ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

রাজনৈতিক অধিকারের চর্চা, তার লালন ও পালন একটি গনতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মানুষের শ্বাসপ্রশ্বাস নেয়ার মতোই স্বাভাবিক ঘটনা। সেই ১৯৫২ থেকে ১৯৭১ সাল এবং তার পরেও বৈধ্য অবৈধ্য সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে হরতাল/অবরোধ আমরা দেখেছি এবং অংশ গ্রহণও করেছি। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানি সরকারের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান কিংবা ১৯৯০ সালের এরশাদের বিরুদ্ধে গণঅভ্যুত্থান কথা কে না জানে। আমাদের দেশে যতগুলো আন্দোলনে বা গণঅভ্যুত্থান হয়েছে তার সবগুলি ছিল স্বতঃস্ফূর্ত অর্থাৎ জনগণ নিজের ইচ্ছেয় নিজের স্বার্থে ঐ সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করেছিল। কিন্তু গণতন্ত্রের নামে, ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে বাসে আগুন দিয়ে মানুষ মারা কিংবা পেট্রোল বোমায় মানুষ পুড়িয়ে কেও যদি বলে এটা আমার রাজনৈতিক অধিকার তবে তা মেনে নেয়া যায় কি? অবশ্যই না । দেশকে মৃত্যুপুরীতে রূপান্তর করে, লক্ষ্য লক্ষ্য ছেলে মেয়েদের লেখাপড়া অনিশ্চিয়তার মধ্যে ফেলে দিয়ে, নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগনের রুটি রুজির চাকা বন্ধ করে, আর যাই হোক কোন রাজনৈতিক অধিকারের চর্চার কথা শোভা পায় না। গণতন্ত্রের একটি মূল শর্তই হচ্ছে জবাবদিহিতা। একটি দেশের সকল রাজনৈতিক দলকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকতে হয়। আওয়ামীলীগ, বিএনপি বা অন্য যে কোনো দলকে তাঁদের কৃত কর্মের জন্য জনগণের কাছে একদিন না একদিন জবাবদিহি করতে হবে।
১৩ মার্চ এক সংবাদ সম্মেলনে জামাত-বিএনপি জোট নেত্রী নিরপেক্ষ নির্বাচনের স্বার্থে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের কথা বলেছেন। ২০১১ সালের ৩০ জুন এ সংশোধনী আনা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের পাশাপাশি অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা দখলের জন্য রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ বিবেচনায় সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান রাখা হয় এ সংশোধনীতে। এছাড়া এ সংশোধনীর মাধ্যমে ৭২’র সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা পত্র এই সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সুতরাং কারো বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা না যে তাঁর আসল উদেশ্য। প্রকৃত পক্ষে তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার পাশাপাশি আমাদের সংবিধান থেকে ৭২’র সংবিধানের চার মূলনীতি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা বাতিল করে, ১৯৭৫ সালের সংবিধানে ফিরে যেতে চান। তিনি সরকারে বিরুদ্ধে লড়াই না করলে স্বাধীনতা ব্যর্থ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেছেন। অথচ তিনি নিজেই স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার, আলবদর আর নব্য জঙ্গিদের নিয়ে আমজনতাকে শেষ করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। পাকিস্তানী কায়দায় বেগম খালেদা জিয়া শুধু এদেশের মাটি চান, যার উপর তিনি একটি নুতুন পাকিস্তান গড়ে তুলবেন। তিনি উক্ত সংবাদ সম্মেলনে হিটলারি কায়দায় যে কথাগুলো বলেছেন তাঁর পুরোটাই ছিল মিথ্যাচারে ভরা । তিনি বলেছেন যে এ সরকারের অধীনে দেশের কোন মানুষ নিরাপদ নন। অথচ বেগম জিয়ার বিগত শাসন আমলে যত খুন-হত্যা-নির্যাতন-ধর্ষণ-সন্ত্রাস-বোমাবাজি হয়েছে তার ফিরিস্তি লিখে শেষ করা যাবে না। তাঁর এ কথা মনে রাখা দরকার যে ১৯৭১ সালে রক্তেস্নাত এই বাংলাদেশের মানুষ আর কখনই স্বাধীনতা বিরোধী, পাকিপন্থিদের কাছে মাথা নত করবেনা।
উক্ত সম্মেলনে জামাত-বিএনপি জোট নেত্রী ঘোষণা দিয়েছেন যে তাঁদের দুইমাস যাবত চলমান মানুষ মারার আন্দোলন হাসিনা সরকার না হঠানো পর্যন্ত চলতে থাকবে এবং এ জন্য তিনি জনগণকে কষ্ট স্বীকার করতে অনুরোধ করেছেন। খুব ভালো কথা, একজন রাজনীতিবিদ দেশের মঙ্গলের স্বার্থে এটুকু অনুরোধ করতেই পারেন। কিন্তু শুধু মাত্র নিজের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য অর্থাৎ ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তিনি কি এধরনের অনুরোধ করতে পারেন? বিশেষ করে যখন তার দলের বা জোটের সমর্থক, ছাত্রদল/জামাত/শিবির ইতিমধ্যেই ১১৫ জনকে পুড়িয়ে হত্যা করেছে । হাসপাতালের বিছানায় হাজার হাজার মানুষ মৃত্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। তাই তাঁকে বা তার জোটকে জনগণকে কষ্ট স্বীকার করার অনুরোধ করার আগে গত দুইমাসে হত্যা সহযে সব অপকাণ্ড ( সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড) তিনি বা তাঁর জোট করেছে তার দায় স্বীকার করতে হবে এবং প্রয়োজনে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে।
শুধু তাই নয় জামাত-বিএনপি জোটকে ১৯৯০-১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০১-২০০৫ সাল পর্যন্ত হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, জঙ্গিবাদের উত্থন, স্বাধীনতা বিরোধীদের ক্ষমতায়ন শেখ হাসিনাকে অবৈধ্য ভাবে ক্ষমতাচুত্য করার ষড়যন্ত্র সহ দেশ ধ্বংসকারী যে সকল কু কর্ম কাণ্ড করেছেন তারও জবাবদিহি করতে হবে। তারপর তিনি দেশের স্বার্থে কষ্ট স্বীকার করতে জনগণকে অনুরোধ করতে পারেন। তার আগে নয়।
বাঙালী শুধু মাত্র আবেগ প্রবণ জাতি নয় দলকানাও বটে, তাই জামাত-বিএনপি জোটের ১৯৯০-৯৬ এবং ২০০১-২০০৫ সালে ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাঁদের কু কর্মের কিছু চিত্র দৃষ্টান্ত হিসাবে পাঠকদের সামনে তুলে ধরতে লোভে সামলাতে পারছিনা। উল্লেখ্য ১৯৯৯ সালেও তাঁরা বোমা হামলার মতো জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে।

১৯৯০-৯৬ এবং ২০০১-২০০৫ সাল ছিল আমাদের দেশের এক কলঙ্কময় ও ন্যাকারজনক অধ্যায়। খালেদা জিয়ার আর (২০০১-২০০৫) তার ক্যাডার বাহিনী এক রাতে ভোলায় পাঁচশোর অধিক নারী ধর্ষণ করে। বানিয়াচরে ৫ বছরের শিশু থেকে ৭০ বছরের খৃষ্টান মহিলাও বাদ যাননি ধর্ষণ থেকে। খালেদা জিয়ার ক্যাডার বাহিনী সংখ্যালঘু বাড়ীতে যেয়ে আবদার জানিয়ে বলেছে, আজকে রাতে আপনার মেয়ের সাথে আমরা সহবাস করবো। অসহায় মাকে বলতে হয়েছে বাবারা, আমার মেয়েটির বয়স কম, তোমরা এক সাথে না এসে একজন একজন করে এসো। জোট আমলে কত পূর্ণমার চোখের জলে বাংলাদেশ ভেসেছে তার হিশাব নাই বা দিলাম। আর দশ ট্রাক অস্ত্র কেলেঙ্কারি, হাওয়া ভবনের সীমাহীন দুর্নীতি সহ অসংখ্য দুর্নীতির কথা কে না জানে ।

এ রকম হাজার হাজার বোমাবাজি, ধর্ষণ, চাঁপাই নবাবগঞ্জে বিদ্যুতের জন্য গুলি করে ১৯জন কৃষক হত্যা, কুষ্টিয়ায় বিদ্যুতের জন্য গুলি করে কৃষক হত্যা, সারের জন্য কৃষক হত্যা সহ অসংখ্য নির্মম হত্যা কাণ্ডর ঘটিয়েছিল ১৯৯০-৯৬ এবং ২০০১-২০০৫ সালে জোট সরকার। তার পরেও তাঁরা গণতন্ত্রের (?) জন্য মায়াকান্না করেন। আন্দলনের জন্য সকলের সহযোগিতা কামনা করেন। জনগণের সহযোগিতা কি হাতের মোয়া, যে চাইলেই পাওয়া যায় ?

আমরা, এ দেশের মানুষরা সহজেই সবকিছু ভুলে যাই। আবেগ আর অনুভূতিই আমাদের চিন্তা চেতনাকে চালিত করে। যুক্তি সেখানে মূল্যহীন ও অসার । সমাজের সর্বক্ষেত্রই ধর্মীয় গোঁড়ামিতে ঠাসা। তাই নিজে ধর্ম পালন না করলেও ধর্ম দোহাই দিয়ে সহজেই জনগণকে হাতে রাখা যায়। ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য জামাত-বিএনপির জোট জন্ম থেকেই এই কাজটিই করে এসেছে। আর একবার ক্ষমতায় যেতে পারলে তো কথাই নাই, পুরো দেশটাই হয়ে যায় তাঁদের গনিমতের মাল। সুতরাং, এই মহিলা (বেগম জিয়া) যদি আবার কোনভাবে বাংলার মসনদ হস্তগত করতে পারেন, কি পরিণতিই না হবে দেশের জনগণের এবং জাতির তা সহজেই অনুমেয়। তাই সরকারের উচিৎ যারা বোমা মেরে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করে, ষড়যন্ত্র করে ক্ষমতায় যেতে চায়, সে সকল নরপিশাচ বা দলকে আসামির কাঠগড়ায় দাড় করিয়ে বিচার করা তা নাহলে জনগণই একদিন তাদের যোগ্য ভাষায় জবাব দিবে ।

১৩ মার্চের জামাত-বিএনপি জোট নেত্রীর সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য হালকা ভাবে নেয়ার কোন অবকাশ নাই। জামাত-বিএনপি জোট পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা, দেশি-বিদেশি জঙ্গি সংগঠনের সহায়তায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করেই এই আন্দোলনে নেমেছে। তাঁদের এই আন্দোলনের ( হাসিনাকে ক্ষমতা চুত্য করা সহ) সফলতা জন্য তাঁরা যেকোনো সময় আরও বড় ধরনের নৈরাজ্য বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালাতে পারে যা দেশকে ধ্বংসের শেষ প্রান্তে নিয়ে যাবে। তাই সরকারের উচিৎ একলা চলার পথ পরিহার করে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সকলকে নিয়ে এক সাথে এই জাতীয় দুর্যোগ মোকাবেলা করা। এক্ষেত্রে কোন ছল চাতুরির আশ্রয় নেয়া ঠিক হবে না। বিভিন্ন দেশ এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন যাতে জামাত-বিএনপির জোটের ফাঁদে পা না দেয় সেদিকে অবশ্যই নজর দিতে হবে, এবং জামাত-বিএনপির জোটের আসল উদ্দেশ্য বিশেষ করে জামাতের ১৯৭১ সালের সন্ত্রাসী ভুমিকার কথা তুলে ধরতে হবে। জামাত-বিএনপি জোট যদি কোন বড় ধরনের ষড়যন্ত্র করে থাকে তা অবশ্যই জনসম্মুখে প্রকাশ করা উচিৎ। জামাত একটি সন্ত্রাসি সংগঠন। এই দলকে নিষিদ্ধ করতে হবে এখনই এবং তাঁদের সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাজেয়াপ্ত করে রাষ্ট্রেকে তাঁর দায়িত্ব নিতে হবে। ছাত্রদল/জামাত/শিবিরের যারা পেট্রোল বোমায় মানুষ হত্যা করছে বা যারা পরিকল্পিত ভাবে সরকারি সম্পত্তি ধ্বংস করছে তাদেরকে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে বিচারে করতে হবে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। সরকারকে যে কোন মূল্যে মানুষের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিত করতে হবে, যা তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্ব। কোন রাজনৈতিক দল বা জোট যদি নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য দেশে যুদ্ধাবস্থা তৈরি করে বা সহিংসতার মাধ্যমে জনজীবন বিপর্যস্ত করতে চায়, দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে করে দেয় অচল তবে তাদেরকে অবশ্যই দাঁতভাঙ্গা জবাব দিতে হবে। শুধু মাত্র সভা সমাবেশে আর টিভিতে লেকচার দিয়ে দেশ ধ্বংসকারী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বন্ধ করা যাবে না। এ জন্য দরকার সমন্বিত পরিকল্পনা এবং বাস্তব প্রয়োগ । বর্তমানের রাজনীতির এই পিচ্ছি পত্থে, একবার যদি হাসিনা সরকার পা পিছলে পরে যায় বা কোন ভুল কোরে বসে, তবে তাঁর মাসুল কিন্তু দেশবাসীকেই দিতে হবে, অনেক মূল্যে।