ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

১.
‘ভাষা আন্দোলনের ৬০ বছর’ -এই মূল প্রতিপাদ্য নিয়ে অমর একুশে বইমেলা শুরু হয়েছে। ফেব্রুয়ারী মাসের প্রথম দিনেই মেলার এবং বাংলা একাডেমীর নবনির্মিত আট তলা ভবনের উদ্বোধন করেছেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অমর একুশে বইমেলা শিক্ষিত বাঙালী সমাজ আর সৃষ্টিশীল অঙ্গনে নিবেদিত সকলের প্রাণের মেলায় পরিনত হয়েছে।

২.
এবারের বইমেলায় প্রকাশকরা দ্বিমুখী চাপে পৃষ্ঠ হচ্ছেন। প্রথমত অকল্পনীয়ভাবে প্রকাশনা ব্যয় বেড়ে গেছে। ঢাকার অন্যতম প্রধান কাগজের মার্কেট বাবুবাজারে কয়েকজন কাগজ ব্যবসায়ীর সাথে কথা বলে জানা যায় যে, বইমেলাকে কেন্দ্র করে ব্যবসায়ীদের একটি সংঘবদ্ধ চক্র কৃত্রিম কাগজের সংকট তৈরী করেছে। গত বছর ডিসেম্বর জানুয়ারীতে ১২০ গ্রাম অফসেট কাগজের মূল্য ছিল রীম প্রতি মান ভেদে এক হাজার নয়শত পঞ্চাশ টাকা থেকে দুই হাজার দুইশত টাকা। অথচ চক্রের কারসাজিতে এবার দাম বেড়ে হয়েছে তিন হাজার আটশত থেকে চার হাজার দুইশত টাকা পর্যন্ত। এছাড়া প্লেট, কালি, বাঁধাই, কম্পোজ, পজিটিভ, লেমিনেটিংসহ অন্যান্য ক্ষেত্রেও মূল্য বৃদ্ধি ঘটেছে। দ্বিতয়ত, বইমেলাকে কেন্দ্র করে স্বনামধন্য প্রকাশন সংস্থাগুলো বই প্রকাশ করলেও বিক্রির মন্দাভাবে দুশ্চিন্তা গ্রস্থ হয়ে আছ্নে।

৩.
নব্বই সালের পর থেকেই বইমেলা প্রাঙ্গনের ধূলা, স্টল বরাদ্ধ আর একাডেমীর বাইরের সড়কে মেলার বিস্তার নিয়ে নেতিবাচক বির্তক মেলার স্বাভাবিক অনুষঙ্গ হিসাবে পরিচিতি লাভ করেছে। বাংলাবাজার ও শাহবাগ কেন্দ্রীক কয়েকজন প্রকাশক এবং প্রকাশনার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত ব্যক্তির সাথে কথায় স্পষ্ট যে, প্রকাশকদের মাঝে লটারি প্রক্রিয়া আর স্টল বরাদ্ধ নিয়ে ক্ষোভ বিরাজ করছে। স্টল বরাদ্ধের ক্ষেত্রে কখনও কখনও রাজনৈতিক অবস্থান এবং লেখকদের রাজনৈতিক কানেকশন প্রধান ভুমিকা পালন করে। নিয়মিত ও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রকশনা থাকা সত্বেও অনেক প্রকাশের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা হয়। চলমান বইমেলাতেও এমন কয়েকজন প্রকাশককে একাডেমীর ভিতরে স্থান না দিয়ে বাইরে স্থান দেয়া হয়েছে। কারন কতিপয় প্রতিস্ঠানকে রাজনৈতিক বিবেচনায় একাডেমীর ভিতরে তিন ইউনিটের স্টলও বরাদ্ধ দিতে হয়েছে। মেলা আয়োজন কমিটির একজন সদস্য আক্ষেপ করে জানান যে, এক ইউনিটের একটি স্টলের জন্য ছাত্রনেতা, ক্যাডার থেকে শুরু করে এমপি এবং মন্ত্রীদের লিখিত ও মৌখিক সুপারিশের আধিক্যে তটস্থ থাকতে হয়। স্টল বরাদ্ধে রাজনৈতিক আর্শীবাদের ধারাবাহিকতা আজ প্রকট আকার ধারণ করেছে।

৪.
গতকাল ছিল মেলার পঞ্চম দিন। কিছু কিছু স্টল গতকাল পর্যন্ত খোলাই হয় নাই। লিটিল ম্যাগ প্রাঙ্গনে দাড়িয়ে দেখা যায়, প্রভাবশালী লিটিল ম্যাগ প্রতিষ্ঠানগুলিকে বরাদ্ধ দেয়া স্টলগুলি খালি পড়ে আছে। সকাল থেকে মেলা শুরু হলেও বিকেল ৪ টা থেকে ধীরে ধীরে স্টলগুলি খুলতে শুরু করে। বয়রা গাছ তলার লিটিল ম্যাগ স্টলগুলিই লিটিল ম্যাগ প্রাঙ্গনকে মুখর করে রেখেছে। গতকালও মেলায় কোন কোন স্টলের ডেকোরশনের কাজ চলছিল- বিষয়টি পুরোপুরি দৃস্টিকটু মনে হয়েছে। বর্ধমান হাউজের কাছেই কপিরাইট অফিসের একটি স্টল খোলা হয়েছে। সেখানে গতকাল পর্যন্ত কাউকে পাওয়া যায় নাই।

৫.
বইমেলার নীতিমালা অনুযায়ী এক প্রকাশক অন্য প্রকাশকের বই স্টলে রাখতে বা বিক্রি করতে পারবেন না। যদি রাখতে চান তবে বইয়ে পরিবেশক হিসাবে নাম মুদ্রিত থাকতে হবে। কিন্তু জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সম্পর্কিত বই-এর বিষয়ে মনে হয় এই আইন প্রযোজ্য নয়। কারণ পরিবেশক হিসাবে নাম মুদ্রিত না থাকলেও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কিত বই বিভিন্ন স্টলে বিক্রয় করা হচ্ছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্টলও এর ব্যতিক্রম নয়। বইমেলাতেও প্রভাব বিস্তারের বাণিজ্যিক উপকরণ হিসাবে ‘জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান’ ব্যবহৃত হচ্ছেন।

৬.
বইমেলার স্টলগুলিতে শিশুতোষ বই-এর ক্ষেত্রে ডরিমন, টম এন্ড জেরী, হ্যারী পোটার, মিস্টার বিনসহ অনেক চরিত্র বিশাল জায়গা দখল করে আছে। অথচ বাংলা একাডেমী নির্বিকার। বাংলা ভাষার উল্লেখযোগ্য শিশুতোষ প্রকাশনাগুলি যেমন নাই (এক সুকুমার রায় ব্যতিক্রম) তেমন নতুন শিশুতোষ লেখারও পৃষ্ঠপোষকতাও নাই। শিশুতোষ প্রকাশনার ক্ষেত্রে এই অনাগ্রহ কতটা ভয়ংকর এবং আত্নধ্বংসী তা অনুধাবন করবার সময়ও কারো নাই।

৭.
এবারের বইমেলাকে উপলক্ষ্য করে ব্লগ লেখকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বই প্রকাশিত হয়েছে। আর পরিচিত ব্লগারদের উৎসাহিত করবার জন্য অন্য ব্লগাররা স্বেচ্ছায় বই কিনছেন। সহ ব্লগারের লেখা বই সম্পর্কিত আলোচনা করছেন এবং অন্যজনকে কিনতে উদ্ধুদ্ধ করছেন। খুব ধীরে ধীরে হলেও ব্লগ কেন্দ্রীক একটি নতুন সাহিত্যধারা সৃষ্টি হয়েছে এবং বিকশিত হচ্ছে। এই আশা করা খুব বেশী নয় যে, লিটিল ম্যাগ চত্বরের মত হয়তো কয়েক বছরের মধ্যেই বইমেলায় ব্লগ চত্বর-এর ব্যবস্থা করতে হবে।

৮.
৩১শে জানুয়ারী বইমেলার সার্বিক দিক নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে আয়োজকরা জানান যে, এইবারের বইমেলার বাজেট এক কোটি চল্লিশ লক্ষ টাকা। আয়োজকদের কাছে বিনীত অনুরোধ এক কোটি চল্লিশ লাখ টাকার মেলাকে ধূলায় ধূসরিত করবেন না।

৯.
গতবার বইমেলায় বিক্রয় লব্ধ অর্থ ছিল প্রায় পঁচিশ কোটি টাকা। প্রকাশক আর লেখকরা প্রার্থনা করছেন যেন, গতবারের তুলনায় এইবার বেশী বাণিজ্য হয়। কিন্তু প্রথম সপ্তাহে বিক্রয় সূচকে তারা খুব বেশী আশাবাদী হতে পারেন নাই। বইমেলা বাঙালীর প্রাণের মেলা বলেই প্রকাশকরা স্বপ্ন দেখছেন যে, পয়লা ফালগুন আর ভালোবাসা দিবস উপলক্ষ্য করে মেলায় বিক্রির সূচক ইতিবাচক মোড় নিবে। তাদের বিনিয়োগকৃত অর্থ লাভ সমেত ফিরে আসবে।