ক্যাটেগরিঃ ফিচার পোস্ট আর্কাইভ, স্বাধিকার চেতনা

 

গত প্রায় দেড় দশক ধরে চলছে স্বাধীনতার ঘোষক নিয়ে হাউকাউ। আসলে স্বাধীনতার ঘোষক কে? এমন প্রশ্ন রাজনীতিবিদেরাই করেন এবং নিজেরাই এর উত্তর দিয়ে দেন। এই প্রসঙ্গে টিভি চ্যানেলের টক-শোতে বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিষ্টার মওদুদকে প্রশ্ন করা হয়, স্বাধীনতার ঘোষক কে? সরাসরি প্রশ্নের উত্তর তিনি খুব সাহসিকতার সাথে এড়িয়ে যান। সাহসিকতা শব্দটা এই জন্য ব্যবহার করলাম কারণ, তিনি ধাপ্পাবাজ নেতা হওয়া সত্ত্বেও খুব সুন্দর করেই রাজনৈতিক জীবন অতিবাহিত করছেন। আর এই জীবন পার করার জন্য দরকার সাহস। যাহোক, উত্তরে তিনি বলেছিলেন, দেখুন- “আমরা বাঙালী জাতি হিসেবে অত্যন্ত সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচয় দিচ্ছি। স্বাধীনতার এতোগুলো বছর পরও আমাদের এইগুলো নিয়ে কথা বলা হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর অবদান নিয়ে ইতিহাসের কোন প্রশ্ন নেই। কিন্তু যারা এই ধরনের ইস্যূ দাঁড় করাতে চাচ্ছেন তারাই বঙ্গবন্ধুকে খাটো করছেন। সবচাইতে বড় বিষয় জিয়াউর রহমান তার জায়গায় এবং বঙ্গবন্ধু নিজ জায়গায় এখনও বসে আছেন।”

আমাদের টক-শোগুলোতে সমস্যা এখানেই। আমরা যে বিষয়গুলো নিয়ে টক-শো দেখি সে বিষয়টি বাদে অন্য বিষয়গুলোই বেশী হয়। এবং লাইন বিচ্যূত হওয়ার পরও উপস্থাপকরা পাল্টা বিষয়টাতে ফেরত আসেন না।
যাইহোক, আজকে ব্লগে মিনহাজ হেলাল নামে একজন ব্লগার স্বাধীনতার ঘোষক সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। (এই লিংকে লিখাটি আছে।)
আলোচনার শুরুতেই তিনি বলেছেন, “স্বাধীনতার ২৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগ পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে কেউ অস্বীকার করেন নি।”

যুক্তিতর্কের কাছে এই মন্তব্যটি খুবই দূর্বল। কারণ সত্যি কথা বলতে কি ১৯৯৬ সালের পূর্বে বঙ্গবন্ধুকে অনেকটা আড়ালেই রাখা হয়েছিল। অন্তত আমি বলতে পারি, ৯৬ সালের পূর্বে আমি শুধু নিজের ঘরেই মায়ের মুখে বঙ্গবন্ধুর নাম শুনেছিলাম। এবং সেই সাথে বলতে হয়, ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষন সম্পর্কেও আমি জানতাম না। আওয়ামী লীগের মতে ৯৬ সাল পর্যন্ত দেশকে একটা অন্ধকারের মধ্যে রাখা হয়েছিল। আসলে, দেশ অন্ধকারে না থাকলেও ইতিহাস বিষয়ে অনেকটাই অন্ধকারে ছিল এই দেশ। এমনকি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক জাদুঘরও হয়েছে ৯৬ সালের পর। এর আগে জিয়া-এরশাদ কেউ ভাবেননি মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করা উচিত। তবে, জিয়া বরাবর নিজেকে একটা লাইম লাইটে আনার চেষ্টা করেছেন। তবে সেটা নিজ উদ্যোগে নয়। চাটুকার তো আছেই এই জন্য।

ইতিহাসে জিয়াউর রহমান একজন ভাগ্যবান মানুষের নাম। এমন কপাল নিয়ে মনে হয় শুধু তিনিই জন্মেছিলেন। ২৬ মার্চ ঘোষনা পত্র পাঠ করার জন্য একজন সেনা অফিসার প্রয়োজন ছিল। সামনে জিয়াকে পাওয়া গেলো। জিয়াকে দিয়ে পাঠ করানো হলো। প্রথমে তিনি বঙ্গবন্ধুর নাম উল্লেখ করেন নাই। পরে তাকে আবার পাঠ করতে বলা হয়। তিনি আবার পাঠ করেন, আমি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের পক্ষে বলছি……..
এখন বোবার বিয়েতে বোবার হয়ে কাজি যদি কবুল বলেন তাহলে বউ হয়ে যাবে কাজির। বিষয়টি যদি এমন হয় তাহলে যুক্তিতর্কে যাওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। আর একটি ঘোষনা পাঠ করা নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষক কে! এমন প্রশ্ন করাটাই অবান্তর। বঙ্গবন্ধু মানেই তো স্বাধীনতা।

ব্লগার মিনহাজ বলেছেন, যদি ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়ে থাকেন তবে সেইদিন কেন স্বাধীনতা দিবস পালন হয় না।
এখান থেকেই প্রকাশ পায় ব্লগারের অজ্ঞতা। বঙ্গবন্ধু অপেক্ষা করছিলেন সশস্ত্র হামলার। কারণ, বিপ্লব সশস্ত্র হামলা ছাড়া আসবে না। বিপ্লবের জন্য প্রয়োজন হামলার। এবং এটা তখন অনেকটা নিশ্চিত ছিল যে পশ্চিম পাকিস্তান হামলা করবে। এবং ঠিক তখনই বাংলাদেশে স্বাধীনতার ঘোষনা করা হবে। এমন প্রস্তুতি ছিলই। আর সেজন্যই তিনি ৭ মার্চের ভাষনে বলেছিলেন, “তোমাদের যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো।”

৭ মার্চের ভাষনে শুধু একটি রাজনৈতিক ভাষন ছিল না। সেখানে একটি যুদ্ধের নির্দেশনা ছিল।

এই ভাষন শুনে কিংবা দেখে যে বাঙালী ইতিহাস নিয়ে তর্ক করেন তার দেশপ্রেম বিষয়ে যথেষ্ট বড় একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন দাঁড় করানো যায়। উক্ত ব্লগার এও বলেছেন, “বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতির ধাপ হিসেবে লাখো কোটি জনতার সাক্ষ্যকে অস্বীকার করা পূর্বক আওয়ামী ঘরানার কিছু স্বঘোষিত বুদ্ধিজীবী স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে জিয়াউর রহমানকে অস্বীকার করে বসে। গায়ে প্রগতিশীল তকমা লাগিয়ে ক্ষমতাসীনদের আনুকুল্য পেতে এক শ্রেনীর বুদ্ধিজীবী নামধারী সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির দাসেরা একের পর এক মিথ্যা, বানোয়াট এবং মনগড়া ইতিহাস রচনার প্রতিযোগীতায় লিপ্ত হয়। আর দেশের আপামর জনসাধারনকে ধোকায় ফেলার এক নগ্ন খেলায় মেতে ওঠে তৎকালীন ক্ষমতাসীনরা। ভাড়াটিয়ে লেখক দিয়ে ইচ্ছেমত ইতিহাস রচনা করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে চরম বেঈমানী করে নতুন প্রজন্মকে অন্ধকারে পতিত করার যে কৌশলের আশ্রয় নেওয়া হয় তা গত আড়াই বছরে লজ্জাজনক স্তরে পৌছে গেছে।”

বিষয়টি আসলে ভয়াবহ। মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে কথা বলতে গেলে ভাড়াটিয়া লেখকের তকমা গায়ে লাগানো বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। আমি নিজেও বলতে চাচ্ছি – ‘জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বলা যায় না। ‘ কিন্তু আমি কোন ভাড়াটিয়া লেখক নই। আমাকে এই সত্যিটি প্রকাশ করার জন্য কেউ টাকা দেয়নি। দিতে চাইলেও ইতিহাস পাল্টাবার অধিকার আমার নেই। সত্যি যতই চাপা দিয়ে রাখা হোক না কেন প্রকাশ তাকে পেতেই হবে। তিনি আবার বলেছেন, জিয়াউর রহমান নিজেও কখনও স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে নিজেকে দাবি করেন নাই।

এটা সত্যি। তাঁর কোন বক্তব্যে তিনি এ দাবি করেননি। সুতরাং বুঝে নিতেই হবে এই স্বাধীনতার ঘোষক পদটি সৃষ্টি করেছে চাটুকারেরা।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, স্বাধীনতার ঘোষক হওয়ার জন্য জনগণের ম্যান্ডেট প্রয়োজন। যা জিয়াউর রহমানের ছিল না।
এ প্রসঙ্গে আমার মতামত হচ্ছে- এভাবে জিয়াউর রহমানকে বিভিন্ন জায়গায় প্রতিষ্ঠিত করছেন আওয়ামীলীগ স্বয়ং। দরকার কি? সংবিধানে বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে লেখা হবে। এই নিয়ে মওদুদ আহমেদ বলেছেন, তাঁর সরকার ক্ষমতায় গেলে এগুলো সব পরিবর্তন করবে।
স্পষ্ট হয়ে গেলো ৫ বছরের ইতিহাস নিয়ে মারামারি কাটাকাটি চলবে। আবার সংসদ এভাবেই উত্তপ্ত হবে। বঙ্গবন্ধুকে গালি দেবে বিএনপি। জিয়াকে গালি দেবে আওয়ামী লীগ। জিয়া নিজেও মনে হয় অবাক হতো তার এতো জয়জয়কার দেখে। যেই জিয়া মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার ছিলেন। তিনি হয়ত স্বপ্নেও ভাবেন নাই একদিন এভাবে এ দেশের ইতিহাসে একটা উল্লেখযোগ্য জায়গা তিনি দখল করে নিবেন।

জিয়া সম্পর্কে কর্ণেল তাহেরের বক্তব্য ছিল- মীর জাফরের পর জিয়া হলো আরেকজন মীর জাফর।

তাঁর জবানবন্দীতে আছে,

“আমাদের জাতির ইতিহাসে আর একটাই মাত্র এরকম বিশ্বাসঘাতকতার নজীর রয়েছে, তা’ হচ্ছে মীর জাফরের। বাঙালি জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে সে গোটা উপমহাদেশকে দু’শ বছরের গোলামীর পথে ঠেলে দিয়েছিল। ভাগ্য ভালো যে এটা সতের শ’ সাতান্ন সাল নয়। উনিশ শ’ ছিয়াত্তর। আমাদের আছে বিপ্লবী সিপাহি জনতা, তারা জিয়াউর রহমানের মতো বিশ্বাসঘাতকদের চক্রান্তকে নির্মূল করবে।”
জিয়াকে জন্ম দিয়েছিল কর্ণেল তাহের। সেই তাহেরকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়েছিল জিয়া। ৭ নভেম্বর জিয়ার অনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হয় বাংলাদেশের ইতিহাসে। খেতাব প্রাপ্ত একজন পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হয়েছে। এটা সত্যি আমাদের ইতিহাসের সবচাইতে কলঙ্কজনক অধ্যায়। জিয়া একজন শাসক হিসেবে কেমন ছিলেন আমি সেই প্রশ্নে যাবো না। তবে আমি প্রধানমন্ত্রীর কিছু কথা টানতে চাই। তিনি বক্তব্য দিয়েছেন, জিয়া সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি।

আমি বলবো সংকীর্ণতার জবাব আরেকটি সংকীর্ণতার উদাহরন। এই খেতাব জিয়ার অর্জন। এবং বঙ্গবন্ধুই এই খেতাব জিয়াকে দিয়েছেন। এই ধরনের প্রসঙ্গ টানলে বার বার বঙ্গবন্ধুকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা হয় বলে আমার মনে হয়। জিয়া আমার দৃষ্টিতে একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারপর তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি। আবার বঙ্গবন্ধু আমার কাছে প্রথমে একজন নেতা। বাংলার স্বাধীকার আন্দোলনের নেতা। তারপর তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতি। নেতার পর তিনি শাসক। এখানেই বঙ্গবন্ধু এগিয়ে। নেতার সমতূল্য আর কেউ হতে পারে না। জিয়া তো নেতা ছিলেন না।

এতো সংলাপ-সংলাপ নিয়ে চিল্লান আমাদের রাজনীতিবিদরা। তাদের উচিত ইতিহাস নিয়ে এই দুই দলের সংলাপে বসা। একটি দেশ ইতিহাসের জায়গায় বিভক্ত। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে। একটি পয়সার এপিঠে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। অন্য পিঠে জিয়ার বিএনপি। পাঁচ বছরের ইতিহাসের খেলা হয় “বঙ্গবন্ধু বনাম জিয়া”। আর মাঝখান দিয়ে সুবিধা আদায় করে নেয় চাটুকাররা। বিষয়টা এমন হয়ে গেছে একই ঘরে কেউ বঙ্গবন্ধুকে গালি দিবে কেউ জিয়া গালি দিবে। গালাগালির রাজনীতিতে বিদ্ধ হচ্ছেন দুই রাষ্ট্রপতি।

জিয়ার জন্ম সেনা ব্যারাক থেকে। যেখান থেকেই জন্ম হোক। জিয়ার স্ত্রী দু্ইবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা সাহসের সাথে লড়েছেন গণতন্ত্রের জন্য। এটাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এটাও মেনে নিতে হবে, কোন দেশের পলিটিক্যাল নেতারা একদম পরিশুদ্ধ হন না। সেটা থাকাও সম্ভব না। ক্ষমতা কখনও মানুষ কুক্ষিগত করতে পারে না। আসলে ক্ষমতাই মানুষকে কুক্ষিগত করে ফেলে। সেই ক্ষমতা মানুষকে কিছুটা হলেও নৈতিক জায়গা থেকে সরিয়ে আনবে এটা অনেকটা মানুষের নিয়তি।

সেখান থেকে বেগম জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা কেউই বের হয়ে আসতে পারেন নাই। পারবেন বলেও আমি আশা করি না। তবে হয়তো নতুন প্রজন্ম এই দেশটাকে অনেকটাই পরিবর্তন করে দিতে পারে। কিন্তু ইতিহাসটা নির্ভর করবে আমাদের পূর্ববর্তী প্রজন্মের উপর। তাদের রেখে যাওয়া পুথি আমরা পাঠ করবো। সেটা নির্ধারণ হওয়া উচিত। সঠিক ইতিহাসটা রচিত হওয়া উচিত। আমি পাঁচ বছর আর তুমি পাঁচ বছর এই করে আমাদের ইতিহাসটাই হয়তো একসময় নিস্তেজ হয়ে যাবে। শুধু থেকে যাবে বঙ্গবন্ধু বনাম জিয়া। সত্যি কথা হচ্ছে- দুজন “বনাম” নয়। দুজন সমান কাতারেও নয়। দুজন আলাদা। সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে দুজনের জন্ম। ভিন্ন জায়গায় দুজন বেড়ে ওঠা। একজন সাধারণ মানুষ থেকে নেতা হয়ে উঠা। আরেকজন সামরিক পোষাক থেকে শাসক হয়ে ওঠা। দুজনের ভিন্নতা থাকবেই। শুধুমাত্র এক জায়গাতেই তাঁরা দুজন ছিলেন অভিন্ন। সেটা হলো মুক্তিযুদ্ধ। দুজনের কেউ এখানে কম্প্রোমাইজ করেননি। দুজনই একটি স্বাধীন দেশ চেয়েছেন।