ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

১.
জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান ৭মার্চের ভাষণে ‘জিয়ে পাকিস্তান’ বলেছিলেন- এই তথ্য অনেক পুরানো। আহমদ ছফাসহ অনেকে অনেক আগেই এই তথ্য প্রকাশ করছেন। ৯৬-এর লীগ সরকার ক্ষমতাসীন থাকাবস্থাতেও এই আলোচনা বারবার হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ ‘জোছনা ও জননীর গল্প’ এবং ‘দেয়াল’- এই তথ্য সন্নিবেশিত করলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তবে বিষয়টি প্রথমে সামনে আনেন কবি শামসুর রহমান। জাষ্টিস হাবিবুর রহমান তার বিখ্যাত গ্রন্থের প্রথম সংস্করনে এই তথ্য প্রকাশ করলেও পরবর্তী সংস্করনে তা পরিমার্জন করে বাদ দিয়া হয়েছিল বা দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেনের লেখাতেও এই তথ্য আছে। এ কে খন্দকার আওয়ামী লীগ সরকারের পরিকল্পনামন্ত্রী থাকাবস্থায় প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থেও একই তথ্য প্রদান করেছেন।  সুতরাং এ কে খন্দকার প্রথম বা নতুন করে এই তথ্য দেন নাই।

২.
মনে রাখতে হবে, ৭মার্চের ভাষণ স্বাধীনতার অফিসিয়াল ঘোষণা ছিলোনা। আজ ৭মার্চের ভাষণকে অফিসিয়াল ঘোষণায় পরিণত করতে চাওয়ার কারিগরেরা জানেন না, ৭ মার্চ ১৯৭১-এ বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করার মত অবস্থানে ছিলেন না। এছাড়া, বঙ্গবন্ধু তখন অবিভক্ত পাকিস্তানের নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ট দলের প্রধান এবং ভাবী প্রধানমন্ত্রী পদের ন্যায্য দাবীদার ছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে নিজ দায়িত্ববোধ আর কৌশলগত কারনে “জিয়ে পাকিস্তান” বলা যৌক্তিকভাবে স্বাভাবিক। যেমন একই কারনে ২৫শে মার্চ পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গিয়েছিলেন। তাতে তাঁর অবদান খাটো হয়ে যায় না, খাটো হয়ে যায় নাই।

৩.
২৫শে মার্চে তাঁর স্বেচ্ছা আত্নসমর্পন কোনো বিবেচনাতেই গ্রহনযোগ্য ছিলোনা, গ্রহনযোগ্য নয় এবং গ্রহনযোগ্য হবেনা। উনি যদি সব কিছুর পরিকল্পনা করে দিয়ে যেতেন তবে প্রবাসী সরকার গঠিত হতে এপ্রিল মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতনা। যৌক্তিক কারনেই প্রবাসী সরকার গঠিত না হয়ে বিপ্লবী সরকার গঠিত হত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র থাকতো, বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন তার বস্তুনিষ্ঠ/কংক্রীট তথ্য থাকতো। ফলে এক একজনের কাছ থেকে এক এক বক্তব্য শুনতে হত না, বিতর্কের কোনো অবকাশ থাকতোনা।

৪.
বঙ্গবন্ধু সুপারম্যান ছিলেন না। তিনি রক্তমাংসের মানুষ ছিলেন। সুতরাং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়েই তাকে শ্রদ্ধা করতে হবে, ভালবাসতে হবে।

৫.
যারা বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বানিজ্য করেন, বঙ্গবন্ধুকে বেঁচে জীবিকা নির্বাহ করেন, যাদের শ্রদ্ধায় ঘাটতি আছে তারাই বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা সহ্য করতে পারেনা। তাদের স্বার্থ আর মুনাফা অর্জন অব্যাহত রাখার জন্যই বঙ্গবন্ধুর সুপারম্যান হওয়াটা জরুরী, সুপারম্যান বানানোর প্রক্রিয়া চালু থাকাটা ভীষণ দরকারী। অথচ, এই অবিবেচকের দল বঙ্গবন্ধুকে ৭মার্চের ভাষণ আর মুজিবকোটে সীমাবদ্ধ করে ফেলেছে। এই বঙ্গবন্ধুজীবীদের কারনে ভবিষ্যত প্রজন্ম যদি এই সিদ্ধান্তে পৌছায় যে “মুজিব কোট পড়িয়া একটা উজ্জিবিত ভাষণ দিয়া স্বাধীনতা অর্জন করা গেলে পৃথিবীতে পরাধীন বলিয়া কোন দেশ থাকিতো না” তবে দুঃখিত হলেও অবাক হবার অবকাশ থাকবেনা।

৬.
বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা সংগ্রামের অসংবাদিত নেতা ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন। তিনি তাঁর সকল সীমাবদ্ধতা ধারন করেই অসংবাদিত নেতায় পরিনত হয়েছিলেন। তবে স্বাধীনতা পূর্ববর্তী বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহনে এবং স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সফলতা ব্যার্থতা লক্ষ-কোটিবার কঠোরভাবে সমালোচিত হতে পারে। এই সমালোচনা করার অধিকার এই দেশের মানুষকে এই দেশের সংবিধান দিয়েছে।

৭.
সমালোচনায় বঙ্গবন্ধু খাঁটো হননা, সমালোচনায় বঙ্গবন্ধুর অবমাননা হয়না। বঙ্গবন্ধু খাটো হন যখন তাকে সুপারম্যান বানানোর চেষ্টা চলে, যখন তাকে ফ্যান্টাসির চরিত্রে পরিনত করার ধারাবাহিক কর্মযজ্ঞ চলমান থাকে। দুঃখজনক সত্য হচ্ছে চামচা আর বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বানিজ্য করা গোষ্ঠী শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুর পরিবার এবং উনার কন্যাও বঙ্গবন্ধুকে ক্রমাগত ফিকশনের চরিত্রে পরিনত করে চলেছেন, পরিনত করার কাজে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন।