ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি


১।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, “আমরা ক্ষমতায় আসার পর গণমাধ্যম সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে। সত্য হোক, মিথ্যা হোক, লিখেই যাচ্ছে। প্রতিদিন সরকারের বিরুদ্ধে না লিখলে মনে হয় তাঁদের পেটের ভাত হজম হয় না। এটাই বাস্তবতা। এতে যে দেশের ক্ষতি হচ্ছে, তা তাঁরা চিন্তাও করেন না। আমরা তাঁদের বাধা দিই না।’ বিস্তারিত: পত্রপত্রিকায়, টক শোতে দেশের এক চিত্র, আর গ্রামে অন্য চিত্র

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর মিডিয়ার প্রতি অবস্থান বা মনোভাব উপরের বক্তব্যেই স্পষ্ট। এই ধরনে বক্তব্য গত দুই বছরে তিনি বহুবার দিয়েছেন। কিন্তু একবারই মিথ্যা তথ্য প্রকাশের দায়ে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করেন নাই। তিনি যখন বলেন “এতে যে দেশের ক্ষতি হচ্ছে, তা তাঁরা চিন্তাও করেন না। আমরা তাঁদের বাধা দিই না।” তখন আতংকিত হতে হয়। দেশের প্রধানমন্ত্রী বা সরকার যদি দেশের ক্ষতি হলে বাঁধা না দেন তাহলে সবচাইতে বড় দেশপ্রেমিক প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেশ কতখানি সুরক্ষিত!! এর নাম কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা!!

২।
অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ সাংসদদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন করে বক্তব্য দিয়েছেন বলে গতকাল রোববার সংসদ অধিবেশনে অভিযোগ (বিস্তারিত সংবাদ বিডিনিউজ, প্রথম আলোতোলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনেন স্বতন্ত্র সাংসদ ফজলুল আজিম এবং আলোচনা করেন সাংসদ মুজিবুল হক ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম। সরকারি দলের মাননীয় সাংসদ আলী আশরাফ স্পিকারের দায়িত্ব পালনকালে বলেন , ‘সংসদ অবমাননা করা ব্যাড সিগন্যাল। এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে, গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ দেখা যাচ্ছে। সংসদকে অবমাননার মাধ্যমে দেশের জনগণ ও সংবিধানকে অবমাননা করা হয়েছে। এতে সাংসদদের বিশেষ অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। এটা বিচ্ছিন্ন কোনো বক্তব্য নয়। সে জন্য তাঁকে (আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ) বিশেষ অধিকার কমিটির মাধ্যমে নোটিশ করে আমরা এ সংসদে তলব করতে পারি। কমিটি সিদ্ধান্ত নেবে। একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। তাঁকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে। কারণ, সংসদকে অবমাননা করার অধিকার কারও নেই।’

মাননীয় সাংসদ আলী আশরাফ, আপনার বক্তব্যে স্পষ্ট যে, আপনি হুমকী দিচ্ছেন। জাতীয় সংসদ অধিবেশনের সভাপতির ভাষা এটা হতে পারেনা এবং সংসদে হুমকী ধামকী দেয়া কোন সাংসদ বা সভাপতির কাজ নয়। সাংসদদের বিশেষ অধিকার বলতে আপনি কি বোঝাতে চেয়েছেন যে, তারা সকল সমালোচনার উর্দ্ধে! তারা সাসংদ হয়েছেন বলে যা খুশী তা করার এবং বলার লাইসেন্স পেয়ে গেছেন! আপনি ‘দৃষ্টান্ত স্থাপন’ বলেত কি বুঝাতে চাচ্ছেন! একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বলে মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাশে কালো মেঘ জমানোর জন্য সাধারন ভোটারগন আপনাদের ভোট দেয় নাই।

বর্তমান সংসদের মাননীয় সাংসদদের অধিকাংশই আজ এমন স্বরে কথা বলেন যেন তারা সকল আইন ও সমালোচনার উর্দ্ধে। জনগন তাদের যা খুশি তাই করবার জন্য পাঁচ বছরের জন্য ক্ষমতায় পাঠিয়েছে। এই সকল সাংসদদের আচার আচরণকে নিয়ন্ত্রণ না করায় জাতীয় সংসদ নির্বাচিত রাজনৈতিক মাস্তানদের আস্তানায় পরিনত হওয়ার পথে এগিয়ে যাচ্ছে।

৩।
জাতীয় সংসদে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ-এর সমালোচনাকালে সাংসদ শেখ ফজলুল করিম সেলিম বলেন, এই বক্তব্য গণতন্ত্র ও সংসদের ওপর আঘাত। বুদ্ধিজীবীরা জাতির বিবেক হয়েছেন। বিপদে তাঁদের টিকিটিও খুঁজে পাওয়া যায় না। কোনো মন্ত্রীর বিরুদ্ধে যদি অভিযোগ থাকে, তবে প্রমাণসহ উপস্থাপন করেন। সেই মন্ত্রী পদত্যাগ করবেন। কিন্তু ঢালাও অভিযোগ করা যাবে না। শেখ সেলিম অর্থমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেন, ‘যেসব বুদ্ধিজীবী সরকারের সমালোচনা করেন, তাঁদের আয়ের উৎস কী, তা খতিয়ে দেখেন। এক-এগারোতে তাঁরা কী করেছেন, তা আমাদের জানা আছে। একজন শিক্ষক এত দামি গাড়িতে কী করে চড়েন? নির্বাচিত সরকার থাকলে তাঁদের মাথা খারাপ হয়ে যায়। অনির্বাচিত সরকার থাকলে তাঁরা পদ পান। এক-এগারোর পর ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষকদের যখন গ্রেপ্তার করা হয়, তখন তো তাঁরা একটি কথাও বলেননি, বরং সেই সরকারের প্রশংসা করেছেন।’

মাননীয় সাংসদ ফজলুল করিম সেলিম আপনার বক্তব্যে আপনি সত্যকে আড়াল করেছেন। আপনি সত্যকে আড়াল করা আর মিথ্যা বলার মধ্যে ফারাক কতটা ভালো জানেন। আপনি বলেছেন,”ঢালাও অভিযোগ করা যাবে না।” কিন্তু আপনি সকল বুদ্ধিজীবীকে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করেছেন। আপনাকে স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, নিজেদের কৃতকর্মের কারনে এক এগারোর সময় আপনারা গর্তে গিয়ে লুকিয়ে ছিলেন। সেই সময় জাতির বিবেক হিসেবে বুদ্ধিজীবীরাই এগিয়ে এসেছিলেন। তারা এক এগারোর ভালো কাজকে সমর্থন জানিয়েছিলেন আর খারাপ কাজকে সমালোচনা করেছিলেন। কিন্তু আপনার দলের নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক এগারোর কুশীলবদের পক্ষ নিয়ে ঘোষনা করেছিলেন ক্ষমতায় গেলে এক এগারোর সরকারের সকল কাজের বৈধতা দিবেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী কথা রেখেছেন বলেই নির্বাচিত সরকারের সহায়তায় মইনউদ্দীন আর ফখরুদ্দীন নিরাপদে দেশ ত্যাগ করতে পেরেছেন। মাঝে মাঝে তাদের বিচারের নামে লোক দেখানো একটা নাটক মঞ্চস্থ হয়।

শেখ ফজলুল করিম সেলিম, এক এগারোয় কার কি ভূমিকা ছিলো সেই বিষয়ে সমালোচনা করবার আগে নিজেদের ভূমিকা ভুলে যাওয়া আপনার মোটেও উচিত হয় নাই। জাতীয় সংসদে দাড়িয়ে সত্যকে আড়াল করে বক্তব্য দিয়ে আর সংসদ অবমাননা করবেন না, জনগন সংসদ অবমাননা করবার জন্য সাংসদদের ভোট দেয় নাই।

আপনি আরো বলেছেন, “যেসব বুদ্ধিজীবী সরকারের সমালোচনা করেন, তাঁদের আয়ের উৎস কী, তা খতিয়ে দেখেন। ” অর্থাৎ যারা সরকারের সমালোচনা করেন না তাদের আয়ের উৎস দেখার প্রয়োজন নাই। আপনারা এই সকল দলপালিত সুশীল বুদ্ধিজীবীদের আয় রোজগারের দায়মুক্তি পাঁচ বছরের জন্য দিয়েছেন। তাই দলপালিত পোষা বুদ্ধিজীবিদের অন্যতম দায়িত্ব হয়ে দাড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছাপূরনে পিঠাপুলি ও চটপটি ফুচকা খাওয়া আর বিটিভিতে উন্নয়নের ঢাঁকঢোল বাজানো।

আপনার একটি প্রশ্ন খুব যর্থাথ হয়েছে, “একজন শিক্ষক এত দামি গাড়িতে কী করে চড়েন?” এই বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা গ্রহন করা উচিত। এই প্রশ্নটার আগে সচেতন মানুষের প্রশ্ন ছিলো, মাত্র সাড়ে তিন বছরে আওয়ামী লীগের সাংসদদের একটা অংশ কিভাবে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে আর ব্যাংকের লাইসেন্স পান?” সাহারা গ্রুপ কেন আপনার পুত্রকেই তাদের এজেন্ট নিয়োগ করে?” এমন হাজার প্রশ্ন আমজনতার মাথায় ও মুখে ঘুরপাক খাচ্ছে। কিন্তু তদন্ত করে জবাব দিবে কে!?

৪।
মজার বিষয় হল, জাতীয় সংসদের মাননীয় সংসদ সদস্যরা নিজেদের অধিকার ক্ষুন্ন হয়েছে বলে যে বক্তব্যের সমালোচনা করেছেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সেই কথা বলেন নাই। দৈনিক প্রথম আলোর রেকর্ড অনুযায়ী ট্রান্সপারেন্সী ইন্টারন্যাশনালের অনুষ্ঠানে তাঁর বক্তব্য ছিলো , “চোর যে চুরি করে, ডাকাত যে ডাকাতি করে, সেটি কি দুর্নীতি? আমার ধারণা, এটা দুর্নীতি নয়। কারণ, দুর্নীতি শব্দের মধ্যে আরেকটি শব্দ লুকিয়ে আছে। শব্দটি হলো ‘নীতি’। চোর বা ডাকাতের কাজ ঠিক দুর্নীতি নয়। কারণ, তাদের কোনো নীতিই নেই। সুতরাং, দুর্নীতি সেই মানুষটি করে, যার নীতি আছে। একটা উদাহরণ দিই। যেমন—যদি একজন মন্ত্রী এই বলে শপথ নেন যে তিনি শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ না করে সবার প্রতি সমান বিচার করবেন, কিন্তু পরে তিনি সেটি না করেন, সেটা হবে দুর্নীতি।’ (বিস্তারিত প্রথম আলো)

সাংসদদের আলোচনা শুনে একটা প্রবাদ বহুদিন পরে মনে হল। পুরোহিতের প্রশ্ন: ঠাকুর ঘরে কে রে? ঠাকুর ঘরের ভিতর থেকে উত্তর এলো : আমি কলা খাইনা।

৫।
মাননীয় সাংসদগন, আজ নীতিভ্রস্ট আর্দশহীন নষ্ট রাজনীতির জয়জয়কার। রাজনীতিকে এই জায়গায় নিয়ে আসার জন্য আপনাদেরও বিশাল অবদান রয়েছে। সরকারীদল ও বিরোধীদল এবং দুই দলের জোটভূক্ত ও জোটহীন সুবিধাবাদী দলগুলো রাজনীতির নামে ব্যবসা আর ক্ষমতার ফায়দা হাসিলে ব্যস্ত। রাজনীতিকদের লজ্জাহীনতা আর স্বার্থপরতায় আমজনতা ধারাবাহিকভাবে নিষ্পেষিত, নির্যাতিত এবং প্রতারিত। নির্বাচিত সাংসদগনের অধিকাংশই ভুলে যান যে তারা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি মাত্র, তারা রাজনৈতিক মাস্তান নন এবং জাতীয় সংসদ তাদের আস্তানা নয় যে তারা চাইলেই সর্বজন শ্রদ্ধেয় কারো বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে তার চরিত্র হনন করতে পারবেন।

৬।
মাননীয় সংসদ সদস্য আলী আশরাফ বলেছেন, “সংসদ অবমাননা করা ব্যাড সিগন্যাল।” কিন্তু সাংসদগন যেভাবে নিজেদের আইন ও সামালোচনার উর্দ্ধে ভাবছেন এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে দেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের বক্তব্যকে ভুলভাবে উপস্থাপন করে চরিত্র হনন করছেন তা শুধু গণতন্ত্রের জন্যই নয় সমগ্র দেশের জন্যই একটি ব্যাড সিগন্যাল, ভেরী ব্যাড সিগন্যাল।

এই পোস্টটির সাথে সহমত পোষণ করলে লিখাটি শেয়ার করুন।

 

আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ