ক্যাটেগরিঃ নাগরিক সমস্যা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
passport

বাংলাদেশের মানুষের সমস্যার শেষ নেই। প্রতিদিন ঘর থেকেই সমস্যার শুরু। তারপর পুনরায় ঘরে ফেরা পর্যন্ত সমস্যার লিস্ট বানাতে গেলে শেষ হবে না। এদেশের মানুষ এগুলোকে নিয়তি হিসেবে মেনে নিয়েছে। যেমন ধরা যাক- সিএনজি ড্রাইভারদের সমস্যা। তাদের বাহনে মিটার থাকলেও সেটাতে দুরত্ব মেপে তারা চলবেন না। তারা চলবেন চুক্তিতে। যেখানে যেতে লাগবে ১০০ টাকা সেখানে ভাড়া চাওয়া হবে ৩০০ টাকা। খুব ভালো চালক পেলে অবশ্য ২৫০টাকায় যেতে পারবেন! এই হলো ভালোর অবস্থা আর কি!‍

এখন তো আবার সিএনজিতে উঠলেই চালক খুব কাকুতি করে বলবে- ভাই, সার্জেন্ট ধরলে বইলেন মিটারে যাচ্ছেন। বিষয়টা হলো, রাষ্ট্রের কাছে এই অপরাধীকে আপনি ধরিয়ে দেবেন না। কারণ এদেশের সব যাত্রীরা অসহায়। তাই অসহায় যাত্রী অসহায় ড্রাইভারের পাশে দাঁড়ায়। তারা গন্তব্যে যেতে পারছেন এতেই খুশী। আবার ট্রাফিক পুলিশ আটকাবে। কেস দেবে। কত সময় চলে যাবে। সময় নষ্ট করার দরকার কি!

এ শহরে মানুষ এভাবে চলে। অবাধে অপরাধের সঙ্গে চলছে। ছোট্ট ছোট্ট অপরাধে ভরা এ শহরে কোনো নিরাপদ জায়গা নেই। বড় অসহায় এই নগরের মানুষ। কি করবে? কার কাছে বলবে? রাষ্ট্র তো এসব সমস্যা নিয়ে ভাববে না। ভাববে বড় বড় রুই কাতলার সমস্যার নিয়ে।

যাইহোক। কথা বলতে চাচ্ছিলাম আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে। বিষয়টা হলো ‘পাসপোর্ট’। এটিকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্পও বলা যেতে পারে। অন্যে এমন অভিজ্ঞতার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করলে কোনো অসুবিধা নেই। মেনে নেব।

গল্পের সূচনা:
সিদ্ধান্ত নিলাম পাসপোর্ট করবো। অনেকের সঙ্গেই আলোচনা করা শুরু করলাম। শুনেছি পাসপোর্ট অফিসে অনেক ঝামেলা। দালাল ছাড়া কাজ হয় না। অনেক ঘুরানো হয়। কি করা যায় এসব রোধে?

অফিসের সব কলিগরা মিলে বললেন, এখন তো পাসপোর্ট আবেদন অনলাইনে করা যায়। এখন নিশ্চয় বিষয়টা সহজ হয়ে গেছে। ডিজিটাল পাসপোর্ট পাওয়া খুব সহজ। পেলাম ওয়েবসাইটের ঠিকানা।

(http://www.passport.gov.bd/Redirect.aspx) ওয়েব সাইটে ঢুকে একটু চোখ বুলিয়ে দিক-নির্দেশনাও পড়লাম। ভাবলাম, বাহ সুন্দরভাবে ফর্মটা পূরণ করে দেব। পাসপোর্ট অফিসের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে, রোদে পুড়তে হবে না।

ফর্ম পূরণ করতেই নানান বিপত্তি। এখানে অনেক বিষয় জানার প্রয়োজন রয়েছে। ধরেন আমি গত তিনবছর ধরেই চাকরি করছি। এবার আমি বাইরে পিএইচডির জন্য আবেদন করবো। তাহলে আমার পাসপোর্ট ক্যাটাগরি কি চাকুরীজীবী নির্বাচন করবো নাকি স্টুডেন্ট?

বিপত্তির প্রশ্নের উত্তর কেউ দিতে পারেনি। শংকা থেকে যাচ্ছে। আমি তো দিয়েছি চাকুরীজীবী। কারণ তিনবছর চাকরি করে কিভাবে পাসপোর্টে নিজেকে স্টুডেন্ট দাবী করি? এখন ধরেন দেশের বাইরে অ্যাপ্লাই করলাম। তখন তারা যদি ভিসা দেয়ার সময় বলে বসে, আপনাকে ভিসা দেয়া সম্ভব নয়। কারণ আপনার পাসপোর্ট একজন সার্ভিস হোল্ডারের। স্টুডেন্ট ভিসা এজন্য দেয়া যাবে না। এই শংকা নিয়েও ফর্ম পূরণ করলাম।

আবার বিপত্তিতে পড়লাম পিতার নাম লিখতে গিয়ে। আমার সব এডুকেশনাল সার্টিফিকেটে বাবার নাম লেখা Md. ABC (বাবার নাম দিলাম না। উদাহরণ হিসেবে ABC দিলাম)। সমস্যা হলো, অনলাইন পাসপোর্ট ফর্মে Md-এর পর ডট নেয় না। অর্থাৎ ডট ছাড়া লিখতে হবে। না হয় মুহাম্মদ পুরোটা লিখতে হবে। সমস্যা থেকেই গেল। মুহাম্মদ দিলে সার্টিফিকেটের সঙ্গে মানানসই হচ্ছে না। তাই ডট ছাড়াই Md বসানো লাগলো।

যাইহোক। ফর্ম পূরণ করলাম। সাবমিট করলাম। তারপর ইমেইলে বিশাল সাইজের একটি ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড দিল। নির্দেশনা হলো- টাকা জমা দিয়ে স্লিপ নিয়ে পাসপোর্ট অফিসের অনলাইন বুথে জমা দিয়ে দিতে হবে।

অর্থাৎ কাজটি খুবই সহজ বলেই ধরে নিয়েছি।

ব্যাংকের বিড়ম্বনা:
টাকা জমা দিতে হবে। গেলাম আগারগাঁও সোনালী ব্যাংক শাখায়। প্রিয় পাঠক এখান থেকেই শুরু একটি চক্রে ঘুরপাক খাওয়ার গল্প। ব্যাংকের সামনে থাকে দীর্ঘ লাইন। ভেতরের লাইনের কথা বলছি না। ব্যাংকের মূল ফটকের বাইরেই টাকা জমা দেয়ার দীর্ঘ লাইন।

সেখানে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে থাকেন তরুণ-তরুণী, বৃদ্ধ পুরুষ/মহিলা। কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস ফেলে। কেউ আমার মতো অফিস রেখে দাঁড়িয়ে থাকে। কি করবে? লাইন তো এগোয় না। মাঝে মাঝে কিছু মহিলা এসে ঘুরে যায়। নিচু স্বরে বলে যায়, একটা (ফর্ম) টাকা জমা ১০০ টাকা, দুইটা টাকা জমা ১৫০ টাকা। অনেকে এই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে দালাল খপ্পড়ে পড়েন। টাকা জমা দেয়া সত্যিই দ্রুত গতিতে হয়ে যায় এই দালালদের মাধ্যমে। তাহলে আর কেউ এর বিরুদ্ধে কথা বলবেন কেন?

অনেকেই আমার মতো রাষ্ট্রের বেগতিক অবস্থায় অপরাধে লিপ্ত হয় না। কিন্তু অনেকে নিরুপায় হয়ে দ্বায়গ্রস্থ হয় অপরাধের।

প্রায় আড়াই ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ঢুকতে পারি সোনালী ব্যাংক শাখায়। ঢুকেই আমি হতবাক নির্বাক হয়ে যাই। হাজার হাজার মানুষ এই ব্যাংকে পাসপোর্টের টাকা জমা দিচ্ছে। অথচ বুথ মাত্র দুটি। তাও জায়গার অভাব। গুমট দম বন্ধ হওয়ার মতো অবস্থা!

সত্যায়িত:
অ্যাটাসটেড মানে সত্যায়িত। ফর্মের বাম পাশে ছবি আঠা দিয়ে লাগিয়ে সেখানে সত্যায়িত করতে হবে। তারপর সঙ্গে রাখতে হবে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ফটোকপি। সেটাও সত্যায়িত। এছাড়াও চাকরীজীবী হলে অফিসের আইডি কার্ডের ফটোকপি সত্যায়িত। অর্থাৎ অ্যাটাসটেড।

এটার জন্যও দালাল আছে। পকেটে সিল-কালি নিয়ে ঘুরবে। ৫০টাকার বিনিময়ে আপনার সব কাগজপত্র সত্যায়িত হয়ে যাবে। আমিও অবশ্য এই অ্যাটাসটেড বিড়ম্বনায় পড়ে গেলাম। কি করা যায়? ভাগ্য ভালো সময় মতো আমার এক আংকেলের কথা মনে পড়ে গেল। কাছেই অফিস। দৌড়ে ওনার কাছে চলে গেলাম। অ্যাটাসটেড করে নিলাম। প্রশ্ন হচ্ছে- সেঁকেলে এই সত্যায়িত বিড়ম্বনা আর কতকাল মানুষ বয়ে বেড়াবে? সরকারি সব কিছুতে সত্যায়িত কাগজ জমা দিতে হবে। যিনি সত্যায়িত করছেন তিনি যে আসলেই দেখে শুনে সত্যায়িত করছেন, এই বিষয়টি কে সত্যায়ন করে দেবে?

দীর্ঘ লাইন:
যাইহোক। টাকা জমা দিয়ে ফর্ম সত্যায়িত (ন্যাশনাল আইডি এবং অফিস আইডি সত্যায়িত করা হয়নি) করে আবার দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হবে। পাসপোর্ট অফিসের গেট দিয়ে প্রথমে লাইন ক্লিয়ারেন্স। সেই লাইনও প্রায় ৩০ মিনিট লাগবে। সেখানে ক্লিয়ারেন্স পাওয়ার সময় অনলাইন ফর্ম তিন তলায় বলে পাঠিয়ে দেবে।

তিন তলায় গিয়ে আবার লাইন। সেই লাইন খুব ধীর গতিতে এগোয়। যাইহোক। প্রায় দরজার কাছাকাছি। ঠিক সেসময় একজন অফিসার সবার ফর্ম রিচেক করে নিচ্ছেন। তিনি লাইনে এসে একজন একজন করে সবার ফর্ম দেখছেন। আমার ফর্ম দেখেই বলল- ফর্ম দুটো লাগবে। এবং ন্যাশনাল আইডি, অফিস আইডিরও সত্যায়িত লাগবে। তখন ঘড়িতে ২টা বেজে ৪০ মিনিট। ফর্ম জমা নেয়া হবে ৩টা পর্যন্ত। সকাল ১০টা থেকে যে যুদ্ধ সে যুদ্ধ অসমাপ্ত রেখেই বের হয়ে আসতে হলো পাসপোর্ট অফিস থেকে।

অনলাইনে পাসপোর্ট:
প্রিয় পাঠক, কেউ কি অনলাইন সেবার সঙ্গে সাধারণ সেবার পার্থক্য খুঁজে পেয়েছেন? আমি পেয়েছি। অনলাইনে ফর্ম পূরণ করতে আপনাকে কম্পিউটার এবং ইন্টারনেটের সংযোগ লাগবে। যা একটু ব্যয়সাপেক্ষ। আর সাধারণ পদ্ধতিতে আপনার লাগবে একটি কলম। খরচ বরঞ্চ কমে গেল। কারণ বাকি সবকিছুই আপনাকে সাধারণ পদ্ধতিতেই করতে হচ্ছে। এটাকে কোনোভাবে অনলাইন পাসপোর্ট সেবা বলা হয় না।

যা হতে পারে:
আমি মোটা মাথাদের মতো চিন্তা করতে পারি না। প্রতিদিন হাজারখানেক মানুষ কনট্রোল করতেই পাসপোর্ট অফিসের লোকদের মাথা নষ্ট হয় নিশ্চয়। তাই সহজ একটা পদ্ধতি কেন মোটা মাথায় আসে না তা সৃষ্টিকর্তা মালুম। আমরা খুব সাধারণভাবেই এই কাজটি করে ফেলতে পারি। যেমন-

১. অনলাইনে পাসপোর্ট ফর্ম পূরণ করা হলো। পূরণ করার সময়েই সে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের সফট কপি এবং চাকরির আইডির সফট কপি ফর্মের সঙ্গে অ্যাটাচ করে দেবে।

২. গ্রাহককে দেয়া হবে একটা ইউজার আইডি এবং পাসওয়ার্ড। ওই আইডি দিয়েই সে অনলাইন অ্যাকাউন্টে অ্যাকসেস করতে পারবে।

৩. ইউজার আইডি নাম্বারেই যে কোনো ব্যাংক থেকে পাসপোর্ট অফিসের নির্দিষ্ট অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠিয়ে দেবে।

৪. পাসপোর্ট অফিস সেই ডাটা অনলাইনেই অ্যানালাইসিস করবে। দেখবে কোনো তথ্য ঘাটতি আছে কিনা। যদি থাকে তাহলে অ্যাকাউন্টে তথ্য সঠিক করা জরুরী বলে একটি ম্যাসেজ পাঠিয়ে দেবে। এটিকে মোবাইল ম্যাসিজিংয়ের আওতায়ও আনা যেতে পারে।

৫. তথ্য সব ঠিকঠাক থাকলে পাসপোর্ট অফিস তাদের বাকি সব কাজ শুরু করে দিতে পারে।

৬. পুলিশ ভ্যারিফিকেশন। পুলিশ যখন ঘরে তথ্য যাচাই করতে আসবে তখন তাকে ন্যাশনাল আইডি কার্ডের ফটোকপি, চাকরির আইডির কার্ডের ফটোকপি দিয়ে দেয়া এবং অরিজিনাল কার্ডের সঙ্গেও পুলিশ মিলিয়ে দেখবে।

৭. কাজ শেষ হলে অ্যাকাউন্টে ম্যাসেজ বক্সে তথ্য চলে যাবে। তারপর সম্ভাব্য তারিখ দিয়ে দেয়া। যে তারিখে পাসপোর্ট নিতে গ্রাহক আসবেন।

এটাকে ডিজিটাল সেবা বলা যেতে পারে। ডিজিটাল সেবা মানে হলো, হয়রানি না হয়ে যে কোনো কাজ সহজে শেষ করা। এতে খরচ এবং ঝামেলা কমে আসবে। কিন্তু আমাদের ডিজিটাল সিস্টেম বলতে শুধু কম্পিউটার আর ইন্টারনেট বোঝালেই সমস্যা।

একটি সঠিক পদ্ধতির আওতায় পাসপোর্টকে নিয়ে আসা জরুরী হয়ে উঠেছে। আশা করি সরকার ব্যবস্থা নেবেন। নাগরিকদের পাশে সরকার দাঁড়ালে তারা কখনও অপরাধে লিপ্ত হবে না। আমি মনে করি প্রতিটা কাজে দালালরা যেমন অপরাধ করছে, ঠিক তেমনি যিনি দালালদের মাধ্যমে কাজ করাচ্ছেন তিনিও সমান অপরাধী।