ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

আজকে এমন একটা বিষয় নিয়া বলতে মন চাইতাছে যা নিয়া কথা বলার যোগ্য আমি না (শুরুতেই সেইভ জায়গায় চইলা যাওয়ার পলিসি হিসেবে কইলাম)। বিষয়টা হইল “শিক্ষা”। শিক্ষার মানদন্ড কি হওয়া উচিত? এই নিয়া এর আগেও একবার একটা লেখা লিখছিলাম। তখন কইতে চাইছিলাম- শিক্ষার মানদন্ড নির্ধারণ করার আগে শিক্ষক-গো নীতির মানদন্ড নির্ধারণ করা উচিত। শিক্ষা জীবনে ভালো ফলাফল, প্রযুক্তি নির্ভর দেশগুলা থেকা পিএইচডি ডিগ্রিসহ গাদা গাদা গবেষণা কইরা আসলেই আমরা মনে করি- গুড টিচার। ড. ওমুক; ওমুক জায়গা থেকে পড়াশুনা করে এসেছেন। এখন তিনি ওমুক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ান। নিশ্চয় ওমুক বিশ্ববিদ্যালয়ের মান অত্যন্ত ভালো।

এই ওমুকদের নৈতিকতা কতটা ঠিক আছে। আদও তিনি শিক্ষার্থীদের শুধু শিক্ষা নয়; মানবতাও শেখাতে পারছেন কিনা সেগুলা নীতিতে আছে কি নাই আমি জানি না। থাকলেও কাগজে আছে। কাগজে বোল্ড পয়েন্টে নাই। বোল্ড পয়েন্টে থাকে শিক্ষার সিষ্টেমের কথা। এবং শিক্ষকরা যেহেতু এই নীতি প্রণয়ন করেন তাই তেনাদের বেতন কাঠামোটা মাশাল্লাহ্ দিলে বাদ যায় না। প্রতি বছর একটা অনশন হবে তেনাদের বেতন লইয়া। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে এমন কথা শোনা যায় না। স্কুলের শিক্ষকরাই এই আন্দোলনটা একটু বেশী করে। তবে আমি স্কুল শিক্ষকদের এই আন্দোলনকে সার্পোট করি। তাদের বেতন অত্যন্ত কম। সেই বেতনে জীবন অতিবাহিত করা কঠিন। তাই তারা বাসায় কোচিং সেন্টার খুইলা বসছেন। এইসব কোচিং সেন্টারের বিরুদ্ধে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের বুদ্ধিজীবী শিক্ষক সমাজ।

যাইহোক, এইসব নিয়া প্যাকর প্যাকর কইরা লাভ নাই। শিক্ষানীতি কখনও শিক্ষার্থীদের মন মতো হইব না। হইব শিক্ষকদের মন মতো। এডুকেশন কারিকুলাম নিয়া বহু জ্ঞানী-গুনীজন কথা কয়। কিন্তু এডুকেশন যাগো লাইগা তাগো কর্মসংস্থান নিয়া কেউ চিন্তা করে না। বুদ্ধিজীবীরা বলেন- চাকরী একজন ছাত্রের লক্ষ হইতে পারে না। আসলে বুদ্ধিজীবী নিয়া এই এক সমস্যা। পোলাপান চিন্তা করবো একটা আর ওনারা চিন্তা করবো আরেকটা।
চাকরীর কথা চিন্তা করলাম না। ঠিক আছে। তো, যদি চাকরী না পাই আমাগো নীতিনির্ধারকরা কি মাস শেষে আমারে ট্যাকা দিবো?

একবার এক কবি আমারে কইতাছিল। সেও তখন বেকার, আমিও বেকার। সেই কবি আমারে কয়- ভাই, বহু সাহিত্যিক আমারে কইছে, তুমি অনেক ভালো কবিতা লিখো। ভবিষ্যত উজ্জল। কিন্তু কেউ আমারে জিগায় নাই- দুপুরে কি খাইছ?
বেচারা এক কৃষকের সন্তান। আমার খাওয়ার সমস্যা হয় নাই। কারণ বাপের হোটেলে ভাত ফ্রি। কিন্তু ঐ কবি’র বাপের হোটেল আছিল না। তাই ক্ষুধার্ত অবস্থায় মনের ক্ষোভ কইতাছিল। সে আরেকটা কথা কইছিল- কবিতা ভাত দেয় না; ভাব দেয়। তাই ভাব লইয়া বইসা থাকুম?

এবার কই গুড ষ্টুডেন্ট-ব্যাড ষ্টুডেন্ট লইয়া। বুঝেন নাই? ষ্টুডেন্ট দুই প্রকার। গুড ষ্টুডেন্ট এবং ব্যাড ষ্টুডেন্ট। গুড ষ্টুডেন্টরা ব্যাড কিছু করলেও শিক্ষকদের চোখে তারা গুড। আর ব্যাড ষ্টুডেন্টরা গুড কিছু করলেও সেটা ব্যাড। এই মাইন্ড সেট-আপ নিয়া শিক্ষকদের সমাজের বহু শিক্ষক পার করতাছেন দিনের পর দিন। দশকও পার হইয়া গেছে। একবার এক সফট্‌ওয়্যার কোম্পানির মালিকের সাক্ষাৎকার নিতে গেছিলাম। তার সাক্ষাৎকারে তারে হাসতে হাসতে জিগাইছিলাম- ছোটকাল থেকেই কি আপনার কম্পিউটারের প্রতি আকর্ষন ছিল।

ব্যাটা হাসতে হাসতে কয়- ভাই, স্কুলে বলেন আর কলেজ বলেন অথবা বিশ্ববিদ্যালয় বলেন। আমার কোনদিনই পড়াশুনার প্রতি ইন্টারেস্ট ছিল না। মনে হইত এইগুলা ভোগাস। আমার লাইগা না। খালি আড্ডা দিতাম। বন্ধু লইয়া ফূর্তি করতাম। আমি যখন কলেজে পড়ি তখন কম্পিউটার নতুন আইছে। হুট কইরা চিন্তা করলাম জিনিসটা কি? একটু গুতাইয়া দেখি। সেই গুতানি এখনও দিতাছি। কলেজের রি-ইউনিয়নে গেলাম। যাইয়া দেখি, ক্লাসের ফার্স্ট বয় আমার লগে কথা কয় না। কারণ হইল ইগো সমস্যা। খুব কষ্ট লাগলো। বুঝলাম, পড়াশুনায় ভালো আছিলাম না। তাই ভালো কিছু করলেও কেউ খুশী হইবো না। তাই সবার থেকে যোগাযোগ হারাইয়া এখন নিজের গুতা-গুতি নিয়াই আছি।

ব্যাটার কথা আমার মনে আটকাইল। বুঝলাম দুনিয়াটাই এমন। আমারও এমুন অনেক দেখা আছে। অনেক বন্ধু থেকে শুরু কইরা ছোট ভাইগো ঘটনা দেখছি। অনেকরেই দেখছি। ব্যাড ষ্টুডেন্ট কিন্তু চলে গেছে ভালো জায়গায়। তার শিক্ষকরা এই নিয়া উদ্বেগ প্রকাশ করেন। উদ্বেগ প্রকাশ কইরা বলেন- আপনের মতো ষ্টুডেন্টরা চাকরী পায়। কিন্তু ভালো ষ্টুডেন্টরা এখনও বইসা আছে।

এইসব দেইখা সত্যিই সমাজের প্রতি ঘৃণা জন্মাইয়া যায়। মনে হয়, কিসের শিক্ষা? যেখানে শিখানোর কথা মানুষজাতি সমান। ভেদাভেদ বইলা সমাজে কিছু নাই। সেইখানেই উচু জাত-নিচু জাত তৈরী কইরা বইসা আছে আমাগো শিক্ষা ব্যবস্থা।

এতো কাহিনী কওয়ার দরকার ছিল না আমার। কইতে চাইতাছিলাম অন্য বিষয়ে। আজকে দৈনিক সমকালে হেড লাইন “আগামী বছর থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি বন্ধ”।
এই নিউজ পইড়া তো আমি মাথায় হাত! আরে কয় কি?

শিক্ষার মানের উপর বিচার কইরা এখন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হইবো না। বন্ধ হইবো জমির পরিমাণ দিয়া। শিক্ষার মান আর জমির পরিমাণ এখন সমান। শিক্ষা দিতে পারবেন তবে এই জন্য আপনার জমি লাগবো। বিষয়টা এমুনিই হইয়া গেলো। ঢাকায় বর্তমানে ৩৫টা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে। হিসাব অনুযায়ী দরকার ১০৫ বিঘা জমি। ঢাকায় নতুন রাস্তা করনোর জায়গা নাই। আর ১০৫ বিঘা জমি সরকার কি আসমান থেকা আইনা দিবো নাকি তাই বুঝতাছি না। উচ্চ শিক্ষার লাইগা ৩ লাখ শিক্ষার্থী বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে হয় বাস্তবতার চাপে পইড়া। ২ লাখ শিক্ষার্থীদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে দিতে পারে সরকার। এই হইল বাস্তবতা। সরকার এতো নিয়ম ফলাইতে আসেন। তো, এই নিয়ম দিয়া কি হইব? সরকার এতো পাকনামি কইরা কি ৫ লাখ শিক্ষার্থীর সবাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ কইরা দিতে পারবো? দেখি কিসমে কিতনা হ্যায় দম।

খালি আইন হবে। হমবি-তমভি হবে কিন্তু নিজের ঘরে ঠুনঠুন বাজনা বাজবে এমুন হইলে তো হইবো না।

ঢাকায় জমি নাই। তারপরও জমির কথা আসল যেহেতু তাই কইতাছি, আমার বিশ্ববিদ্যালয় ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ বসুন্ধরায় নিজস্ব ক্যাম্পাসে আইসা পড়ছে। নিজের ক্যাম্পাস। কি লাভ হইল!! বিদ্যুৎ এখনও আসে নাই। ডেসকো বিদ্যুৎ দেয় নাই। পোলাপানের ট্যাকা দিয়া অয়েল জেনারেটর দিয়া সারাদিন এসি-লিফ্ট-কম্পিউটার সবই চলে। তেল পুড়ে। সাথে পুড়ে পোলাপানের বাপের ট্যাকা। এই ট্যাকা তো অন্য খাতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ব্যয় করতে পারতো। কিন্তু তেল পুইড়া সব ট্যাকা কালা ধোয়াতে উড়াইয়া দিতাছে। তো, সরকার কি এইখানে পাকনামি কইরা ডেসকোরে কইতে পারে না? কইবো, যদি কোন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়রে ডেসকো বিদ্যুৎ না দেয় তবে তাগো লাইসেন্স ক্যান্সেল কইরা দেওয়া হইবো। আমরাও দেখতাম সরকারের পাওয়ার কতো!!

আমি ভাই সাধারণ মূর্খ একটা মানুষ। এতো জ্ঞান অথবা গুন আমার নাই। কিন্তু আমি মানতে পারলাম না যে, জমির পরিমাণ দিয়া বিশ্ববিদ্যালয় খুলা থাকবো নাকি বন্ধ থাকবো এইডা সিদ্ধান্ত নেয়া হইবো। যদি মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী সাহেব বলেছেন, ‘বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে যারা জমি কিনবে, ক্যাম্পাস প্রতিষ্ঠায় হাত দেবে, তাদের আন্তরিকতার পরিচয় দেবে, তাদের বিষয়টি অবশ্যই ভেবে দেখা হবে। যারা কিছুই করবে না, অবশ্যই তাদের শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ করে দেওয়া হবে।’

এইডারে বলে কথার ফাঁক। এই ফাঁক ফোকর দিয়া সরকার বাইর হইয়া যাইবো।
আসলে সরকার কি চায় শিক্ষা খাতে? সৃজনশীল পদ্ধতি প্রসংশিত হইছে। আমি এর পক্ষ্যে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ হইলো বিশ্বকে জানতে পারার বিদ্যালয়। যেখানে মানবতার কথা বলা হবে। আর নিজের ক্যারিয়ারকে সুগঠিত করবে। কিন্তু ক্যারিয়ারের কাছে মানবতাকে নিঃশেষ করা হবে। আর শিক্ষকরা অত্যন্ত বীর দর্পে মানবতাকে পদ-তলে পিষ্ট করবেন এইটা তো মানা যায় না। সরকারের উচিত আগে এইসবের মান ঠিক করা। জমি দিয়া মান নির্ধারণ করলে হইবো না। হইতে পারেও না। সরকারের এই সিদ্ধান্তরে আমি নিন্দাই শুধু না ধিক্কার জানাই।

তাই আমি কইতে চাই, আগামী বছর জমির জন্য একটা বিশ্ববিদ্যালয় যদি বন্ধ হয় তাইলে সরকার শিক্ষারেই বন্ধ কইরা দিক।