ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

স্পষ্টত এই হামলা ইসলামের নামে করা হয়েছে! হামলাকারী এই ‘ইসলামী জঙ্গীদের’ মতে, বাংলাদেশে বসবাসকারী দেশীয় ও বিদেশি নাগরিক যারা ‘ইসলামের দুশমন’ তাদেরকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে ‘ইসলামের বিজয় সুনিশ্চিত’ করার প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে! ঘটনার সারসংক্ষেপ এটিই। প্রমান হিসেবে অভিযানে উদ্ধার হওয়া জিম্মিদের বর্ণনাই যথেষ্ঠ। তাদের বর্ণনা মতে, হামলায় অংশ নেয়া ইসলামী জঙ্গীরা জিম্মি লোকদের কুরআনের আয়াত তেলাওয়াত করতে বলেছিলো। যারা তেলাওয়াত করতে পেরেছে তাদের তেমন কিছু বলে নি। আর যারা পারে নাই তাদের ধারালো অস্ত্র দিয়ে খুঁচিয়ে-খুঁচিয়ে নির্যাতন করেছে, তারপর হত্যা করেছে। হামলাকারীরা যে ‘ইসলামী জঙ্গী’ তাতে কোন সন্দেহ নাই। হতে পারে এরা আইএস, আল-কায়দা, আনসার-আল-ইসলাম বা জেএমবির সদস্য। তো যার সদস্যই হোক না কেন এদের যোগসূত্র, চিন্তা-চেতনা একই। এবং এটিও প্রমানিত এরা হত্যাকান্ডের সময় আল্লাহ-ইসলামের নামে স্লোগান দেয়। ধর্মের নামে এইসব হত্যাকান্ড এরা জায়েজ করে নিয়েছে। এসবই নির্মম সত্য! ইসলাম ধর্মের অনেক অনুসারীই এই সত্যটি মানতে চাইছে না! কেউ মানুক আর না মানুক সত্য সবসময়ই সত্য। সত্যের রং-ঢং কিচ্ছু নেই।

তবে পাশাপাশি এখানে আরও একটি সত্যও রয়েছে। সেটি হলো উপরে বর্নিত উপায়ে ইসলাম পালনকারীদের সংখ্যা সারা পৃথিবীতে খুবই নগন্য। হয়ত মোট মুসলিম জনসংখ্যার ৫ শতাংশেরও কম হবে। শুধুমাত্র এই ৫ শতাংশ ইসলামী জঙ্গীরাই ধর্ম ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করে না! এই ইসলাম বাকী আরো ৯৫ শতাংশ মুসলিমেরও। তারাও এই ধর্ম ইসলামকেই প্রতিনিধিত্ব করে। এবং এই বিশাল অংশ তাদের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ আল-কোরআনের এই আয়াতটি (উক্তি) বিশ্বাস করে যে, “কেউ যদি একজন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করলো”। এরা বিশ্বাস করে ইসলাম শান্তির ধর্ম। এর স্বপক্ষে অনেক প্রমানই রয়েছে। যদি সাম্প্রতিক দু-একটি বিষয় উল্লেখ করি তাহলে দেখবো বাংলাদেশে এক লাখ ইসলামি ক্লারিকস জংগীবাদকে সরাসরি হারাম (নিষিদ্ধ) বলে ফতোয়া (সিদ্ধান্ত) দিয়েছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পৃথিবীর অনেক দেশের বড় বড় ইসলামী ক্লারিকসরাই এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

এখন প্রশ্ন হলো এই দুই পক্ষই ইসলামের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে দাবী করছেন নিজেদের। তাহলে প্রশ্ন আসতেই পারে কোন পক্ষটি সত্যি সত্যি ইসলামকে প্রতিনিধিত্ব করছে? ধর্ম ইসলাম আসলে কোনটা? জংগী-ধর্ম ইসলাম না শান্তির-ধর্ম ইসলাম?
ইসলাম সম্পর্কে আমার তেমন বিশদ জ্ঞান নেই বলেই জানি। তবে প্রাথমিক বিষয়গুলো সম্পর্কে মোটামুটি ওয়াকিবহাল বলেই আমার বিশ্বাস। এবং আরও বিশ্বাস যে বড় আরও চারটি ধর্ম সম্পর্কে প্রাথমিক কিছু জ্ঞানও রয়েছে। ইদানিংকালে (বছর খানেক ধরে) ধর্ম নিয়ে নিজের মধ্যে এক ধরনের কৌতূহল তৈরী হওয়ার কারনে বাইবেল এর সর্বশেষ ভার্সনটির বাংলা অনুবাদ এবং কুরআন শরীফের বাংলা অনুবাদ বেশ মনযোগ সহকারে পরেছি। এই দুটো পবিত্র ধর্ম-গ্রন্থ থেকে অন্তত এতটুকু উপলব্ধি হয়েছে যে এই দুটো ধর্মের কোনটাই উগ্র পন্থাকে সমর্থন করে না। (আশা করছি বড় আরো তিনটা পবিত্র ধর্ম-গ্রন্থ খুব শীঘ্রই বাংলা অনুবাদ পড়ে নেব) এখন প্রশ্ন হলো ধর্ম ইসলাম উগ্রপন্থাকে সমর্থন না করলে জংগী-ইসলাম আসলো কোত্থেকে?

হ্যা, সেটি আমারও প্রশ্ন। তবে এই প্রশ্নের কিঞ্চিত উত্তরও জানতে পেরেছি। যদি গুলশানের গতরাতের ঘটনাটাই উদাহরন হিসেবে নিয়ে আসি তাহলে কিছুটা পরিষ্কার হওয়া যাবে। সেটি হলো গতকাল রাত ৯:৪৫ মিনিটে অতর্কিত হামলা চালালো জংগীরা ঠিক যখন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা তারাবি নামাজরত। তারমানে এই সময়টাকেই তারা উপযুক্ত বলে বেছে নিয়েছে। আর এই বিশাল ধংসযজ্ঞের প্রস্তুতি নিতে এই ভ্রান্ত জংগিদের আরো মিনিমাম ঘন্টা দুয়েক লেগেছে। তারমানে এদের কেউই তারাবি নামাজ পরেনি এটা নিশ্চিত। এরা কেউ রোজা থাকে নি এটাও অনুমেয়। রমজান মাসে যে মানুষটির ধর্ম পালনে সবচেয়ে বেশি অনীহা সেও অন্তত তারাবীর নামাজ পরতে যায় স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য। কিন্তু এই পথভ্রষ্ট তরুনগুলো নামাজ পড়তে না গিয়ে হত্যায় মেতে উঠলো। অথচ ধর্মের মূল স্পিরিট বলে অন্য কথা। সেটি হলো যদি কেহ ‘যুদ্ধরতও’ (সংগত অনিবার্য যুদ্ধ) থাকে তাহলেও তাকে আগে নামাজ আদায় করতে হবে। কিন্তু এই পথভ্রষ্টরা কি করলো? সত্যি কথা হলো এরা ধর্মের পবিত্রতা থেকে অনেক দূরে। ধর্ম সম্পর্কে এদের দু-একটি ভ্রান্ত শিক্ষা দিয়ে ব্রেইন ওয়াশ করা হয়। এরা শুধু এদের ‘প্রভুদের’ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করার কাজেই নিযুক্ত! এরা নিজেরাও স্পষ্ট করে জানে না কেন এগুলো করছে? যেমন, কুষ্টিয়ায় জংগীদের দ্বারা বিচারক হত্যা মামলায় বিচারক যখন কুরআন থেকে আয়াত তেলাওয়াত করে শোনাচ্ছিলেন এরকম কিছু পথ-ভ্রষ্ট তরুন ঝরঝর করে চোখের পানি ফেলতে শুরু করেছিলো এবং নিজেদের অপকর্ম সম্পর্কে অবগত হয়ে বারবার মূর্ছা যাচ্ছিলো। কিন্তু তখন মূর্ছা গিয়ে কি লাভ? যা করার তো করেই ফেলেছে?

মূল ব্যাপারটা হলো একটি বিশেষ অঞ্চলের ‘জারজ রাজা-বাদশাহরা’ তাদের ‘অবৈধ ক্ষমতা’ টিকিয়ে রাখতে আর তাদের প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই জংগী জংগী খেলা টিকে রেখেছে। এই বিশেষ অঞ্চলের জারজদের মদদদাতা হিসেবে ‘মানবতার ধ্বজাধারী’ পশ্চিমা এক জারজ রাষ্ট্রের খ্যাতি রয়েছে। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে এই অস্ত্রের উৎপাদন করেছে এখন নিজেদের জন্যই বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে! আর এই উন্মাদগুলো এখন নগদ অস্ত্র-সস্ত্র পেয়ে মাস্তানিতে নেমে পড়েছে। ‘ইসলামি খেলাফতের’ স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। এর উদ্দ্যেশ্য আসলে ক্ষমতা কুক্ষীগত করে হেরেমখানা, শরাইখানা তৈরী করা। হেরেমখানায় অবলা নিরীহ নারীদেহ নিয়ে উন্মাদনায় ফেটে পড়া! আর রক্তখেকো ক্ষমতালোভীদের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া। পার্থিব ক্ষমতাকেন্দ্রিক চিন্তা আর মৃত্যু-মৃত্যু খেলা দেখানোয় এদের একমাত্র উদ্যেশ্য। (আরও কিছু উদ্যেশ্যের কথা অন্য একদিন সময় করে বলা যাবে) অথচ ইসলামের মূল স্পিরিট হলো জাগতিক বিষয়সমূহের মোহ ভুলে গিয়ে সম্পুর্ন স্রষ্টার সন্তুষ্টি বিধানের লক্ষ্যে কাজ করা। কিন্তু ইসলামের নাম ব্যবহার করে কি নষ্টামিই না করছে এসব ভ্রান্ত-বিশ্বাসীরা? বস্তুত এখানে ইসলাম ধর্মকে নিছক ঢাল হিসেবে ব্যবহার করার আরেকটি কৌশল হলো ধর্ম ইসলামকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ঘৃনার ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, স্বয়ং ধর্ম ইসলামকেই কাঠগোড়ায় দাড় করানো এবং একটা পর্যায়ে এই ধর্মের সমস্ত অনুসারীদেরকে তাদের পক্ষে নিয়ে আসতে বাধ্য করা। স্বয়ং ধর্ম ইসলামকেই কাঠগোড়ায় দাড় করাতে পারাটাই তাদের জন্য বিরাট সাফল্য। বিরাট কৃ্তিত্ব! সে লক্ষ্যেই তাদের এই বিরামহীন রক্তপাত ঘটানো। এবং তারপর তারা পুরো পৃথিবিকে দুইটা ভাগে তথা ‘মুসলিম-ননমুসলিম’ ভাগ করে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলা শুরু করবে!

আর একারনেই ধর্ম ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছে এই অন্ধরা! ওরা এটি করতে পারলেই কেল্লা ফতে! ওদের হুজুরেরাও মহা খুশি হয়। এই সুযোগ এই অন্ধদের কখনোই দেয়া যাবে না। সুতরাং, মানবিক মানুষদের বলছি, ধর্ম ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিবেন না প্লিজ! তবে এমনটিও মনে করার কারন নেই যে ধর্ম ইসলাম এখানে পুরোটাই দায়মুক্ত! ধর্ম ইসলামের ‘ভ্রান্ত কিছু’ উপাদান যেগুলো আরেক ধরনের ভ্রষ্ট ধর্ম-ব্যবসায়ীরা নিজেদের সুবিধার জন্য তৈরী করে ধর্মের স্পিরিটের নামে চালিয়ে দিচ্ছে কৌশলে। এই ভ্রষ্ট ধর্ম-ব্যবসায়ীরা সরাসরি জংগীবাদের সাথে জড়িত না থাকলেও বিভিন্নভাবে সমর্থন যুগিয়ে থাকে তাদের ধর্ম ব্যবসা পরিচালনার স্বার্থে! সমাজে এদের সংখ্যাও খুবই নগন্য। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে হয়ত এই সংখ্যা আরও ৫ শতাংশ হবে। কিন্তু এই ৫ শতাংশের ভুমিকা বেশ শক্তিশালী। এদের প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা অনেক যেহেতু এরা সমাজের মূলস্রোতের সাথে বসবাস করে। এই অংশ এরা স্রেফ ধর্ম ব্যবসায়ী। এদের ব্যবসার স্বার্থে এরা বিভিন্ন সময় ধর্মের মূল প্রবাহের সাথে এই ব্যাড এলিমেন্টগুলো ছড়িয়ে দেয় যা আরো কিছু নিরীহ ধর্ম পালনকারী ভুলক্রমে গ্রহন করে নেয়! তাহলে মোটা দাগে বলতে গেলে এসব ঘটনার পুরো দায় এই ১০ শতাংশের উপরেই বর্তায়। ধর্মের উপর যেহেতু বিভিন্নভাবে এদের প্রভাব রয়েছে সেহেতু ধর্ম ইসলামও পুরোপুরি দায়মুক্ত নয়! সুতরাং ধর্ম ইসলামও কিছুটা দায়ী যতক্ষন পর্যন্ত না এই ধর্মের বাকী ৯০ শতাংশ শান্তিপ্রিয় মানুষ এই ১০ শতাংশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ গ্রহন অথবা এদেরকে ইসলাম ধর্মের কেউ নয় বলে ঘোষনা করবে ততক্ষন পর্যন্ত ধর্ম ইসলামেরও কিছুটা হলে দায় থেকেই যাবে। এবং যতক্ষন প্যন্ত না ধর্মের নামে যে ব্যাড এলিমেন্টগুলো ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে সেগুলো অপসারনের উদ্যোগ গ্রহন করবে! আর কোনভাবেই যাতে বর্বররা এই সুযোগ না পায় সেজন্য এই ধর্মের বাকী শান্তিপ্রিয় এই বৃহৎ অংশের মানুষদের সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। এরা যাতে কোনভাবেই মাথাচারা দিয়ে উঠে মানব বিধ্বংসী কর্মকান্ডে মেতে উঠতে না পারে সেদিকে সর্বোচ্চ খেয়াল রাখতে হবে। তা না করতে পারলে আগামীর জন্য একটা মানবিক পৃথিবী গড়া দূরুহ হয়ে উঠবে।

তবে যেহেতু এই বৃহৎ অংশের মানুষগুলো নিরীহ এবং ক্ষমতাহীন সেহেতু তারা যদি এই নরপশুদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন নাও করতে পারে তবুও এটার মানে এই নয় যে, সরাসরি ধর্ম ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেয়াটা সমীচীন হবে। যদি সরাসরি ইসলামকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দেন তাহলে এই ১০ শতাংশ ভন্ড-কপোট-বর্বর ধর্ম ব্যবসায়ীদের জন্য বাকী ৯০ শতাংশ নিরীহ ধর্মবিশ্বাসীদেরও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হলো না? এই নিরীহ ধর্মপ্রান মানুষগুলো কেন কাঠগড়ায় দাঁড়াবে? সুতরাং সরাসরি ঢালাওভাবে গুটিকয়েক মানুষের অপরাধের জন্য এই ধর্মের সমস্ত মানুষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর মানে হলো পরোক্ষভাবে এই অপরাধীদেরকেই সমর্থন করা! কারন এই ভয়ংকর অপরাধীরা তো এটিই চাইছে। সুতরাং কোনভাবেই এমনটি করবেন না যাতে সরাসরি ধর্ম ইসলাম কোন বাছবিচার ছাড়াই কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যায়। আর এটি হয়ে গেলে ওদের কুৎসিত হাসির শব্দে আকাশ-বাতাশ প্রকম্পিত হয়ে উঠবে প্রতিনিয়ত! পুরো পৃথিবীকে নরক বানিয়ে ফেলবে এই নরপশুরা! সুতরাং সাধু সাবধান।

 

এম.এ. সাঈদ শুভ
০২.০৭.২০১৬
এম.ফিল গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ

ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com

ফেইসবুক: facebook.com/sayeed.shuvo.90

টুইটার: twitter.com/sayeed.shuvo

 

 

 

 

slide