ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

জাতির ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব অনস্বীকার্য। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যম হল আয়না। এই আয়নায় সমাজের প্রতিচ্ছবি ফুটে ওঠে। আর সমাজের প্রতিচ্ছবি আয়নায় ফুটিয়ে তোলার প্রক্রিয়ার সাথে যাঁরা জড়িত তাঁরা সকলেই সাংবাদিক। যাঁরা তথ্য সংগ্রহ করে সংবাদ লিখেন বা ডেস্কে বসে সম্পাদনা করেন তাঁরা সকলেই সাংবাদিক। সহজ কথায়- গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশনের নীতি-নির্ধারক সম্পাদক থেকে শুরু করে উপজেলা বা ইউনিয়ন পর্যায়ে কর্মরত সংবাদ প্রতিনিধি পর্যন্ত সকলেই সাংবাদিক।
প্রাচীন স্থাপত্যকলার নিদর্শন সমৃদ্ধ চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্রের ইতিহাস ব্যাপক সমৃদ্ধ নয়। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে মালদা জেলার অন্তর্গত ছিল এ অঞ্চল। সে সময়ের সাংবাদিকতার কোন রেকর্ড খুঁজে পাওয়া যায় না। শিক্ষার হার অত্যন্ত কম থাকায় তখন লোকসঙ্গীত গম্ভীরা, আলকাপ, কবিগান প্রভৃতির মাধ্যমেই সমাজের চিত্র সম্পর্কে মানুষ জানতে পারতো। তাই আমাদের লোকসঙ্গীতগুলো লোকগণমাধ্যম হিসাবেও গণজাগরণে ব্যাপক ভূমিকা রাখতো সে সময়, এ কথা বিজ্ঞজন মাত্রই বিদিত। পরবর্তীতে ধীরে ধীরে শিক্ষা বিস্তার লাভ করে। এ অঞ্চলে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। রক্ষনশীল সমাজ প্রগতির পথে ধাপিত হয়। উন্মোচিত হয় সাংবাদিকতা নামের নতুন দিগন্ত।
ঠিক কোন সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকতা পেশার যাত্রা শুরু হয় সে সম্পর্কিত নির্ভরযোগ্য কোন তথ্য পাওয়া যায় না। বৃটিশ উপনিবেশিক শাসনামলে লেখালেখির চর্চা চললেও সাংবাদিকতা পেশার যাত্রাকালের বিষয়টি অস্পষ্ট। দেশবিভাগের পর শাহ জামান, মহসিন মাস্টার, মজিবুর রহমান তারু মিয়া, মোহিত কুমার দাঁ, ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, ডা. আব্দুল মতিন, ডি.এম তালেবুন নবী, জবদুল হক, আফসার হোসেন মাস্টার, আফজাল হোসেন, জি.কে শামসুল হুদা, ডা. বুলবুল-এ গুলেস্তান, সামসুল ইসলাম টুকু প্রমুখ মহোদয়ের পদচারণায় এ অঞ্চলের সাংবাদিকতা গতিশীল হয়ে ওঠে। এই কলম সৈনিকরা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভের দিনগুলোতে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার জ্বলন্ত সাক্ষীও। অবাধ তথ্য প্রবাহের স্বাধীনতা তখন ছিল না, ছিল না উন্নত যোগযোগ ব্যবস্থাও, তবু তাঁরা কঠোর পরিশ্রম ও ঝুকি নিয়ে কাজ করে সাংবাদিকতায় যে অবদান রেখেছেন তা তুচ্ছ করে দেখা সমীচীন হবে না। বরং তাঁদের দেখিয়ে যাওয়া পথই স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ের সাংবাদিকদের সাহস ও অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর এ অঞ্চলে শিক্ষার আরো প্রসার ঘটে। বৃদ্ধি পায় তথ্য জানার আগ্রহও। পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সমাজ বিনির্মাণে এগিয়ে আসে তরুণ সমাজ। কেউ রাজনৈতিক কর্মি হিসাবে, কেউ সাংস্কৃতিক কর্মি হিসাবে, আবার কেউ সাংবাদিকতায় সম্পৃক্ত হয়ে সমাজের জন্য লড়াই-সংগ্রামে অংশ নেন। সত্তর দশকে মফস্বলের সাংবাদিকতা বলতে সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা প্রধান বিবেচ্য ছিল। অবশ্য বিটিভি ও বেতারের প্রতিনিধিও সে সময় ছিল। তবে সচেতন মানুষ মাত্রেই সংবাদপত্রের নিয়মিত পাঠক ছিল। গ্রামাঞ্চলের অল্প আয়ের মানুষদের কাছে বেতার ব্যাপক জনপ্রিয় ছিল। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভের পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস না থাকা বাঙালি জাতির সেই শ্রেষ্ঠ অর্জনের এখনো অকাট্য সাক্ষী ওই সংবাদপত্রগুলো।
স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে দেশে দু’বার সামরিক সরকার জাতির ঘাড়ে চেপে বসায় এর বিরূপ প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হয় গণমাধ্যম অঙ্গনও। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাঁধাগ্রস্ত ও নিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ায় জাতীয় উন্নয়নে স্বাধীন-স্বকীয় ধারার ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয় দেশের গণমাধ্যমগুলো। এ সময় জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে কর্মরত সকল সাংবাদিক মুক্ত সাংবাদিকতার দাবিতে সোচ্চার হন। অবশ্য চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর সীমান্ত প্রায় অরক্ষিত থাকায় চোরাচালানী মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি ঘটে এবং এ সময় সাংবাদিকদের মধ্যে কেউ কেউ হলুদ সাংবাদিকতায় জড়িয়ে পড়ে।
সচরাচর শখের বশবর্তী হয়েই অনেকের সাংবাদিকতার জীবন শুরু হয়। তবে এদের মধ্যে যাঁরা সাংবাদিকতায় মহত্ম খুঁজে পান তাঁরা হয়ে ওঠেন শক্তিশালী কলম সৈনিক। এদিক থেকে অন্তত দশ বছর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা যাঁদের অর্জিত হয়নি তাঁদের সাংবাদিকতা জীবনের স্থায়ীত্ব সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে কিছু দাবি করা কঠিন। বর্তমানে প্রায় ৩৫ জন বিভিন্ন জাতীয় ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োজিত রয়েছেন। নিচে বর্ণ ক্রমানুসারে দশ বছরের বেশি অভিজ্ঞতা অর্জনকারী সাংবাদিকদের তালিকা দেয়া হল :
০১। আনোয়ার হোসেন দিলু, স্বরূপনগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০২। আজিজুর রহমান শিশির, বেলেপুকুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৩। আমিনুল ইসলাম, আলীনগর মুন্সিপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৪। আলমগীর কবির কামাল, হাসপাতাল রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৫। ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইট, দাউদপুর রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৬। এমরান ফারুক, দাউদপুর রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৭। কামাল উদ্দিন, হুজরাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৮। গোলাম মোস্তফা মন্টু, মসজিদপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ০৯। জাফরুল আলম, কাঁঠাল বাগিচা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১০। জোনাব আলী, মহারাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১১। ডাবলু কুমার ঘোষ, ঝিলিম রোড, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১২। ডি. এম. তালেবুন নবী, ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৩। নাইমুল হক, মিস্ত্রিপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৪। তসলিম উদ্দিন, ছত্রাজিতপুর, শিবগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৫। ফয়সাল মাহমুদ, মহারাজপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৬। মতিউর রহমান, হুজরাপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৭। মনিরুল ইসলাম বাদল, মিস্ত্রিপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৮। মাহবুব আলম, হরিপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ১৯। মাহবুবুর রহমান মিন্টু, স্বরূপনগর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২০। মিজানুর রহমান কুটু, বেলেপুকুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২১। রফিকুল আলম, পাঠানপাড়া, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২২। শহীদুল হুদা অলক, পোল্লাডাঙ্গা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২৩। সাত্তার হোসেন, শান্তিবাগ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২৪। সামসুল ইসলাম টুকু, ইসলামপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ; ২৫। সৈয়দ নাজাত হোসেন, বালুবাগান, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।

স্বাধীনতা পরবর্তী সময় থেকে বর্তমান পর্যন্ত চাঁপাইনবাবগঞ্জের মিডিয়া জগতে পদচারণা ছিল এমন অনেকেই আজ স্থানান্তর, পেশা পরিবর্তন, মৃত্যুসহ বহুবিধ কারণে সাংবাদিকতায় অনুপস্থিত। এঁদের মধ্যে রয়েছেন- বজলার রহমান ছানা, জি.কে শামসুল হুদা, ডা. মোহাম্মদ আলাউদ্দিন, অধ্যাপক শাহাবুদ্দীন, মোহিত কুমার দাঁ, ডা. বুলবুল-এ গুলেস্তান, শামীম উদ্দিন, আলিমুল হক সিদ্দিকী, আব্দুর রাজ্জাক রাজু, এস.এম.জি ফারুক স্বপন, শহীদ শুকরানা ডালু, বাবুল কুমার ঘোষ, এ্যাডভোকেট সোহরাব আলী, মাযহারুল ইসলাম তরু, ইয়াকিন আলী, হযরত আলী, ফজলে রাব্বী নবাব, এম. এ জামান হিরো, সাখাওয়াত জামিল দোলন, আবুল কাশেম, গোলাম রাব্বানী টমাস, এ.কে রেজাউন নবী তপু, ফাউজুল কবির রনি, কাজী আব্দুল বারী, আব্দুর রশিদ, রাজ, নিয়াজ, রোকন, শামসুজ্জামান বকুল, তসিকুল ইসলাম, আবু বাক্কার, সুলতানা নাদিরা বেগম, শাহরিয়ার আলম ফিডেল, অসিত সরকার, রায়হান আজম খান নাহিদ, আমিনুল ইসলাম জনি, ওমর ফারুক, শাহ জামাল, আব্দুল হাফিজ, মাহফুজুর রহমান, রহমত আলী, জাহিদুর রহমান হিমেলসহ আরো অনেকে।

ঢাকার লেখালেখি জগতে বিচরণের পর চাঁপাইনবাবগঞ্জে এসে সাংবাদিকতা করছেন রবিউল হাসান ডলার। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতা জগতে আরো বিচরণ করছেন- আব্দুল মালেক, নাসিম মাহমুদ আশরাফুল ইসলাম রঞ্জু, মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ, সাজেদুল হক, হোসেন শাহনেওয়াজ, আব্দুল মান্নান, আশরাফুল ইসলাম, কামাল শুকরানা, রেজাউল, শাহাবুদ্দিন সনু, এম. এ মাহবুব, হারুন-অর-রশিদ, মনোয়ার হোসেন জুয়েল প্রমুখ। ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক হিসাবে এ জগতে বিচরণ করেন তৌফিকুল আলম, আওলাদ হোসেন আখের, সিয়াম সারোয়ার জামিল প্রমুখ। শিশু সাংবাদিক হিসাবে আসমাউল হুসনা জ্যোতি, মমরেজা মহল, জিহাদ জনি, সাবিকুন নাহার, তৌহিদা হক লিপি প্রসংশিত হয়েছে।

জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা অর্জন করে মফস্বলের সাংবাদিকতাকে এগিয়ে নিতে বিশেষ অবদান রাখছেন অনেকেই। এঁদের মধ্যে শিবগঞ্জের জবদুল হক, আহসান হাবিব, নাচোলের নুরুল ইসলাম বাবু, মতিউর রহমান, গোমস্তাপুরের আজম আলী, এহিয়া খান রুবেল, নুর মোহাম্মদ এবং ভোলাহাটের মোহাম্মদ সালাউদ্দিন ও রবিউল ইসলাম এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়েও সাংবাদিকতায় বিশেষ অবদান রাখছেন এ জেলার মেধাবী কলম সৈনিকরা। রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমে কর্মরত রয়েছেন দৈনিক খবরপত্রের সাব-এডিটর সাব্বির আহমেদ, আরটিভি’র আনোয়ার হক, এনএনবি’র সাব-এডিটর সাত্তার হোসেন, দৈনিক যুগান্তরের স্টাফ রিপোর্টার আব্দুল্লাহ আল মামুন, ডেইলী স্টারের স্টাফ রিপোর্টার মোবারক হোসেন, বাংলা ভিশনের স্টাফ রিপোর্টার জিয়াউল হক সবুজ, মাছরাঙা’র স্টাফ রিপোর্টার আরিফ রেজা মাহমুদ, চ্যানেল আই-এর স্টাফ রিপোর্টার সোমা ইসলাম, একটি ম্যাগাজিনে তাসকিনা ইয়াসমিন। ফ্রিল্যান্স হিসাবে ঢাকায় কাজ করছে আজমল হোসেন মামুন। শিক্ষানগরী রাজশাহীতে সাংবাদিকতায় দৈনিক সানসাইনের সম্পাদক তসিকুল ইসলাম বকুল, দৈনিক কালের কন্ঠ’র আনু মোস্তফা বিশেষ ভূমিকা রাখছেন। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জের ইতিহাসে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে থাকা আবুল কালাম শেখ নূর মোহাম্মদের ছেলে আহসানুল হক সাথী দিনাজপুরের একজন প্রভাবশালী কলম সৈনিক হিসাবে দেশব্যাপী পরিচিতি লাভ করেছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে সাংবাদিকতা করে এলাকার গণ্ডি অতিক্রম করে খ্যাতি অর্জন করেছেন বেশ ক’জন। তবে সাংবাদিকতায় পুরস্কৃত হয়েছেন প্রথম আলো’র সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন দিলু। আদিবাসী বিষয়ক সাংবাদিকতার জন্য ২০০৭ খৃীষ্টাব্দে আনোয়ার হোসেন দিলুসহ সারা দেশের ৬ জন সাংবাদিককে পুরস্কৃত করে জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, সম্প্রীতি মঞ্চসহ আদিবাসীদের ৩ সংগঠন। এছাড়া টিভি চ্যানেলে সংবাদ পরিবেশন করে বাংলাদেশ ক্যাবল টিভি অপারেটর দর্শক জরীপে মফস্বল বিভাগে মনোনয়ন লাভ করেন চ্যানেল আই-এর চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি সৈয়দ নাজাত হোসেন। দর্শক মনোনয়ন লাভ করা সংবাদটির শিরোনাম ছিল ‘ভারতীয় কারাগারে ৮শ’ বাংলাদেশির মানবেতর জীবন যাপন’।

জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর মালিকানা বর্তমানে সাংবাদিকদের হাতে নেই। প্রায় দুই দশক আগেই এর সিংহভাগ মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ চলে গেছে পূজিপতি ব্যবসায়ীদের হাতে, মতান্তরে কালো টাকার মালিকদের হাতে। সাংবাদিকদের মালিকানাধীন গণমাধ্যমগুলো ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও আর্থিক সংকুলান না হওয়ায় সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা দিতে পারতো না। সে কারণে কাজের ক্ষেত্রে ফাঁকি দেওয়ার ব্যাপারে কোন জবাবদিহিতাও ছিল না। সময় পরিবর্তনের সাথে গণমাধ্যমগুলোর মালিকানা ব্যবসায়ীদের হাতে গেছে, সম্পাদনা নীতিমালায় পরিবর্তন (মতান্তরে পতন) এসেছে, সাংবাদিকদের জবাবদিহিতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ সম্মানজনক বেতন প্রদান নিশ্চিত হয়নি। ঢাকার বাইরের সাংবাদিকদের সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানে গণমাধ্যমের ব্যবসায়ী মালিকদের আগ্রহ না থাকার বিষয়টি এখন পানির মতোই পরিস্কার। কিন্তু অদৃশ্য কারণে এ ব্যাপারে সরকারিভাবেও কোন কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে না। ফলে জাতীয় গণমাধ্যমগুলোতে বহুমাত্রিক নেতিবাচক প্রভাব বিস্তার লাভ করেছে। এরমধ্যে- জাতীয় গণমাধ্যম অপকর্মকারীদের ‘শেল্টার’ হিসাবে আবির্ভূত হয়েছে, নির্বিঘ্নে অযোগ্য-অদক্ষ ব্যক্তি সাংবাদিকতা পেশায় নিয়োগ লাভ করেছে, ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজী করে সাংবাদিকতা পেশাকে কলঙ্কিত করছে, ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা সদরে বর্তমানে জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের গণমাদ্যমের নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ৩৫ জন সাংবাদিক রয়েছেন। এদের মধ্যে ২০ জনই সংবাদ লিখতে বা তৈরি করতে জানেন না। এমনকি দৈনন্দিন ঘটনাগুলোর (যেমন : সড়ক দূর্ঘটনা, প্রচার মিছিল, বিভিন্ন দিবসের র‌্যালি, আলোচনা সভা প্রভৃতি) তথ্যও পুরোপুরি সংগ্রহ করতে অসমর্থ এমন কিছু ব্যক্তি কাঁধে ক্যামেরার ব্যাগ ঝুলিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ঘোরাফেরা করেন, মোড়ে দাঁড়িয়ে ট্রাফিক বা থানার হাবিলদারের সাথে চা পান করে তৃপ্তির ঢেকুর তোলেন, কলম ভাঙা নব্য শিল্পপতিদের হেমরমখানায় ধর্ণা দিয়ে নিজেকে ‘হাই সোসাইটি’র ভাবেন, থানায় গিয়ে ওসি’র বেনসন সিগারেট টানেন অথবা মোটর সাইকেলে চেপে চরম ব্যস্ত ভাব দেখিয়ে ঘোরাফেরা করেন। এ জগতে নবাগতরাই যে কেবল এমন, তা কিন্তু মোটেও না। পনের-বিশ বছরের কথিত অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের মধ্যেও এমন একেবারে বিরল নয়। আগে এ জগতে শিক্ষক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মিরা বিচরণ করতেন। বর্তমানে গণমাধ্যমগুলোর মালিকানা পরিবর্তন ও সরকারি উদাসীনতার কারণে হকার-মেকার-পিয়ন চাপড়াসি-কবিরাজ-মোল্লা-এনজিও কর্মি, কেউ বাদ নেই। নিজের নাম পর্যন্ত শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করতে জানেন না- এমন চূড়ান্ত মুর্খও এখন নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দেন। সাংবাদিকতার দর্শনের সাথে যাদের সম্পৃক্ততা দূরের কথা, নূন্যতম ধারণাও নেই তাদের অনেকেই আজ সমাজে সাংবাদিক হিসাবে পরিচিত।

বিভিন্ন টিভি চ্যানেলগুলোতে যারা প্রতিনিধি হিসাবে কাজ করছেন তারাও পেশাগত কর্মপ্রক্রিয়ায় চরম দৈন্য। প্রতিনিধি হিসাবে নিয়োগ দেয়া হলেও কার্যক্রম অন্যান্য সাধারণ ভিডিও ক্যামেরাম্যানদের মতো অনেকটা। কিছু চলমান ঘটনার ফুটেজ প্রেরণ করেই টিভি চ্যানেলগুলোতে জেলা প্রতিনিধি হিসাবে বহাল থাকা যায়। দেশে বেসরকারি টিভি চ্যানেল যাত্রার শুরুর দিকে কিছু জেলার প্রতিনিধিকে ক্যামেরা প্রদান করা হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেল- টিভি চ্যানেলের ষ্টীকার লাগানো ক্যামেরাগুলো সুন্নাতে খাৎনা, বিয়ে, বধু বিদায় প্রভৃতি অনুষ্ঠানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ভিডিও প্রোগ্রামে মগ্ন হয়ে পড়েছে। প্রেক্ষিতে কর্তৃপক্ষ জেলা পর্যায়ে ক্যামেরা বিতরণ বন্ধ করলেন এবং এটাই হল আজকের ক্যামেরাম্যান রূপী জেলা প্রতিনিধি জন্মলাভের প্রধানতম কারণ। যাদের কাছে ভিডিও ক্যামেরার মূখ্য উপযোগীতা বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রোগ্রাম করা, তাদের টিভি চ্যানেলের সাংবাদিক বানানোর নূন্যতম প্রক্রিয়া সম্পাদন না করে নিয়োগপত্র ও ক্যামেরা দেয়া অর্থহীন। ক্যামেরার উপযোগীতা নিয়োগপ্রাপ্ত বর্তমান জেলা প্রতিনিধিদের কাছে অনেকটা আগের মতোই। শুরুর দিকে টিভি চ্যানেলের দেয়া ক্যামেরাগুলো ভাড়া খাটতো সামাজিক অনুষ্ঠানে, বর্তমানে প্রতিনিধির নিজের টাকাই কেনা ক্যামেরাগুলো ভাড়া খাটে কখনো সংবাদ মূল্যহীন সভা, সেমিনার, সমাবেশে; কখনো ক্যাসেট ছাড়াই ঘোরাঘুরি করে দুর্নীতিবাজ পদস্থ সরকারি কর্মচারীর অফিসে।

অন্যান্য অঞ্চলের সাথে পাল্লা দিয়ে চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতায়ও বিরোধ-অনৈক্য-গ্রুপ প্রভৃতি ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছে। সাংবাদিকদের ওই অনৈক্য বা বিরোধকে ঘিরে অতীতে গড়ে উঠতো একাধিক গ্রুপ। একসময় এই অনৈক্যকে ঘিরে জন্মলাভ করেছে একাধিক সংবাদপত্র। গ্রুপগুলোর বিরোধ সহনীয় পর্যায়ে অতিক্রম করায় সৃষ্টি হয়েছে একাধিক প্রেসক্লাব। জেলা সদরে বর্তমানে ৫টি সাংবাদিকতা সংশ্লিষ্ট সংগঠন রয়েছে। তবে সবগুলোর জন্ম সাংবাদিকদের বিরোধের সূত্র ধরে নয়, কর্তব্যের দায়বদ্ধতা থেকেও গড়ে উঠেছে কোন কোনটি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাব : জেলার সবচে’ প্রাচীন এই প্রেসক্লাবটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের স্কুল-ক্লাব রোডে অবস্থিত। এটি ১৯৬২ খৃীষ্টাব্দে স্থাপিত হয়। এক সময় জেলা সদরে কর্মরত সকল সাংবাদিকের সংগঠন ছিল এটি। জেলার সাংবাদিকতার বহু ঘটনার কেন্দ্রবিন্দু এই প্রেসক্লাবটি। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৭ জন।

জেলা প্রেসক্লাব, নবাবগঞ্জ : জেলার দ্বিতীয় প্রেসক্লাবটি গঠিত হয় ১৯৯০ খৃীষ্টাব্দে। বিভিন্ন সময়ে শহরের দাউদপুর রোড ও হুজরাপুরে এ প্রেসক্লাবটির কার্যালয় ছিল। ১৯৯৫ খৃীষ্টাব্দে চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের সাথে একত্রিত (মার্জ) হয়। কিন্তু একত্রিত হওয়ার এ প্রয়াস বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একই বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের ঐক্য ভেঙে যায়।

প্রেসক্লাব, নবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের প্রথম ভাঙনে ১৯৯৫ খৃীষ্টাব্দে জন্মলাভ করে এই সংগঠনটি। সদস্য সংকট দূর করার কৌশল হিসাবে নতুন সাংবাদিক সৃষ্টিতে মনোনিবেশ করে। শহরের ঝিলিম রোডে এই প্রেসক্লাবের কার্যালয় ছিল। ২০০১ খৃীষ্টাব্দে পৃথক আরেকটি প্রেসক্লাবের সাথে ভিন্ন নামে একত্রিত হয়।

দি নিউ প্রেসক্লাব, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রেসক্লাবের দ্বিতীয় দফার ভাঙনে ২০০০ খৃীষ্টাব্দে জন্ম নেয় এই প্রেসক্লাব। বিভিন্ন সময়ে শহরের গোদাগাড়ী রোড ও ইসলামপুরে এর কার্যালয় ছিল। জন্মের অল্প কিছুদিন পর থেকেই এই ক্লাবে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও বিরোধ দেখা দেয়। এর সদস্য সংখ্যা ছিল ৬ জন।

জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা : জাতীয় ভিত্তিক এই সাংবাদিক সংগঠনটির চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখা ১৯৯৫ খৃীষ্টাব্দে গঠিত হয়। বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ সংগঠনের কোন অস্তিত্ব নেই।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিউ প্রেসক্লাব : চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতায় সাংগঠনিক বিরোধ চরম থাকলেও সাংগঠনিক মিলনও লক্ষ্য করা যায়। ২০০১ খৃীষ্টাব্দে প্রেসক্লাব, নবাবগঞ্জ ও দি নিউ প্রেসক্লাব এক সংগঠনে পরিণত হয়। দু’ প্রেসক্লাবের সম্মিলনে গড়ে ওঠা সংগঠনটির নাম দেয়া হয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ নিউ প্রেসক্লাব। বেশ ক’বছর এটির কার্যালয় শহরের নিমতলা মোড়ে ছিল। বর্তমানে এটি শহীদ সাটু হল মার্কেটে অবস্থিত। এর বর্তমান সদস্য সংখ্যা ১৪ জন। ক্লাবের নবনির্বাচিত কমিটি সম্প্রতি এর নাম পরিবর্তন করে ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রেসক্লাব’ করেছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সাংবাদিক ফোরাম : জেলার সাংবাদিকদের বিরোধের ফসল হিসাবে নয়, পেশাগত দায়বদ্ধতা থেকে জন্ম লাভ করে এ সংগঠনটি। স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন ও পরিবেশ রক্ষায় বহুবিদ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে সুনাম অর্জন করেছে এ সংগঠনটি। বিশেষ করে জনমত জরীপ, অপচিকিৎসা বিষয়ক সংবাদ পরিবেশন, গবেষণা ও প্রকাশনার কাজগুলো প্রশংসিত হয়েছে। এটি উত্তরাঞ্চলের সাংবাদিকদের সংগঠন এবং কার্যালয় বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে অবস্থিত। জেলা পর্যায়ে এর কোন নির্ধারিত কার্যালয় নেই। ২০০৫ খৃীষ্টাব্দে গঠিত এই ফোরামের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ইউনিটের নির্ধারিত সংখ্যক সদস্য ষংখ্যা ৬ জন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সাংবাদিক ইউনিয়ন : মফস্বলের সাংবাদিকদের পেশাগত উৎকর্ষতা বৃদ্ধি ও অধিকার সংরক্ষনের ভাবনা থেকে ২০০৬ খৃীষ্টাব্দে এ সংগঠনটি জন্ম লাভ করে। এর সদস্য সংখ্যা ১২ জন, কোন কার্যালয় নেই।

শিশুপ্রকাশ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ : মাস লাইন মিডিয়া সেন্টার (এমএমসি) পরিচালিত শিশু সাংবাদিকদের জাতীয় ভিত্তিক সংগঠন এটি। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থীরা এর সদস্য পদ লাভ করে থাকে। ২০০৫ খৃীষ্টাব্দে শিশু প্রকাশের চাঁপাইনবাবগঞ্জ শাখা ১০ জন শিশুকে নিয়ে প্রথম গঠিত হয়। বর্তমানে এর কার্যালয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ ক্লাব-সুপার মার্কেটে অবস্থিত।

শুধুমাত্র জেলা সদরেই সাংবাদিকদের এতোগুলো সংগঠন থাকা সত্ত্বেও নবীন-প্রবীন আরো ৬/৭ জন সাংবাদিক কোন প্রেসক্লাব বা সাংবাদিক সংগঠনের সাথে সম্পৃক্ত নেই। এদের কেউ কেউ প্রেসক্লাবের সদস্য হতে মোটেও আগ্রহী নন।

সাংবাদিকদের বিরোধ শুধু জেলা পর্যায়েই নয়, উপজেলা পর্যায়েও সমানভাবে বিরাজ করতে দেখা যায়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সাংবাদিকতার বিবাদমান বিরোধ নিয়ন্ত্রিত হয় ঢাকা থেকেও। জেলার অন্যতম বৃহৎ উপজেলা শিবগঞ্জে বর্তমানে কোন প্রেসক্লাব ভবন বা কার্যালয় নেই, তবে সাংবাদিকদের দু’টি পৃথক ধারা রয়েছে। গোমস্তাপুরের বর্তমানে দু’টি প্রেসক্লাব রয়েছে। একটি রহনপুর প্রেসক্লাব, অন্যটি গোমস্তাপুর প্রেসক্লাব। নাচোলে একাধিক প্রেসক্লাব না থাকলেও সাংবাদিকতায় বিরোধ রয়েছে। ভোলাহাটেও একাধিক প্রেসক্লাব নেই, তবে একাধিক ধারা রয়েছে।

জাতির ভাগ্য পরিবর্তন ও উন্নয়নে বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু বাংলাদেশে কালো টাকার মালিকদের হাতে গণমাধ্যমের কর্তৃত্ব তুলে দেয়ার মধ্য দিয়ে ‘মিডিয়া ব্যক্তিত্ব’ হয়ে ওঠা শাইখ সিরাজ, শাহ আলমগীর, মতিউর রহমান, মাহফুজ আনাম, গোলাম সারোয়ার, আবেদ খান, নঈম নিজাম, সাইফুল ইসলাম, ইমদাদুল হক মিলন, নাইমুল ইসলাম খানরা মিডিয়া’র স্বাধীনতা খর্ব করে চলেছেন। পুঁজিপতিদের মালিকানাধীন মিডিয়া মুষ্টিমেয় মিডিয়া ব্যক্তিত্ব জন্ম দিয়েছে, কিন্তু দেশের সর্বস্তরের সাংবাদিকতাকে তাবেদারিত্বে শৃঙ্খলিত করেছে। ফলে সমাজে মানবাধিকার, ন্যায় প্রতিষ্ঠায় মিডিয়ার ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ অন্যান্য জেলা শহরগুলোর সাংবাদিকতার এমন বেহাল দশার পরিবর্তনের তাগিদও লক্ষ্য করা যায় সচেতন মানুষের মধ্যে। কিন্তু ওই সকল সচেতন মানুষেরা সংগঠিত না হওয়ায় তাদের ভাবনাগুলোর কোন সমন্বয় ও কার্যকারিতা নেই। এ ব্যাপারে সরকার, প্রশাসন, রাজনৈতিক-সাংবাদিক নেতৃবৃন্দ ও সচেতন দেশপ্রেমিক নাগরিকদের করণীয় সমূহ নিচে তুলে ধরা হল :

* সরকার/স্থানীয় প্রশাসনের করণীয় :

ক) ‘ওয়েজ বোর্ড’ অনুযায়ী বেতন-ভাতা না দেয়া গণমাধ্যমগুলোকে ডিএফপি মিডিয়া তালিকা থেকে বাতিল করা বা বিজ্ঞাপন প্রচারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা।
খ) যে জেলা বা উপজেলার সাংবাদিককে বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে না, সেখানে ওই গণমাধ্যমের প্রকাশ/প্রচার বাতিল/অবৈধ করা।
গ) মিডিয়া’র মালিকদের সম্পদের হিসাব নেয়া, সকল আয়ের বৈধতা যাচাই করা ও জনগণের সামনে তুলে ধরা।
ঘ) যোগ্যতার নিরিখে সাংবাদিক নিয়োগ নিশ্চিত করা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে না হওয়া পূর্বের নিয়োগসমূহ বাতিল করা।
ঙ) সাংবাদিক দিয়ে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ নিষিদ্ধ করা ও ‘রোটেশন’ অনুযায়ী সরাসরি মিডিয়ার বিজ্ঞাপন শাখায় বিজ্ঞাপন প্রদানে বিজ্ঞাপনদাতাদের বাধ্য করা।
চ) সাংবাদিকতার নামে ‘ব্ল্যাক মেইলিং’ কঠোর হস্তে দমন করা।

* স্থানীয় রাজনৈতিক/সুধী/সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের করণীয় :
ক) সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা না দেয়া গণমাধ্যমগুলোর প্রচারে প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
খ) জাতীয় উন্নয়নে মিডিয়ার ভূমিকা শক্তিশালী করা বিষযে জনমত গড়ে তুলতে ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা।

* সচেতন দেশপ্রেমিক জনগণের করণীয় :
ক) সাংবাদিকদের বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত করা গণমাধ্যমগুলোকে পৃষ্টপোষকতা না করে বর্জন করা এবং অন্যদেরও এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা।

বর্তমান সময়ের মিডিয়াকে সর্বাধিক স্বাধীন বলা হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতা এখনো বেশির ভাগ সময় পুলিশ-প্রশাসন, র‌্যাব, বিডিআরের প্রেসরিলিজ নির্ভর। বিশেষত: সীমান্ত বিরোধ, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, আগ্নেয়াস্ত্র-বোমা-মাদক-জাল টাকা ও চোরাচালানী পণ্য উদ্ধার, দুর্ধর্ষ আসামী গ্রেফতার, স্থলবন্দর দিয়ে বৈধ পণ্যৈর আড়ালে অবৈধ ভাবে আনা পণ্য আটক, কাস্টমস শুল্ক ফাঁকি, প্রভৃতি ঘটনার সংবাদ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর বক্তব্য-বিবৃতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে দেখা যায়। অথচ এসব গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর ইস্যুতে সাংবাদিকদের দায়িত্ব অনেক বেশি, যা এড়িয়ে যাওয়ার অর্থ জাতীয় উন্নয়ন পিছিয়ে দেয়া।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতার ইতিহাস পুরনো হলেও ডিজিটাল সাংবাদিকতার অধ্যায় সূচিত হয়েছে অতি সম্প্রতি। একুশ শতকের শুরু থেকে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো দর্শকপ্রিয়তার তুঙ্গে অবস্থান করলেও তা এ জেলার সাংবাদিকতায় ব্যাপক পরিবর্তন আনতে পারেনি। টিভি চ্যানেলগুলোর সাংবাদিকরা মিনি ডিভি ক্যামেরায় ফুটেজ ধারণ করে কুরিয়ার যোগে অথবা নাইট কোচে ঢাকা অফিসে প্রেরণ করতেন। ফলে আজ ঘটে যাওয়া ঘটনার ফুটেজযুক্ত সংবাদটি পরের দিন দুপুর নাগাদ বা আরো পরে প্রচারিত হতো। সংবাদপত্রের সাংবাদিকরা ফিল্মের ম্যানুয়াল ক্যামেরা ব্যবহার করতেন এবং সংবাদ প্রেরণ করতের ফ্যাক্স ও কুরিয়ার যোগে। কিন্তু এমন পশ্চাদমুখী ধারার সাংবাদিকতায় তীব্র আঘাত হেনে এ জেলায় ডিজিটাল সাংবাদিকতার যুগ শুরু করেন সাংবাদিক সাত্তার হোসেন ও ফয়সাল মাহমুদ। পরে ব্যক্তিগতভাবে উদ্বদ্ধ হয়ে ডিজিটাল সাংবাদিকতায় এগিয়ে আসেন সাংবাদিক শহীদুল হুদা অলক, আমিনুল ইসলাম, আজিজুর রহমান শিশির, ইমতিয়ার ফেরদৌস সুইটসহ আরো ক’জন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল সাংবাদিকতা চাঁপাইনবাবগঞ্জে শুরু করে প্রথম আলো ২০০৬ খৃীষ্টাব্দে। বর্তমানে জেলা সদরে কর্মরত প্রায় সকল সাংবাদিকই চলমান ঘটনার সংবাদ, ছবি ও ফুটেজ সর্বাধুনিক প্রযুক্তি অনলাইনের মাধ্যমে প্রেরণ করেন। ফলে প্রতিদিনের ঘটনার ফুটেজসহ সংবাদ মাত্র ১/২ ঘন্টার ব্যবধানে টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে প্রচারিত হচ্ছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জের সাংবাদিকতায় এ উৎকর্ষতা অতীতের যে কোন সময়ের চেয়ে উজ্জ্বল। তবে ভবিষ্যতের জন্য আরো উৎকর্ষতা অপেক্ষা করছে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। খুব সম্ভবত: সাংবাদিকতা বিষয়ক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাই হবে অপেক্ষমান উৎকর্ষতার বাহন।