ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ম্যানিফল্ড মিনিংয়ের দুনিয়া রে! পরিস্থিতি এমন হয় যে, অ-পক্ষপাতদুষ্ট থাকবার উপায় নাই যেনো! শত্রুকেও মিত্র জ্ঞান করবার পরিপ্রেক্ষিত যেনো নিভু নিভূ! লোমহর্ষক দৃশ্যটি দেখবার পর জাতীয়তাবাদী চেতনার যুক্তি সামনে আসে। যেনো নড়তেই হবে বাধ্যতামুলক! যেনো জ্বলতেই হবে, যেনো জ্বালাতেই হবে! নিজের শরীর-মন-অনুভূতির সমান্তরালের ব্যাপার। দেশ-ভাষা-সমাজ-সংস্কৃতি-ঘর-চেতনাকে সম্মান করবার যুক্তি আছে। বিভক্তের সারমর্ম আছে একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত। ফলে সীমানা রক্ষার যুক্তিও আছে। সীমানা রক্ষার সাথে অস্তিত্বের সংকট যুক্ত। অস্তিত্ব ক্ষণকালের একটা অর্থ নির্মাণ করে। সেই অর্থ ধরে রাখতে হয়।

সীমান্ত প্রহরীগণ নিরাপত্তার রক্ষার দায়িত্ব পালনে থাকবার অর্থ এই নয় যে, সুযোগ পেলেই তারা লোমহর্ষক দৃশ্য রচনা করবে। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ দেশগুলোর সীমান্তের চৌকিদারেরা নৃশংসভাবে মানুষ বধ করে।

বিবস্ত্র লোকটির আর্তনাদের ভাষা- ‘ও মা, এ মা-রে, আমি কেনে আইছিলাম রে মা এইকানে। ও বাবা, আমারে ছাড়ি দেন।’ যারা শুনছে খুব কাছে থেকে, তারা বিএসএফ, তারা ভারতের সীমান্ত প্রহরী, তারা বস্ত্রহীন মানুষটির কোমরে পায়ে পিঠে ঠাস ঠাস পিটাচ্ছে আর হাসছে। লোকটি বাংলাদেশের প্রান্তিক ব্যবসায়ী। ওপারে গিয়েছিলো, বিএসএফ ধরে তাকে নেংটা করেছে, পা বেঁধেছে, কাঁধের উপর লম্বা বাঁশ রেখে দুই হাত দুই দিকে প্যাঁচ দিয়ে বেঁধেছে ওরা। বাঁধা লোকটাকে দাঁড় করাতেই দৃশ্যটি হয়ে গেলো জেসাসকে ক্রুশবিদ্ধ করবার আগে যেমনটি দেখাচ্ছিল। শকিং ভিডিও। দৃশ্যটি দেখামাত্র মনে পড়লো, ‘দি প্যাশন অব দি ক্রাইস্ট’ ছবিটি। ওই ছবিতে ইয়াহুদ পরিচয়ের লোকেরা তাদের মাথায় আরেপিত ধারণা মোতাবেক বেরহম পিটায় জেসাসকে। রক্তাক্ত যিশু। মোটা মোটা তার র্কাঁটার রশি দিয়ে বেঁধেছে এমনভাবে যাতে আধা ইঞ্চি করে লোহাগুলো গেঁথে আছে মাথার চতুর্দিকে। মারতে মারতে নিয়ে যাচ্ছে ক্রশের দিকে। বনি ইসরাইলের হাতে ধরা পড়বার আগে যিশু পালিয়ে গিয়েছিলেন জঙ্গলে কয়েকজন সাথী নিয়ে। অন্ধকার রাতে জঙ্গলে বৃস্টিতে ভিজতে ভিজতে বিপর্যস্ত জেসাস বলছিলেন ‘এলি এলি লামা সাবাকতানি’- মানে, ‘আমার প্রতিপালক, তুমি কি আমাকে ছেড়ে গেছো।’ নবীয়ানা কষ্ট-আর্তনাদের ব্যাখ্যা দেন জ্ঞানীগণ। (ঈসায়ী ধর্ম মতে জেসাসকে ক্রুশবিদ্ধ করে মারা হয়েছে, আর ইসলামের মতে, তাঁকে হত্যার আগে আল্লাহ উঠিয়ে নিয়ে গেছেন, তিনি আবার পৃথিবীতে আসবেন কেয়ামতের আগে। সেদিকে আপাতত যাচ্ছি না।) নবীর কষ্টের মর্মের সাথে ওই বাংলাদেশী লোকটির আর্তনাদের কারণ ভিন্ন হলেও ঝলসে ওঠা কস্ট-আর্তনাদের রঙ রূপ এক। জেসাসকে ওরা পিটিয়েছে নির্মমভাবে শত্রু মনে করে। বাংলাদেশী ব্যবসায়ীটাকে ওরা পিটিয়েছে নির্মমভাবে শত্রু মনে করে। বিএসএফ গালিও দিচ্ছিল লোকটার ইসলাম ধর্মকে। লোকটা যদি ‘অপরাধী’ হয়েও থাকে তবু তার উপর এমন নির্যাতন কেন?! কে বোঝাবে ওদের সব মানুষই ‘মানুষ রতন’।

এই কষ্ট-দুর্ভোগের সুনির্দিষ্ট ফান্ডামেন্টাল মিনিং কী? ঘটনাগুলোর ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক-সূত্র গ্রন্থিত কেন? কেন মঙ্গল অমঙ্গলের যুথবদ্ধতা দেখতে পাওয়া যায় জগতের ঘটনাগুলোর ভেতর! মানুষের সভ্যতার প্রতিটি পর্যায়ে নৃশংসতা আছে। বহুবিধ শান্তি আর ভালোবাসার শিক্ষা সবখানে রুখতে পারে না নির্মম অত্যাচার! যে-মানুষগুলো নির্মম ঘটনার জন্ম দিলো, ওরাও নির্মম পরিণতি পেতে পারে। পায়। পেয়েছে বহুবার ইতিহাসে।

আমরা বাংলাদেশের মানুষ চাই না, সীমান্তে মানুষ মানুষকে হত্যা করুক। কিন্তু বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশী হত্যা, নির্মম নির্যাতন আজকাল প্রতিদিনের খবর। ইউটিউব ভরে আছে ভিডিও দৃশ্যে। আমরা এইসব ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাই। জানা গেছে ৮ জন বিএসএফ জোয়ানকে সাসপেন্ড করা হয়েছে। কিন্তু বারবার কেন এমন ঘটনা দেখা যায়! বন্ধু প্রতিবেশীর ওই ধরণের লোকগুলোর এমন জঘন্য আচরণের ইতি হোক।

-সারওয়ার চৌধুরী
২৫ মার্চ ২০১২
ইউএই