ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

মা,

আজ ১৭ নভেম্বর ২০১৭। গত বৎসর এই দিনে তুমি আমাদের ছেড়ে চিরদিনের জন্য চলে গেলে অসীম শূন্যতার দেশে। তোমার চির প্রস্থান আকস্মিক হলেও অপ্রত্যাশিত ছিল না আমার কাছে। বেশ কয়েক মাস ধরেইও তুমি যাই যাই করছিলে। তোমার শরীর ভাল যাচ্ছিল না। ডেমনেসিয়া তোমাকে কুড়ে কুড়ে খাচ্ছিল। শারীরিক প্রতিবন্ধিকতা থাকা সত্ত্বেও, যে দৃঢ় মনোবল আর প্রচন্ড ইচ্ছা শক্তির বলে, তুমি বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখতে সেটা বোধহয় দিন দিন নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছিল। তুমি বোধহয় তোমার শারীরিক যন্ত্রণায় শেষ সীমায় পৌঁছে গিয়েছিলে। প্রতিনিয়ত তোমার চোখে মুখে ফুঠে উঠত প্রচণ্ড জীবন- বিতৃষ্ণা অবশেষে সব যন্ত্রণার অবসান ঘটিয়ে তুমি চলে গেলে না ফেরার দেশে।

তারিখটা ছিল ১৭ নভেম্বর, বিকাল বেলা। না মা, আমি থাকতে পারিনি তোমার পাশে। তোমার চলে যাওয়ার সময়। যান্ত্রিক ঢাকা শহরের যানজট আমাকে থাকতে দেয়নি তোমার মৃত্যুশয্যায়, তোমার কাছে। যদিও চেয়েছিলাম আমি তোমার চলে যাওয়ার সময় তোমারই হাত মুঠো করে বসে থাকতে। তোমার পাথর চোখের যন্ত্রণা খুঁজে নিতে। কিন্তু পারলাম না। এই দুঃখ আমি বোধহয় আজীবন বয়ে বেড়াব। মাঝে মাঝে মনে হয়, আমার সহ্য ক্ষমতায় সন্দিহান হয়ে সৃষ্টিকর্তা বোধ হয় ইচ্ছা করেই আমাকে তোমার অন্তিম সময় কাছে থাকতে দেয়নি।

মা, তুমি যখন তোমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলে তখন আমি বাংলা কলেজের কাছে। বাসা থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে। টুশির কাছে তোমার ‘কোমায়’ যাওয়ার সংবাদ পেয়ে অফিস থেকে বেড়িয়ে পড়েছিলাম। র‍্যাপা প্লাজার ঘণ্টা খানেক যানজট পেরিয়ে যখন বাসার কাছে পৌঁছলাম তখন ঘড়িতে বিকাল ৪টা পার হয়ে গেছে। সান্ত্বনা ছিল একটাই, অবশেষে আমি বাসার কাছে। মাথার মধ্যে তখন অসংখ্য চিন্তার ঝড়। আমার ‘মা’ কে দেখতে পাওয়া না পাওয়ার দোদুল্যমনতা। মনের পর্দায় বারবার ভেসে উঠেছিল শামা-সাম্য আর লাভলির অসহায় মুখ। টুশিকে আবার ফোন করলাম। ও জানালো ডাক্তার তোমাকে দেখছে। বাইরে এ্যাম্বুলেন্স অপেক্ষামান। যদি দরকার পরে হাসপাতালে নেয়া হবে। আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলল। মনে মনে ভাবলাম এ যাত্রায় হয়তো তুমি বুঝি বেঁচে গেলে। পরক্ষণেই টুসির গলায় কান্নার শব্দ। বুঝলাম সব শেষ। শারীরিক আর মানসিক সীমা হীন যন্ত্রণার ইতি টেনে তুমি চলে গেছ অন্তিম শয়ানে। আপনজনদের একা ফেলে। না মা, আমি কাদিনি। আমি পাথরও হয়ে যাইনি। আমিতো বোধহয় এটাই চেয়েছিলাম। তোমার শারীরিক যন্ত্রণা আর পরনির্ভরশীলতা আমাকে প্রতিনিয়ত কষ্ট দিত। তোমার শারীরিক/মানসিক অক্ষমতা আমি মেনে নিতে পারছিলাম না কোন ভাবেই। তোমার মৃত্যু আগে প্রায় প্রতিদিন-রাত আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে তোমার সুস্থ্যতা অথবা শারীরিক মুক্তি জন্য প্রার্থনা করতাম। তাই সেই মুহূর্তে আমি এই ভেবেই সান্ত্বনা খুঁজেছিলাম যে, তুমি হয়তো ভাল থাকবে, কষ্টহীন নতুন জীবন। তুমি ভাল আছ তো মা…?

 

মা, তোমার চলে যাওয়া আমাকে যেন এক অন্য এক মানুষে পরিণত করেছে। শামুকের মত নিজের মধ্যে নিজেকে গুটিয়ে নিচ্ছি প্রতিনিয়ত। লাভলি/সামা/শাম্য আজ তোমাকে হারিয়ে বড় নিশ্চুপ, বড় অসহায়। তাদের বিরক্ত করারও কে নেই যেন। বাসায় যখন কেও থাকে না, তোমার ঘরের দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া করার কিছু থাকে না তাদের। সারাদিন বাসার প্রতিটি ঘরে এক অদ্ভূত বিষন্নতা ছেয়ে থাকে। তুমিই ছিলে আমার পরিবারের আশা-আনন্দ আর ভাল থাকার অনুপ্রেরণা। তোমার ভাল থাকাটাই ছিল এক অকৃত্রিম সুখ। সেই তুমি চলে গেলে! এখন শুধুই রক্তক্ষরণ। শুধু আমি না, তোমার সব ছেলে-মেয়ের কাছে তুমিই ছিলে ভাল থাকার একমাত্র অনুপ্রেরণা। আজও আমি ভুল করে হলেও তোমার অপেক্ষায়  থাকি। এ এক কষ্টের অপেক্ষা। অনন্ত কালের……

মা, তোমার খাটের কথা মনে আছে? তশুক-বালিশের কথা বাদই দিলাম, কি ছিল না তোমার এই খাটে? জামাকাপড়, চিরুনী, গরম কাপড়, শাল, নামাজ শিক্ষার বই, টাকা-পয়সা, রাবার ব্যান্ড, আংটি আরও কত কি? সব কিছুই তুমি পরম যত্নে গুছিয়ে রাখতে। কেউ তোমার কোন জিনিস অগোছালো করলে বা হাত দিলেই তুমি প্রচণ্ড ক্ষেপে যেতে। এই খাটই ছিল তোমার শেষ জীবনের সংসার। আবার তোমার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ, অন্তিম গোসলও এই খাটে। তোমার মৃত্যুর পর এই খাটের পাটাতনেই তোমাকে শেষ গোসল করানো হয়, তোমারই প্রিয় বারান্দায়। যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে তুমি এক চিলতে আকাশ দেখতে। তোমার প্রিয় নয়ন তারা ফুল ফুটতো। আমি বরাবরই মেঝেতে তশুক পেরে শুতাম। খাটে শুতে চাইতাম না। এ জন্য তোমার আক্ষেপের সীমা ছিল না। বকাও কম খাইনি। তোমার সেই খাট এখন আমার ঘরে। আমি ব্যবহার করি। সেই খাটে শুয়ে গভীর রাতে হটাত ঘুম ভেঙ্গে গেলে শুনতে পাই, তোমার বুকের গভীর দীর্ঘশ্বাস আর কষ্ট। আমার কপালে অনুভব করি তোমার হাতের কোমল স্পর্শ। চোখের সামনে ভেসে ওঠে তোমার হাসিমাখা মুখ আর পলকহীন পাথর চোখ।

মারা গেলে মানুষের নাকি বাহ্যিক কোন পরিচয় থাকে না। তার থাকে একটাই পরিচয়, লাশ। তুমিও মৃত্যুর পরক্ষণেই আমাদের কাছে লাশে পরিণত হলে। কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। ছিলে মা হয়ে গেলে লাশ। মনের সব আবেগ, কান্না, কষ্টর টুটি চেপে ধরে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম মায়ের ‘লাশ’ দাফনের আনুষ্ঠানিকতায়। যে তোমাকে ভাল রাখার জন্য ২৪ ঘণ্টাই আমাদের ব্যস্ত থাকতে হতো। কাটাতে হত নির্ঘুম রাত। সেই তোমার লাশই পরে রইল বাসা থেকে দূরে নির্জন ধাতুর হিমঘরে এক রাত। সকালে জানাজা শেষে, তোমাকে চিরদিনের জন্য শুইয়ে দিলাম মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের লাল মাটিতে। অতঃপর তুমি হয়ে গেল ফ্রেমে বাঁধানো ছবি। আচ্ছা মা, তোমার কি একবারের জন্যেও ইচ্ছা করে না ফ্রেমে বাঁধানো ছবি থেকে বেরিয়ে এসে আমার হাত চেপে ধরতে। করে না…?

মা, আজ তোমার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে, দেখতে একটি বৎসর, ৩৬৫ দিন পার হয়ে গেল। তুমি চলে গেলে চিরদিনের জন্য। শুয়ে আছ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের লাল কোমল মাটিতে। যে মাটিতে চির নিদ্রায় শায়িত আছেন কত জানা-অজানা বীর মুক্তিযোদ্ধা আর দেশের কৃতি সন্তানেরা। মা আমি জানিনা তুমি বুঝতে পার কিনা, তোমাকে একা রেখে গেলেও আমি কিন্তু বার বার এখানে (তোমার কবরের পাশে) ফিরে আসি। মনের একটু শান্তির জন্য। আমার মনের সব অস্থিরতা, দুশ্চিন্তা আর হতাশা নিমেষেই কর্পূরের মত উড়ে যায় এখানে আসলে। কল্পনার চোখে দেখতে পাই তোমার মুখের এক চিলতে মলিন পবিত্র হাসি, আর বেঁচে থাকার ব্যকুল আকুতি।

তারপরেও তুমি চলে গেলে। সবাই বুঝি এভাবেই যায়। বাবা, ভাইয়া অতপর তুমিও চলে গেলে। সাদা কাফনের কাপড়ে মোড়ানো আমার ‘মা’ তুমি চলে গেলে চিরদিনের জন্য আমাদের বড় একা করে দিয়ে। শারীরিকভাবে তুমি আমাদের আড়ালে চলে গেলেও,  মা আমি জানি, তুমি আমাকে ছেড়ে চলে যাওনি। তুমি যেতে পার না। আছো তুমি সবখানে। যতদিন বেঁচে থাকব, তোমার হাত থাকবে আমার মাথার উপর। তোমার আশির্বাদ থাকবে আমার চলার প্রতি মুহূর্তে, ছায়ার মত।

মা, তোমার হাতে গড়া তোমার এই ছেলের সংসার।  দীর্ঘ ২৩/২৪ বৎসর, সুখে-দুঃখে, রাগ-অভিমানে আর আনন্দে সবাই এক সাথে জড়াজড়ি করে ছিলাম। তোমার চলে যাওয়াতে, তারই ছন্দ-পতন হল। আমাদের জীবনের ছন্দটাই বড় এলোমেলো হয়ে গেল। মা তুমি ভালো থেকো…………

১৭ নভেম্বর, ২০১৭