ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

দোষ বের করতে থাকলে লেখক পাঠক প্রকাশক সমালোচক সম্পাদক, সকলের দোষ বের করা যায়। দোষে গুণে মানুষ। গুণী মানুষটিও ত্রুটিমুক্ত না। ত্র্রুটি বা দোষ বা অন্যায় একটা ক্ষণকালের অর্থবোধক এই সংসারে শনাক্ত করা যায়। ((‘ন্যায়’ আর ‘অন্যায়’ বের করতে লেগে গ্রীক দার্শনিক বিশাল গ্রন্থ ‘রিপাবলিক’ লিখে ফেলেছিলেন। তবু সুরাহা হয় নি। তবু এই সভ্য দুনিয়ায় এখনো কয়েক হাজার বছর আগের সওয়ালটির জবাব সহজে মানুষ বোঝে। প্রশ্নটি হলো, (ড্যান ব্রাকার তার ‘লুজিং ফেইথ ইন ফেইথ’ এ মিথ্যা দাবীর দলিল মোতাবেক না বলে নিজের মতো করে বলি) ‘তোমার হাত কেটে যে-মানুষটি তোমার কাছে তার ব্যান্ডেজ বিক্রি করলো, তুমি কি তার দিকে ভালো নজরে চাইবে?’ এখনো এই দুনিয়ার বেশির ভাগ মানুষ বলবে- ‘লোকটা ধূর্ত অপরাধী’। চুরি করলে সবাই একযোগে চোর বলে। যদিও চোরেরও যুক্তি থাকতে পারে। ব্যান্ডেজ বিক্রেতারও যুক্তি থাকতে পারে। অন্যায় শনাক্তের এই কনটেক্সটের একটা অর্থ আছে, যে-অর্থের সাথে সম্পর্ক আছে মানুষের বেঁচে থাকবার প্রয়াসের সাথে। ফলে মনে হয় ‘দোষ’ জিনিসটা সমাজে শনাক্তকরণের উপায় আছে একটা ক্ষণকালের অর্থ অনুযায়ীই।))

বইও পণ্য, বুদ্ধিও পণ্য, চিন্তাও পণ্য (এ্যাসেন্সিয়াল চিন্তা), শিল্পও পণ্য অর্থনীতির চোখে। জীবন জীবিকার যোগ বিয়োগের সাথে সম্পর্ক আছে এই পণ্যগুলোর। কেউ বই লিখে প্রকাশ করে রুটি রুজির চিন্তা না-করলেও বইটি সমাজের অর্থ ব্যবস্থার সাথে যুক্ত। পেশাদার বই লেখকের (সাহিত্য-শিল্প ইত্যাদিসহ) জন্য বইয়ের কাটতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রুটি রুজির মোয়ামেলা।

লেখকও পাঠক। লিখতে থাকার সাথে পঠনও হয়। নিজের রচনার প্রথম পাঠক তিনিই। তিনি পাঠ করে করে রচনার/গল্পের/উপন্যাসের/কবিতার পরিমার্জন-পরিশীলন করেন। অবশ্য অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ লেখা খুব একটা ঘষামাজা করতে হয় না। তাছাড়া সবাই তো আর মারিও পুজো, অগাথা ক্রিস্টি, সুনীল, শীর্ষেন্দু, হুমায়ূন, মিলন, সিডনি শেলডনদের মতো জনপ্রিয় হতে পারেন না। কেউ কেউ টলস্টয়, চেখভ, জয়েস, ক্যামু, কাফকা, মার্কেজ, মানিক প্রমুখদের মতো হন। গ্যায়টে, মিল্টন, শেক্সপিয়র, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল এঁদের মতো সর্বত্র বিরাজ করার শক্তিসম্পন্নদের কথা আলাদা। এঁরা শতশত বর্ষের শীর্ষে, সহস্রাব্দের চূড়ায় আসন গ্রহণ ক’রে, দেহত্যাগ করেও প্রজন্ম পরম্পরায় মানুষের অন্তরে, পাঠকের অন্তরে জীবন্ত থাকেন।লেখক কেউ জন্মগত, কাউকে বানানো হয়, কেউ লেখকগিরি নিজেদের উপর চাপিয়ে দেন,ঠিক যেমন- ‘সাম আর এডিটরশিপ থার্স্ট আপোন দেম’। এই চাপানোর ব্যাপারটা একযোগে অজস্র লেখক প্রকাশক সম্পাদক পাঠক সমালোচক শিল্পীদের সম্পর্কে বলা যায়। সবাই নয়, অধিকাংশ এমনতর দেশে দেশে।

সিরিয়াস লেখকরা বেশি জনপ্রিয় হন না, কেউ কেউ বলেন। কথাটা সর্বাংশে সত্য নয়। শেক্সপিয়র, বাট্রান্ড রাসেল, জ্যাক দেরিদা, জাঁ পল সাত্রে প্রমুখদের খ্যাতি আছে সমগ্র বিশ্বে। হ্যাঁ, আধুনিক ভাববাদী দর্শনের জনক রেনে দেকার্তের, তাঁর জীবদ্দশায় পরিচিতি কম ছিল। এখন সমগ্র বিশ্বের কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া কিংবা স্বশিক্ষিত জ্ঞানতাপসগণের কাছে দেকার্ত পরিচিত। তাঁর দার্শনিক মতবাদ, ‘কগিটো আরগো সাম’ বা ‘আই থিংক দেয়ারফোর আই এ্যাম’ বা ‘আমি চিন্তা করি অতএব আমি আছি,’ বিশ্ব জুড়ে পরিচিত। দার্শনিক-লেখক ইমানুয়েল ক্যান্ট ছোট্ট শহর কোয়েনিগ্সবার্গে সারাজীবন কাটিয়েছেন। জীবনের শেষ বছরগুলোতে এসে বিশ্বব্যাপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। তাঁর ‘দ্য ক্রিটিক অব পিওর রিজন’ গ্রন্থটি পাশ্চাত্য দর্শনের জগতে বিপ্লব ঘটায়। কারো কারো বেলায় এমন হয় যে, মৃত্যুবরণের শত শত বছর পর তাঁরা জনপ্রিয় হয়েছেন। একজনের কথা বলি। জর্মন ক্লাসিক কবি ফ্রেদরিখ হল্ডালিন (জর্মন উচ্চারণ) ইংরেজি উচ্চারণ ফ্রেডরিক হোল্ডারলিন। মৃত্যুর শতাধিক বছর পর জনপ্রিয় হয়েছেন।

সাহিত্য সমালোচনার জগতে অনাকাঙ্খিত কিছু ব্যাপার বিরাজ করে। সমালোচকরাও লেখক। তবে অসৎ সমালোচকরা খামাখা ভালো লেখকের লেখার /বইয়ের অপব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে, অনর্থক ক্ষতি করতে চান। আর সৎ সমালোচক লেখকের যথাযথ মূল্যায়ন করে লেখক-পাঠকের সম্পর্ককে আরো বেশি ভালোবাসাময় করে তোলেন। ‘কালের খেয়া’ ৮ম সংখ্যায় শিহাব সরকার’র ‘সমালোচনার সন্ত ও দুবৃত্তরা’ শীর্ষক গুরুত্বপূর্ণ একটি নিবন্ধ ছাপা হয়েছিল। এখানে ঐ নিবন্ধ থেকে কয়েকটি বাক্য তুলে ধরা প্রয়োজন মনে করছি।‘মূল কথা লিখে যাওয়া। বদ সমালোচকের আস্ফালন, তুকতাক এবং বদমায়েশী যতো তীব্রই হোক না কেন,খাঁটি লেখার শিল্পগুণের কাছে ওসব কর্পূরের মতো উড়ে যায়। এর ব্যত্যয় হবার নয়। এজন্য বিশুদ্ধ, বড় লেখকেরও ধৈর্য ধরার প্রয়োজন আছে।’

বাংলা একাডেমির বইমেলার উপর নানা ধরণের নারাজি ইতোমধ্যে বহুবার জাহির হয়েছে। একাডেমির অভিভাবকত্ব, মেলার ব্যবস্থাপনাতে হ য ব র ল অবস্থা ইত্যাদি। রাজনৈতিক বিদঘুটে হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি, খাতিরের সুবিধা ইত্যাদির অভিযোগ শোনা গেছে। বাংলা একাডেমির বই মেলায় ‘ভালো বই’ প্রকাশিত হয় এবং ‘ভালো বই’ প্রকাশিত হয় না- দুইই সঠিক। মিথ্যা হলো, এই মেলা উপলক্ষে প্রচুর বই প্রকাশিত হয় না। ‘ভালো বই’ কি জিনিষ তা নিয়ে প্রচুর হ্যাঁ না তর্ক হতে পারে। তবু ‘ভালো বই’ সম্পর্কে একটা ওজন সম্পন্ন উপসংহার মনে হয় এমন হতে পারে যে, ‘ফ্রন্ট লাইন অব থিংকিং’ (বাংলা তর্জমা কি হতে পারে যথার্থ!) সম্বলিত বই অথবা ওই থিংকিংয়ের ছায়া অনুসরণে প্রবন্ধ গল্প কবিতা উপন্যাস ইত্যাদি, যে-গুলোতে লেখকের নিজস্ব মেধার পরিচয় থাকে। আবার এর মানে এই নয় যে, দুই পাতা পড়তেই মাথা ঘুরে যায়। মাথা অবশ্য সবার ঘুরে না, কারো কারো। কঠিন শব্দ, প্যাঁচ লাগানো সিনটেক্স থাকলেই রচনা ক্লাসিক হয়ে যায় না। যদিও কিছু চিন্তা ওজন সম্পন্ন শব্দ বাক্য দাবী করে। অপেক্ষাকৃত মূল্যবান চিন্তা সহজ ভাষায়ও প্রকাশ করা যায়। আবার নানাবিধ শিল্পতত্বের আওতায় কিছু রচনা দুর্বোধ্য সুন্দর। আমাদের জীবনানন্দ আর কমলকুমার আগের মতো এখন অতোটা দুর্বোধ্য না। সময়ের ব্যবধানে দুর্বোধ্যতা কেটে যায়। হল্ডালিনের ব্যাপারেও তাই হয়েছে।এবং উল্লেখ্য, ‘ফ্রন্ট লাইন অব থিংকিং’ মানে এমন নয় যে, প্রশ্ন করা যাবে না। দেখবার বিষয় হলো, প্রশ্ন বা ক্রিটিসিজম নেয়ামত হয়ে আসে কি না।

দেখা গেছে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে, ব্যবসায়িক ফায়দা লুটবার জন্য বাঘা বাঘা পত্রিকা কর্তৃক প্রশংসিত একটি ‘ভালো বই’ মিলিয়নজ কপি বিক্রি হওয়ার পর, দেশে দেশে কথা রচিত হয় -‘বইটি খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু না’। এ ধরণের একটি বই স্টিফেন হকিংয়ের ‘এ্যা ব্রিফ হিস্টরি অব টাইম’। অবশেষে হকিং নিজেই বলেছেন বিবিসির সাক্ষাতকারে যে, তিনি সারপ্রাইজ পছন্দ করেন এবং পয়সা কামানোর জন্য একটা জনপ্রিয় বই লেখবার সখ পূরণ হয়েছে ওই বইটি লিখে। সাক্ষাতকারটি ‘ব্লাক হোল এ্যান্ড বেবি ইউনিভার্সেস’ বইটির শেষে যুক্ত আছে। এই পর্যায়ে রিচার্ড ডওকিন্স’র ‘দি গড ডেলুশন’ বইটির কথাও বলা যায়। ওটা বাজার পেয়েছে লেখক এবং প্রকাশকের চটকদারিতে। বিশ্বের নামি দামি পত্রিকায় বইটির তীব্র সমালোচনা প্রকাশ পেয়েছে। শুধুমাত্র নিখিল একটি রাজনৈতিক চক্রের কাছে এই ধরণের বই সমাদৃত।
বই পাঠ করেন বহু কিসিম ধারণাবন্দী পাঠকেরা। অনেকে নিজেদের অভিজ্ঞতায় মজুদ থাকা মানদন্ড মোতাবেক বিভিন্ন বইয়ের বিচার করে থাকেন। তাছাড়া বই তো জীবন ও জগতের অজস্র বিষয়ভিত্তিক রচিত হয়। সবাই সব কিছু পড়তে পছন্দ করে না। কিন্তু ‘ফ্রন্ট লাইন অব থিংকিং’ এর আওতাভূক্ত কোনো নতুন কিছু আছে এমন বই সব ধরণের পাঠক একবার পড়ে দেখতে চান। তবে সেক্ষেত্রে বইটি সম্পর্কে পাঠক সমাজকে অবহিত করবার ব্যাপারটা থাকে। আমি জানি না, আমাদের কয় জন প্রকাশক একটি নতুন ‘ভালো বই’ প্রকাশ করবার আগে সারাদেশে পাঠকদেরকে জানানোর কাজটি করে থাকেন? ‘পেঙ্গুইন’ বা ‘ফেবার এ্যান্ড ফেবার’ নতুন বই প্রকাশের আগেই বইয়ের আলোচনা-প্রশংসা প্রকাশ করে থাকে, যাতে বই প্রকাশ হওয়া মাত্র মিলিয়ন মিলিয়ন কপি বিক্রি হয় সারা দুনিয়ায়।প্রযুক্তির দৌলতে ট্রিপল ডব্লিউ এর দ্বারা ভার্চুয়াল দুনিয়ার আবির্ভাব মুদ্রিত বইয়ের বাজারে কিছু ভাটা পড়েছে। তবু সারা দুনিয়ায় কোটি কোটি কপি বই ছাপা হয়। কারণ, বই পড়ুয়াগণ হাতে বই নিয়ে পড়তে চান এখনো। দেখা গেছে, ল্যাপটপে ই-বুক সেইভ থাকা সত্ত্বেও মুদ্রিত বই কিনে নিয়ে পড়েন অনেকে। সুতরাং মুদ্রিত বইয়ের দুনিয়া এখনো জিন্দা আছে।

বাংলা একাডেমীর বইমেলায় বই প্রকাশ করে তরুণ কবি সাহিত্যিকেরা, বইয়ের বিক্রয়লব্ধ টাকা দিয়ে দালানকোটা বানানোর স্বপ্ন দেখেন না। বই বিক্রি ভালো হলে বেশ মজা লাগে তাদের। কারো হয়তো কিছু অর্থযোগের স্বপ্ন থাকতে পারে। বইমেলাতে তো নামি দামী লেখকের বইও খুব একটা বিক্রি হয় না অনেক স্টলের। ফলে, তরুণ লেখকদের জন্য সুসংবাদটি হলো, আপনার বিবেকের সাড়া মোতাবেক যদি ‘ভালো বই’ লিখে থাকেন আপনার জ্ঞানের দৌলতে, সেটা মেলায় কম বিক্রি হোক, তাতে আপনার হতাশ হওয়ার কিছু নাই। প্রতিটি বই এক একটা সিঁড়ি। হতাশার আসলেই কিছু নাই। কোনো কিছুই হারায় না, ফিরে ফিরে আসে নব নব রূপে। এছাড়া যদ্দুর জানি, প্রকাশকগণ সারা বছরই সারা দেশে নানা ব্যানারের মেলায় অংশ নেন এবং যার যার বলয়ে বই বিক্রি করে থাকেন। ‘ভালো বই’ লেখকগণ শুধু মেলা নির্ভর না হয়ে বছরের যে কোনো দিন বই প্রকাশ করবার দিকে মনোযোগি হতে পারেন।