঠি, সিঁড়ি বেয়ে অথবা সিঁড়ি ছাড়া।) শ্রেণী বিন্যাসের তাত্পর্য উদ্ধার করতে পারি। দ্রষ্টা কবিদেরকে শীর্ষে রাখবার অন্যতম প্রধান কারণ তারা যতটা শীর্ষে নামেন অথবা উঠেন, ততটা অন্যদের দেখা যায় না।

বড় কবি মহাকালধৌত সম্ভাবনাকে সামনে রাখেন। ইউনিভার্স শুধু না, অমনিভার্সের চৌদিকে পরিভ্রমণ করতে চান। তিনি সাধারণ মানুষের মতো পক্ষপাতদুষ্ট জ্ঞান-ভাষা-ধারণাদের নিয়ে অ-পক্ষপাতদুষ্ট অবস্থানে যেতে চান। তাঁর প্রয়াসে বিচ্যুতি থাকতে পারে কিন্তু বুঝতে পারা যায় তিনি কূপমন্ডুক থাকতে চান নি। এই রকম দ্রষ্টা কবি’র দৃষ্টান্ত খলিল জিবরান, জালালউদ্দিন রুমি, ইকবাল, ওয়াল্ট হুইটম্যান, জন কীটস, মীর্জা গালিব, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। বড় কবি কখনো কখনো রাজনীতি খেতে পারেন কিন্তু রাজনীতি তাকে গিলে ফেলবার সাহস রাখে না। দ্রষ্টা কবি তাত্পর্যের তাত্পর্য যা কিছু পাওয়া যায় তারও তাত্পর্য খুঁজতে থাকেন। কারণ তিনি ‘দশ দিগন্তের দ্রষ্টা’। তিনি হলেন A pure spring from which all thirsty soul can drink./ He is a tree watered by the river of Beauty,…Gibran/The poet. কাজী নজরুল ইসলাম রচিত প্রবন্ধ ‌’রাজবন্দীর জবানবন্দী’ ইশারা দ্যায় বাংলা ভাষার এই কবি দ্রষ্টা কবি।

আর কবিতার মজা প্রসঙ্গে বলা যায়, বাসকিন রবিনস’র মিঠাইও মজাদার এবং গ্রামের রুচিশীল গৃহবধুর হাতে বানানো মিঠাইও মজা। সকল স্তরের কবিতা লাইক ক্লিক পেতে পারে। স্তর জ্ঞানটাও প্রাসঙ্গিক। বাস্তব স্তরে স্তরে বিন্যাসিত। মানুষ বহুতল জ্ঞানের রাজ্যে সাঁতার কাটে। কেউ কেউ নির্ধারিত স্তর পর্যন্ত থাকবার মধ্যেও হেকমত আছে।

বড় কবি নক্ষত্র সমতুল তাই বুঝি তাঁর দীর্ঘশ্বাস- দুঃখবোধ-হতাশাও অন্ধকারাচ্ছন্ন করে না। এই কারণে- pain and pleasure are intertwined in “Ode to a Nightingale”(জন কীটস’র)। আমরা বুঝে নেই, বড় কবি নিজে উজ্জল এবং তিনি উজ্জলতা বিকিরণ করেন শুধু। (কেননা আলোকেন্দ্রিক আমাদের জীবনের একটা অর্থময়তা আছে যা অন্ধকারে অসম্ভব আমাদের সীমাবদ্ধতার কারণে) পেইন এ্যান্ড প্লেজার মিলে এক প্রকার অমৃত নির্মাণ করবার জন্যে কীটসকে কি চর্চা নির্ভর পোক্তা হতে হয়েছিলো? না কি তাঁর চিন্তা পোক্তা হওয়াটা অনির্বচনীয়ের আওতাভুক্ত? আহা বচন! তোমাকে স্পর্শ করি অনির্বচনীয়ের সুখ পাই!

***
সারওয়ার চৌধুরী
আবুধাবী
ইউএই
২৭ অক্টোবর, ২০১১