ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি


১.
মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গলার স্বরকে মোটা করে আবৃত্তির ঢং-এ মাঝে মাঝে গূঢ়গম্ভীর বক্তব্য প্রদান করেন। সেই সব বক্তব্য শুনলে মনটা ভালো হয়ে যাবার কথা। সাধারন মানুষ হিসাবে আশ্বস্ত হওয়া উচিত। কিন্তু উনার এই সব বক্তব্য শুনলে মনে দু’টো প্রশ্ন জাগে। প্রথম প্রশ্নটা হল উনি যা বলেন তা কি নিজের কানে শুনতে পান? দ্বিতীয় প্রশ্নটা হল যদি উনি নিজের বক্তব্য নিজের কানে শুনতে পান তবে সেই বক্তব্য কি উনি অনুধাবন করেন ও বিশ্বাস করেন?

২.
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখন সুযোগ পেলেই বলেন মিডিয়া সত্য মিথ্যা মিশিয়ে যা খুশী লিখছে। যা খুশী লিখার৯!!) সমালোচনাকারী প্রধানমন্ত্রী বলেছেন যে, বিএনপি আমলে অপহরণ ও গুমের রাজনীতি শুরু হয়েছিল। যা খুশী লিখা যেমন কাম্য নয়, তেমন যা খুশী বলাও শোভন নয়। কারণ সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের সরকার জাসদ ও সর্বহারা আন্দোলন দমনের নামে অপহরন ও গুমের রাজনীতি কার্যকর করে। প্রথম ক্রস ফায়ারের কৃতিত্বও বাংলাদেশের প্রথম সরকারের। সিরাজ সিকদারকে হত্যার মধ্য দিয়ে ক্রশ ফায়ার সংস্কৃতির সফল সূচনা করেছিল তৎকালীন সরকার। পরবর্তী প্রতিটা সরকার এই ধারাকে সমুন্নত রেখেছে। তবে অপহরণ এবং গুমের বর্তমান চরম উৎকর্ষতা লাভের সাফল্য বর্তমান সরকার করতেই পারে।

৩.
বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহনের পরে প্রথম আলোচ্য অপহরন এবং গুমের ঘটনা ছিলো ‘চৌধুরী আলম’-এর গুম হওয়ার ঘটনাটি। আমাদের দায়িত্ব পরায়ন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অলৌকিক ক্ষমতাবলে বলে দিয়েছিলেন বিরোধী দল চৌধুরী আলমকে লুকিয়ে রেখেছে। উনার এই দিব্য দৃষ্টির প্রখর ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর থাকবেনা সেটা হতে পারেনা। এবার প্রধানমন্ত্রী ইলিয়াস আলীর অপহরনের বিষয়ে একই কথা বলেছেন। দুজনের বক্তব্য শুনলে মনে হয়, বিএনপি তার দলের নেতা ও কর্মীদের অপহরন, খুন ও গুম করার অধিকার রাখে। ফলে সরকারের কিছুই করার নাই। এই সূত্র অনুসারে দেশের বৃহত্তম দল হিসাবে আওয়ামী লীগেরও একই ক্ষমতা ভোগ করবার কথা।

৪.
ইলিয়াস আলী বিএনপি’র একজন প্রভাবশালী নেতা। উনার জন্য বিএনপি তথা প্রধান বিরোধী দল হরতাল কর্মসূচী পালন করছে। এতে অবাক হবার কিছু নাই। কিন্তু ভাবতে খুব অবাক লাগে যে কিছু দিন আগেই সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকান্ডটি যখন ঘটে এবং হত্যাকান্ডের তদন্ত স্পষ্টভাবে দীর্ঘায়িত করা হচ্ছিল, তদন্তকে ধামাচাপা দিতে স্বরাস্ট্রমন্ত্রীকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তখন বিরোধী দল নির্লজ্জের মত রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের স্বার্থে কথার ফুলঝুরি ফোটাতে ব্যস্ত ছিল। সাধারন মানুষের মত দলহীন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির হত্যাকান্ড ও তদন্ত নামক নাটকের প্রতিবাদে যখন দলমত নির্বিশেষে একটা কর্মসূচীর প্রয়োজন ছিলো তখন বিরোধীদল মিডিয়ায় মাইক্রো ফোনে ফায়দা হাসিলে বিভোর।

৫.
ইলিয়াস আলীর অপহরন ঘটনা এবং সাগর-রুনির হত্যাকান্ডের তদন্তের গতি প্রকৃতি এটাই প্রমান করে যে সরকারী দল আর বিরোধী দলের কাছে সাধারন মানুষ ভোটার মাত্র, এর বেশী কিছু নয়। আমি বা আপনি বা আমরা যারা সরাসরি রাজনৈতিক দলের
সাথে সম্পৃক্ত নই তাদের মূল্য প্রধান দুইটি রাজনৈতিক দলের কাছেই শূণ্য। এক একজন মহান নেতা যতই দেশপ্রেমের কথা বলেন, জনগনের কথা বলেন আর গণতন্ত্রের কথা বলেন প্রকৃতপক্ষে তারা দেশপ্রেমের মোড়কে নিজেদের ঢেকে গণতন্ত্রের নামে রাজনীতির নামে ধান্ধাবাজী করেন আর মনে করেন সাধারন জনগন তাদের অনুগতদের মত অন্ধ ও খরিদসূত্রে দাস মাত্র।

৬.
আমাদের স্বরাস্ট্রমন্ত্রীর যোগ্য আইজিপি সাগর-রুনি হত্যাকান্ডের তদন্তের বিষয়ে আশার কথা শুনিয়েছিলেন। মিডিয়ায় দেয়া বক্তব্য অনুসারে আইজিপি এই হত্যাকান্ডের তদন্তের বিষয়ে ‘প্রনিধানযোগ্য অগ্রগতি’র পরে সাম্প্রতিক সময়ে ‘সন্তোষজনক’ সন্তুষ্টিতে তৃপ্ত ছিলেন। অথচ হাইকোর্টের মাধ্যমে জানা গেল যে এতদিন তদন্ত নামক যে বিষয়টি পরিচালনা করা হয়েছে তা সম্পূর্ণ ব্যর্থ। হাইকোর্টের এই অবস্থানের পরে একটা প্রশ্নের মুখোমুখি বারবার হচ্ছি; যখন আইজিপি বুঝতে পারেন না কোনটা প্রনিধানযোগ্য অগ্রগতি আর তদন্ত কোন অবস্থায় থাকলে সন্তোষ প্রকাশ করতে হয় তখন তিনি আইজিপি পদে বহাল থাকেন কি করে!! বিবেকের তাড়না বলে কি কিছু নেই।!! অথবা পদ ও ক্ষমতার ‘প্রনিধানযোগ্য অগ্রগতি’র ‘সন্তোষজনক’ সন্তুষ্টিতে বিবেক পলাতক!!

৭.
৯০-এর গণ আন্দোলনে সামরিক স্বৈরাচারী সরকার পতনের পরে প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছে রাজনৈতিক দলীয় স্বৈরাচারী সরকার। গত দুই দশকের অধিক সময় ধরে ধারাবাহিক রাজনৈতিক দলীয় স্বৈরাচার সরকারের কারনেই প্রশাসনের দেহের মাথার চুল থেকে পায়ের নোখ পর্যন্ত বেশীর ভাগ অংশই চরম দলবাজী রোগে অক্রান্ত। যখন যারা ক্ষমতায় এসেছেন তারা নির্লজ্জভাবে দলকেই দেশ ও রাস্ট্র ভাবতে শুরু করেছেন। তাদের কাছে দলের স্বার্থই রাস্ট্র ও জনগনের স্বার্থ হয়ে ওঠে। ফলে সাধারন জনগন জিম্মি হয়, দেশের অগ্রগতি ব্যহত হয়। কিন্তু এর জন্য যারা দায়ী তারা নিজেদের সাচ্চা দেশপ্রেমিক মোড়কে আবৃত করে নিজেদের নগ্ন স্বার্থ ঢাকবার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

৮.
সবকিছুর একটা সীমা থাকে। সহ্যের যেমন সীমা থাকে, অসহ্যেরও সীমা থাকে। সীমা থাকে চরম নির্লজ্জতার। অথচ দলীয় রাজনৈতিক স্বৈরাচারদের নির্লজ্জতার কোন সীমা নাই। রুপকথার সেই রাজাকে যখন এক সাধারন বালক উলঙ্গ বলেছিল তখন রাজা লজ্জিত হয়েছিলেন, বিব্রত বোধ করেছিলেন। রুপকথার রাজার লজ্জাবোধ অবশিষ্ট থাকলেও আমাদের ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতালোভী রাজনীতিক ও তাদের অন্ধ অনুগতদের ভিতরে সেই বোধটুকুর অতি ক্ষুদ্র অংশও আর অবশিষ্ট নেই।