ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
BCL brandish firearms

ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সাল। হাজার-হাজার সাধারন শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছিলো বর্ধিত ফি প্রত্যাহার ও বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বাতিলের দাবিতে। অন্যান্য দিনের মতোই ২ তারিখ সকাল থেকেই চলছিলো শান্তিপৃর্ন আন্দোলন। আন্দোলন শুরু হয়েছিলো জানুয়ারির ১৬ তারিখ থেকে। ওইদিন সকালেই গুঞ্জন শুনলাম পুলিশ, ছাত্রলীগ যৌথভাবে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হামলা চালাবে । বেলা বাড়ার সাথেই সাথেই গুঞ্জনের সব উপকরনের দেখা মিলতে শুরু করলো। বেলা সাড়ে ১২টা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ভবনের সামনে বাণিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বিরোধী বক্তব্য চলছিলো শিক্ষার্থীদের। একটু পরেই ছাত্রলীগের একটি মিছিল শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ সমাবেশ মাড়িয়ে ওপারে চলে গেল। আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী প্রগতিশীল ছাত্রজোট নেতারা শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহবান জানাচ্ছিলো বারবার।

10915176_839698492754638_1046440249099930627_n

ছাত্রলীগের মিছিল সমাবেশস্থল পার হতে না হতেই এরই মধ‌্যেই শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করে শুরু হলো ককটেল হামলা। ককটেলগুলো আসছে ছাত্রলীগের মিছিল থেকেই। প্রথম ককটেলটি সম্ভবত আমার মাথায়ই পড়ত যদি কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধান ঘটে যেত। তারপর শুরু হলো পুলিশের রাবার বুলেটের বৃষ্টি। পাখির মতো গুলিবিদ্ধ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীরা। তাদের কয়েকজনকে মেডিকেলে পাঠাতে ব্যতিব্যস্ত। এরই মধ্যেই একের পর এক ফোন আসা শুরু করলো আমার সহকর্মীদের। ছুটে গেলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে। সেখানে গিয়ে দেখি আমার সহকর্মীদের কয়েকজন রাবার বুলেট-বিদ্ধ। মাথায় রক্ত উঠে যাওয়র মতো অবস্থা! এলোমেলো উত্তেজিত ভাষায় জবাব চাইতে লাগলাম কর্তৃপক্ষের অনেকের কাছে। কারও কাছে কোন জবাব নেই। ছুটে চললাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কার্য়লয়ে। উপাচার্যের কার্যালয়ে উপস্থিত সবাই অগ্নিমূর্তি ধারন করে আছে। মেজাজটা আরও খারাপ হয়ে গালিগালাজ বের হতে শুরু করছিলো মুখ থেকে। উপাচার্য়ের কাছে জানতে চাইলাম কেন এতগুলো সাধারন শিক্ষার্থী আর সাংবাদিকদের উপর নির্বিচারে গুলি চালানো হলো? উত্তর পাই নি। আজও কোন উত্তর পাই নি। আবার আহতদের বিরুদ্ধেই উল্টো আবার মামলা করা হলো। এখনো মামলার ঘানি টানতে হচ্ছে তাদের। এর উত্তরও এখনো পাইনি।

সবচেয়ে দু:খজনক ঘটনা ছিলো এই রকম একটি মর্মান্তিক ঘটনার পরও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র আরও বাড়তে থাকলো। প্রশাসন ভবনের একজন বড় কর্তা ডেকে শাসানো শুরু করলেন আমাকে অন্যতম ইন্ধনদাতা হিসেবে আখ্যায়িত করে। আমিও একটুও ছাড় দিয়ে কথা বলেছিলাম বলে মনে পড়ে না! সবশেষে শাসিয়ে কাজ না হলে এবার মেকি অনুরোধ শুরু করলো এইভাবে যার মূল কথা হলো, ঘটনা যা ঘটেছে তা তো ঘটেই গেছে এখন এটাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতে হবে। এটি করতে যা যা প্রয়োজন তাঁরা সবকিছু দিতে প্রস্তুত। সেই প্রস্তাবের মুখে লাথি দিয়ে বের হয়ে এসে রিপোর্ট করতে বসলাম। চারদিকে ইতোমধ্যেই ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার আমেজ শুরু হয়ে গেছে। চ্যানেল আই সংবাদে বলতে শুরু করেছে ছাত্রলীগ-শিবিরের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে রাবিতে! কি আজব! আমরা (বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদ কর্মীরা) সবাই তো অবাক! ইতোমধ্যে কয়েকটি পত্রিকা অফিস থেকে এরকম গুঞ্জন-সংবাদ প্রচারের ব্যাপারে চাপ আসতে শুরু করেছে! বিভিন্ন কোয়ার্টার থেকে আমিসহ আমার সহকর্মীদের অনেককেই ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে প্রভাবিত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যেই সমস্ত তথ্য সরবারহ করে বিবিসি বাংলার আহরার ভাইয়ের কাছে একটি রিপোর্ট ফাইল করলাম। তারপর, দ্বিধাহীন কণ্ঠে ঐদিনের সত্য ঘটনাগুলো সংক্ষেপে বলার চেষ্টা করলাম। কোন ভনিতা না করে সরাসরি সেই সময়ের ছাত্রলীগ সভাপতির নেতৃত্বে হামলা হয়েছে বলে সরাসরি উচ্চারন করলাম। অবশ্য বর্তমান ছাত্রলীগের হাতেগোনা কয়েকজন নেতাকর্মী ছাড়া অনেকেই জানতই কি হতে যাচ্ছে ঐ দিন!

পরেরদিন প্রশাসন ভবনের উর্দ্ধতন কর্মকর্তারা জরুরীভিত্তিক আবারও ডেকে পাঠালেন আমাকে। আন্দোলনের ইন্ধনদাতা হিসেবে করে চিহ্নিত করে আমিসহ আমার আরও বেশ কয়েকজন সংবাদ কর্মীর বিরুদ্ধে মামলা করার হুমকি দিলেন। প্রশাসন-ছাত্রলীগ-পুলিশের পক্ষ থেকে টানা চললো একের পর এক হুমকি। রাগ-ক্ষোভ আরো বেড়ে গেলো। কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের বর্ননা দিয়ে টানা স্পেশাল রিপোর্ট চললো এক সপ্তাহ ধরে।

কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে ঐদিন রাতেই জরুরি সিন্ডিকেট ডেকে ক্যাম্পাস অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিলো। তারপর শুরু হলো আন্দোলনকারি শিক্ষার্থীদের উপর মামলা-হয়রানি যা এখনো চলছে। অনেক আশ্বাস দিয়েও এখনো প্রত্যাহার হয় নি শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মিথ্যা মামলাগুলো। আর যারা নির্বিচারে গুলি চালালো তাঁদের দেয়া হলো ফুলের মালা। মামলা তো দূরের কথা!

আমি আশির দশকের ছাত্র আন্দোলন দেখিনি তবে আমি ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ফি বৃদ্ধি ও বানিজ্যিক সান্ধ্যকোর্স বিরোধী আন্দোলন দেখেছি। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কিভাবে এত সুশৃংখল হতে পারে সরাসরি প্রত্যক্ষ না করলে বুঝতে পারতাম না। সাধারন শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে কিছু ছাত্র আর হাতে-গোনা কয়েকজন প্রগতিশীল ছাত্রজোটের ছাত্রনেতারা পুরো আন্দোলনকে যেভাবে নেতৃত্ব দিচ্ছিলো তা সত্যিই অসাধারন একটা ব্যাপার ছিলো। ধন্যবাদ রাবির তৎকালীন প্রগতিশীল ছাত্রনেতাদের।

11424_839680032756484_6959081656637344410_n

আজ ২ ফেব্রুয়ারি ২০১৬। এই মর্মান্তিক ঘটনার দুই বছর পূর্তি আজ। এখনো প্রত্যাহার হয়নি আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলাগুলো। আজ আবার জিজ্ঞেস করলাম ওই দিনের ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির আহবায়ক অধ্যাপক খালেকুজ্জামান এর কাছে। ঐ একই ভাষ্য বরাবর আগের মতই, “হামলাকারীদের সম্পর্কে কোন তথ্য-প্রমানাদি পাওয়া যায় নি। একজন প্রত্যক্ষদর্শীও পাওয়া যায়নি।” আমার বিশ্বাস আর কোন দিনও পাওয়া যাবে না এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের। এখন কথা হলো ঐ দিন কিছুই ঘটে নি! কারন তদন্তকারী কর্তৃপক্ষরা যা বলছে তাই সত্যি! যা মানুষ দেখেছে এবং শুনেছে সেগুলো আসলে মিডিয়ার অপপ্রচার ছাড়া কিছুই না! সুতরা-ওই দিন আসলে কিছুই হয় নি!! যাইহোক, অনেক বলে ফেললাম। আসলে ঐদিনের এক একটি মিনিট বর্ননা করতে এরকম দু-চার পেজ পার হয়ে যাবে!

10422265_839699069421247_8769242960940957319_n

সেই মর্মান্তিক ঘটনার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো-এত নিরীহ ছাত্র-ছাত্রী আহত হলো হাতে গোনা মাত্র ছয় জন শিক্ষক শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলো। প্রায় দেড়-হাজার শিক্ষকের মধ্যে অনেকেই গুলি করার পক্ষে আবার অনেকেই নীরব দর্শকের ভুমিকা পালন করেছেন। তারপর থেকেই সারা বাংলাদেশেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কটা একটা জঘন্য পর্যায়ে পৌঁছেছে যা এখনো স্বাভাবিক হয় নি। শিক্ষকদের বিরুদ্ধে ছাত্রদের যে ‘হেইট্রেড’ তৈরি হয়েছে সেটির একটি ভয়াবহ ফলাফল হয়তো আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হবে। ইতোমধ্যেই কিছু বিষয লক্ষ্যণীয় যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের মর্যাদা-বৃদ্ধির যৌক্তিক দাবির আন্দোলনটাকে ফালতু এবং অযৌক্তিক মনে করে এদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। এর কারনটা হতে পারে ঐ সময়ের জন্ম নেয়া হেইট্রেডগুলো যা অনেকই এখনো চিহ্ণিতই করতে পাচ্ছে না! এমনকি শিক্ষকদের প্রতি অপমানসূচক অনেক মন্তব্য করা হলেও এটার প্রতিবাদ কোন ছা্ত্র বা ছাত্র নেতারাও করেন নি! ব্যাপারগুলো বিস্তর চিন্তার দাবি রাখে।

এম. এ. সাঈদ শুভ
প্রতিবেদক, দ্য ডেইলী স্টার
ও সাবেক সভাপতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি

ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com