ক্যাটেগরিঃ গণমাধ্যম

 

১/১১ এর সেনাসমর্থিত তত্বাবধায়ক সরকার আমলের কিছু সংবাদ প্রকাশের ব্যাপারে ডেইলী স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের ’এডিটোরিয়াল জাজমেন্ট’ এর কিছু ভুল স্বীকারের পর দেশের মিডিয়া ও রাজনৈতিক অঙ্গন বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় মাহফুজ আনামের আটক দাবি করেছেন। তার পরপরই মঞ্চায়িত হতে শুরু করেছে একের পর এক নাটক! সংসদে ডেইলি স্টার বন্ধের ও মাহফুজ আনামকে গ্রেপ্তারের দাবি তুলেছেন সরকার দলীয় সাতজন সাংসদ। ইতোমধ্যেই ডজন খানেকের বেশি মানহানির মামলা হয়েছে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ এনেও একাধিক মামলা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে একটি মামলা তদন্ত করার অনুমতিও দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়।

এমতাবস্থায় দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমার মনে বেশ কিছু প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। সাংসদ তাহজীব আলম সিদ্দিকীও ঐ দিন সংসদে একটি প্রশ্ন তুলতে চেয়েছিলেন কিন্তু তার আগেই তাকে থামতে হয়েছিলো। তিনি এভাবে শুরু করেছিলেন–‘মাহফুজ আনামকে নিয়ে আমি কথা বলব না। কারণ, সেদিন ভয়ে অনেকে বিবেককে জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। আজকে এই সংসদে সদর্পে বসে আছেন যাঁরা, সেদিন যাঁরা বাধ্য হয়ে বিবেককে জলাঞ্জলি দিয়ে সত্যের অপলাপ করেছিলেন।’কিন্তু দু:খজনক হল্ওে সত্য যে যখন মাহফুজ আনামকে এক তরফা দোষারোপ করা হচ্ছিলো স্পীকার তথন কাউকে থামানোর প্রয়োজন মনে না করলেও সাংসদ তাহজীব আলমকে থামিয়ে দিয়েছিলেন কৌশলে। সংসদ সদস্য তাহজীব আলম সিদ্দিকী এইটুকু বলার পরই স্পিকার জানতে চান- সংসদ সদস্য কি বিষয়ে কথা বলতে চান। জনাব তাহজীব আলম পরিষ্কার শুদ্ধ বাংলায় কথা বলতেছিলেন। এমন না যে তিনি চাইনিজ বা হিব্রু ভাষায় কথা বলছিলেন যার বিষয়বস্তু বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো জনাব স্পীকারের। সাংসদ ঠিকই বুঝে নিয়েছিলেন স্পীকারের এমন ইঙ্গিতপূর্ন প্রশ্ন। বুঝতে পেরে সাথে সাথেই প্রসঙ্গ পাল্টে ফেলেছিলেন।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাহফুজ আনামকে যে কারনে অভিযুক্ত করা হচ্ছে সেটি হলো ডেইলী স্টার ও পত্রিকাটির সম্পাদক তৎকালীন মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের কাছে নতি স্বীকার করে সাংবাদিকতার নীতি নৈতিকতার জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। মোটা দাগে বলতে গেলে তাঁর বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ যেটি তা হলো-মাহফুজ আনাম আড়ালে থেকে মঈন-ফখরুদ্দিনের সরকারকে বিভিন্নভাবে সমর্থন জুগিয়েছেন এবং আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তারের পটভূমি রচনা করেছেন যেটি প্রধানমন্ত্রী পুত্র তাঁর ফেসবুক স্ট্যাটাসে বলার চেষ্টা করেছেন। জনাব সজীব ওয়াজেদের দাবির সারকথা হলো তাঁর মাকে জেল খাটতে হয়েছিলো মাহফুজ আনামের কারনেই। তিনি সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে আনতে চেয়েছিলেন! আরেকটি অভিযোগ হলো মাহফুজ আনাম উচ্চ রাজনৈতিক অভিলাষ থেকেই সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর সহযোগিতায় তাঁর পত্রিকা ডেইলী স্টারের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হনন করেছেন! মাইনাস টু ফর্মুলা বাস্তবায়ন করে তিনি রাজনীতির মাঠে নেতৃত্ব দিতে চেয়েছিলেন! সবচেয়ে বড় অভিযোগটা হলো ১/১১ প্রেক্ষাপট রচনা করেছেন মাহফুজ আনাম!

এসব অভিযোগসমুহের ভিত্তিতে আমার মনে অসংখ্য প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। কিন্তু সব প্রশ্নের অবতারনা করবো না। মোটা দাগে শুধু দুটি প্রশ্নের অবতারনা করেই শুরু করছি আমার এই লেখাটা:-
১. ২০০৭ সালের ১৫ মার্চ আমেরিকা চলে যাওয়ার সময় ঢাকা বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের কে বলেছিলেন, “আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার?” ২. ২০০৮ সালের ১৯ অক্টোবর কারা বলেছিলেন “আওযাামী লীগ ক্ষমতাযয় গেলে এ সরকারের (মঈন-ফখরুদ্দিনের তত্বাবধায়ক সরকার) সকল কর্মকান্ডের বৈধতা দেযা হবে?”

বর্তমান সময়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন দুটি প্রশ্ন। প্রশ্ন দুটির উত্তর প্রায় সকলেরই জানা। তারপরও এই প্রশ্ন দুটির উত্তর স্মরণ করিয়ে দিতে চাই আপনাদের। একদম সহজ উত্তর। অনেকেরই কানে বাজছে সেই উত্তর দুটি। ১৫ মার্চ ২০০৭-এ আমেরিকা যাওয়ার সময় ঢাকা এয়ারপোর্টে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “আমাদের আন্দোলনের ফসল এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তারা ফেল করলে আমাদের লজ্জা পেতে হবে। বিএনপি-জামায়াত আমাদের দোষারোপ করবে। আশা করবো, এ ধরনের পরিস্থিতি যেন না হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার তো মহাচোরদেরই ধরছে। এতে আমাদের ভীত এবং আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। দুশ্চিন্তার কী আছে? আমরা ক্ষমতায় গেলে তাদের এসব কার্যক্রম র‌্যাটিফাই করে দেবো। দেশের মানুষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কার্যক্রমের প্রশংসা করছে। এ সুন্দর পরিবেশ থাকতেই নির্বাচন সম্পন্ন করা উচিত। সভা থাকতেই কীর্তন শেষ করতে হবে। (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৬ মার্চ ২০০৭)

আচ্ছা মানলাম অগনতান্ত্রিক সেনা-সমর্থিত সরকারে চাপে পড়ে এমনটা বলেছিলেন। কিন্তু মঈন-ফখরুদ্দিনের সরকারের শেষ সময়ে নির্বচনের মাস দেড়েক আগে ২০০৮ সালের ১৯ অক্টোবর আওয়ামীলীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আবার বললেন- “আওযামী লীগ ক্ষমতায় গেলে এ সরকারের (মঈন-ফখরুদ্দিনের তত্বাবধায়ক সরকার) সকল কর্মকান্ডের বৈধতা দেয়া হবে?” (দৈনিক ইত্তেফাক, ১৯ অক্টোবর ২০০৮) এরপর ৯ নভেম্বর ২০০৮ দলের সাধারন সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আনুষ্ঠানিকভাবে বললেন তাঁরা ক্ষমতায় গেলে এই সরকারের সস্ত কিছুর বৈধতা দিবেন। (১০ নভেম্বর ২০০৮) কথা রেখেছে আওয়ামিলীগ। সমস্ত কিছুর বৈধতা দিয়েছে, মূলহোতাদের নিরাপদ আশ্রয়ে আমেরিকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আবার অনেক কুশীলবদের কাউকে কাউকে রাষ্ট্রদূতও বানিয়েছিলেন ক্ষমতায় এসেই। তাহলে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে আনিত অভিযোগের সত্যতা প্ওায়া যাচ্ছে? আপনারা এক-এগারোর সরকারকে সমর্থন জানালেন, বৈধতা দিলেন, কুশীলবদের রাষ্ট্রদূত বানালেন আর সমস্ত দোষ মাহফুজ আনামের!

এখন যেসমস্ত অভিযোগগুলো এই দুটি উত্তরে কাভার করছে না সেগুলোর দিকে একটু নজর দেয়া যাক। মাহফুজ আনামই যদি ১/১১ এর সরকারের পটভুমি রচনা করেছিলেন তাহলে ২০০৭ সালের ২৮ অক্টোবর এক পক্ষ লগি-বৈঠা আর এক পক্ষ বোমা-পিস্তল নিয়ে হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠেছিলেন কারা? রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে বলেছিলেন মাহফুজ আনাম? বিএনপিকে বলেছিলেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়িয়ে দিতে যাতে তিনি তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হতে পারেন? শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে তাঁকে অস্বীকার করতে? এসব উত্তরই আপনাদের জানা। মাহফুজ আনাম যদি শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারে খুশিই হইতেন তাহলে এর প্রতিবাদে ২০০৭ সালের ১৭ জুলাই লিখতেন না ’দিজ ইজ নো ওয়ে টু স্ট্রেনথেন ডেমোক্রেসি’। শেখ হাসিনার গ্রেপ্তারকে বলেছিলেন এটা স্বেচ্ছাচারীতা এবং ক্ষমতার সর্বোচ্চ অপব্যবহার।

মাহফুজ আনাম সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে প্রবেশ করানোর পটভুমি রচনা করেছিলেন? উত্তরের জন্য একটু চোখ বুলিয়ে নিন ২০০৭ সালের ১৭ জুলাইয়ের মন্তব্য প্রতিবেদনটিতে। মাহফুজ আনাম বলেছিলেন, ” সেনাবাহিনী নতুন দল গঠন করে রাজনীতিতে যুক্ত হবে না, আমরা সেনাবাহিনী প্রধানের এই কথা বিশ্বাস করি। কিন্তু আমরা যখন আমাদের প্রতিনিধিদের প্রতিবেদন দেখি যে, জেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা ’তথাকথিত কিøন ইমেজের’ রাজনীতিবীদদের তালিকা তৈরি করে তথাকথিত নতুন ’কিংস পার্টিতে’ যোগ দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। আবার যখন আওয়ামীলীগ-বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতারাই আমাদেরকে বলেন যে তাঁদেরকে চাপ প্রয়োগ করে বলা হচ্ছে হয় কিংস পার্টিতে যোগ দিতে হবে নতুবা দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হতে হবে?’ সুতরাং আমরা স্ট্রংলি পরামর্শ দিতে চাই যে এটা গনতন্ত্রকে শক্তিশালী করার কোন পথ নয়। গনতন্ত্রের মূলমন্ত্র হলো জনগনকেই তাদের নেতা নির্বাচনের অধিকার দিতে হবে।” বাংলাদেশের কয়জন নীতিননৈতিকতাবান সাংবাদিক বা সম্পাদক এই ভাষায় কথা বলেছিলো। এটা মাহফুজ আনামই বলেছিলেন।

২০০৭ সালের ৬ এপ্রিল সেনাপ্রধান মঈন-ঊ- আহমেদ এর রাজনৈতিক উচ্চাভিলাসের বিরুদ্ধে মনÍব্য প্রতিবেদন মাহফুজ আনামই লিখেছিলেন। আমরা আশা করি সেনাবাহিনী কখনই রাজনীতিতে যুক্ত হবে না এবং দ্রুত ব্যারাকে ফিরে যাবে। এমন আহবান তাঁর অনেক লেখাতেই ছিলো। তাহলে আর কি? মাহফুজ আনামের দোষ তিনি রাজনৈতিক সংস্কার চেয়েছিলেন। এটি সত্য। রাজনৈতিক সংস্কার তো আওয়ামীলীগ প্রধান ্ও বিএনপি প্রধানও চেয়েছিলেন। তার প্রমান ২০০৭ সালের ১৭ জুন ডেইলী স্টারে প্রকাশিত শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার এবং ১৯ জুন ২০০৭ এ খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎকার। সাক্ষাতকারে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, তিনি নিজেই দলের নেতাদের চেয়ে বেশি সংস্কার চান যার শিরোনাম ছিলো-”হাসিনা ওয়ান্টস রিফর্মস ডিপার দ্যান হার পার্টি লিডার্স’। আর খালেদা জিয়াও যেকোন সংস্কার প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছিলেন যার শিরোনাম ছিলো খালেদা ওয়েলকামস রিফর্ম প্রপোজালস’। তাহলে মাহফুজ আনাম যদি রাজনৈতিক সংস্কার চেয়ে থাকেন তাহলে তিনি কি খুব বেশি অন্যায় করেছিলেন? বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষের প্রাণের দাবি রাজনৈতিক সংস্কার। এখনো সে দাবির তাৎপর্য শেষ হয়ে যায় নাই। গনতন্ত্রের পক্ষে মাহফুজ আনামের কলম ছিলেন সদা জাগ্রত।

এখন ব্যপারটি এমন দাঁড়ালো যে এসব অভিযোগ কখনো উত্থাপিত হতো না যদি না মাহফুজ আনাম বিষয়টি নিয়ে ভুল স্বীকার না করতেন! মাহফুজ আনাম সাংবাদিকতার ইতিহাসে নতুন একটি মাত্রা যোগ করেছেন যেটি বহুল প্রশংসার দাবিদার ছিলো কিন্তু তা হয় নি। ডিজিএফআইয়ের দেওয়া লিখিত তথ্য বা অডিও সিডির ট্রান্সক্রিপ্ট প্রকাশের কথা স্বীকার করার মধ্য দিয়ে মৌলিক আরও কিছু প্রশ্ন জন্ম দিয়েছে। প্রথমত, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা তার এখতিয়ারের বাইরে গিয়ে কাজ করেছেন, দ্বিতীয়ত তখন রাজনীতিবিদের চরিত্র হননের চেষ্টা হয়েছে, তৃতীয়ত তারা যেসব অডিও সিডি দিয়েছে তাতে রাজনীতিবিদদের স্বকণ্ঠে দেওয়া জবানবন্দি ছিল। যারা আজ সংসদে মাহফুজ আনামের বিচার দাবি করছেন সেই রাজনীতিবিদরা জবানবন্দিতে হয় সত্য বলেছেন, নয় তারা টিএফআই সেলের চাপে মিথ্যা বলতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু সত্যটা হলো তারা বলেছেন। আর গণমাধ্যম সেটা শুনে রিপোর্ট করেছে। চতুর্থত, ইউটিউবে এখনো সেসব অডিও পাওয়া যায়। পঞ্চমত, রাজনীতিবিদরা এখনো বলেনি তারা টিএফআই সেলে কোনও জবানবন্দি দেননি অথবা তারা চাপ সইতে পারেননি।

অথবা প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং কেন এমন কথা বলেছিলেন ? তাদের সমস্ত কুকর্মেও বৈধতা দিতে চাইলেন কেন? ভয়ে না লোভে পড়ে? যেকোন একটি তো অবশ্যই। তাই যদি হয়, সাংবাদিকরা চাপ সইবেন বা ভয় পাবেন না এমনটি আশা করা কি খুব বেশি যৌক্তিক? আলাদা করে ভেরিফাই না করে সংবাদ প্রকাশ অবশ্যই দুর্বল শ্রেণীর সাংবাদিকতা। কিন্তু এত বিতর্কের পরও কি এই পথ পরিহার হবে? আজকাল অহরহ ক্রসফায়ারের গল্প ছাপানো হয়। পুলিশ-র্যাবের কাছে দেওয়া জবানবন্দি ছাপানো হয়। এগুলো কি উৎকৃষ্ট মানের সাংবাদিকতা?

আর ওই সময়ের সংবাদপত্রের বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের ডিজিএফআইয়ের সরবরাহ করা খবর দেশের প্রায় সব গণমাধ্যম রীতিমত প্রতিযোগিতা করে প্রকাশ করেছে। কেউ ভয়ে ছেপেছে, কেউ অতি উৎসাহে ছেপেছে। সময়টা কিন্তু ছিল জরুরি অবস্থা। মুক্ত সাংবাদিকতার সুযোগ ছিল না। জরুর বিধিমালায় বলা ছিল, সরকারবিরোধী যেকোনও তথ্য, সংবাদ, সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, টকশো, আলোচনা ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে। সরকার চাইলে যেকোনও বই-পুস্তক সংবাদপত্র বা টেলিভিশন চ্যানেল বন্ধও করে দিতে পারবে। সরকার ওই ধারা ব্যবহারও করেছে।

এখন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও মুক্ত কী ধরনের সাংবাদিকতা আমরা করছি? যেসব রিপোর্ট প্রকাশের দায়ে আজ মাহফুজ আনামের দিকে তীর ছোড়া হচ্ছে সেই ধরনের রিপোর্ট আমরা এখনো গণমাধ্যমে দেখি। ‘সূত্র জানায়’ বলে বিভিন্ন সংবাদপত্রে বিভিন্ন ধরনের সংবাদ প্রকাশ হচ্ছে। বিশেষ করে কাউকে আটক করা হলে রিমান্ডে তিনি কী কী বলছেন তার সবই ‘সূত্র জানায়’ বলে উল্লেখ করা হয়। তেমনি টিএফআই সেলে কে কী বললেন না-বললেন সেটিও সূত্র জানায় বলে প্রচার করা হয়। তেমনি রাজনীতিবিদরা টিএফআই সেলে কে কী বলেছেন সেটির অডিও সিডি শুনে গণমাধ্যম রিপোর্ট করেছে। আমি বলছি না যে ডিজিএফআই’র দেওয়া তথ্য যাচাই না করে প্রকাশ করা সঠিক হয়েছে। সেটা সাংবাদিকতার নীতি বিরুদ্ধে কাজই হয়েছে। কোন পরিস্থিতিতে রাজনীতিবিদরা ওই জবানবন্দি দিয়েছেন সেটাও সহজে অনুমেয়। আমি বলছি এই চর্চা আগেও ছিল, এখনো চলছে। যেমন কিছুদিন আগে মাহমুদুর রহমান মান্না আর সাদেক হোসেন খোকার টেলিসংলাপ শুনে রিপোর্ট করা হয়েছে। টিভিগুলো ওই সংলাপ প্রচার করেছে। ওই সংলাপ কোনও মিডিয়া কি গোপনে রেকর্ড করেছে? যারা ওই সব ট্রান্সক্রিপ্ট ছেপেছেন তারা কি সূত্রের কথা উল্লেখ করেছিলেন?

তবে মাহফুজ আনাম একমাত্র সম্পাদক যিনি একাধিক লেখা লিখেছেন তাঁর মন্তব্য প্রতিবেদনে র্যাব-পুলিশের এসব অসমর্থিত সূত্রের বিরুদ্ধে। তিনি একটি লেখায় বলার চেষ্টা করেছিলেন এভাবে যে, ” ক্রসফায়ারের পর গনমাধ্যমে যে প্রেস বিজ্ঞপ্তি পাঠানো হয় সেটি অনেকটা মুখস্ত একটা প্রেস রিলিজ (আগে থেকে সাজানো) যেখানে আগেরটা থেকে শুধুমাত্র নাম, ঘটনার স্থান এগুলো পরিবর্তন করা হয়। আমরা এমন অভিযানের গল্প শুনে আশ্চর্য হয়ে যাই যেখানে গোলাগুলি শুরু হয়ে যায় আর শুধুমাত্র আটককৃত ’লোকটাই’ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। অথচ ব্যাপক গোলাগুলিতে র্যাব-পুলিশের কিছুই হয় না (যদিও আমরা প্রত্যাশা করি না) ” চলছে এসস্ত গল্প বছরের পর বছর। আর মিডিয়া জোর করে গেলাচ্ছে জনসাধারনদের। এট নীতি বিরুদ্ধ না?

আট বছর পর মাহফুজ আনাম স্বীকার করে নিয়েছেন যে তিনি ওই রকম কিছু রিপোর্ট প্রকাশ করে ভুল করেছেন। এখন সংসদে তার বিচার দাবি করা হচ্ছে। বিচার্য বিষয় হতে পারতো কারা রাজনীতিবিদদের বিনা মামলায় ধরে নিয়ে গিয়েছিল, জোর করে কেন স্বীকারোক্তি আদায় করেছিল আর সেই স্বীকারোক্তি ছাপতে সাংবাদিকরা কেনইবা বাধ্য হয়েছিল? বোধ হয়, এই সংসদে এ বিষয়ে কোনওদিন আলোচনাও হবে না। (বাংল ট্রিবিউন ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৬)

মজার ব্যাপার হচ্ছে, যে ঘটনাগুলো প্রকাশের জন্য ডেইলি স্টার বন্ধের দাবি তোলা হচ্ছে- সেই ঘটনাগুলো কিভাবে তৈরি হলো তা নিয়ে কিন্তু কেউ কথা বলছেন না। ডেইলি স্টার নিজেরা মিথ্যা কোনো প্রতিবেদন প্রকাশ করেনি। তারা ডিজিএফআইর পাঠানো প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলো মাত্র। যেটি সেই সময় প্রায় সবকটি পত্রিকাই প্রকাশ করেছে। আর ডিজিএফআইর পাঠানো প্রতিবেদনগুলো ছিলো মূলত: আওয়ামী লীগের নেতাদের জবানবন্দি। এমপি সাহেবরা সংসদে ডেইলি স্টারের শাস্তি দাবি করলেও যারা মিথ্যা জবানবন্দি দিয়েছেন কিংবা মিথ্যা জবানবন্দি দিতে বাধ্য করেছিলেন- তাদের ব্যাপারে টুঁ শব্দটিও করছেন না। ২০১১ সালে সংসদীয় কমিটি মঈন-ফখরুদ্দিনের শাস্তি চেয়ে সুপারিশ করেছিলো। কিন্তু সেই সুপারিশ কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? এসব প্রশ্নের উত্তর কি আপনাদের জানা আছে?

আসলে একটি দেশে গণতন্ত্রের ভিত্তি কতোটা মজবুত তা সেই দেশের গণমাধ্যমের অবস্থান থেকে পরিমাপ করা যায়। যে দেশের গণতন্ত্র যতো মজবুত সেই দেশে গণমাধ্যমও ততোটাই শক্তিশালী। স্বৈরশাসকেরা কখনো গণমাধ্যমকে শক্তিশালী হিসেবে দেখতে চায় না। অগণতান্ত্রিক শাসনামলে স্বাধীন এবং শক্তিশালী মিডিয়া নানাভাবে হয়রানির শিকার হয়, আর দুর্বল, বশংবদ মিডিয়া রাষ্ট্রের তথা সরকারের অনুকূল্য পায়। আশংকার কথা, বাংলাদেশেও এখন শক্তিশালী মিডিয়াগুলো সরকার এবং সরকার সমর্থকদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে।এটা সত্য যে, মাহফুজ আনামের ভুল স্বীকারের মধ্য দিয়ে ১/১১ আবারো আলোচনায় উঠে এসেছে। আশা করি আরো অনেক কিছুই বের হবে।

সেই সময় কার কী ভূমিকা ছিলো, রাজনীতিকদের কী ভূমিকা ছিলো, আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতারা কেনো দলীয় নেত্রীর বিরুদ্ধে এমন অপবাদ তুলে জবানবন্দি দিলেন, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাই বা কেনো সেগুলো মিডিয়ায় পাঠিয়ে তা প্রকাশে বাধ্য করলো- এসব কিছুইতো পর্যালোচনা হওয়া দরকার। যেই এমপিরা সংসদে ডেইলি স্টার নিয়ে সোচ্চার হয়েছেন, তারা কি এগুলো নিয়েও প্রশ্ন তোলার সাহস রাখেন? সম্ভবত রাখেন না। ১/১১ নিয়ে নতুন বিতর্কে সরকারের, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অবস্থানটাও বোধ হয় পরিষ্কার হওয়া দরকার। জাতীয় সংসদে একটি পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ার দাবি তোলা হলে- সরকারের চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি হয়। সামগ্রিকভাবে অন্যান্য মিডিয়ার জন্যও আতংকজনক পরিস্থিতি তৈরি করে।

আবারো উল্লেখ করছি মাহফুজ আনাম জরুরী অবস্থার দুই বছরে যে দুই শতাধিক সম্পাদকীয় লিখেছেন একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের লক্ষ্যে, গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার পক্ষে। সেটি কি বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে? তিনি দিনের পর দিন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে চলেছেন, আন্তর্জাতিকভাবে জনমহ গঠনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে এগিয়ে নিতে নিরন্তর লিখে যাচ্ছেন, সুশাসনের কথা বলছেন, আমরা তার সামগ্রিকভাবে বিচার করবো নাকি দু-চারটি রিপোর্ট প্রকাশের দায়ে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো? মাহফুজ আনাম যা ছেপেছিলেন, ওই একই রিপোর্ট ছেপেছেন এমন একজন সম্পাদকও আছেন মন্ত্রিসভায়। অমন সম্পাদকদের অন্তত দুজনকে এই সরকার একুশে পদকও দিয়েছে। তাহলে শুধুমাত্র মাহফুজ আনামকেই কেন টার্গেট করা হচ্ছে? অন্যরা সবাই বশে আছে তাই! এখন যেকোনভাবেই হোক মাহফুজ আনামকে বশে আনতে হবে।

আর একটা কথা, ডেইলি স্টার- মাহফুজ আনাম আক্রান্ত হয়েছেন- এই ভেবে যে স্বঘোষিত প্রভাবশালী সাংবাদিক এবং সম্পাদকরা তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন, তারা বোধ হয় নিজেদের বিপদটা আঁচ করতে পারছেন না। ডেইলি স্টার শক্তিশালী একটি মিডিয়া, শক্তিশালী মিডিয়া আক্রান্ত হলে, সেই আক্রমণ কোনো ধরনের প্রতিরোধ বা প্রতিবাদের মুখোমুখি না হলে অপেক্ষাকৃত দুর্বল মিডিয়াগুলোতে নিমিষেই নাই হয়ে যাবে। এদেশের অধিকাংশ মানুষের কাছেই এটা পরিষ্কার যে, ডেইলি স্টার আর মাহফুজ আনামকে নিয়ে যে নোংরা রাজনীতি শুরু হয়েছে তা এখনই অবসান হওয়া দরকার। কিন্তু খুব শীঘ্রই এটির অবসান হবে বলে তো মনে হয় না।

এটা স্পষ্ট যে মাহফুজ আনাম আর ডেইলী স্টারকে বশে আনতে যে পরিমান চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে এটি নজিরবিহীন। স্বৈরতান্ত্রিক শাসনামলে এমনটা ঘটেছে কিন্তু এটার তীব্রতা এতটা ছিলো কি না তাতে সন্দেহ আছে। সবচেয়ে আশ্চর্যেও বিষয় হলো একটি শক্তিশালী গনমাধ্যমের উপর যেভাবে হামলে পড়েছে সরকারদলীয় সমর্থক লোকজন তা বস্তুতপক্ষে দলের ও সরকারের উচ্চ মহলের ইশারায় বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে। কিন্তু এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত গনমাধ্যম সংশ্লিষ্ট প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে তেমন কোন প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি এ্যালার্মিং বলে মনে হচ্ছে। হয়রানির ধরন দেখে বুঝা যাচ্ছে হুট করে পত্রিকাটির সম্পাদক বা পত্রিকা সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত সরকার নিবে না তবে ধীওে ধীরে এই সম্পাদকের এবং পত্রিকার সাংবাদিকদের মনোবল ভেঙ্গে দিয়ে স্বাধীন সাংবাদিকতা থেকে দুরে ঠেলে দিয়ে সরকারের বশে রাখবে। এক ধরনের মানসিক চাপই এখানে মূখ্য বলে মনে হচ্ছে। কারনটা হলো যেভাবে মানহানির মামালা শুরু হয়েছে–তাতে হাজিরা দিতে দিতেই অবস্থা বেশ শোচনীয় হবে এতে কোন সন্দেহ নেই।

এ সমস্ত ঘটনায় আরো একটা বিষয় স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে যেখানে বিচার বিভাগের একটা চিত্র ফুটে উঠছে। যেখানে মানহানির মামলার ক্ষেত্রে যার মানহানি হয় তাকেই মানহানির মামলা করতে হয়। প্রথমত মাহ্ফুজ আনামের বিরুদ্ধে যে মানহানির মামলা হয়েছে, তা আইনগতভাবেই ভিত্তিহীন। তবুও আদালত আমলে নিয়ে হাজিরার আদেশ দিচ্ছে। আর মাহ্ফুজ আনামের পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন কীভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ হয়েছে, সেটাই বোঝা মুশকিল। এগুলো আসলে কাল্পনিক অভিযোগ। এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই। অতএব সম্পূর্ণ হয়রানিমূলকভাবে ও প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে এসব মামলা করা হচ্ছে। এর পেছনে রাজনীতি রয়েছে। এগুলো বাকস্বাধীনতা সীমিত করার চেষ্টা হীন ছাড়া আর কিছুই না।

দন্ডবিধির ১২৪/ক ধারায় বলা আছে, আইনসংগতভাবে স্থাপিত কোনো সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, ঘৃণা ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এক-এগারোর পরের সরকারের আমলের ঘটনা নিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার মামলা হয়েছে। মাহ্ফুজ আনাম কি ওই সরকারের বিরুদ্ধে লিখেছিলেন বা বলেছেন? ওই সময় তো শেখ হাসিনার সরকার ছিল না। সুতরাং রাষ্ট্রদ্রোহিতা কিভাবে হয় এটা বোধগম্য নয়। একদিনেই মোট ১৩ টা মামলা করা হয়েছে। আরো কতগুলো হবে তা কে জানে? এসমস্ত ঘটনা মোটেই সুখকর নয়। এমন ন্যক্কারজনক ঘটনা দেখেও যদি গনমাধ্যম সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ চুপচাপ বসে থাকে তাহলে ‘গনমাধ্যমের স্বাধীনতা’ শব্দটি কাগুজে বাঘে পরিনত হতে খুব বেশি সময় লাগবে বলে মনে হয় না। পরিস্থিতি দেখে এটুকুই বলতে চাই সরকার আর সরকার সমর্থিত লোকজনের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক।

তবে এসব থেকে আরেকটা বিষয় স্পষ্ট প্রতীয়মান হচ্ছে, তা হলো এ সমস্ত ঘটনা যে মাহফুজ আনাম আর তাঁর পত্রিকাকে আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা এবং পাঠক হৃদয়ে ভালবাসা তৈরী করে দিচ্ছে এতে কোন সন্দেহ নাই। এজন্য সম্পাদক মাহফুজ আনামের অবশ্যই ’কৃতজ্ঞতা প্রকাশ’ করা উচিৎ এসমস্ত অভিযোগকারীদের প্রতি। যদিও কখনো ’কর্তৃত্বপরায়ন’ এই সরকাররে রোষানলে পড়ে ডেইলী স্টার বন্ধ হয়ে যায় অথবা সম্পাদক মাহফুজ আনামকে বন্দীও হতে হয় (যদিও এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীন) তব্ওু এদেশের মানুষের মনে এবং স্বাধীন সাংবাদিকতার ইতিহাসে মাহফুজ ও ডেইলী স্টার চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস। জয় হোক বাক-স্বাধীনতার, জয় হোক মুক্ত গনমাধ্যমের এবং জয় হোক মানবতার।

Relevant Links—

  1. www.thedailystar.net/frontpage/no-way-strengthen-democracy-214285
  2. http://www.thedailystar.net/frontpage/gen-moeen-goes-public-politics-419149
  3. http://www.thedailystar.net/frontpage/read-you-react-418471
  4. http://www.thedailystar.net/frontpage/anamosity-511279
  5. http://www.banglatribune.com/columns/opinion/77667

 

এম.এ. সাঈদ শুভ
আইনজীবী ও লেখক
ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com

www.facebook.com/sayeed.shuvo.90