ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা, ফিচার পোস্ট আর্কাইভ

 
Faizullah-Fahin-madaripur
এটাকে স্রেফ একটা ‘হত্যাকাণ্ডই’ বলব! রাষ্ট্রের অাইন-শৃংখলা রক্ষার অতন্দ্র প্রহরী খ্যাত পুলিশ কর্তৃক তথাকথিত বন্দুক যুদ্ধের নাটক সাজিয়ে হত্যাকান্ডটি সংঘটিত করা হলো।এখন প্রশ্ন হলো-পুলিশি রিমান্ডে থাকা গোলাম ফয়জুল্লাহ ফাহিমকে কেন হত্যা করা হলো? বড় বড় কোন ‘রাঘব বোয়ালকে’ বাঁচাতে এই হত্যাকাণ্ড? নাকি ছেলেটাকে বলির পাঠা বানানো হলো? মানুষের মনে একটু অাশার সঞ্চার হয়েছিলো হয়তো পুলিশ এবার গুপ্ত হত্যাকারীদের ব্যাপারে কিছুটা কূল-কিনারা করতে পারবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি।জনতা জীবন বাজি রেখে এই ‘অপরাধীকে’ আটক করে পুলিশে দিলো আর পুলিশ তাকে নিয়ে হত্যা করলো? পুলিশ কাকে বাঁচাতে চাইছে?
মানলাম, ফাইজুল্লাহ একজন ‘অপরাধী’ যদিও দেশের প্রচলিত বা বিশেষায়িত কোন বিচারিক অথবা সাংবিধানিক আদালত কর্তৃক এটি প্রতিষ্ঠিত হয় নি। তারপরও ধরে নিলাম সে একজন ‘কুখ্যাত সন্ত্রাসী’ বা জঙ্গী। বা একজন মানুষ হত্যাকারী। আচ্ছা একবার ভাবুনতো এই ফয়জুল্লাহ মাত্র ১৯ বছরের একটা তরুন। সদ্য কৈশোর পেরুনো এক তরুন। তার কি বা এমন বিচার-বুদ্ধি হয়েছে যে তাকে হত্যার মিশনে নামতে হবে? তার স্বার্থ কি? হ্যাঁ তার স্বার্থ হয়তো রয়েছে! সে হয়তো মানুষ হত্যা করে ‘ইসলাম কায়েম’ করতে চায়! অথবা মোটা অংকের টাকা উপার্জন করতে চায়!
মানলাম, সে দুটোর কোন একটি করতে চায়! কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই বয়সী তরুনের নিজস্ব বিচার বুদ্ধি প্রয়োগ করে এমনটা করা অসম্ভব! এই তরুনকে অবশ্যই কেউ পরিচালিত করছে এটি নিশ্চিত।সবাই এই বিষয়ে একমত হবেন যে তাকে হত্যাকান্ডে ব্যবহার করা হয়েছে মাত্র! কিন্তু তাকে কারা ব্যবহার করছে? কেন ব্যবহার করছে? কাদের নেতৃত্বে এই তরুন আজকে এই চরম পন্থা বেছে নিলো তা কি কিছু উদ্ধার করতে পেরেছে আমাদের পুলিশ? করে থাকলে কি করছে তথ্য তার তথ্য-প্রমান জাতির কাছে উন্মোচিত করা হোক! নাকি এমন কিছু উদ্ধার করেছে যেটি প্রকাশ করলে বড় বড় রাঘব-বোয়ালদের মুখোশ উন্মোচিত হতো? এই কারনে তাকে সড়িয়ে ফেলা জরুরী হয়ে পড়লো? এই প্রশ্নের উত্তরগুলো জানতে খুব ইচ্ছে করছে।
এখনতো দৃশ্যপট বিশ্লেষণ করে মনে হচ্ছে এই ফয়জুল্লাহ কি আদৌ অপরাধী ছিলো? না পুলিশের সাজানো স্ক্রিপ্ট? সন্দেহ হচ্ছে! সন্দেহ হওয়াটই স্বাভাবিক। সে তো এখনও পর্যন্ত কোন আদালত কর্তৃক অপরাধী সাব্যস্ত হয় নি। সেক্ষেত্রে তাকে আমরা স্পষ্টত একজন অপরাধী বলতে পারি না।অাচ্ছা না হয় স্পষ্টত অপরাধীই বললাম। যেহেতু সে শিক্ষক রিপন হত্যাকান্ড ঘটিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় জনতার হাতে আটক হয়েছিলো! তারপর ধরে নিলাম সে একজন অভ্যাসগত ভয়ানক অপরাধী।একাধিক হত্যাকান্ড সংঘটিত করেছে। তারপরও কি পুলিশের কোন এখতিয়ার রয়েছে ফয়জুল্লহকে হত্যা করার। পুলিশ কেন আাইন হাতে তুলে নিচ্ছে? পুলিশের কি আইন-আদালতের প্রতি বিন্দু মাত্র শ্রদ্ধা নেই? যদি না থাকে সে সমাজের আইনের শাসনের আলাপ আর পাগলের প্রলাপ একই কথা।
এখন কথা হলো পৃথিবীতে বড় বড় অপরাধ সংঘটিত হবে এমনটা ধরে নিয়েই পুলিশি ব্যবস্থা, আইন-আদালতের প্রতিষ্ঠা। রাষ্ট্রের নাগরিক তাদের ঘাম ঝড়ানো ট্যাক্সের টাকা দিয়ে পুলিশকে লালন করে এই অপরাধীদের ধরে আইনে সোপর্দ করার জন্য। কিন্তু পুলিশ কি করছে? আইন-আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘হত্যাকান্ডে’ মেতে উঠেছে! মূল হোতাদের ধরা ছোঁয়ার বাহিরে রেখে চুনোপুঠিদের ক্রসফায়ারে মেতে উঠেছে?একজন হত্যাকারীকে আইনের কর্তৃত্ব ব্যতিরেকে হত্যা করাও দন্ডনীয় নরহত্যা।
তাহলে একজন অপরাধী যা করলো পুলিশও তাই করলো। একজন হত্যাকারী আর পুলিশ বা আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তফাৎ থাকলো কোথায়? হ্যাঁ পুলিশ বলতে পারে আমরা এত কষ্ট করে অপরাধীদের গ্রেপ্তার করি আর অপরাধীরা আইনের ফাঁক-ফোকরে আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে যায়। হ্যাঁ এমনটি হয় তবে সেটিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুলিশের প্রত্যক্ষ মদদে এবং সহযোগিতায়। তাঁরা আদালতের বিচার কার্যক্রমে সহযোগিতা করে না বিধায় এমনটি ঘটে। সে দায়ও আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর উপরেই বর্তায়।একটি সভ্য সমাজে বিচার-বহির্ভুত হত্যাকান্ড কখনোই গ্রহনযোগ্য নয়। এবং কোন অজুহাতেই নয়।
এখন হয়তো পুলিশ বলবে আত্নরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করতে গিয়ে তাদের এমনটা করতে হয়। সেক্ষেত্রে তাদের যুক্তিগুলো বড্ড বেমানান।ক্রসফায়ারের নাটক মঞ্চায়িত হওয়ার শুরু থেকেই র্যাব-পুলিশ একটি প্রেসরিলিজ লিখে রেখেছে গনমাধ্যমে পাঠানোর জন্য। সেখানে কাহিনী হুবহু আগের ঘটনাগুলোর মতই। এখানে শুধুমাত্র অপরাধীদের নাম, ঠিকানা আর বয়সটা পরিবর্তিত হয় আর তাদের এই স্ক্রিপ্টটা সবক্ষেত্রে একই।
কি হাস্যকর গল্প! বন্দুকযুদ্ধের গল্প! মিডিয়াও কোন ধরনের বিচার-বিশ্লেষন  করেই সেটি দেদারসে প্রচার করতে প্রতিযোগিতা শুরু করে দেয়! কি আজব? আচ্ছা একটা জিনিস কখনো ভেবেছেন, পুলিশ বা র্যাব আসামীকে যখন মিডিয়ার সামনে হাজির করে একদম বুলেট প্রুফ জ্যাকেট পড়িয়ে পুরো যুদ্ধোংদেহী একটা পরিবেশ তৈরী করে। অার আসামীকে নিয়ে যখন অভিযানে যায় তাকে একদম উদোম গায়ে নিয়ে যায় আর তার সহযোগীদের গুলিতে বেছে বেছে ঐ আসামীটাই মারা যায়! বাহ! কোন পুলিশ বা র্যাব সদস্যের কিছুই হয় না (যদিও এটা কাম্য নয়) কি শ্রুতিমধুর গল্প? যদিও ইদানীংকালে দু-একজন সদস্য আহত হওয়া নাটকও মঞ্চস্থ করে!
আচ্ছা, পুলিশ-র্যাব তো যখনই গ্রেপ্তারকৃত অাসামীকে নিয়ে সহযোগী আসামীদের ধরতে অভিযানে যায় সেসব ক্ষেত্রেই তো বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটে। তাহলে পুলিশ জনগনকে একটা বন্দুকযুদ্ধের ভিডিও দেখাক। ধরা যাক, তারা যখন বড় কোন আসামীকে নিয়ে অভিযানে যাবে তাদের অতিরিক্ত একটা ফোর্স থাকবে যাদের কাজ হবে বন্দুকযুদ্ধ শুরু হওয়ার সাথে সাথে লাইটিং পুরো ঘটনাটা ভিডি্ও করে ফেলা করা।অন্তত পুলিশ আমাদের এরকম একটি ভিডিও দেখাক!
আসলে সত্যটা হলো একটা অন্যায়কে আরেকটা অন্যায় দিয়ে জাস্টিফাইড করা যায় না। পুলিশ অন্যায় করলেও অন্যায়, অপারাধী অপরাধ করলেও অন্যায়।।একই অপরাধ! কোন পার্থক্য নেই। ভেবেছিলাম কোথা্য় ফয়জুল্লাহকে কাউন্সেলিং করে তার গড ফাদারদের সম্পর্কে সঠিক তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করবে. বাচ্চা ছেলেটাকে আলোর পথে ফিরিয়ে আনবে, এক নতুন জীবন দান করবে, তারপর ছেলেটি তার অপরাধ সম্পর্কে জ্ঞাত হয়ে একটি উপলব্ধি করে চোখের অশ্রু ছেড়ে দেবে! তার কিছুই হলো না।ফয়জুল্লাহ গ্রেপ্তার হওয়ার পর একজন উচ্চ পদস্থ পুলিশ কর্মকর্তাকে এই আশা জানিয়ে ই-মেইল করছিলাম। কোন রিপ্লাই এখনো পাই নি।পাবোও না কখনো।
এম.এ.সাঈদ শুভ
এম.ফিল (গবেষক)
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
ই-মেইল: sayeedlaw@gmail.com