ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

বাংলা কমিউনিটি ব্লগ বিকল্প মাধ্যম হিসাবে প্রতিদিন বিকশিত হচ্ছে। বিকশিত হচ্ছে শত তরুনের উদ্যমে আর স্বপ্ন ডানায় ভর করে। বাংলা ভাষার কমিউনিটি ব্লগগুলিতে যে প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা যায়, পৃথিবীর অন্যকোন দেশের কমিউনিটি ব্লগে এই প্রাণ চাঞ্চল্য পাওয়া দুষ্কর। একথা অনস্বীকার্য যে, তথ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে অসম্ভবকে সম্ভব করার এই সোনালী সময়ে ব্লগ মুক্তমত প্রকাশ, মত গঠন আর সাহিত্য চর্চার এক অমিত শক্তিশালী মুক্ত মাধ্যম। সাহিত্যানুরাগী উল্লেখযোগ্য বাঙালীর আসা যাওয়া আর বসবাস বাংলা কমিউনিটি ব্লগগুলিতে। গত কয়েক বছরে সাহিত্যের একটি নতুন ব্লগ কেন্দ্রিক প্রথা বিরুদ্ধ ধারা বিকশিত হয়েছে এবং দিনে দিনে পুষ্ট হচ্ছে। এই ধারায় বেড়ে ওঠা বা এই ধারাকে ঋদ্ধ করা ব্লগাররা একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে নিজেদের মলাটবন্দী স্বপ্ন তুলে দিচ্ছেন মুল ধারার পাঠকদের হাতে।

বাংলা ভাষায় ব্লগ ভিত্তিক লিটিল ম্যাগাজিন নিয়মিত প্রকাশ করা সম্ভব এটা এখন প্রমানিত সত্য। এই দূরুহ কাজটিকে বাস্তবে রুপদান করেছে লিটিল ম্যাগাজিন ‘শব্দতরী’। শব্দতরীই বাংলা ভাষার একমাত্র ব্লগ ভিত্তিক নিয়মিত সাহিত্য পত্র যা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। তাই যারা বাংলা ভাষায় ব্লগিং করেন, ব্লগ পাঠ বা কোন না কোনভাবে ব্লগের সাথে সম্পৃক্ত তাদের কাছে শব্দতরী ইতোমধ্যেই নিজগুনে শক্ত অবস্থান তৈরী করে নিতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য যে, শব্দতরী ব্লগারস ফোরামের নিয়মিত প্রকাশনাসমূহের অন্যতম।

ব্লগ লেখকদের মানসম্মত লেখা নিয়ে শব্দতরীর তৃতীয় বর্ষ, প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছে জানুয়ারী মাসে। কিন্তু পাঠকদের অপেক্ষা করতে বলা হয়েছে একুশে বইমেলার জন্য। একুশে বইমেলার প্রথম দিন থেকেই লিটিলম্যাগ পিয়াসীদের জন্য বইমেলার লিটিল ম্যাগ চত্বরে শব্দতরী স্টলে এই সংখ্যাটি পাওয়া যাবে। শব্দতরীই বাংলা ভাষার একমাত্র ব্লগ ভিত্তিক নিয়মিত সাহিত্য পত্র যা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। তাই যারা বাংলা ভাষায় ব্লগিং করেন, ব্লগ পাঠ বা কোন না কোনভাবে ব্লগের সাথে সম্পৃক্ত তাদের কাছে শব্দতরী ইতোমধ্যেই নিজগুনে শক্ত অবস্থান তৈরী করে নিতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখ্য যে, শব্দতরী ব্লগারস ফোরামের নিয়মিত প্রকাশনাসমূহের অন্যতম।

শব্দতরী তৃতীয় বর্ষের প্রথম সংখ্যাটি সম্পাদনা করেছেন জান্নাতুন নাহার। তিনি সম্পাদনার কাজে যে শতভাগ সফল হয়েছেন তা নিরুপনের জন্য বোদ্ধা হবার প্রয়োজন নাই। এই সংখ্যাটি পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে যারা ব্লগে লিখালিখি করছেন বা যাদের লিখা এই সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে তারা সবাই শক্তিমান লেখক। প্রতিটি লিখার মধ্যে গাঢ় সৃষ্টিশীলতা, পরিমিতি বোধ, ভাব ও ভাবনার মিশেল, বাক্য বিন্যাস ও শব্দচয়নে প্রতিজন লেখকই পরিণত, খুব বেশী পরিণত। শব্দতরীর এই সংখ্যাটির প্রচ্ছদ এঁকেছেন পীযুষ দস্তিদার।

একথা সত্য যে, মূলধারার অনেক লেখক ও সমালোচক ব্লগ লেখকদের একটু বাঁকা চোখে বা স্পষ্ট করে বললে অবজ্ঞার চোখে দেখে থাকেন। কারণ ব্লগ লেখকরা ইচ্ছে করলেই একটা লেখা ব্লগে প্রকাশ করতে পারেন। ব্লগে লেখা প্রকাশের জন্য কোন লিটিল ম্যাগ বা নামভারী পত্রিকার সাহিত্য বিশারদ সম্পাদকের কঠিন কাঠগড়া বা পুল সিরাত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়না। প্রকাশের এই সহজ ও সরল পন্থা মূল ধারার অনেকের কাছেই অসহনীয় এবং প্রশ্নবিদ্ধ। কিন্তু তারা ভুলে যান যে, ব্লগে লিখা প্রকাশ করা অনেকটা মঞ্চ নাট্যে অভিনয়ের অনুরুপ। মঞ্চনাট্যের দর্শকদের মতই ব্লগ পাঠকরা সচেতন। যারা নিয়মিত ব্লগ পাঠ করেন তাদের অধিকাংশই কোন না কোনভাবে সাহিত্য, শিল্প বা সাংস্কৃতিক অঙ্গনের সাথে সম্পৃক্ত।আর খুব বেশী স্পষ্টভাষী। তাই ব্লগে একটি ভালো লেখার জন্য অঢেল প্রশংসা যেমন সহজলভ্য, একটি নিম্নমানের লেখার জন্য কঠিন সমালোচনাও ততটাই সহজলভ্য। ইতোমধ্যে ব্লগ এমন এক শ্রেনীর সমালোচক সৃষ্টি করতে পেরেছে যারা সাদাকে সাদা, কালোকে কালো আর ধূসরকে ধূসর বলতে কুণ্ঠিত হননা। একজন লেখকের ভালো লেখাটির জন্য যেমন প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন, নিজ উদ্যোগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে দেন আবার নিম্নমানের লিখাটির জন্য তিরস্কারেও পঞ্চমুখ হন। এই প্রেক্ষাপট আর বাস্তবতাই ব্লগ লেখকদের দায়িত্ববান হতে বাধ্য করেছে, দায়িত্ববান প্রতিজন জনপ্রিয় ব্লগারই শক্তিমান লেখক। কারণ তারা জানেন মুখকাটা সমালোচক তার ভালো লেখাটির প্রশংসা করলেও খারাপ লেখাটির বিষয়ে উচিত কথা বলতে ছাড়বেন না।

জান্নাতুন নাহারের সম্পাদনায় প্রকাশিত শব্দতরীর এই সংখ্যায় ছয়টি গল্প স্থান পেয়েছে। জুলিয়ান সিদ্দিকীর ‘বয়রা’, আজাদ কাশ্মীর জামানের ‘জীবন একটি ছোট গল্প’ আর রাবেয়া রব্বানির ‘বিসর্জন’ অনবদ্য। এছাড়া ফরিদুল আলম সুমন, সবাক আর সকাল রয়ের গল্পগুলি যে কারো মনে দাগ কেটে যাবে। এই গল্পকারদের নিয়মিত হতে অনুরোধ করবো। কারন বাংলা সাহিত্যে তারা নিজ যোগ্যতায় অবস্থান করার অধিকার রাখেন বলে আমার বিশ্বাস।

প্রবন্ধ কতটা সহজ আর সরল করে উপস্থাপিত হতে পারে তার কিছুটা নমুনা পাওয়া যায় ফকির ইলিয়াসের ‘সাহিত্য সমাজ ও মানুষের দায়বদ্ধতা’ , এ. কে. এম. ওমর ফারুকের ‘ধ্রুপদী সাহিত্যে লঞ্জাইনাসের ভাবনা ও কিছু কথা” আর রেজওয়ান তানিমের ‘নজরুল সাহিত্যে দ্রোহ ও প্রেম’ প্রবন্ধসমূহ। এছাড়া আরো দুইটি মূল্যবান প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে এই লিটিল ম্যাগে। এই দুইটি প্রবন্ধ লিখেছেন ফজিলাতুন নেছা শাপলা ও দাউদুল ইসলাম।

জামান আরশাদ একজন আদ্যপান্ত কবি। ব্লগে তিনি শুধু কবিতাই লিখেন। তার কবিতাগুলো আকারে ছোট। অনেকটা সন্তুরের সুরের মত। কবিতা পাঠ করবার পরেও অনেকক্ষন রেশ থেকে যায়। তার ‘শব্দের আশার বুঁনোহাস’ কবিতাটি পড়বার পরে অনেকক্ষন বিভোর হয়ে থেকেছি। এছাড়া আবু মকসুদ, কবিরনি, মৃদুল, আশিক শাওন (প্রভাষক), ছায়াবাজী আর শুদ্ধ কাকতাড়ুয়ার কবিতাগুলি বারবার পড়বার মত। বাংলা ব্লগে এই কবিদের বিশেষ পাঠকপ্রিয়তা প্রমান করে যে বাঙালী এখনও কবিতা পড়ে। ছড়া বিভাগে রাফিউর রাজি রিটন, আফরোজা হক, মুহাম্মদ সাঈদ আরমান আর কামরুল আলমের বিভিন্ন স্বাদের ছন্দময় ছড়া আর পদ্য শব্দতরীর কলেবরই শুধু বাড়ায়নি, সাথে সাথে ছন্দপ্রিয় পাঠকের ক্ষুধা মিটানোর চেষ্টাও করেছে।

আমার অন্যতম প্রিয় লেখক রেজা নূর। তার অনুবাদ কবিতার বিশেষ ভক্ত আমি। তবে শব্দতরীতে তার ‘আমার সুন্দরবন দর্শন’ পড়লাম। তার লিখার গুনেই সাদামাটা ভ্রমন কাহিনীটা একটানে পড়ে ফেললাম আর অভিভূত হলাম। লেখকের ছোট ছোট অনেক ঘটনা আর আকুতি ছড়িয়ে আছে শব্দে শব্দে। কত সরল করে রেজা নূর লিখতে পারেন “খুলনা পৌঁছতে দেরি হলো। বাস থামিয়ে গাড়ির ভেতরেই পাউরুটি-কলা এসব বিলি ক’রে আমাদের ক্ষুধা মেটালেন শিক্ষকরা। মনের ক্ষুধা মনে রয়ে গেল। কোথায় রূপসা নদী। পাড় দিয়ে বাস ঘুরিয়ে নেওয়ার সময় বলা হলো, সন্ধ্যে হয়ে গেছে। তোমরা জানালা দিয়ে এক নজর নদীটা দেখে নাও। আমাদের এখনই ফিরতে হবে। রূপসা নদীর নাম ক’রে কী দেখেছিলাম মনে পড়ে না। ”

শামিম রহমান জনপ্রিয় ব্লগার। তার গল্প লিখবার হাত অসাধারন। তবে শব্দতরীতে তার লিখা নাটক দেখে অবাক হয়েছি। আরও বেশী অবাক হয়েছি গল্পের মত অনবদ্য তার নাটক রচনার ক্ষমতা দেখে। অনুরুপভাবে ফকির আবদুল মালেককে ব্লগ জগতের সবাই একজন কবি হিসাবেই চিনেন। অথচ তিনি যে কিশোরদের জন্য এমন সুন্দর গল্প লিখতে পারেন তা জানা ছিলনা। তার ‘গোল-কিপার নাম্বর টু’ গল্পটি সবার ভালো লাগবে বলে বিশ্বাস। শিশুতোষ বিভাগে মেঘ অদিতির ‘ভালবাসার দিনরাত্রি’র প্রশংসা না করলে লিখাটির উপর অবিচার করা হবে। শব্দতরীর সম্পাদক প্রকাশ করে দিয়েছেন।

শব্দতরীর এইবারের সংখ্যার স্মৃতিচারন বিভাগে অন্যতম তথ্যবহুল একটি প্রবন্ধ ‘ইতালির প্রথম শহীদ মিনার ও তার ইতিকথা’। স্মৃতিচারণমূলক এই লেখাটি লিখেছেন শক্তিমান ও জনপ্রিয় লেখক জিয়া রায়হান। যতদূর জানি, তিনি দীর্ঘ দিন প্রবাসে কাটিয়েছেন। তাই তার সাবলীল বর্ণনা জল রং-এ আঁকা পোট্রেটের মত স্পস্ট। স্মৃতিচারণ বিভাগে জেড. এইচ. সৈকতের লিখাটি খুবই ভালো লেগেছে। আর সিনিয়র ব্লগার কালপুরুষ এবং নিল পিঁপড়ার স্মৃতিচারন সবার কাছেই ভাল লাগবে। পাঠকের জীবনের কোন না কোন ঘটনা বা স্মৃতির সাথে মিলে যাবে। মুক্তগদ্য বিভাগে বাবুল হোসেইন লিখেছেন ‘ অপোর মৃত্যু অথবা সোনালি সন্ধ্যার গান এবং চোখের গহ্বরে সমুদ্র পোষার গল্প।” আর চিঠি বিভাগে আনন্দময়ীর ‘ঋষি বালকের জন্য’ একটি লিখা সম্পাদক পাঠকের হাতে তুলে দিয়েছেন। এই লিখাটির মধ্যে বিশেষ কি আছে জানিনা। তবে আমাদের সাধারন জীবনের অনেক প্রাপ্তী, অপ্রাপ্তী, ঘাত-প্রতিঘাত, ছোট ছোট অনুভূতি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। ধন্যবাদ সম্পাদক।

মুক্তিযুদ্ধ বিভাগে সাইফুজ্জামান খালেদের ‘ সামনে নতুন একটি যুদ্ধ, আপনি কি প্রস্তুত?’ শীর্ষক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বিষয়ে একটি তথ্যবহুল প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার কার্যক্রম, ট্রাইবুন্যালসহ অন্যান্য অনেক প্রশ্নের সুনির্দষ্টি উত্তর পেয়ে যাবেন কৌতূহলী পাঠক। তবে এই বিভাগে একটি মাত্র প্রবন্ধ দেখে হতাশ হয়েছি। কারণ বাংলা ব্লগ সমূহে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যত প্রবন্ধ, গল্প, কলাম প্রকাশিত হয়েছে তাতে এই বিভাগটি এত রুগ্ন থাকবার কথা নয়।

ব্লগারস ফোরাম সাহিত্যপত্র ‘শব্দতরী’ এক অনিন্দ্য প্রকাশনা। শব্দতরীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য এর ধারাবাহিক ও নিয়মিত প্রকাশ। ব্লগ লেখকদের একমাত্র নিয়মিত প্রকাশনা হিসাবে শব্দতরীর অবস্থান উজ্জল থেকে উজ্জলতর হচ্ছে। শব্দতরী এখন পাঠকের কাছে নিজ গুরুত্ব আর মহিমা নিয়েই নিজের পোক্ত অবস্থানকে আরো পোক্ত করে যাচ্ছে। সবশেষে শব্দতরীর সম্পাদকীয় সাথে গলা মিলিয়ে বলতে চাই, “‘লিটিল ম্যাগাজিন পড়তে পড়তে বেড়ে উঠা আমার মত আর সবাই হয়তো জানেন ছোট কাগজ যার নাম সেটা কিন্তু আসলে তত ছোট নয়। জনপ্রিয়তা কিংবা বিক্রিও তার অভিপ্রায় নয়। নতুনের আবাহন, প্রথা ভাঙার শপথ কিংবা গতানুগতিকতার বাইরে বেরিয়ে আসার রুচিশীল তাড়নার সাথেই এর জন্ম আর বেড়ে উঠার সবটুকু যোগ। “শব্দতরী’ও এই জায়গায় তার ব্যতিক্রম নয়। শব্দতরী নিয়ে আমাদের চলার পদাঘাতে কোন রক্তাক্ত বিপ্লব আসবে না জানি, কিন্তু সময়ের দাবী আর এগিয়ে চলা বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে নীরব এক বিপ্লবের স্বপ্ন আমরা ঠিকই দেখছি। ”

শব্দতরী (৩য় বর্ষ, ১ম সংখ্যা)
ব্লগারস ফোরাম সাহিত্যপত্র
সম্পাদক: জান্নাতুন নাহার
প্রচ্ছদ: পীযুষ দস্তিদার
মূল্য: ১৫০ টাকা

প্রাপ্তী স্থান:
শব্দতরী স্টল
লিটিল ম্যাগ চত্বর
একুশে বইমেলা, বাংলা একাডেমী।