ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

  •  “আমার ছাত্রদের রক্তের দাগ আমার গায়েও লেগেছে, সেজন্য আমি গর্বিত”—শহীদ ড. শামসুজ্জোহা’।
  • “কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে আমার গায়ে যেন গুলি লাগে”—শহীদ ড. শামসুজ্জোহা’।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রতীক। এটি জ্ঞানের, গবেষণার এবং আলোর প্রতীক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রত্যয়টিও একটি প্রতীক। সেই প্রতীকটি জ্ঞানচর্চা-গবেষণা-আলোর ধারকের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীদের পরম আশ্রয়েরও বটে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিক্ষকদের আচরন দেখে এটি মানতে কষ্ট হচ্ছে যে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পরম আশ্রয়স্থল। গত ১৪-১৬ ফেব্রুয়ারীতে অধ্যাপক ড. জোহা যে ক্যাম্পাসে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন খোদ সেই ক্যাম্পাসের আইন বিভাগের শিক্ষকদের দ্বারা শিক্ষার্থীদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরন সত্যিই হতাশাজনক। এখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের দোহায় দিয়ে প্রায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে না দেয়া আইনত সঠিক হলেও এটি অমানবিক। শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাদের ক্লাসে উপস্থিতি ৬০ শতাংশের কম। এ্ই জন্য প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শতাধিক শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহন করতে পারে নি। শিক্ষার্থীরা পিতৃতুল্য শিক্ষকদের কাছে হাত জোড় করে, পা ধরে ক্ষমা চেয়েছেন কিন্তু অভিভাবকতুল্য এই শিক্ষকেরা ক্ষমা করে দেন নি এই কোমল মতি শিক্ষার্থীদের। তারা তিন দিন তিন রাত অনশন করেছে কোন শিক্ষকই তাদের চাওয়ার প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ দেখান নি। মানলাম এই শিক্ষার্থীরা অন্যায় করেছে, রেগুলার ক্লাস করে নি। কিন্তু তারা ক্ষমা চেয়েছে। আর কখনো এমন ভুল হবে না এমন প্রতিশ্রুতিও দিযেছে। কিন্তু শিক্ষকদের মন গলে নি। এত গুলো শিক্ষার্থীর জীবন থেকে এক বছর করে শতাধিক বছর কেড়ে নেয়া হলো। প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের সূত্রে যতদূর জানতে পারলাম তা হলো মোট ৭ টি কোর্সের মধ্যে ২ টি কোর্সে তাদের উপস্থিতি একদমই নগন্য। অন্য কোর্স গুলোতে উপস্থিতি স্বাভাবিক। তাহলে এখানে প্রশ্নটি কি প্রাসঙ্গিক নয় কেন তারা ঐ ২টি ক্লাস করেনি বিভাগীয় কর্তৃপক্ষ কি কখনো জানার চেষ্টা করেছেন কেন এই শিক্ষার্থীদের ২টি ক্লাসে উপস্থিতি এত কম? খুব সম্ভবত জানার চেষ্টা করেন নি অথবা জেনে না জানার ভান করে শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই বিভাগের একজন সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে আমার কিছু পর্যবেক্ষন দেয়ার প্রয়োজন অনুভব করছি। এই বিভাগের সদ্য সাবেক যার কারনে পর্যবেক্ষনগুলো হয়ত খুব বেশি অপ্রাসঙ্গিক হবে এমনটা আশা করছি না। আরেকটু বলে রাখা ভালো যে আমি বিভাগের মোটামুটি রেগুলার একজন ছাত্র ছিলাম বলেই আমার ধারনা। ৫ বছরের গড় হিসেব করলে ৮০-৮৫ শতাংশ ক্লাসে উপস্থিত থেকেছি বলে আমার বিশ্বাস। আর ছাত্র হিসেবে খুব ভাল না হলেও খুব খারাপ ছিলাম এটা বলারও মনে হয় কোন অবকাশ নেই। কারন সে সার্টিফিকেট বিভাগ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ই দিয়েছে। অনার্স-মাস্টার্স এ সর্বোচ্চ ফলাফল না করতে পারলেও শীর্ষ কয়েকজনের মধ্যেই ছিলাম সেটি আমার মার্কসিট আর সার্টিফিকেটই বলছে। অনেকের মনে হতে পারে যে ড. জোহা স্যার আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে লিখতে বসে আমি নিজের ঢোল পেটানো শুরু করেছি! হয়তো হ্যাঁ আবার হয়তো না। বলাটা এই কারনে জরুরী মনে করেছি যে আমি বিভাগের পরীক্ষা বঞ্চিত শিক্ষার্থীদের পক্ষাবম্বন করে কিছু লিখেছিলাম বলে বিভাগের দু’একজন সাবেক ছাত্র কোন রকম বাছবিচার না করে বা আমাকে না জেনেই ক্লাস ফাঁকি দেয়া ছাত্র এবং ফলাফলে একজন দুর্বল প্রকৃতির ছাত্র হিসেবে আখ্যা দেয়ার চেষ্টা করেছেন। যার কারনে এটি খুব বেশি প্রাসঙ্গিক না হলেও এখানে উল্লেখ করে রাখলাম নিজেের ডিফেন্সের জন্য। আর একটি কথা বলে রাখা ভালো যে মাস্টার্স-এ আমার একটি কোর্সে শতভাগ উপস্থিতি ছিলো। এছাড়াও আমি পড়াশুনার পাশাপাশি ইংরেজী দৈনিক দ্য ডেইলী স্টারের প্রতিবেদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি এবং রাজশাহী বিশ্বিবিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি-রাবিসাস এর সাধারন সম্পাদক এবং পরবর্তীতে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি। এত কিছু বলার মানে হলো আমি আপনাদের বুঝানোর চেষ্টা করছি এখানে আমার পর্যবেক্ষন দেয়ার যথেষ্ট কারন ও যোগ্যতা রয়েছে। অন্যদের নাই এমনটি বলছিনা। অন্য সকলেরই রয়েছি। কিছু সমালোচকদের জবাবে এমন ঠুনকো কিছু বিষয় লিখতে হলো যা খুব বেশি প্রাসঙ্গিক নয় বলে মনে করি তবুও লিখলাম। তারপরও কারও খুব খারাপ লাগলে অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।।
যাইহোক এবার মূল প্রসঙ্গে আসি। যদি ৫-১০ জন শিক্ষার্থী ডিসকলেজিয়েট বা প্রয়োজনীয় সংখ্যক ক্লাস উপস্থিতি না নিয়ে পরীক্ষায় বসতে না পারতো তাহলে বুঝতাম সেটি ঐ শিক্ষার্থীদের ব্যর্থতা। কিন্তু প্রায় পঞ্চাশ শতাংশ শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে যা ঘটলো সেটি বিশ্বাস করা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে শিক্ষার্থীরা ভর্তি হয় তাদের মেধার যোগ্যতার প্রমান দিয়েই ভর্তি হতে হয়। যোগ্যতার প্রমান দিয়ে ভর্তি হয়ে হঠাৎ এত খারাপ অবস্থা হলো এই শিক্ষার্থীদের! যদি এরা নষ্ট হয়েও থাকে এর দায় কি শিক্ষকদের উপর বর্তায় না? এই বিভাগে অনেক স্কলার শিক্ষক রয়েছেন যাদের যোগ্যতা নিয়ে কোন প্রশ্ন নেই। তবে এটিও সত্যি এই বিভাগে এমন দু-এমন শিক্ষকও রয়েছেন যাঁদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুললে খুব বেশি অযৌক্তিক হবে বলে মনে করি না। আমি সম্মানিত শিক্ষকদের প্রতি যথেষ্ট সম্মান প্রদর্শন পূর্বক দায়িত্ব নিয়ে বলছি এই বিভাগে এমন দু-একজন শিক্ষকও রয়েছেন যাঁদের পাঁচ মিনিটের বেশি ক্লাস নেয়ার সামর্থ্য নেই। যাঁরা ক্লাসে এসে ঐ দেখা য়ায় হাইকোর্ট…ঐ খানে তোমরা যেও না…. টাইপ কথাবার্তা বলে ক্লাস শেষ করে চলে যেতেন। এমন একজন শিক্ষকের ক্লাসে আমি আবেগের বশবর্তী হয়ে বলেই ফেলেছিলাম, “স্যার এই তথ্য-প্রযুক্তি আর বিজ্ঞানের প্রসারের যুগে এসব আবোল-তাবোল মার্কা বয়ান দিয়ে ছা্ত্রদের কোন উপকার হবে না। এসব বয়ান ছাড়ুন।” এটি বলে বিরাট অন্যায় করেছিলাম সেটি ছাত্র অবস্থায়ই বুঝতে পেরেছিলাম। যাইহোক, আসলে এটি অন্যায়ই করেছিলাম। হাজারো হলেও শিক্ষাগুরু! এভাবে বলা মোটেই ঠিক হয় নি। তবে এটির জন্য ঐ সময় ক্ষমা চাই নি বা চাওয়ার প্রয়োজনও মনে করি নি। তবে আজ ক্ষমা চাচ্ছি। ক্ষমা করবেন স্যার। আর এমন ভাষায় লেখার জন্য অগ্রীম ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি সম্মানতি শিক্ষকদের কাছে। তবে কারো এমনটা মনে করার কারন নেই যে বিভাগের সকল শিক্ষকই এমন। এই বিভাগের অধিকাংশ শিক্ষকই অনেক জ্ঞান এবং পান্ডিত্যের অধিকারী। তারপরও এখন সচেতন বিবেকসমুহের কাছে ছেড়ে দিলাম শিক্ষার্থীরা কেন ক্লাস থেকে দুরে সরে যাচ্ছে এটি ভেবে দেখতে!। আপনারা রায় দিবেন। আমি বলছি না ক্লাস ফাঁকি দেয়া শিক্ষার্থীর ভাল কিছু করেছে! অবশ্যই অন্যায় করেছে নিজেদেরকে নিজেরাই ঠিকিয়েছে কারন তাদের বিকল্প পথ খুঁজে বের করা প্রয়োজন ছিলো।
সদ্য সাবেক হিসেবে আমি এদের অনেককেই চিনি। এদের কিছু সংখ্যকের মেধা ও আউটস্ট্যান্ডিং কিছু যোগ্যতা সম্পর্কেও হালকা ধারনাও রয়েছে। এদের কেউ অনেক ভাল গিটার বাজায়। কেউ ভাল গান করে। কেউ তুখোর বিতার্কিত। কেউ মঞ্চ অভিনয়ে পারদর্শী। কেউ বা ভালো লিখে। এদের কেউ পড়াশুনার পাশাপাশি সাংবাদিকতাও করে। আরও অনেক প্রতিভার অধিকারী এরা…! সুতরাং হুট করে এদের বাজে ছেলে বলে রায় দেয়ার কোন কারন নাই। আসলে ব্যাপারটা হলো এদের সবাইকে যে ক্লাসের সেরা বা সবচেয়ে মনোযোগী শিক্ষার্থীই হতে হবে এমনটা নয়। আর বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র ক্লাস আর পরীক্ষার জন্যই নয়। এখানে মানসিক বিকাশের চর্চা হবে বেশি বেশি। এখানে কেউ কবিতা লিখবে, কেউ গান গাইবে, কেউ বিতর্ক করবে, কেউ দেয়ালপত্রিকা বানাবে, কেউ লিটল ম্যাগ কর্মী হবে, কেউ সিনেমা বানানোর স্বপ্ন দেখবে, কেউ ব্লগে লিখবে, কেউ ছবি তুলবে, কেউ তুখোড় ছাত্রনেতা হবে—এরা সবাই মিলে পাল্টে দিতে চাইবে এই ‘ঘুণে ধরা সমাজ’, কেউ গিটার নিয়ে গান ধরবে ‘আমার ভালোবাসা’, কেউ তুমুল প্রেমিক হবে, কেউ উদাস হবে, কারও বা মন খারাপ থাকবে, কেউ বা শিক্ষকদের পেছনে ছুটবে একটু নেক নজরে পড়ার জন্য—সবাইকে নিয়ে কী তুমুল ভালোবাসার পরিবারই হবে বিশ্ববিদ্যালয়! শিক্ষার্থীরা আছে বলেই তো শিক্ষকেরা আছেন, দালানকোঠা আছে, লাইব্রেরি, রাস্তা, রেজিস্ট্রার বিল্ডিং, শিক্ষকদের প্রমোশন, হাউস টিউটর-প্রক্টর-ডিন-প্রোভিসি-ভিসি হওয়া। এসবই শিক্ষার্থীদের জন্যই।
এই সত্য শিক্ষকেরা ভুলে গেলে চলবে কি করে? কিন্তু খুবই দু:খজনক ঘটনা হলো ড. জোহার ক্যাম্পাসের শিক্ষকরাই এই সত্য`বেমালুম ভূলে যাচ্ছেন বারবার। ড. জোহার রেখে যাওয়া সহকর্মীরাই গুলি চালিয়েছে তাদের শিক্ষার্থীদের বুকে। ২ ফেব্রুয়ারী ২০১৪ সাল। ড. জোহার সহকর্মীদের প্রত্যক্ষ মদদে নিরীহ সাধারন শিক্ষার্থীদের বুকে নির্বিচারে পাখির মতো গুলি চালিয়েছেন তাও ড. জোহা স্যার যেখানে শুয়ে আছেন ঠিক ঐ জায়গাটিতেই দাঁড়িয়ে। গুলিবিদ্ধ হয়ে যখন ছটছট করছিলো এই শিক্ষার্থীরা তখনও কেউ ছুটে আসে নি তাদের পাশে। ড. জোহা আপনি ঐখানে শুয়েই নিশ্চয় আপনার সহকর্মীদের এইসব হীন কর্মকান্ড দেখেছেন! ড. জোহা আপনার সহকর্মীদের ক্ষমা করবেন! আপনার রেখে যাওয়া আদর্শকে তাঁরা গলা টিপে হত্যা করতে চাইছে প্রতিদন! হয়ত, আপনার সহকর্মীরা ভুলে গেছেন ভুলে গেছেন আপনার বীরত্বগাঁথা আত্নত্যাগের কথা। তাঁরা ভূলে গেছেন ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারীর কথা।
ড. জোহার আত্নত্যাগের কথা সত্যিই ভুলে গেছেন বর্তমান যুগের অধিকাংশ শিক্ষকেরাই। ১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে পাকিস্তানি জান্তাদের হাত থেকে তাঁর ছাত্রদের বাঁচাতে গিয়ে ড. জোহা বলছিলেন–ডোন্ট ফায়ার! আই সেইড, ডোন্ট ফারার! কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার গায়ে গুলি লাগে।’ এভাবেই ছাত্রদের আগলাতে নিজে পাকসেনাদের নিশানা হন ড. মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা। সেই রেশ ধরেই ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান তৈরি করেছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শক্ত ভিত। সেদিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন প্রত্যক্ষদর্শী রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য প্রফেসর আব্দুল খালেক বলছিলেন-“অধ্যাপক জোহা স্যার দুই জন পাকিস্তানি আর্মি অফিসার ক্যাপ্টেন হাদি ও লেফটেন্যান্ট থাদেম শাহকে অনুরোধ করছিলেন ছাত্রদের (যাঁরা ১৪৪ ধারা ভেঙ্গে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী সার্জেন্ট জহুরুল হককে হত্যার প্রতিবাদে মিছিল বের করছিলেন) ওপর যেন গুলি চালানে না হয়” এরপর বাক-বিতন্ডা শুরু হয় জোহা স্যারের সাথে। একপর্যায়ে জোহা স্যার বললেন ছাত্রদের বুকে গুলি করার আগে যেন আমাকে গুলি করা হয়। তখনই ক্যাপ্টেন হাদি একজন বাঙ্গালী সৈনিককে নির্দেশ দেন গুলি চালানোর। তিনি প্রত্যাখ্যান করলে নরপিশাচ ক্যাপ্টেন হাদি নিজ হাতে তার পিস্তল দিয়ে গুলি চালান জোহা স্যারের বুকে। এরপর তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন”।
যাঁদের আত্মত্যাগে এ সংগ্রাম গণআন্দোলনে (ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান) রূপ নিয়েছিল, তাদের অন্যতম ড. শামসুজ্জোহা, বাংলার প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। শিক্ষার্থীদের জন্য একজন শিক্ষক তার অমূল্য জীবনও উত্সর্গ করতে পারেন। এমনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন প্রক্টর ও রসায়ন বিজ্ঞান বিভাগের প্রাণপ্রিয় শিক্ষক ড. শামসুজ্জোহা। ’৬৯ সালে আন্দোলন চলছিল দেশজুড়ে। পাকিস্তানি জান্তা ১৫ ফেব্রুয়ারি বন্দী অবস্থায় গুলি করে হত্যা করেন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি সার্জেন্ট জহুরুল হককে। এর প্রতিবাদে সারা দেশে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদের মিছিলে সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হয় অসংখ্য ছাত্র। ড. জোহা ছাত্রদের হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সার ব্যবস্থা করেন। ১৭ ফেব্রুয়ারি ছিল ছাত্র ধর্মঘট। এতে বিনা উসকানিতে পুলিশ লাঠি চার্জ করে ছাত্রদের রক্তাক্ত করে। এরপর ১৩ জন ছাত্রকে একটি ছোট্ট ভ্যানে রক্তাক্ত অবস্থায় গাদাগাদি করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ। ড. জোহা ছিলেন এ বিপদগ্রস্ত ছাত্রদের সাথে। সে সময় ক্যাম্পাসে চলছিল একুশের অনুষ্ঠান যা প্রতিবাদ সভায় পরিণত হয়। ড. জোহা এই প্রতিবাদ সভায় বলেছিলেন, ‘সিরাজদ্দৌলাকে অন্ধকূপে হত্যার মিথ্যা দুর্নাম দেওয়া হয়েছিল। আজ অন্ধকূপ দেখে এসেছি। ছোট্ট একটা গাড়িতে বার চৌদ্দজন রক্তাক্ত ছাত্রকে ঠাসাঠাসি করে তোলা হয়েছিল। আমার ছাত্রদের রক্তের দাগ আমার গায়েও লেগেছে, সেজন্য আমি গর্বিত…।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আন্দোলন কর্মসূচির ঘোষণায় পাক বাহিনী পূর্ব পাকিস্তানে ১৪৪ ধারা জারি করে। কিন্তু ১৮ ফেব্রুয়ারি সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা এই ধারা উপেক্ষা করে মেইন গেটের সামনের মহাসড়কে পাকিস্তানি স্বৈরাশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন প্রক্টর ড. জোহা মেইন গেটে ছুটে যান। প্রক্টর হিসেবে তিনি ছাত্রদের শান্ত করার এবং ক্যাম্পাসে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন। ছাত্ররা পিছু হঠতে না চাইলে পাক বাহিনীর ক্যাপ্টেন হাদী ছাত্রদের গুলি করার নির্দেশ দেয়। তখন ড. জোহা পাক বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, ‘কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার গায়ে গুলি লাগে।’ এ সময় তিনি ‘ডোন্ট ফায়ার! ডোন্ট ফায়ার!’ বলে চিত্কার করতে থাকেন। সেদিন মহান এই শিক্ষক ড. জোহার বুকের রক্তে রঞ্জিত হয়েছিল মতিহারের নিষ্পাপ সবুজ চত্বর। হাসপাতালে নেওয়ার পথে ড. জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সেদিন শুধু ড. জোহার বুকে্ই গুলি লাগেনি বরং সারা বিশ্বের শিক্ষক জাতি তথা বুদ্ধিজীবীর উপর আঘাত হানা হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন বিরল ঘটনা আর নেই।এমন বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করার পরও শুধুমাত্র রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়েই প্রতিবছর ১৮ ফেব্রুয়ারিকে ড. জোহা দিবস (শিক্ষক দিবস) হিসেবে পালন করা হয়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা দীর্ঘদিন থেকেই এই দিনটিকে ‘জাতীয় শিক্ষক দিবস’ হিসেবে ঘোষনা করার দাবি করে অাসছেন।দাবীর প্রতি কর্ণপাত করা হয় নি।এখন সময় এসেছে এই দিনটিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষনা করার। এটি সারা বাংলাদেশের মুক্তিকামী ছাত্র-শিক্ষকদের প্রানের দাবি। যেকোন মূল্যেই ১৮ ফেব্রুয়ারিকে জাতীয় শিক্ষক দিবস হিসেবে ঘোষনা করতে হবে।
অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী ড. শামসুজ্জোহা ১৯৩৪ সালে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৪৮ সালে বাঁকুড়া জেলা স্কুল থেকে তিনি প্রথম বিভাগে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে বাঁকুড়া ক্রিশ্চান কলেজ থেকে প্রথম শ্রেণীতে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রসায়ন সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন। ১৯৫৩ সালে ড. জোহা দ্বিতীয় শ্রেণীতে সম্মান ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৪ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৬ সালে বিস্ফোরক দ্রব্যের উপর প্রশিক্ষণ লাভের জন্য তিনি ইংল্যান্ডে যান। সেখানে তিনি ইমপেরিয়াল কলেজ ও লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এআরসিএস ও বিএস স্পেসাল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৬১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। বিদেশ থেকে পিএইচডি ও ডিআইসি ডিগ্রি নিয়ে পুনরায় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ড. জোহা মৃত্যুর সময় স্ত্রী নিলুফা জোহা ও এক কন্যা সন্তান রেখে যান।
ড. জোহা একজন কৃতি ক্রিকেটার ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রীড়া অঙ্গনের সাথে তার সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি শাহ মখদুম হলের আবাসিক শিকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৮ সালের ১৫ এপ্রিল তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়। ড. জোহা বিভিন্ন গবেষণা কর্মের সাথেও জাড়িত ছিলেন। দেশী ও বিদেশী বিভিন্ন জার্নালে তার বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ড. জোহার মৃত্যুর ফলেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলন চরম আকার ধারণ করে এবং বাংলাদেশ স্বাধীনতার ধারা উন্মুক্ত হয়। ড. জোহার স্মৃতিকে ধরে রাখার জন্য পাঠ্যপুস্তকে তার আত্মদানের কাহিনী অন্তভূর্ক্ত করা এবং জাতীয় ভাবে দিবসটি উদযাপন করা এখন সময়ের দাবি। ড. জোহার স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখলে তাঁর আদর্শও বেঁচে থাকবে। সেটি হলে ছা্ত্রদের ভক্ষক না হয়ে তাঁর সহকর্মীরা নিজের বুকের তাজা রক্ত ঢেলে ছাত্রদের রক্ষক হওয়ার চেষ্টা করবেন তখন। সেটি করতে না পারলে এই বাক্যটি উচ্চারন করা ছাড়া আর কিছু করার থাকবে বলে মনে হয় না–“ড. জোাহা আপনার সহকর্মীদের ক্ষমা করবেন!”
এম. এ. সাঈদ শুভ
লেখক ও আইনজীবী
ই-মেইল: sayeedlaw@gmail.com
ফেইসবুক: www.facebook.com/sayeed.shuvo.90
টুইটার: twitter.com/SayeedlawShuvo