ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 

১.
মাননীয় সাংসদগণ, আর কতটা নির্লজ্জ হলে আপনাদের বোধগম্য হবে যে আপনারা রূপকথার সেই নগ্ন রাজার সংস্করণে পরিণত হয়েছেন! এই দেশকে আর কতটা গ্রাস করলে আপনাদের উদরপূর্তি হবে! আর কতটা স্বেচ্ছাচারী হলে আপনাদের ভঙ্গুর ও অদৃ্শ্য ভাবমূর্তি রক্ষা করতে পারবেন!! দলীয় অন্ধ অনুগত মোসাহেবদের ভীড় ঠেলে একবার সাধারন জনতার কাছাকাছি গেলে অনুধাবন করতে পারতেন তাদের মনে কতটা ক্ষোভ, ব্যাথা, প্রতারিত হবার কষ্ট, আপনাদের ভোট দেবার জন্য অনুতপ্ত বোধ এবং আপনাদের প্রতি বর্ষনের জন্য গাঢ় ঘৃনার শব্দবলী জমে আছে। জনগনের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনগনের কাছে না গিয়ে সুরক্ষিত তিনশত ত্রিশ আসনেই আপনারা গণতন্ত্র খুঁজেন আর সংসদের নামে নিজের ভাবমূর্তি রক্ষায় আস্ফালন করেন।

২.
মাননীয় সাংসদগণ, জনগন আপনাদের নির্বাচিত করেছে বলে যা খুশী তাই করে বেড়ান। এই জন্যই কি জনতা আপনাকে ভোট দিয়েছিল! দলীয় ভোট ব্যাংক ব্যতীত যাদের ভোট আপনার বিজয়কে নিশ্চিত করেছে তারা কেন আপনাকে ভোট দিয়েছে সেটা কি একবার ভেবে দেখেছেন! সচেতন ভোটারগন আপনার মার্কায় সীল মেরেছিল এই জন্য যে আপনি আপনার প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় কম খারাপ/বদমায়েশ ছিলেন। সুতরাং ভোটে নির্বাচিত হয়ে আস্ফালন করা বেমানান।

৩.
মাননীয় সাংসদগন, 1990 সালে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের পতনের পর হতে আজ পর্যন্ত সাধারন জনগন একটা সরল দৃশ্য দেখে আসছে। সেই দৃশ্যটা হল পাঁচ বছর অন্তর ক্ষমতার পালা বদল হবে। ক্ষমতাসীন দল নিজেদের ভাগ্য উন্নয়ন আর লুটপাটতন্ত্র চালু রাখবে। কিন্তু বোকা জনগন আর দূর্ভাগা দেশ যেখানে থাকবার সেখানেই থেমে থাকবে।

৪.
মাননীয় সাংসদগন, আপনারা যারা প্রধান বিরোধী দলের প্রতিনিধিত্ব করেন তারা সংসদ বর্জন করে চললেও সাংসদ হিসেবে সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছেন। আপনারা নির্বাচনী প্রচারের সময় আপনার এলাকার ভোটারদের বলেছিলেন কি যদি সরকার গঠন করতে না পারি তবে সংসদে যাবনা! আপনারা জনগনের ভোটে নির্বাচিত সাইনবোর্ড ব্যবহার করবেন, সংবিধান প্রদত্ত সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করবেন কিন্তু সংসদে যাবেন না- এটা কি স্পষ্ট প্রতারনা নয়! যাদের ভোটকে পূঁজি করে আপনি তিনশত ত্রিশ জনের একজন সেই ভোটারদের কাছে গিয়ে কি ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন! জানি করেন নাই, কারণ প্রতারক হলেও আপনারা সকল কিছুর উর্দ্ধে।

৫.
মাননীয় সাংসদগন, আপনারা যারা সরকার গঠন করেছেন তারা জনগনের কাছে একটি নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিলেন। তাতে স্পষ্ট উল্লেখ ছিল যে, ক্ষমতায় গেলে আপনাদের সম্পদের হিসাব জনগনের কাছে প্রকাশ করবেন। কিন্তু ক্ষমতার সাড়ে তিন বছর অতিক্রম হলেও আপনাদের সম্পদের হিসাব প্রকাশ হয় নাই। আপনাদের সম্পদের পরিমান এতই বিশাল যে সাড়ে তিন বছরে তার হিসাব দেয়া সম্ভব নয়! অথবা সম্পদের উৎস এমন যে হিসাব দেয়া অসম্ভব। প্রসঙ্গত, আপনাদের আয় রোজগারের হিসাব এলাকার সাধারন মানুষ খুব ভালোভাবে জানে, এলাকায় কানপাতলেই শুনতে পাবেন।

৬.
মাননীয় সাংসদগন, সংসদ সার্বভৌম হলেও সাংসদ কি সার্বভৌম! একজন সাংসদ কি সংসদে যা খুশী বলবার এবং করবার অধিকার রাখেন! আপনাদের আচার আচরনে এই বিষয়গুলো সাধারন মানুষের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আপনারা একটা মিথ্যা সংবাদের উপর ভিত্তি করে একজন সর্বজন শ্রদ্ধেয় মানুষের চরিত্র হনন করলেও ক্ষমা চাইলেন না, দু:খ প্রকাশও করলেন না। এই শিষ্ঠতা কি সংবিধান আপনাদের শিক্ষা দিয়েছে! স্বাভাবিক সমালোচনার প্রতি আপনাদের এই আক্রোশ কোন ভীতি থেকে উৎপন্ন হয়েছে!

৭.
মাননীয় সাংসদগন, আপনারা আইনের শাসন নিশ্চিত করেছেন বলে ঢোল বাজান। আপনারাই বলেন আইন তার নিজস্ব গতিতে চলছে। তাহলে একজন বিচারপতির বিরুদ্ধে আপনারা সোচ্চার হলেন কেন! তিনি ‘কি বলেছেন’ সেটা অপেক্ষা ‘বলতে পারেন কিনা’-এটা কেন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। আপনাদের আলোচনায় স্পষ্ট যে আপনারা তাকে দলীয় বিবেচনায় নিয়োগ দিয়েছেন। প্রশ্ন হল, সংবিধান কি আপনাদের এই অধিকার দেয় যে যোগ্যতা অপেক্ষা দলীয় বিবেচনায় দল অনুগত ব্যক্তিকে বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে! সংবিধান যদি সেই অধিকার আপনাদের না দিয়ে থাকে তবে সংবিধানকে ধর্ষন করবার অধিকার ও সাহস আপনারা পেলেন কি করে! সংসদে সাংসদদের মাধ্যম ঘটা সংবিধান লংঘনের রেকর্ড কারো পক্ষে ভাঙা সম্ভব নয়।

৮.
মাননীয় সাংসদগন, আপনারা কোটি টাকা ব্যয় করে নির্বাচন করেন। আমজনতা বিশ্বাস করে এই ব্যায় শুধুমাত্র দেশপ্রেম এবং দেশসেবার সুযোগ প্রাপ্তীর জন্য নয়। এই ব্যায় এক লাভজনক বিনিয়োগ। পাঁচ বছর মেয়াদী ফিক্সড ডিপোজিট ও ক্ষমতার লাইসেন্স। তাই আপনাদের ভাবমূর্তি এত ভঙ্গুর। নির্বচিত হবার পরে আপনারা এতটাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যান যে, সিকিউরিটির লোক আর নিজের তোষামোদকারী কর্মীবাহিনী ছাড়া নিজের এলাকাতেই স্বাভাবিক চলাফেরা করতে আতংকিত বোধ করেন। সাধারন জনতার ভোটে নির্বাচিত হলেও সাধারন জনতাকে একটা সময় প্রতিপক্ষ ভাবতে শুরু করেন। নিজেদের নিরাপদ রাখার জন্য হাস্যকরভাবে যুক্তিহীন বিকারগ্রস্থ আচরনে লিপ্ত হন। কিন্তো সাধারন জনগন বিকারগ্রস্থ নয়। তারা কোন সুরে কোন গান- এটা ভালোই বুঝেন।

৯.
মাননীয় সাংসদগন, ব্যাবসায়ীরা তাদের ব্যবসায় অধিক মুনাফা আর কর্তৃত্ব ধরে রাখবার জন্য সিন্ডিকেট গঠন ও মেইনটেইন করে। পেশাদার অপরাধীদেরও সিন্ডিকেট থাকে। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পরবর্তী দুই দশকে রাজনীতিকগন রাজনীতি নামক ব্যবসার একটা শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে এবং রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছেন। তাই রাজনীতিতে নতুন কোন উদ্যোগ এলেই এই সিন্ডিকেট ব্যবসায়ীরা ঝাঁপিয়ে পড়েন। এই সিন্ডিকেটের কারনেই সোহেল তাজের মত লোকদের আক্ষেপ নিয়ে নীরব হয়ে যেতে হয়।

১০.
মাননীয় সাংসদগন, সাধারন জনগন নষ্ট রাজনীতির ভয়াল সিন্ডিকেট ভাঙার পক্ষে- এটা ওয়ান ইলেভেনের প্রথম বছরেই স্পষ্ট ছিলো। একে একে রাজনীতিকদের মুখোশ উন্মোচনে জনগন উল্লসিত হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ওয়ান ইলেভেন নিজেই পথহারা হয়ে যায়। এই সুযোগে নষ্ট রাজনীতির আর্দশহীন সিন্ডিকেট মূলা প্রর্দশন কার্যক্রমে সফলতার সাথে ওয়ান ইলেভেনকে উদরস্থ করে ফেলে। তাই সাংসদগন ওয়ান ইলেভেনের সমালোচনা করলেও এর কুশীলবদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহন করে নাই। কারণ, যদি ব্যবস্থা গ্রহন করতে গেলে সামরিক কেঁচোর গর্ত থেকে নির্বাচিত সাঁপের গোপন তথ্য বেরিয়ে আসে।

১১.
মাননীয় সাংসদগন,
যদি,
দলীয় স্বৈরাচারী সরকারের সমালোচনা করা সংবিধান লংঘন হয় তবে সাধারন জনতার একজন হিসাবে এই হ-য-ব-র-ল ব্যর্থ ও হাস্যকর মন্ত্রীসভার সরকারের প্রতি ধিক্কার জানিয়ে আমি সংবিধান লংঘন করলাম।

যদি,
ক্ষমতার অপব্যবহার করে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক খুনের আসামীর মৃত্যুদন্ড মওকুফের মাধ্যমে সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করার বিরোধিতা দেশবিরোধী চক্রান্ত হয় তবে আমি সেই চক্রান্তকারী।

যদি,
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বিতর্কিত অযৌক্তিক কাজ ও বক্তব্যের সমালোচনা করা রাষ্ট্রদ্রোহীতা হয় তবে শেয়ার বাজারের লক্ষ লক্ষ বিনিয়োগকারীকে নি:স্ব করে দলীয় লোকদের লাভবান করা এবং সাগর-রুনির হত্যাকান্ড নিজ হাতে ধামাচাঁপা দেয়ার প্রচেস্টার জন্য ধিক্কার জানিয়ে আমি রাস্ট্রদ্রোহী হলাম।

যদি,
কুইকরেন্টাল পদ্ধতির বিরোধিতা করার অর্থ দেশদ্রোহীতা হয়,তবে তারেক জিয়ার খাম্বা বাণিজ্যের বর্তমান ডিজিটাল ফরমেট কুইকরেন্টাল লুটপাট তন্ত্রের বিপক্ষে আমি দেশদ্রোহী।

১২.
মাননীয় সাংসদগন, নিজের নির্বাচনী এলাকায় যান আর সাধারন জনগনের বুকে কান পেতে শুনুন। এই লেখায় যা বলা হয়েছে সাধারন জনতা সেই কথাই বলবে। জনগন কর্তৃক প্রদত্ত পাঁচ বছরের লাইসেন্স আপনারা ব্যবহার করছেন নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে। বিরোধী দল আসন্ন নির্বাচনের মাধ্যমে পাঁচ বছর মেয়াদী লাইসেন্স নিশ্চিত করবার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। বাস্তবতা হল সাধারন জনতা এই চক্র থেকে মুক্তি চায়। সাধারন জনতার সহ্যের সীমা অনেক আগেই অতিক্রম করে গেছে। ফলে জনতার অসহ্য উত্তাপে যে কোন সময় রাজনীতি বাণিজ্যের সিন্ডিকেট ভেঙ্গে পরতে পারে । আমজনতা ও সচেতন ভোটারবৃন্দ ক্ষমতার তিনশত ত্রিশ শেয়ার অন্যভাবে বন্টন করে দিতে পারে।

১৩।
মাননীয় সাংসদগন, মুখোশের স্বভাব এই যে, একদিন সে খুলে যাবেই। আপনারা আপনাদের মুখোশ খোলা শুরু করেছেন। এইবার জনতার পালা, আর্দশ ও নীতিহীন নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছে জনতা , প্রস্তুত হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

এই পোস্টটির সাথে সহমত পোষণ করলে লিখাটি শেয়ার করুন।

ফেসবুক আইডি Abu Sayeed Ahamed