ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

১.

পূর্ণ উদ্যমে হরতাল চক্র শুরু হল। আগামী সংসদ নির্বাচনের পূর্ব পর্যন্ত এই চক্র চলমান থাকবে। আমাদের তথাকথিত দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক নেতারা তাদের প্রবল দেশপ্রেমের টানে স্বদেশকে হরতাল চক্রে আবদ্ধ করে ফেলেছেন। যে জাতির জন্য তারা এই চক্র তৈরী করেছেন সেই জাতি মনেপ্রাণে এই চক্র থেকে মুক্তি চায়। কিন্তু এই চক্র থেমে গেলে ক্ষমতায় যাওয়া বা ফিরে আসা সহজ হবেনা। অর্থাৎ জনগন মূল কথা নয়, মূল কথা হল ক্ষমতায় যাওয়া।

২.

বিএনপি জামাত জোট হরতাল করে কি আদায় করতে চায়? সহজ উত্তর জনগনের ভোটের অধিকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা। অথচ এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিএনপি’র কাছে গ্রহনযোগ্য ছিলনা। কারন এই ব্যবস্থা কার্যকর হলে ক্ষমতায় পুনরায় আসা অসম্ভব ছিল। তাই আওয়ামী লীগ, জামাত, জাতীয় পার্টিসহ অন্যান্য দলকে কঠোর আন্দোলনে যেতে হয়েছিল।

১৯৯৪ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত ৭০ দিন হরতাল করেছিল আওয়ামীলীগ, জামাতসহ অন্যান্য দলগুলো। এর মধ্যে ৯৬ ঘন্টার হরতাল ছিল একটি, ৭২ ঘণ্টার হরতাল দুইটি, ৪৮ ঘন্টার হরত পাঁচটি। প্রতিটি হরতাল শেষে দেশবাসীকে হরতাল প্রত্যাখান করবার জন্য সরকার এবং হরতাল সফল করবার জন্য বিরোধীদল অভিনন্দন জানিয়েছেন। অভিনন্দিত জনগন অভিনন্দনের বদলে রাজনীতিকদের শুভবুদ্ধি উদয়ের প্রার্থনা করেছে। বিএনপি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চায় নাই তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহালের দাবীতে হরতাল আহ্বানের কোন নৈতিক অধিকার তাদের নাই। কিন্তু নষ্ট রাজনীতির ধারকরা নৈতিকতার ধার ধারেননা।

৩.

আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ সর্বশেষ নির্বাচন পর্যন্ত বলে এসেছেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের মূল রূপকার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এই ব্যবস্থা প্রবর্তনের কারনে দেশে গণতন্ত্র সুসংহত হয়েছে। এই ব্যবস্থার রুপরেখা দিয়ে শেখ হাসিনা তার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা প্রমান করেছেন। তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রর্বতনের জন্য ১৯৯৬ সালের ৩ ও ৪ জানুয়ারী ৪৮ ঘন্টার হরতাল পালন করেছিল আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি এবং জামাত। সেই সময় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ” দাবি আদায় না করে ঘরে ফিরবেন না। সবাই মাঠে নেমে পড়ুন। যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের জন্য প্রস্তুত থাকুন।” তত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এতটাই জরুরী ছিল যে তিনি আরও বলেছিলেন, “প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ভেবেছেন রোজার মাসে হরতাল হবে না। ইচ্ছা মতো ভোট চুরি করে একদলীয় নির্বাচন করিয়ে নেবেন। কিন্তু তিনি জানেন না রোজার মাসেও যুদ্ধ হয়েছিল।’

১৯৯৬-এর ক্ষণস্থায়ী সংসদের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করতে বাধ্য হয় বিএনপি সরকার। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসাবে বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান শপথ গ্রহন করেন। সেই মহেন্দ্রক্ষনে তত্বাবধায়ক সরকারের সাফল্য কামনা করে শেখ হাসিনা নিজের অনুভূতি ব্যক্ত করেছিলেন এই বলে,”জনগণের অপরিসীম ত্যাগ ও তিন দলের আন্দোলনের ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি বিএনপিকে মানতে বাধ্য করা হয়েছে।” এখানেই শেষ নয়, আবেগাপ্লুত কণ্ঠে ও দৃঢ় চিত্তে বলেছিলেন ” “ন্যায় ও সত্যের সংগ্রাম সব সময় জয়ী হয়।”

আজ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করে বলেন যে, তিনি জনগনের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করেছেন। আপনার “ন্যায় ও সত্যের সংগ্রামের সব সময় জয়ী হয়”- এই মুহূর্তে বাক্যের অবস্থান আজ কোথায়! তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য ৭০ দিন হরতাল পালনের মধ্য দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আপনি জনগনের ভোটের অধিকারের কি করেছিলেন!!

৪.

আমাদের রাজনীতিকদের লোভ কতটা প্রকট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নিয়ে ক্ষমতায় থাকাবস্থায় এবং ক্ষমতার বাইরে থাকাবস্থায় তাদের অবস্থান দেখলেই পরিষ্কার হয়ে যায়। ক্ষমতা লাভের পরেই তারা ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হিসাবে পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেন। তার জন্য যা যা করা প্রয়োজন তা করতে বিন্দুমাত্র লজ্জিত বা কুণ্ঠিত হননা। ক্ষমতা লাভের পরে জনমতের প্রতি আর তাদের শ্রদ্ধা থাকেনা, আস্থাও থাকেনা। তখন সরকারের সমালোচনা করা মানেই দেশের শুক্রতে পরিণত হওয়া। যৌক্তিক সমালোচনার জবাবেও ক্ষমতাশীল রাজনৈতিক দলের চামচ শ্রেনীর কর্মীরা নেড়ী কুকুরের মত কামড়াতে আসেন। প্রধান প্রধান নেতাদের কথা উল্লেখ না করাই ভাল।

অপর পক্ষে, ক্ষমতার বাইরে থাকলে তারা জনগনের ভোট নামক ক্ষমতাটি নিয়ে অতি আবেগাক্রান্ত হয়ে পড়েন। ভোট নামক ক্ষমতাটির অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য হরতাল ডেকে ডেকে জনগনকে অতিষ্ঠ করে তোলেন।

৫.

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে কয়টি নির্বাচন হয়েছে প্রতিটিতে পরাজিত দলের নেত্রী সূক্ষ্ম কারচুপি, স্থূল কারচুপি, প্রহসন, ষড়যন্ত্রসহ নির্বাচনকে বিভিন্ন উপাধিতে নির্বাচনকে ভূষিত করেছেন। আর বিজয়ী দল নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠ ও জনমতের প্রতিফলন হিসাবে অভিহিত করেছেন। বিজয়ী এবং পারজিত প্রার্থী দুজনের একজনও ভেবে দেখেন নাই কেন ও কি কারনে জনগন কাকে ভোট দিয়েছে! জনগন তার ভোটাধিকারের মাধ্যমে কি ম্যাসেজ দিচ্ছে।

পরাজিত হলেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ। কারন ক্ষমতায় যেতে না পারার কষ্ট। আর বিজয়ী হলে সুষ্ঠ নির্বাচন। ক্ষমতায় যেতে পারার অবাধ আনন্দ। একই সাথে বিপরীতমূখী মানসিকতা পোষন একধরনের মানসিক অসুস্থতা। এই রকম মানসিকতা পোষণকারী ব্যক্তি মানসিক রোগী এবং তার উত্তম চিকিৎসা প্রয়োজন।

৬.

যে কোন মূল্যে ক্ষমতা লাভ এবং যে কোনভাবে ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার বাসনাও একটি মানসিক রোগ। এই রোগের প্রকোপে হরতাল নামক প্রতিবাদের কার্যকর ভাষাটির অপব্যবহারে চক্রে আবদ্ধ হয়ে ১৯৯১ থেকে ২০১১ সাল অর্থাৎ প্রায় দুই দশক ধরে প্রিয় স্বদেশ ও সাধারন দেশবাসী চরম যাতনা ভোগ করছে।

৭.

প্রতিটি হরতালে কত টাকার ক্ষতি হয় তার একটা সঠিক হিসাব হওয়া প্রয়োজন। দুই নেত্রী এবং তাদের নেতৃত্বাধীন দল ও জোটের কাছ থেকে সেই পরিমাণ টাকা আদায়ের জন্য একটি আন্দোলন গড়ে তোলা প্রয়োজন। তারও আগে প্রয়োজন অসুস্থ মানসিকতার চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে হরতাল চক্র হতে দেশ ও দেশবাসীকে মুক্ত করা।