ক্যাটেগরিঃ ব্লগ

 

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র :
গণমাধ্যম হিসাবে দেশের সংবাদপত্র সর্বদা বিকাশমান থাকলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ওই বিকাশমান ধারণার ব্যত্যয় ঘটে। এ অঞ্চলের নিয়মিত সংবাদপত্র প্রকাশের ইতিহাস সঙ্গত কারণেই ক্ষীণ ও নাতিদীর্ঘ। জ্ঞান চর্চার মাধ্যমে এ অঞ্চলের বহু ব্যক্তি খ্যাতি লাভ করলেও সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাস বড়ই করুণ। তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ এই বাংলাদেশের আঞ্চলিক পর্যায়ের সংবাদপত্রগুলোর করুণ পরিণতির কারণ ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ কি না তা নিয়ে গবেষকরা নিশ্চয় গবেষণা করবেন বলে আশা রাখি। কেননা, এর চুলচেরা ইতিহাস উত্তর প্রজন্মের সংবাদপত্র প্রকাশকারীদের পথের দিশারী হিসাবে যে কাজ করবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সংবাদপত্র সমাজের বাস্তবচিত্র তুলে ধরার পাশাপাশি তথ্যের পরিকল্পিত বিশ্লেষনের মাধ্যমে সমাজকে সত্য-সুন্দরের দিকে ধাপিত করতে পারে। সংবাদপত্রকে বিবেচনা করা হয় রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসাবে। সংবাদপত্র নিঃসন্দেহে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, তবে এর কার্যক্রমে থাকা মহৎ মিশন আর অন্য কোন ব্যবসায় দেখা যায় না। রাষ্ট্র বা সমাজ বিনির্মাণে সংবাদপত্রের একটা মহৎ দায়িত্ব সবসময় ছিল, বর্তমানেও রয়েছে। সংবাদপত্রের উৎপত্তি ও বিকাশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায় যে, পরিস্থিতি ভেদে গোটা সমাজকে দিক নিদের্শনা প্রদান ও গতিশীল রাখার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর পাশাপাশি স্থানীয় ভাবে প্রকাশিত সংবাদপত্রগুলো এক্ষেত্রে সমান, ক্ষেত্র বিশেষে অধিক কার্যকর ভূমিকা পালনে গুরুত্বের দাবিদার। কেননা, দেশের সিংহভাগ জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী স্থানীয় সংবাদপত্রগুলো অনেক বেশি মূর্তভাবে জনগণের আকাঙ্খা, চাহিদা, ইচ্ছা ইত্যাদির কথা ফুটিয়ে তুলতে পারে।
সংবাদপত্র প্রকাশনার সাথে মুদ্রণ শিল্প বা ছাপাখানার বিকাশ বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। এখনকার মতো অফসেট প্রিন্টিং প্রেসে ছাপা সংবাদপত্রগুলোর সর্বাঙ্গ সুদৃশ্য-মনোরম হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্রের দাপট ছিল লেটার প্রেসের আমলেই। নব্বই দশকের মাঝামাঝি সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রথম অফসেট প্রিন্টিং প্রেস আসে। অবশ্য এরও কিছু সময় আগে থেকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্রগুলো রাজশাহী ও বগুড়া’র অফসেট প্রিন্টিং প্রেসগুলো থেকে মনোরম আঙ্গিকে মুদ্রিত হতে থাকে।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের আগে পাকিস্তান আমলে নবাবগঞ্জ মহকুমা রাজশাহী জেলার অন্তর্গত ও বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে মালদা জেলার অন্তর্গত ছিল। এই দুই শাসনামলে রাজনৈতিক, মানবাধিকার ও সাহিত্য বিষয়ক অনেক বিশেষ সংকলন নবাবগঞ্জ মহকুমা থেকে প্রকাশিত হয়। এগুলোর মধ্যে কোন কোনটির একাধিক সংখ্যাও প্রকাশিত হয়েছে বলে শোনা যায়।
স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর থেকে দেশের গণমাধ্যমগুলো স্বাধীনতার সর্বোচ্চ স্বাদ লাভ করে। গণমাধ্যম জগতে স্বাধীনতা লাভের ধারা প্রবাহিত হয় দেশের সর্বত্র। চাঁপাইনবাবগঞ্জে সংবাদপত্র প্রকাশের সবচে’ উর্বর সময় হিসাবে নব্বই দশক বিশেষ ভাবে গণ্য। এ দশকেই চাঁপাইনবাবগঞ্জে আটটি সাপ্তাহিক, একটি পাক্ষিক (পরবর্তীতে সাপ্তাহিকে উন্নীত) ও একটি দৈনিক সংবাদপত্র জন্ম লাভ করে। আগের দশকে একটি সাপ্তাহিক ও পরের দশকে আরো একটি সাপ্তাহিক সংবাদপত্র বাজারে আসে। নিচে এগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরা হল :
১) সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তা : ১৯৮৪ খৃীষ্টাব্দে মহকুমা থেকে জেলায় উন্নীত হওয়া আজকের এই চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে মাত্র ৫ বছর পরেই ১৯৮৯ খৃীষ্টাব্দের এপ্রিল মাসে সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তা প্রকাশিত হয়। এটিই চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার সর্বপ্রথম নিয়মিত সংবাদপত্র হিসাবে গণ্য। জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুরের সৈয়দ নাজাত হোসেন চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তা প্রকাশ করেন এবং সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করেন। আজকের সমাজে প্রতিষ্ঠিত গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাজহারুল ইসলাম তরু, সাপ্তাহিক সোনা মসজিদের সম্পাদক প্রভাষক মোহা: জোনাব আলী, সাংবাদিক শহীদুল হুদা অলক, সাংবাদিক আমিনুল ইসলামদের লেখালেখি জীবনের হাতেখড়ি এই সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তার মাধ্যমে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে প্রকাশিত প্রথম স্থানীয় সংবাদপত্র হিসাবে সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তার পাঠকপ্রিয়তা জেলার সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র প্রকাশনা জগতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করে, তা বলা বাহুল্য।
২) সাপ্তাহিক চাঁপাই সংবাদ : আর দু’ বছর পরই ১৯৯১ খৃীষ্টাব্দে ব্যতিক্রমী মাত্রার সাংবাদিক দেওয়ান মোহাম্মদ তালেবুন নবী প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক চাঁপাই সংবাদ। ভিন্ন স্বাদ ও মেজাজের সংবাদপত্রটি বহুমাত্রিক পাঠকদের মাঝে জনপ্রিয়তা লাভ করে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পাঠক সমাজ বর্তমানেও এমন প্রকাশনার অভাব কতোটা অনুভব করেন, তা সচেতন পাঠকদের সাথে কথা বললেই বোঝা যায়।
৩) সাপ্তাহিক বিশেষ প্রতিবেদন : সাংবাদিক মিজানুর রহমান কুটু’র সম্পাদনায় ১৯৯২ খৃীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক বিশেষ প্রতিবেদন। এর সাথে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত ছিলেন এ্যাডভোকেট মোহাম্মদ ইসাহাক ও সাংবাদিক মাহবুব আলম।
৪) সাপ্তাহিক বীর বার্তা : মুক্তিযোদ্ধা ও সাংবাদিক মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ’র সম্পাদনায় ১৯৯২ খৃীষ্টাব্দে জন্ম নেয়া পাক্ষিক বীর বার্তা অল্পকিছু দিনের মধ্যেই সাপ্তাহিক সংবাদপত্রে পরিণত হয়।
৫) সাপ্তাহিক সীমান্তের কাগজ : তরুণ সাংবাদিক জাফরুল আলম তাঁর অন্যতম দু’ সহযোগী বন্ধুবর সাংবাদিক ডাবলু কুমার ঘোষ ও রফিকুল আলমকে সাথে নিয়ে ১৯৯৩ খৃীষ্টাব্দে প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক সীমান্তের কাগজ। সাপ্তাহিক সীমান্তের কাগজে জেলার সর্বপ্রথম সংবাদপত্র সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ বার্তা’র সম্পাদনা নীতির ব্যাপক প্রতিফলন বিশেষভাবে লক্ষ্যণীয়।
৬) সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ সংবাদ : ১৯৯৪ খৃীষ্টাব্দে সাংবাদিক আব্দুর রাজ্জাক রাজু’র সম্পাদনায় সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ সংবাদ প্রকাশিত হয়।
৭) সাপ্তাহিক মহানন্দা : জেলার অন্যতম প্রধান নদী মহানন্দা’র নামে সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা মন্টু’র সম্পাদনায় ১৯৯৫ খৃীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক মহানন্দা।
৮) সাপ্তাহিক বরেন্দ্র কাগজ : সুকুমার প্রামাণিকের সম্পাদনায় ১৯৯৫ খৃীষ্টাব্দে সাপ্তাহিক বরেন্দ্র কাগজ প্রকাশিত হয়। সংবাদপত্রটিকে পাঠকপ্রিয় করে তুলতে সম্পৃক্ত হন সাংবাদিক এমরান ফারুক ও শহীদুল হুদা অলক।
৯) সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ কন্ঠস্বর : সাংবাদিক এসএমজি ফারুক স্বপনের সম্পাদনায় ১৯৯৭ খৃীষ্টাব্দে প্রকাশিত হয় সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ কন্ঠস্বর।
১০) সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ : জেলার সংবাদপত্র অঙ্গনে ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টির প্রত্যয় নিয়ে ১৯৯৭ খৃীষ্টাব্দে ইঞ্জিনিয়ার মাহতাব উদ্দিন সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ প্রকাশিত করেন। সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদের নির্বাহী সম্পাদক হিসাবে রাজনীতিক ইসরাইল সেন্টু ও সহকারী সম্পাদক হিসাবে সাংস্কৃতিক সংগঠক সাত্তার হোসেন গোড়াপত্তন করেন। কিন্তু তাঁরা চলে যাওয়ায় ব্যতিক্রমী ধারা সৃষ্টির চেষ্টা মুখ থুবড়ে পড়ে এবং একটি গতানুগতিক সংবাদপত্রে পরিণত হয়। তবে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্রের ইতিহাসে একমাত্র সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ নিয়মিত প্রকাশনার এক যুগ অতিক্রম করে।
১১) দৈনিক নবাব : চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার নিয়মিত সংবাদপত্রের পথিকৃত সাংবাদিক সৈয়দ নাজাত হোসেন আবারো সাহসিকাতর পরিচয় দেন ১৯৯৯ খৃীষ্টাব্দে দৈনিক নবাব প্রকাশ করে। তবে দৈনিক নবাবের প্রকাশনা ও সম্পাদনা স্বত্ত্ব ছিল তাঁর শ্যালক সাবেক ছাত্রনেতা আমিরুল মোমেনীন বাবু’র নামে। এ দৈনিকে শুরু থেকে মোহা: জোনাব আলী এবং পরে ফজলে রাব্বী নবাব ও সাত্তার হোসেন সহ-সম্পাদক হিসাবে কর্মরত ছিলেন। এছাড়াও স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে শাহজাহান প্রামাণিক, জিয়াউল হক সবুজ, আজমল হোসেন মামুন, ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট কাজ করেছেন।
১২) সাপ্তাহিক সোনা মসজিদ : গীতিকার ও প্রাবন্ধিক প্রভাষক মোহা: জোনাব আলী প্রাচীন বাংলার ঐতিহাসিক নিদর্শন ছোট সোনা মসজিদের নামানুসারে সাপ্তাহিক সোনা মসজিদ ২০০১ খৃীষ্টাব্দে প্রকাশ করেন। তাঁর অন্যতম সহযোগী হিসাবে ছিলেন ফজলে রাব্বী নবাব। বিভিন্ন সময় সাপ্তাহিক সোনা মসজিদে স্টাফ রিপোর্টার হিসাবে ইয়াকিন আলী, মনোয়ার হোসেন জুয়েল, মো: রোকন কাজ করেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র মানেই নির্দিষ্ট সময়ের পরে বের হওয়া বা মাঝে মাঝে বের না হওয়া- এমন বক্তব্য সকল সংবাদপত্রের ক্ষেত্রে প্রকাশনার শুরু থেকে অথবা কোন না কোন সময় বাস্তব সত্য ছিল। অবশ্য সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ পাঠকের হাতে পৌঁছতে দেরি করলেও এমন সমালোচনা থেকে রেহাই পেতে ‘ডেট লাইন’ নির্দিষ্ট সময়ে রাখতো। যেন পাঠকের কাছে সংবাদপত্রের দায়ব্ধতার চেয়ে ইতিহাস হওয়াটায় মূখ্য। এমন দৃষ্টিভঙ্গি পাঠকের সাথে প্রতারণা কি না- তা বিবেচনার দাবি রাখে। প্রকাশনার ধারাবাহিকতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের সকল সংবাদপত্রে ঘনঘন ছেদ লক্ষনীয়। এমন পরিস্থিতিতে কোন পত্রিকা কখন প্রকাশিত হবে সে ব্যাপারে পাঠক মহলে কোন আস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে চাঁপাইনবাবগঞ্জের পত্রিকাগুলো দীর্ঘমেয়াদী নিয়মিত পাঠক গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি।
সংবাদপত্রের আকর্ষনীয় মেক-আপ পাঠকের দৃষ্টি আটকে দেয়, তাকে কিনতে আগ্রহী করে তোলে। পত্রিকার নান্দনিক মেক-আপ শুধু ব্যবসা বৃদ্ধি ব্যাপার নয়, এটা শৈল্পিকতার অংশ। সংবাদপত্রের আকর্ষনীয় অঙ্গসজ্জা ভাব-গাম্ভীর্য বাড়িয়ে দেয় বহুগুণ। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্রগুলোর অঙ্গ এমন ভাব-গাম্ভীর্যপূর্ণ কখনোই হয়ে উঠতে পারেনি। শিরোনামের আধিক্য, সুদীর্ঘ শিরোনাম, অপ্রয়োজনীয় ছবি, অস্পষ্ট ও ঝাপসা ছবি, অসঙ্গত বক্স নিউজ, অপরিচ্ছন্ন কাটিং-পেষ্টিং, বিজ্ঞাপনের ছড়াছড়ি, সর্বোপরি অস্পষ্ট ছাপা পত্রিকাগুলোর বাহ্যিক সৌন্দর্য্যে দৈন্যদশার পরিচয় বহন করে। সংবাদপত্রের মূল উপাদান খবর হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্রগুলোতে সংবাদ হিসাবে ছাপা আইটেমগুলোর অধিকাংশই তাত্ত্বিক বিবেচনায় সংবাদ হিসাবে গণ্য করার কোন সুযোগ নেই। সংবাদ তৈরির অবশ্য পালনীয় সাধারণ নিয়ম-নীতিগুলো অনুসৃত না হওয়ায় পাঠকের কাছে তা সুখপাঠ্য হয়ে উঠতো না। এমনকি শিরোনামগুলোতে তথ্য উপস্থাপনে অসাবধানতা, অসামঞ্জস্য ভাষা প্রয়োগ, বানান ভুল, অপ্রয়োজনীয় আইভ্রু ও প্রশ্নবোধক বিভ্রান্তি পাঠককে সংবাদ পাঠে অনাগ্রহী করে তোলে। এছাড়া পর্যাপ্ত বিশ্লেষন ও যুক্তির অভাব, অবস্থানগত দৃঢ়তায় ছলচাতুরী প্রভৃতি দিয়ে সম্পাদকীয় ও অনিয়মিত প্রকাশনার ধারাবাহিক পরিস্থিতি থেকে এমন দাবি একেবারে অযৌক্তিক হবে না যে, বিজ্ঞাপন প্রকাশের জন্যই কিছু যেন-তেন লেখা সংবাদ হিসাবে জুড়ে দেয়া হতো ওই সংবাদপত্রগুলোতে। এমন মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি সাংবাদিকতায় সর্বদা পরিত্যাজ্য।
সরকারি তথ্য বাতায়ন অনুযায়ী বর্তমানে শুধুমাত্র সাপ্তাহিক গৌড় সংবাদ ও সাপ্তাহিক সোনা মসজিদ-এর নিবন্ধন বহাল বা প্রকাশনা অব্যাহত রয়েছে। অবশ্য বাজারে নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাওয়া নয়টি সাপ্তাহিক ও একটি দৈনিকের মধ্যে সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ সংবাদ ও সাপ্তাহিক নবাবগঞ্জ কন্ঠস্বরের সম্পাদক মৃত্যুবরণ করেন। আর্থিক সংকটে অন্য আটটি সংবাদপত্রের অকাল মৃত্যু হয়েছে। জীবিত দু’টিও ক’দিন বাঁচবে তা নিয়ে সংশয় পাঠক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। উল্লেখ্য, উক্ত বারোটি সংবাদপত্রের সম্পাদকেরা স্থানীয় সংবাদপত্র বাঁচিয়ে রাখার ব্যাপারে কোনদিন পাঁচ মিনিটের জন্য এক টেবিলে বসে চা পর্যন্ত পান করেননি। এদিক থেকে সংবাদপত্রগুলোর অপমৃত্যুর জন্য দায়ভার প্রথমত সম্পাদকদেরই- এমন দাবি একেবারে অযৌক্তিক হবে না। অবশ্য দুষ্টু সাংবাদিকের প্রতিহিংসামূলক গোপন তৎপরতায় জীবিত ও মৃত সংবাদপত্রগুলোর মধ্যে অধিকাংশই একাধিকবার ডিএফপি মিডিয়া তালিকা থেকে বাদ পড়ে, এমনকি নিবন্ধনও বাতিল হয়। অথচ ওই দুষ্টু সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কোন ব্যবস্থা অদ্যাবধি নিতে পারেননি সমাজের নিরেট সম্মাননার অধিকারী সম্পাদকবৃন্দ।
উল্লেখ্য, সম্প্রতি তথ্য মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের কমিউনিটি রেডিও স্থাপনের অনুমোদন লাভ করেছে প্রয়াস মানবিক উন্নয়ন সোসাইটি। শীঘ্রই এর সম্প্রচার কার্য্ক্রম চালু হওয়ার মধ্য দিয়ে এলাকার উন্নয়নে এ কমিউনিটি রেডিও বিশেষ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়। সংবাদপত্র প্রকাশনার এই আকাল কমিউনিটি রেডিওটি দ্রুত জনপ্রিয়তা লাভ করার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েক গুণ।
সম্প্রতি ক’জন বাঘা বাঘা উদ্যোক্তার অনুরোধে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের নিমতলায় একটি ‘ডাবল ডিমাই’ সাইজের অফসেট প্রিন্টিং প্রেস বসানো হয়েছে। কিন্তু অঙ্কুরিত হওয়ার আগেই ওই বাঘা উদ্যোক্তাদের সংবাদপত্র প্রকাশনার উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। আর কতো দিন ওই ‘ডাবল ডিমাই’ সাইজের প্রেসটি চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র প্রকাশনার করুণ অবস্থার স্বাক্ষী হয়ে থাকবে, তা সময় বলে দেবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সংবাদপত্র প্রকাশনার ইতিহাসে নতুন সেই সংবাদপত্র কবে সংযুক্ত হবে, যা সত্যিকার অর্থেই জেলাবাসীর কন্ঠস্বর হিসাবে বলিষ্ট ভূমিকা রাখবে, তা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন জ্ঞানপিপাসু পাঠক সমাজ।

তথ্যসূত্র :
০১। নবাবগঞ্জ পরিচিতি, আবুল কালাম শেখ নূর মোহাম্মদ, রাজশাহী জেলা কাউন্সিল, জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৩ বঙ্গাব্দ।
০২। চাঁপাইনবাবগঞ্জ মডেল পৌরসভা ঃ ঐতিহাসিক প্রেক্ষিত ও লোকসমাজ, ড. শহীদ সারওয়ার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভা, ২০১০ খৃীষ্টাব্দ।
০৩। চাঁপাইনবাবগঞ্জের পত্র-পত্রিকা, স্বপ্না, সাপ্তাহিক সোনা মসজিদ, বর্ষ ১ সংখ্যা ১, ২৬ নভেম্বর ২০০০ খৃীষ্টাব্দ।
০৪। মহান মে দিবসের চেতনা ঃ জাতীয় গণমাধ্যমের সাংবাদিক, সাত্তার হোসেন, আলোর শিখা, খেলাঘর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, মে ২০১০ খৃীষ্টাব্দ।
০৫। তাত্ত্বিক বিচারে চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্থানীয় সংবাদপত্র সমূহের একটি নাতিদীর্ঘ আধেয়-মূল্যায়ন, আব্দুল্লাহীল বাকী, তৃতীয় চোখে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ৮ এপ্রিল ২০০২ খৃীষ্টাব্দ।
০৬। সাক্ষাতকার : ডিএম তালেবুন নবী, ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জুন ২০০২ খৃীষ্টাব্দ।
০৭। সাক্ষাতকার : মোহিত কুমার দাঁ, ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ২০০৪ খৃীষ্টাব্দের বিভিন্ন সময়।
০৮। সাক্ষাতকার : সামসুল ইসলাম টুকু, ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ১৭ মে ২০১০ খৃীষ্টাব্দ সোমবার।
০৯। সাক্ষাতকার : আনোয়ার হোসেন দিলু, স্বরূপনগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ১৯ মে ২০১০ খৃীষ্টাব্দ বুধবার।
১০। সাক্ষাতকার : সৈয়দ নাজাত হোসেন, বালুবাগান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ১৯ মে ২০১০ খৃীষ্টাব্দ বুধবার।
১১। সাক্ষাতকার : জাফরুল আলম, কাঁঠাল বাগিচা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ২১ মে ২০১০ খৃীষ্টাব্দ শুক্রবার।

লেখক : প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক, কবি ও সংগঠক। মোবাইল : ০১৭১৫৬৫১২১৩, ই-মেইল : chapai_sp@yahoo.com