ক্যাটেগরিঃ প্রযুক্তি কথা

 

ওয়েবসাইট বা ভার্চুয়াল জগত আবিস্কার হওয়ার পূর্বেও লেখা-রচনা-কবিতা-গল্প-তথ্য-তত্ব-ধারণা চুরির ঘটনা ছিল। তুলনামুলক আগে কম এখন বেশি। অন্যের রচনার শুধুমাত্র শিরোণাম বদল করে চোর কর্তৃক নিজের নামে প্রকাশ করবার ঘটনা টের পাই ২২ বছর আগে সংবাদপত্রে কাজ করবার সময়।

ক্রমাগত এক বিস্ময়কর প্রজেকশন আর রিজেকশন প্রক্রিয়ার আওতাধীন আমাদের, মানুষদের, লেখকদের, কবিদের, শিল্পীদের, বিজ্ঞানীদের ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি নিয়ে, ‘ফ্রেশ এ্যাকসেস টু রিয়েলিটি’ নিয়ে আবির্ভাব আর তিরোধান এই মর্তে।’ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ নির্দিষ্ট সময়ের জন্যে নির্ধারণ হয় কেন? একটা গ্রহনযোগ্য জবাব হতে পারে- অসংখ্য বিশৃংখলার মধ্যে কিঞ্চিত শৃংখলার স্বার্থে। এই শৃংখলা কী জন্যে সেদিকে আপতত না-গেলেও চলে। কেননা, এই প্রশ্নের সাথে চলে আসবেই- কেন মায়া, কেন চুম্বন, কেন প্রজননের প্রবল বেগ, কেন লাভিং এ্যাকশন সিগনিফাই ওয়াননেস ইত্যাদি।

এখন দুনিয়া ওয়েবসাইটকেন্দ্রিক। সবকিছু কভার করছে ই-মিডিয়া। কাগজের বইয়ের সমান্তরালে ই-বুক সিস্টেম এসে গেছে। আর ক’দিন পর দেখবেন হাতে হাতে আইপ্যাডের মধ্যে শত শত বই স্টোর করা এবং এর থেকে পড়া-শোনা চলছে। ইতোমধ্যে ইউরোপে-আমেরিকায় এই নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু হয়েছে। গত বছরের তুলনায় এবারের কাগজের বই মুদ্রন কমে গেছে ই-বুক পাঠের কারণে।এখন আছে ওয়েবম্যাগ, ওয়েবব্লগ, কাগজে পত্রিকার অনলাইন এডিশন এবং অনলাইন পত্রিকা।লেখকদের বেলায়, অনলাইন একেবারে অফ যাবে কেমনে? যিনি ফেইসবুকে না-লিখে, পত্রিকার ওয়েব এডিশনের সাহিত্যের পাতায় কিংবা ওয়েবম্যাগে লিখছেন এবং ই-বুক প্রকাশ করছেন, তার লেখাও চোর চুরি করতে পারে।আর কাগজের বই মুদ্রণের নানা জটিলতার কথা ভেবে কেউ যদি কাগজের বই প্রকাশ না-করতে করতেই দম ফুরিয়ে যাবার দিন আসতে পারে। তাই বুঝি, নামিদামী লেখক-বিজ্ঞানীদেরও কপিরাইট আওতাধীন নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে।

কিন্তু চোর তো চোরই। চুরি করে আর কতদূর যেতে পারে! কাগজের বই থেকে চুরি করেও চোর শান্তি পেতে চায়! হাকিকতে এই কাজ করে সে নিজেকে কলংকিত করে।

চোর নিজে না-ধরা পড়বার যত চিন্তা করে আগায়, তার সতর্ক চিন্তার বাইরে শত প্রকার সম্ভাবনা থেকে যায় তার চুরি ধরা খাওয়ার। মানে, সে ধরা পড়েই।

এই মিডিয়ার জমানায় ‘ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি’ কতটুকু প্রপার্টি (Property) হিসাবে ইজ্জত ধরে রাখতে পারছে, তা নিয়ে ভাববার প্রয়োজন আছে। কয়েক বছর আগে যে-কাগজের বই মিলিয়ন ডলার পাইয়ে দিয়েছে প্রকাশক এবং লেখককে, সেই বইটির ই-সংস্করণ পাওয়া যায় গুগুল সার্চে। ফলে বার বার সংস্করণ মুদ্রণ আর বার বার কামাইয়ের সুযোগ নাই।

বর্তমান বিশ্বের কিছু লেখক কপিরাইটকে গুরুত্ব দেন না। এ ব্যাপারে ভাবনার বিষয় যে, ব্যক্তি বিশেষের ডিস্টিংক্ট পছন্দের দ্বারা স্মলার স্কেলের সমাজ বাস্তবতাকে স্বাভাবিক রাখা যায় না। একটা আধুনিক শহরের জনজীবনে স্বাভাবিক গতি রাখার স্বার্থেই ট্রাফিক আইন আর তাতেই দুর্ঘটনার সম্ভাবনা একেবারে শেষ হয়ে যায় না। তবু বাই ল মোভমেন্ট সবাই এ্যাপ্রিশিয়েট করি।একজন পেশাদার লেখকের কথা চিন্তা করুন। তিনি নিয়মিত একটা বিষয়ের এ্যাক্সক্লুসিভ ধারাবাহিক লিখছেন কোনো মাধ্যমে। এর দৌলতে লেখককে সম্মানী দেয়া হচ্ছে। হঠাত দেখা গেলো স্বত্ত্ব আইন না থাকাতে ওই ধারাবাহিক রচয়িতার রচনা কখনো প্রকাশের পরে অথবা চুরি করে আগেভাগেই অথবা প্রকাশের পর অন্য লেখকেরা নিজেদের নামে ওই রচনা প্রকাশ করতে থাকলো, তখন অর্থনৈতিক কারণেই একটা কেওটিক সিচুয়েশন সামনে এসে হাজির হবে। এবং অন্যের স্টাইল অব এ্যাক্সপ্রেশন, বিশেষ সিনটেক্স ইত্যাদি চুরি করা আর long-established tradition of copying as a fundamental practice of the creative process সমার্থক হতে পারে না।

এছাড়া ইনডিভিডুয়েলজমকে ধরতে না-পারা গেলেও অনেক প্রকার জটিলতা থেকে বাঁচবার জন্যে ‘বর্তমান কাল’ এর মতো অধরা সত্বেও ইনডিভিডুয়েলিজমকে কাউন্ট করতে হয়। তাই Plagiarism, journalistic ethics, academic dishonesty, liability for copyright infringement, moral rights, unfair competition, plagiarizing author’s reputation, detect blatant word-for-word copies of text, Scientific misconduct ইত্যাদি বিষয়াবলিকে বিবেচনায় রাখতে হয় মানুষেরই সুবিধার স্বার্থে।

লেখা, তথ্য, তত্ব, শিল্প, চুরি যাওয়ার ভয়ে সাহিত্যিক সাংবাদিক বিজ্ঞানী দার্শনিক শিল্পী ওয়েব মাধ্যমকে বাদ দিতে পারেন না। নিজের সাইট/ব্লগ, কমিউনিটি ব্লগ, ওয়েবম্যাগ, ফেইসবুকের ওয়াল/নোট, অনলাইন সংবাদপত্র, ই-বুক ইত্যাদি মাধ্যমে সৃজনশীল লেখা/তথ্য/তত্ব/শিল্প প্রকাশ পাওয়া ‘প্রকাশিত’ অর্থে সমার্থক। গুণ-মান-ওজন এবং জনপ্রিয়তার সাপেক্ষে কোনো সাইটের গুরুত্ব বাড়ে কমে লেখক পাঠকের বিবেচনাতে। এই বিবেচনার কিয়দংশে বিদঘুটে রাজনৈতিক ভেদ জ্ঞানও ক্রিয়াশীল থাকে। এছাড়া কিছু ওয়েবম্যাগ ও অনলাইন পত্রিকার সম্পাদকগণের বিবেচনা যথাযথভাবে ‘বঙ্কিমও কামিনী রায়ের লেখা ছাপেন নি’ ধরণের দৃষ্টান্ত বার বার আসতে থাকে যুগে যুগে। কিছু ওয়েবসাইটের দাম বাড়ে নির্দিষ্ট কিছু লেখকের লেখার উপস্থিতির কারণে। সেসব থাক আপাতত। (ভবিষ্যতে মজার মজার তথ্য বলবার আশা রাখি।)

চুরি হবে বলে মিশিও কাকু’র মতো হালের বাঘা বিজ্ঞানী নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে তাঁর ব্যাখ্যা/হাইপথিসিস ইত্যাদি উপস্থাপন করা থেকে বিরত থাকছেন না। বিরত থাকছেন না দার্শনিক কবি শিল্পী ধর্মপন্ডিত আধ্যাত্মিক নেতা। নির্দিষ্ট ওয়েব সাইটে তারা নিয়মিত জাহির হচ্ছেন। জাহির হতেই হয়, ফুল ফোটতেই হয়, ঘ্রাণ ছড়াতেই হয় এখানে ওখানে সবখানে।

চুরির ভয়ে ওরা থামে না, থামতে পারে না। ওদের আছে ইনবর্ন ফ্যাকাল্টির ঝর্ণা ধারা!

(কয়েক দিন আগে আমার লেখা গল্প ‘ঘটনাচক্রে প্রেমের গল্পটির জীবনফুল ফোটা’ শিরোণাম বদল করে বাকী সব হুবহু রেখে জনৈক চোর কর্তৃক ফেইসবুকে নোট ধরা পড়বার পর ফেইসবুকে কবি মজনু শাহ ও বন্ধুদের সাথে আলোচনার প্রেক্ষিতে উপরের নোটটি লিখিত)

22 April 2012
UAE