ক্যাটেগরিঃ মতামত-বিশ্লেষণ

 

সীমানা মানি না, সীমানা মানি। সীমানা মেনে বলি স্বাধীন। প্যারাডক্স। এই প্যারাডক্সেই জনম-জীবন-বাস, পরবাস। পরবাস? হ্যাঁ, পরবাসে আছি, আবার নিজ ঘরে আছি, নিজের মধ্যে আছি, আবার নিজ বলে কিছু নাই। প্যারাডক্স। উপায় নাই। এর মধ্যেই থাকা আর না-থাকা।আরো আগে, মানে, বহুদূরের ওপারে গেলে বুঝি আপন-পর শনাক্ত করবার উপায় নাই। এই রকম একটা বুঝাবুঝির ভাঁজে পৌঁছবার পর, কিংবা ওই যে ‘ট্রুথ উইথড্রজ ফ্রম থিংকিং’ সেই থিংকিং এর ভেতরে ক্ষণকালের অর্থবোধক পরিপ্রেক্ষিতে ফিরে আসি।

অভিকর্ষের ভেতরে আছি, বায়ুমণ্ডলের ভেতরে আছি। অভিকর্ষের রাজনৈতিক বিভাজন নাই, বায়ুমন্ডলের মৌসুম ভেদের প্রভাব আছে রাজনৈতিক বিভাজন নাই। সমগ্রের অংশ আমি+তুমি = আমরা=তোমরা, আবার পৃথকভাবে পরিস্ফুটিত। জলের সাথে সম্পর্কসূত্রে বাঁধা কিন্তু জলে থাকি না,পানি ছাড়া প্রাণ যায় যায়, পানি পান করি। থাকি না জলে, থাকি স্থলে। ছায়াপথের সংসারের সদস্য হয়েও গ্রহের পৃষ্ঠদেশে রাত দিন কাটে। অঙ্গে গ্রন্থিত প্রত্যঙ্গগুলো পৃথক পরিচয়ে প্রকাশিত, অথচ ওসব এই দেহেরই অংশ।

ত্রিমাত্রিক দৃষ্টির ক্ষমতাবলে চতুর্মাত্রিক যে-প্রাণীজগত দেখি, ওখানে সারভাইভাল অব দি ফিটেস্ট আছে, প্রজেকশন আর রিজেকশন ক্রিয়াশীল। ক্ষণকালের ‘আমি’গুলো বিপন্ন হওয়ার পরিপ্রেক্ষিত পায়, মোকাবেলা করতে হয়। ছোটখাটো শত্রু ব্যাকটেরিয়ার কবল থেকেও রক্ষা পেতে হয়। ক্ষুধা ও হিংস্রতা এবং ইত্যাদি কারণে ‘অকাল মৃত্যু’র হাত থেকে বাঁচবার ক্রমাগত প্রয়াসের একটা ক্ষণকালের অর্থ আছে। যদিও হাস্যকর এই বেঁচে থাকার অর্থ এই অর্থে যে, বাঁচে না কিছুই অবশেষে। আমাদের ত্রিমাত্রিক দৃষ্টি দেখে সবকিছু ডুবে যায় ক্রমাগত নিস্তরঙ্গপুর।

তবু বাঁচবার জন্যে ঘর, ঘরের ভেতর কক্ষ। কক্ষগুলো বহুবিধ। সুবিধা মোতাবেক কক্ষদের নির্মাণ। বাথরুম বেডরুম, কিচেন ইত্যাদি আলাদা আলাদা রাখতে হয়। কক্ষের সীমা, ঘরের সীমা, গ্রাম শহর বন্দর দেশ মহাদেশের বিভাজনগুলোর ভেতর সুবিধা এবং অসুবিধা যুথবদ্ধ হয়ে আছে। এরিমধ্যে ভালোবাসাদের ভাঁজে ভাঁজে সাক্ষাত; এরিমধ্যে রূপ রস শব্দ গন্ধ মগ্ন সদানন্দ; এরিমধ্যে ‘সীমার মাঝে অসীম তুমি বাজাও আপন সুর’।

এই ধরিত্রীতে পথ ও পথের শাখা উপশাখা বিস্তারিত। পথ বানিয়ে পথে পথে চলতে হয় বিপ্লবীকেও নতুন পথের জন্যে। পথে পথে চলবার অর্থ সদর্থক সীমানার ভেতর দিয়ে চলতে থাকা। পথের সীমা না-মানলে দুর্ঘটনা, ট্রাফিক জ্যাম, স্বাভাবিক গতিশীলতায় বাধা, অচলাবস্থা, নির্দিষ্ট সময়ের ভেতর নির্দিষ্ট গন্তব্যে যাওয়া অসম্ভব। পথ ও পথের সীমানা এই অর্থও নির্মাণ করে রেখেছে।

অতঃপর, সীমানা মানি না ভালোবাসবার জন্যে, সম্প্রীতির জন্যে, সদ্ভাবের জন্যে এবং সীমানা মানি ভালোবাসবার জন্যে, সম্প্রীতির জন্যে, সদ্ভাবের জন্যে। স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে যেয়েও সীমাতে রাখতে হয় ভাষাকে। এবং ভাষার সম্মান রক্ষার জন্যেও সীমানাকে সমীহ করতে হয়।সমীহ করি বাঁধনহারা ওই বিদ্রোহীর ভালোবাসার বন্ধন আর ক্রন্দন! মানে কী? মানে, সীমানা না-মানবার সীমানা মানা!

(আগের আগের পোস্টটি সীমান্তে বাংলাদেশী হত্যা সংক্রান্ত। ফেইসবুকে বন্ধু তারিফা নাজমিনা সমৃদ্ধ মর্মস্পর্শি একটি দীর্ঘ মন্তব্য দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় আহত তারিফা’র মেজো চাচা সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের শিকার হন। মেহেরপুর সীমান্তে তাঁদের গ্রামের বাড়ি। তারিফার মন্তব্যটিতে সীমানা মানা না-মানা প্রসঙ্গ এসেছে। ওই মন্তব্যটির প্রেক্ষিতে লেখা আমার মন্তব্য হলো উপরের পোস্ট।)

সারওয়ার চৌধুরী
২৬ মার্চ ২০১২
ইউএই