ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
Photobucket

১.
পদ্মা সেতুর অর্থায়ন নিয়ে সরকার প্রত্যক্ষভাবে দ্বিধাবিভক্ত। প্রধানমন্ত্রীর সাথে সুর মিলিয়ে সরকারের একটা অংশ নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণের কথা বলছেন। আর বিশ্বব্যাংককে দোষী সাব্যস্ত করে লাগাতার যৌক্তিক- অযৌক্তিক মন্তব্য করে চলেছেন। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং কয়েকজন উপদেষ্টা বিশ্বব্যাংকের অবস্থান বদলানোর জন্য চেস্টা করে যাচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের অবস্থান পরিবর্তনের জন্য অন্য দাতাদেশসমূহ ও সংস্থার সহায়তা কামনা করছেন। সাধারন জনগনের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট নয় যে, নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মাণ করার নীতিগত সিদ্ধান্ত হলে সরকারের পক্ষ থেকে এই প্রকল্পে বিশ্বব্যাংককে সরাসরি “ওয়ালাইকুম আসসালাম” না বলে বিশ্বব্যাংকের সাথে সমঝোতার চেষ্টা কেন! একদিকে লাগাতার অবান্তর ও শস্তা বক্তব্য প্রদান আর অন্যদিকে সমঝোতার আপ্রাণ চেষ্টায় দ্বিধার বিভক্তি রেখাটি স্বচ্ছ।

২.
বিশ্বব্যাংক মূলত দুইটি কারণে পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাড়িয়েছে। প্রথমত বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সঠিকভাবে তদন্ত কার্য পরিচালনা না করা এবং দ্বিতীয়ত দূর্নীতির বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়ায়। বিশ্বব্যাংকের দাবী ছিল দূর্নীতির তদন্তকালীন সময়ে অভিযুক্তদের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়া। এটি একটি স্বাভাবিক রীতি। অভিযুক্ত মানেই দোষী বা আসামী নয় বিধায় আত্নসম্মানবোধ সম্পন্ন ব্যক্তিরা অভিযুক্ত হলে স্বেচ্ছায় সরে দাঁড়ান এবং তদন্তে দোষী প্রমান না হলে মাথা উঁচু করেই দায়িত্বে ফিরে আসেন। পদ্মা সেতু বিষয়ে সরকারের একজন মন্ত্রী অভিযুক্ত হওয়ার পরে সেই মন্ত্রী নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে সরে দাড়ান নাই আর সরকারও তাকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়ার সৎসাহস দেখাতে পারে নাই। অবশেষে চাপের মুখে অভিযুক্ত মন্ত্রীকে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি না দিয়ে হাস্যকরভাবে অন্য মন্ত্রণালয়ে নিযুক্ত করার মাধ্যমে দূর্নীতির পক্ষে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হয়। দূর্নীতির তদন্তকে সহায়তা না করাও দূর্নীতি।

পদ্মা সেতু প্রকল্প থেকে বিশ্বব্যাংকের সরে দাঁড়ানোর ঘটানাটি হঠাৎ ঘটে নাই। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশ্বব্যাংক-কে যে ছয়টি চিঠি পাঠানো হয়েছে তার পাঁচটিই পাঠানো হয়েছে এই বছরের জুন মাসে। অর্থাৎ শেষ সময়ে একটা আপোষরফা করবার লক্ষ্যে অতি তৎপরতা।

৩.
আওয়ামী লীগের দিন বদলের ইশতেহার থেকে দুইটি অংশ উল্লেখ করছি:-
ক)
“বছরের পর বছর ধরে বাংলাদেশ বিশ্বে একটি সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ হিসেবে যেভাবে
কলঙ্কিত হয়েছে এবং বিগত দুই বছরে প্রকাশিত রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাশালীদের অতীতের
দুর্নীতির যেসব লোমহর্ষক কাহিনী জাতিকে লজ্জিত করেছে তা মোচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ
সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করছে। রাষ্ট্র ও সমাজের সকল স্ত রের ঘুষ-দুর্নীতি উচ্ছেদ, অনোপার্জিত
আয়, ঋণখেলাপি, বিলখেলাপি, করখেলাপি ও দুর্নীতিবাজদের বিচার করে শাস্তি প্রদান এবং
তাদের অবৈধ অর্থ ও সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হবে। দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ সুশাসনেরও অন্যতম
পূর্বশর্ত।” (২.১, তৃতীয় অধ্যায়/দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা)

আওয়ামী লীগ নির্বাচনের পূর্বে বা ইশতেহার রচনার সময় বিশ্বাস করত যে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ সুশাসনেরও অন্যতম পূর্বশর্ত।” ক্ষমতা লাভের পরে তাদের এই বিশ্বাস আর অঁটুট নাই অথবা ইশতেহার রচনার সময় ভালো ভালো কথা থাকতে হয় বলেই এই রকম কিছু ভালো কথা বলা হয়েছিল। বিশ্বাস দৃঢ় না থাকার ফলেই বর্তমান সরকার অভিযুক্ত (দোষী নয়) আবুল হোসেনকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যহতি দেয়ার সৎসাহস দেখাতে পারে নাই। বরঞ্চ অভিযোগকারীর সমালোচনা করা হয়েছে এমনভাবে যেন অভিযোগ উথ্থাপন বিশাল অপরাধ। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী যখন বলেন যে, বিশ্বব্যাংককেই অভিযোগ প্রমান করতে হবে তখন তদন্তে সরকারের প্রকৃত আগ্রহের স্বরুপ উন্মোচনের আর কিছু বাকী থাকেনা।

খ)
“প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের
হিসাব, আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে।” (৫.১৫, গণতন্ত্র ও কার্যকর সংসদ, তৃতীয় অধ্যায়)

এটা দু:খজনক সত্য যে, সরকার গঠনের পর হতে আজ পর্যন্ত মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব, আয়ের উৎস জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয় নাই। অথচ ইশতেহারে “প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করা হবে।” -স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব, আয়ের উৎস প্রকাশ করা কেন আজ পর্যন্ত সম্ভব হয় নাই চিন্তা করলে সাধারণ কয়েকটা ধারনা তৈরী হয়:
১. মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যগন কি নি:স্ব তাই হিসাব প্রকাশের কিছু নাই?
২. মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যগনের সম্পদ এতটাই বিশাল এবং আয়ের উৎস অসংখ্য বিধায় সাড়ে তিন বছরে হিসাব করে তা বের করা সম্ভব নয়?
৩. মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যগনের সম্পদের হিসাব এবং আয়ের উৎস কি অবৈধ বা প্রশ্নবিদ্ধ?
৪. মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যগন সাড়ে তিন বছরে কতটা লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্থ হলেন?
৫. মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যগনের সম্পদের হিসাব দিতে আপত্তি কেন? সাধারন মানুষদের কাছে তারা যেভাবে নিজেদের সৎ ও সাধারন মানুষ হিসাবে উপস্থাপন করেন হিসাব প্রকাশিত হলে মুখোশ খুলে যাবে?

পদ্মাসেতু বিষয়ে বিশ্বব্যাংকের অভিযোগ সত্য বা মিথ্যা যাই হোক না কেন এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সংসদ সদস্য ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সম্পদের হিসাব, আয়ের উৎস প্রতি বছর জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা না করে সরকার দূর্নীতি দমনের পরিবর্তে ক্ষমতাসীনদের দূর্নীতি লালনকেই ফরজ মনে করছেন।

৪.
প্রচলিত আছে যে, চাকুরী জীবনের শুরুতে সাফল্য লাভের জন্য দুইটা সূত্র শিখতে হয়। সূত্রটা দুইটা অনেকটা এরকম:
১. বস্ সবসময়ই সঠিক।
২. যদি বস্ সঠিক না হন তবে সূত্র নাম্বার এক অনুসরণ করুন।

দূর্নীতি দমন কমিশনের কার্যক্রম এখন সূত্র দিয়ে প্রমান করা যায়। সূত্রটা হল:-
১. ক্ষমতাসীনগন কখনই দূর্নীতি করতে পারেন না।
২.যদি ক্ষমতাসীনগন দূর্নীতি করেন তবে এক নম্বর সূত্র অনুসরণ করুন।

৫.
সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল এই মেয়াদে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ হবে। বর্তমান সময়ে সরকারের প্রতিশ্রুতি হল এই মেয়াদেই পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হবে। অর্থাৎ সরকারের কাছে পদ্মা সেতু নির্মাণ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। সম্ভবত পদ্মা সেতু না হলে আগামী নির্বাচনে দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ বিশেষত ভোটারদের কাছ থেকে বর্তমান ক্ষমতাসীনদের একটা বড় ধাক্কা খাওয়ার সম্ভবনা প্রবল। পদ্মা সেতু নির্মাণে বিশ্বব্যাংক তার অবস্থান পরিবর্তন করবে কি করবেনা এটা অনিশ্চিত। কুইক রেন্টাল বিদ্যুতের ভর্তুকী সামাল দিয়ে অর্থনীতির চরম চাঁপকে আড়াল করে নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মাসেতু নির্মানের স্বপ্ন কতটা বাস্তবায়নযোগ্য সেটাও প্রশ্ন ও যুক্তিসাপেক্ষ। পদ্মা সেতু নির্মাণ হোক আর না হোক ভোটের রাজনীতির সহজ হিসেব নিকেশে সরকারের বর্তমান মেয়াদেই যে পদ্মা সেতুর ভিত্তি প্রস্থর স্থাপন ও কাজ শুরুর আই ওয়াশ সফল ভাবে সম্পন্ন হবে এটা হলফ করে বলা যায়।

————————-
এই পোস্টটির সাথে সহমত পোষন করলে পোস্টটি শেয়ার করুন