ক্যাটেগরিঃ দিনলিপি

 

আমাদের গ্রামের বাড়ির উঠোনের বারান্দায় বসে কিছু ‘স্বর্গীয়’ মুখ কচি-কাচাদের সাথে গল্পে মেতে উঠেছিলাম আজকের বৃষ্টিস্নাত দুপুরে! ওদের সাথে মিশে প্রায় একাকার হয়ে গিয়েছিলাম। মূহুর্তেই বয়সের ব্যবধান ভুলিয়ে দিয়েছিলো ওরা! চলছিলো ‘স্বর্গীয় আড্ডা!’ আড্ডায় মেতে হঠাৎ নিজের অজান্তেই আনমনে বলে উঠি, তোমরা কেউ কি আমাকে আমার হারানো শৈশবকে ফিরিয়ে দিতে পারবে? যা চাইবে তাই দিবো! একজন সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলো চাচ্চু শৈশব কি? কললাম আমি আবার তোমাদের মত ছোট হইতে চাই!

একজন এইটা শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাইতে শুরু করলো! আরেকজন বলতেছে ভাইয়া তোমার আব্বু তখন আচ্ছাতারে মার দিবে! তখন কেমন লাগবে? আরেকজন বলতেছে চাচ্চু, আজ পড়তে বসি নাই আর আম্মু যে মারটা দিলো? তোমার কাছে বিচার দিতে আসছি আর তুমি কি না আমাদের মত ছোট হতে চাও! তাহলে পিঠে ছালা (বস্তা) বাইন্ধ্যা আমাদের মত ছোট হইয়ো। তার আগে হইয়ো না। আরেক পন্ডিত কইতেছে চাচ্চু তুমি কত সুখে আছো এইটা তো জানো না!

ছোটদের কষ্ট তো কেউ বুঝে না! আবার ছোট হলে স্কুলে যাইতে হবে! আমার স্কুলের হেইড মাষ্টার যেই ‘জাউরা’! (জারজ এর কথ্যরুপ-আমাদের বগুড়া অঞ্চলের একটি জনপ্রিয় গালি) কথায় কথায় যে মার দেয়! অথচ তোমাকে একদিন স্কুলে নিয়ে গেলাম আর তোমার সাথে কি সুন্দর করে কথা বললো! তুমি যা বললে তাই শুনলো! সবাইকে তোমার মত হতে বললো! আর তুমি না কি আমাদের মত হতে চাও?

না চাচ্চু আমাদের মত হইয়ো না! আমাদের মত হলে তুমি যখন বাড়িতে আসবা তখন তো আম্মু আমাদেরকে তোমার কাছে আসতে দিবে না! তুমি তখন আমাদের মত পচা হয়ে যাবে! তুমি জানো, তুমি কত ভালো? আব্বু-আম্মু সবসময় তোমার কথা বলে! তোমার মত হতে পারলে আর কোনদিন মারবে না বলেছে! এখন দেখ, তুমি আসলে আমাদেরকে আম্মু-আব্বু কিচ্ছু বলার সাহস পায় না! আর এই কয়টা দিন মারও খাওয়া লাগে না! আলোচনায় অংশ নিয়ে আরেকজন বলতেছে আচ্ছা কাকু দাদু কি তোমাকে কখনো মেরেছিলো?

এরই মধ্যেই একটা ছাতা হাতে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে আসলো আরেক মহান পন্ডিত! পন্ডিত-এ ‘মুশকু’! মানে বড় পন্ডিত! (পরবর্তী ভার্সন কুম্পুকা-একটি সামাজিক আন্দোলনের নাম) এসেই সবাইরে শাসিয়ে বলতেছে আমাকে ছাড়া কিসের এত আড্ডা, শুনি? কি সর্বনাশ, আমার আংকেল এখানে পোলাপান (সে মস্ত বুড়ো-ক্লাস থ্রি অনলি) নিয়ে আড্ডা দিতেছে আর আমি নাই এখানে? আংকেল, ‘তুমি আমাকে ছাড়াই মজমা (আড্ডা) বসাইলা?’ এটা কেমন কথা? আমি তোমাকে কত ভালবাসি জানো? (ইমোশনাল ব্লাকমেইল শিখে গেছে এই বয়সেই) ‘আংকেল এটা ঠিক কর নি! আর তুমি বাড়িতে আসছো এটা আগে জানাওনি কেন? আমরা আরো দুদিন আগেই চলে আসতাম এখানে!

তুমি তো জানো আমার ‘জাল্লাদ’ আম্মু কেমন? কাউরে একটুও ভয় পায় না! খালি তোমারে একটু ভয় পায়! যাইহোক, ওসব কথা পরে হবে! এখন বলো এদেরকে কি ‘ম্যাজিক’ দেখাইল্যা? এবার নতুন কোন জাদু শিখে আসছো? এটা বলতে বলতেই একজন বলে উঠলো, আরে না না! ভাইয়া জাদু দেখায় নি! ভাইয়া কইতেছে সে আবার আমাদের মত ছোট হতে চায়! এবার মহা পন্ডিত কইতেছে তাই না কি আংকেল? আমাদের মত ছোট হইবা! ভালো তো! তো হও।

বললাম কেমনে? আরে খুবই সোজা। চলো, জামা কাপড় সব ছেড়ে ‘ল্যাংটা’ হয়ে এই ধুম বৃষ্টিতে নেমে হৈ হুল্লুর করি! আমাদের মত হয়ে যাইবা! বললাম, জামা কাপড় ছাড়তে হবে কেন? আরে আংকেল জামা কাপড় ভিজে গেলে আমার ‘জাল্লাদ আম্মু’ বুঝে যাবে আর মারধর সাথে ফাও বকাঝকা করবে! বললাম এটা তোর সমস্যা তো আমাদের ল্যাংটা হতে হবে কেন? সে কিছুক্ষন চিন্তা করে বললো ঐ যে তুমি না বললে তুমি আমাদের মত হতে চাও?

এসময় একজন বলতেছে আরে কাকার লজ্জা শরম আছে না? এতক্ষন চুপচাপ এই পন্ডিতগুলোর কথা গভীর মনযোগ দিয়ে এক ধ্যানে শুনে যাচ্ছিলাম। ওদের কথাবার্তা আর বাচন ভংগি দেখে এবার আর চুপচাপ থাকার কোন জো নেই! ওদের এসব কথাবার্তা শুনে হাসতে হাসতে আমারও গড়াগড়ি খাওয়ার মত অবস্থা! আমি নিজেই হাসি যেন থামাতে পারছি না। সে কি হাসি! বিগত এক দশকে এমন হাসি হেসেছিলাম বলে মনে পড়ে না! হাসি যেন থামতেই চাইছে না! কি প্রানবন্ত আর সুখকর হাসি?

টানা এক সপ্তাহ ধরে মোটামুটি অসুস্থ, দাঁতের যন্ত্রনা, জ্বর, সর্দি, কাশি আর মাথা ব্যথ্যা লেগেই আছে। আজ দাতের ব্যথাটা একটু কমেছে! তবে জ্বর, সরদি, কাশি আর মাথা ব্যথ্যা একটু একটু আছেই। এরই মধ্যেই এই নিষ্পাপ বাচ্চাগুলোর সাথে ‘ল্যাংটা হয়ে’ বৃষ্টিতে ভেজার প্রস্তাব! নিজের ভিতরে এক ধরনের শিহরন কাজ করলো! মনটা কেমন জানি শৈশবের সেই আনন্দঝরা দিনগুলোতে ফিরে যেতে চাইলো।

সিদ্ধান্ত নিলাম এদের নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজবো। দৌড়ে বারান্দা থেকে মায়ের ঘরে মায়ের কাছে একটু অভিমত চাইতে গেলাম যে অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজলে কোন সমস্যা হবে কি না? সমস্যা যে হবে সেটা আমিও জানি! তীব্রভাবে বাধাপ্রাপ্ত হইলাম। বাপের কাছে গেলাম। বললেন তোমার সমস্যা কিন্তু প্রকট আকার ধারন করতে পারে সেটা মেনে নিয়ে যেতে পার!

ভাবলাম যা হয় হোক, আজ ভিজবোই! এক ধরনের জেদই পেয়ে বসলো! যেই চিন্তা সেই কাজ। শরীরে, বুকে, মাথায় ভালো করে ষরিষার তেল মেখে ওদের বললাম চল বৃষ্টিতে নামি! ওরা তো মহাখুশি! রীতিমত নাচতে শুরু করলো! সবাই মিলে হৈ হুল্লুর করে নেমে পড়লাম, একজনকে একটা ফুটবল আনতে বললাম! তারপর ফুটবল, হাডুডু, কানামাছি, বৌছি খেলা চলছে! প্রতিবেশী, বিশেষ করে এই বাচ্চাদের অভিভাবকেরা কি উৎসুক দৃষ্টিতেই না দেখছে আমাদের কান্ডকারখানা অপলক নেত্রে! সাথে একটু উদ্বিগ্নও হচ্ছিলো হয়ত। কিন্তু সব ছাপিয়ে প্রশান্তির ছাপই ফুটে উঠেছিলো তাদের চোখেমুখে।

এভাবেই চলতে থাকলো প্রায় পৌনে এক ঘন্টা ধরে। বৃষ্টির তেজও একটু কমে আসতে লাগলো! শরীরে তাপমাত্রাও ধীরে ধীরে কমতে থাকলো, একটু একটু কাশিও বাড়তে শুরু করলো, নাক দিয়ে পানি পড়তে আরম্ভ হইলো! তারপরও যেন এই নিষ্পাপ বাচ্চাদের সঙ্গ ছাড়তে ইচ্ছে করছে না! কিন্তু কি আর করার শরীরও সাপোর্ট দিতে চাইছে না! সবাইকে ডেকে বললাম চল এবার উঠি, নইলে অসুখ করবে। ওদের সে কি আপত্তি! একজন বলে কাকা, মাত্র এই কয় মিনিট ভিজলা, আরেকজন বলে ভাইয়া আর দশ মিনিট, আরেকজন বলছে আংকেল আর বিশটা মিনিট ভিজি! সে কি অবস্থা!

এরপর প্রায় সবাইকে এক রকম বুঝিয়ে-সুঝিয়ে নিয়ে এসে সবাই মিলে গোসল করে ওদের অগ্রীম একটা করে নাপা এক্সট্রা খাইয়ে দিয়ে স্ব স্ব বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম! সে কি আনন্দ আকাশে-বাতাসে! সত্যিই এই স্বর্গীয় মুখগুলো আমার হারানো শৈশবকে ফিরিয়ে দিয়েছিলো অন্তত এক ঘন্টার জন্য হলেও। এই অস্থির সময়ে এই এক ঘন্টারই যে কি মূল্য তা কোন অংশে কম? এই এক ঘন্টার সুখ-স্মৃতি আরও একশ বছর বেচে থাকার প্রেরনা যোগাবে নিশ্চয়!

বৃষ্টিতে ভেজা তো হলো তবে এখন যে বিষয়টা বুঝতে পাচ্ছি সেটা হলো- জ্বর, সর্দি, কাশি আর মাথা ব্যথ্যার মেয়াদ হয়ত আরেকটু রিনিউ হলো! সেটা এই সন্ধ্যায় শুয়ে শুয়েই কনফার্ম করলাম! তাতে কি? এই সুখ-স্মৃতির মূল্য এই রিনিউয়ের চেয়ে অনেক দামী। এই সুখ-স্মৃতিই আমার দৃষ্টতে এ বছরের সেরা ঈদ উপহার। এমন একটি অমূল্য উপহার পাবো স্বপ্নেও ভাবি নি! সত্যিই মাঝে মাঝে জীবন অনেক সুন্দর! এই অনুভূতিগুলোই কোটি কোটি বছর বেচে থাকার শক্তি যোগায়।

ও হ্যা, আমি তো ওদেরকে কথা দিয়েছিলাম! ওরা তো হারানো শৈশব ফিরিয়ে দিয়েছে অন্তত এক ঘন্টার জন্য হলেও! হ্যা অবশ্যিই আমার ওয়াদা পালন করবো। ওদেরকে একটি করে জিনিস চাইতে বলবো, সাধ্যের মধ্যে হলে অবশ্যই দেয়ার প্রানান্তকর চেষ্টা করবো। কথা দিলাম। সত্যি ওরা আমাকে আরো একশ বছর বেচে থাকার প্রেরনা জুগিয়েছে।

ইট-পাথরের শহর ছেড়ে এজন্য বারবার ওদের কাছেই ছুটে আসতে মন চায়! মাটির সোঁদা গন্ধ নিতে মন চায়, প্রানভরে নি:শ্বাস নিতে মন চায়। ওদের নিষ্পাপ হাসি প্রানভরে দেখতে মন চায়।আমি তোমাদের কাছে, তোমাদের মাটির কাছে আর তোমাদের বৃষ্টির কাছে, তোমাদের নির্মল বাতাসের কাছে চির ঋনী হে স্বর্গীয় সন্তানেরা। তোমরা আমার হারানো শৈশব স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছো। তোমাদের কাছে চির কৃতজ্ঞ! তোমাদের কাছ থেকে পাওয়া এই নির্মল সুখস্মৃতিটুকু উৎসর্গ করলাম সারা পৃথিবীর আনন্দহীন মানুষদের জন্য। সারা পৃথিবীর সুখ-ছন্দ হারানো মানুষগুলোর জীবনে ভর করুক শৈশবের সেই নির্মল আনন্দের ঈদ,খুশি আর সীমাহীন খুশি। আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাক চিরায়ত মানবতা!

এম.এ.সাঈদ শুভ
০৫.০৭.২০১৬
এম.ফিল গবেষক
ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ
ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com