ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

55_east+east+university_protest_09092015_005

২০১৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারিতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলনে শতাধিক শিক্ষার্থী গুলিবিদ্ধ হয়েছিলো। তাদের দাবি ছিলো বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও সান্ধ্য মাস্টার্স কোর্স বন্ধ করা। সম্পূর্ন যৌক্তিক দাবি নিয়ে শান্তিপূর্নভাবে আন্দোলন করছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী। কোন ধরনের উস্কানি ছাড়াই হঠাৎ করে পুলিশ এবং ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিলে নির্বিচারে গুলি বর্ষন শুরু করেছিলো। সাথে ককটেল হামলাও ছিলো। সে কি বিভীষীকাময় এক পরিস্থিতি!

সেই আন্দোলনের পর আমার ফেসবুকে বন্ধু তালিকায় থাকা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া বেশ কয়েকজনকেই এমন বলতে দেখলাম যে আরে ‘দুই টাকা’ ফি বেড়েছে তাতে এত চিল্লাচিল্লির কী আছে? খুবই দু:খজনক সংবাদ হলো, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাত শতাংশ ভ্যাট বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ করলে পুলিশ আজও গুলি চালালো ইস্টওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর। প্রায় ৩০ জন শিক্ষার্থী আহত হলো।

আর এই ঘটনায়ও আজ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া কয়েকজনকে বলতে দেখলাম আরে সাত শতাংশ ভ্যাট আরোপ করেছে তাতে কী হয়েছে? এত চেঁচামেচির কী আছে? এতে আন্দোলনের কী আছে? ওদের বাবাদের তো প্রচুর টাকা ! বেহিসেবি টাকা! এই দুই শ্রেণীর মানুষেরা মোটামুটি একই ধরনের মানসিকতাসম্পন্ন এটা বলার অপেক্ষা রাখে না।

সেদিনের বাড়তি দু’টাকা দিতে অনেক গরীব বাবারই যেমন কষ্ট হয় ঠিক আজও বিত্তশালি বাবাদেরও বর্ধিত সাত শতাংশ ফি দিতেও হিমসিম খেতে হবে। যার কারনেই হয়তো উদ্ভুত এই পরিস্থিতি। হয়ত অনেকেরই একটা ধারনা রয়েছে যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সব শিক্ষার্থীরাই শিল্পপতিদের ছেলে মেয়ে। না মোটেই এই ধারনাটি সঠিক নয়। সবসময় এমন ঢালাও মন্তব্য গ্রহনযোগ্য নয়।

এখানকার অধিকাংশ শিক্ষার্থীই মধ্যবিত্ত পরিবারের। অনেক মেধাবীও বটে। দুর্ভাগ্যবশত সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাংখিত বিষয়ে পড়ালেখার সুযোগ না পেয়ে অগত্যা এক রকম বাধ্য হয়েই ভর্তি হতে হয় বেসরকারীতে।বাড়তি এতগুলো টাকা গুনতে হয় তাঁদের বাবাদের। আর আসন সংকটের কারনে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয়েরও তো এত বিশাল সংখ্যক শিক্ষার্থীদের সংকুলান করাও সম্ভব নয়।

সেক্ষেত্রে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালযগুলো তো একটি বড় দায়িত্ব পালন করছে। এটি বললে মনে হয় ভুল হবে না। তবে হ্যাঁ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিতান্তই ব্যবসা করার হীন মানসিকতা নিয়ে এখানে এসেছে। একরকম ‘সনদ বিক্রির দোকান’ খুলে বসেছে। তাদের কথা ভিন্ন। যারা নিয়মনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে অবৈধভাবে ক্যাম্পাস পরিচালনা করছে তাদের ব্যাপারে কঠোর ব্যবস্থা নিন। তাতে কোন সমস্যা নেই তো।

এটি তো কঠিন একটি সত্য যে, রাষ্ট্রের তো সামর্থ্য নেই সব শিক্ষার্থীদের উচ্চ শিক্ষা প্রদান করা। যে সমস্ত ব্যক্তিরা অনেক কষ্টে অলাভজনক এই খাতে বিনিয়োগ করে এমন শুভ উদ্যোগ নিয়েছেন তাঁদের উৎসাহ প্রদানের পরিবর্তে থামিয়ে দিচ্ছেন। এটা কতটা যৌক্তিক? এভাবে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষা জীবন হুমকির মুখে ফেলার তো কোন অধিকার রাষ্ট্রের নেই।

সবচেয়ে আশ্চর্য হতে হচ্ছে যে এখন কথায় কথায় এসব কোমলমতি তরুনদের বুকে রাষ্ট্রীয় পেটোয়া বাহিনী দিয়ে গুলি চালানো হচ্ছে। এগুলো কিসের লক্ষণ? পুলিশি রাষ্ট্রের চরিত্র সম্পূর্ণরুপে ফুটে উঠেছে। কল্যাণকামী রাষ্ট্রের কোন বৈশিষ্ঠ্যই চোখে পড়ছে না আজ কাল! একটু ভেবে দেখেছেন গুলিটা কোথায় করছেন? এই রাষ্ট্রের কলিজায় বুলেটবিদ্ধ করছেন! সমস্ত সম্ভাবনা অঙ্কুরেই বিনষ্ট করার চেষ্টা করছেন!

একবার কখনো ভেবে দেখেছেন? এই সমস্ত কোমলমতি তরুনদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরন করছেন এটির তো দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। প্রাণহীন নিথর দেহ দিয়ে আগামীর বাংলাদেশ পরিচালনা করতে চান? তাই তো মনে হচ্ছে। কারন এই তরুনরাই আগামী দিনের এই দেশকে নেতৃত্ব দিবে। আমি এও বলছি তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আপনাদেরও কথা থাকতে পারে। কথাগুলো সেভাবেই বলুন। বুলেট তো সমাধানের পথ হতে পারে না।

আরো একটি ভয়াবহ রকমের বিদ্বেষ ছড়ানো বক্তব্য শুনলাম গতকাল। দেশে কি চলছে সব? সরকারের প্রভাবশালী এক মন্ত্রী গতকাল সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের আন্দোলনরত শিক্ষকদের যে ভাষায় আক্রমণ করলেন তাতে রীতিমত আঁতকে উঠতে হচ্ছে। এগুলো কিসের ইঙ্গিত বহন করছে? মাননীয় মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের শিক্ষকরাই যদি জ্ঞানের অভাবে ভোগেন তাহলে জাতি হিসেবে আমাদেরকে ‘অজ্ঞান’ বলতে আর কোন বাঁধা থাকছে না কারও!

এমন বক্তব্যই যদি সত্যি ধরতে হয় তাহলে তো এই রাষ্ট্রের ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে যাচ্ছে! মাননীয় মন্ত্রী, সব জ্ঞান কি শুধু ঐশ্বরিক ইঙ্গিতে আপনার মাথায় এনে জমা করা হয়েছে? তা না হলে এত বড় আহম্মকী মার্কা কথা কিভাবে বলতে পারেন? হ্যাঁ অস্বীকার করছি না অনেক অজ্ঞানই হয়তো অাজকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হচ্ছেন তা তো আপনাদের বদৌলতেই। আপনাদের আশির্বাদেই!

আর আপনাদের আশির্বাদপুষ্ট ‘অজ্ঞানদের’ সংখ্যাও হয়তো দিন দিন হয়তো বাড়ছে তার মানে এই নয় যে সবাই অজ্ঞান। বিশ্ববিদ‌্যালয়গুলোতে এখনো সত্যিকারের পাণ্ডিত্যের অধিকারি আর বিদ্বান শিক্ষ অনেক রয়েছেন। দুবেলা খেয়ে না খেয়ে শিক্ষার্থীদের পেছনে ব্যয় করছেন তাঁদের সমস্ত মেধা আর মনন। টাকার অভাবে যাঁরা সামজিক স্ট্যাটাসটা পর্যন্ত মেইনটেইন করতে পারেন না। তারপরও তাঁরা জ্ঞানের আলো ছড়িয়েই যা্চ্ছেন শুধুমাত্র বিবেকের তাড়নায়। একটি দায়বদ্ধতার জায়গা থকে।এমন শত শত শিক্ষক এখনো রয়েছেন যা আমার চেয়ে আপনারই বেশি ভালো জানার কথা। আপনি এসব জ্ঞানীদের খোঁজ খবর রাখেন? এমন ‘রাবিশ’ মার্কা কথাবার্তা ছাড়ুন। তাতে সবারই মঙ্গল হবে।

এম এ সাঈদ শুভ
লেখক ও অানইজীবী