ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 এই লেখাটি শুরু করছি বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিলীন হয়ে যাওয়া একটি বিরল রাজনৈতিক সংস্কৃতির উদাহরণ টেনে। সালটা ছিল ১৯৯১। সামরিক শাসনের যাঁতাকল থেকে সবে মুক্তি পেয়েছে বাংলাদেশ। অার এর অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হয়ে গেল পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। পরাজয় বরণ করলো আওয়ামী লীগ। অার এ ঘটনার পরপরই বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন প্রত্যক্ষ করলো বিরল রাজনৈতিক সংস্কৃতিটি। নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়ের দায়ভার নিয়ে পদত্যাগের ঘোষনা দিলেন সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
এ ঘটনায় প্রচন্ড মর্মাহত হলেন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ আর ছাত্রলীগের সাধারন কর্মীরা। তাঁদের প্রিয় নেত্রীকে অনুরোধ করলেন এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার জন্য। কিন্তু শেখ হাসিনাও তাঁর সিদ্ধান্তে অনঢ় ছিলেন। এমতাবস্থায় আওয়ামী ভক্ত শত শত সাধারন কর্মীরা তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনার বাড়ির রাস্তার সামনের রাস্তায় শুয়ে পড়লেন এবং তাঁদের নেত্রীকে স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিলেন, ‘আপনাকে যদি দল ছেড়ে যেতেই হয় তাহলে অামাদের মৃতদেহের উপর দিয়ে যেতে হবে।’
এই সাধারন কর্মীদের দাবী ছিলো এই মুহূর্তে শেখ হাসিনা ছাড়া দলে হাল ধরার মত দ্বিতীয় কোন যোগ্য ব্যক্তি নেই। অনেকেই  আছে দল ভাঙ্গার ধান্দায়। দলকে টুকরো টুকরো করার ধান্দায়। সুতরাং নেত্রী আমরা আপনাকে যেতে দেব না। শেষ পর্যন্ত অাজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাধ্য হয়েছিলেন তাঁর সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যজনক ব্যাপার হলো ঐদিন আওয়ামী লীগ বা এর সহযোগী সংগঠনসমূহের গুরুত্বপূর্ন কোন নেতা সেদিন ঐখানে গিয়ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শী কেউ বলতে পারেন নি। হয়ত অনেক গুরুত্বপূর্ন নেতাই সেদিন শেখ হাসিনার চলে যাওয়াটাই চেয়েছিলেন!
যেহেতু সেসময় ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার আজকের অবস্থা ছিলো না বা প্রিন্ট মিডিয়াতেও সেভাবে আসে নি ঘটনাটি তাই আমরা বিস্তারিত জানতে পারি নি। তবে দেশবাসী জানুক আর না জানুক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হয়তো এখনো ভুলে যান নি যে ঐদিন আওয়ামী লীগের কোন কোন শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বেশ উল্লসিত হয়েছিলো আর মনে মনে শেখ হাসিনার চলে যাওয়াটাই কামনা করেছিলো! কিন্তু সাধারণ কর্মীরাই সেদিন আওয়ামী লীগকে মহা পতনের হাত থেকে বাঁচিয়েছিলো। তাঁরা সেদিন প্রমান করেছিলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পর আওয়ামী লীগে শেখ হাসিনার বিকল্প কেউ এখনো জন্মায় নি।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ এখানেই অনন্য যে, দলটি বেশ কয়েকবার পথ হারানোর পরও এই দলের সাধারন কর্মীরাই দলটিকে পথ দেখিয়েছে প্রত্যেকবার। আবার যেহেতু এই দলটির জন্ম হয়েছে গনতান্ত্রিক আন্দোলন আর রাজপথে সাধারন মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাই সাধারন মানুষের এই দলের কাছে এবং এই দলের বর্তমান কান্ডারী শেখ হাসিনার কাছে কতটুকু বা কি বা কেন প্রত্যাশা তা এই লেখার মূল উদ্দেশ্য।
এবার শুরু করা যাক আওয়ামী লীগের ২০তম সম্মেলনের বিভিন্ন দিক নিয়ে। বাংলাদেশের প্রাচীন ও সর্ববৃহৎ এই রাজনৈতিক দলের সম্মেলন নিয়ে তোড়জোড় চলছে ব্যাপক। অতীতের যে কোনো সম্মেলনের তুলনায় এবারের চাকচিক্য, বিলাসিতা কিংবা ঢাকঢোল বেশি। অনেকদিন ধরেই আওয়ামী লীগ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। গত কিছুদিন ধরে প্রায় প্রতিদিনই সম্মেলনের নানা দিক নিয়ে গণমাধ্যমে শিরোনাম হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের সম্মেলন এমনিতেই জাঁকজমকপূর্ণ হবে এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু প্রশ্ন সামনে আসছে বারবার ; রাজনৈতিক দলের সম্মেলনে জাতির কী যায় আসে? জাতীয় রাজনীতিতে কোনো পরিবর্তন আসে কি? বা সাধারন মানুষের ভাগ্যের কি কোন পরিবর্তন ঘটে একটা দলের সম্মেলনের মাধ্যমে?
ছয় মাস আগে বাংলাদেশের আরেক বৃহৎ রাজনৈতিক দল বিএনপিরও জাতীয় সম্মেলন হয়েছে; তাতে রাষ্ট্রের বা জনগণের কী এমন এসেছে বা গেছে? বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বা যে রাজনৈতিক সংস্কৃতির মধ্যে আমরা বাস করছি তাতে এসব প্রশ্ন উঠতেই পারে। যে কেউই প্রশ্ন তুলতে পারেন, রাজনৈতিক দলের সম্মেলন কি দিনকেদিন গুরুত্ব হারাচ্ছে? এ প্রশ্নটাও সামনে আসতে পারে।
আপাতদৃষ্টিতে দেখলে তা-ই মনে হবে। যে দেশে প্রধান দুটি দলের শীর্ষ নেতা তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হচ্ছেন এবং দলের অন্যান্য নীতি নির্ধারক কারা হবেন সেটিও যেখানে এক ব্যক্তিই ঠিক করে দেন, সেখানে নেতৃত্বের বিকাশ নিয়ে কথা ওঠা খুবই স্বাভাবিক। দলের ঘোষণাপত্রে যা উল্লেখ করা হয় তা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী ইশতেহারও করা হয়। কিন্তু ক্ষমতায় গিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয় না। আবার যে নীতি-আদর্শ দলের কাউন্সিলররা ঠিক করে দেন সেই পথে দলগুলো সবসময় চলে না। এসব কারণে দলের জাতীয় সম্মেলন অনেকটা আলঙ্কারিক হয়ে উঠেছে।
তবে এত প্রশ্ন ওঠার মধ্য দিয়েও আমরা যদি স্বাধীনতা-পূর্ব আওয়ামী লীগের আটটি সম্মেলনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখতে পাই– রাষ্ট্র গঠন, জাতি গঠন কিংবা জাতীয়তাবাদ সৃষ্টিতে দলটির কাউন্সিল বিশেষ ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের ইতিহাস বাংলাদেশের জন্মের ইতিহাসেরই কথা বলে।
আবার স্বাধীনতা-পরবর্তী দলটির ১১টি সম্মেলন কখনও ক্ষমতায় থেকে, কখনও সামরিক শাসনামলে আবার কখনও সরকারি দলের নির্যাতনের মুখে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সম্মেলন বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ারই কথা বলেছে। যদিও দলটি নানা সময়ে বিচ্যুত হয়েছে, পথ হারিয়েছে, আদর্শিক দ্বন্দ্বে পড়েছে এবং কখনও কখনও তাদের মূল চরিত্রের বিরুদ্ধেও গেছে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত দলটিকে কর্মীরাই সঠিক পথে চালিত করেছে।
১৯৪৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত যে ১৯টি সম্মেলন হয়েছে এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দল এমন সব গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যা পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রের নীতিতে পরিণত হয়েছে। প্রতিষ্ঠার এই ৬৭ বছরে প্রায় ৩০ বছর সামরিক বা অনির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় ছিল। এ সময়ের মধ্যে ক্ষমতাসীন অবস্থায় আওয়ামী লীগ সম্মেলন করেছে ছয়বার আর ১৩টি সম্মেলন হয়েছে বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়।
প্রচণ্ড বৈরী পরিবেশে ১৯৪৯ সালে কর্মী সম্মেলনের মধ্য দিয়ে ঢাকায় আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি আত্মপ্রকাশ করে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগেরই একটি প্রগতিশীল অংশ এ সম্মেলনের আয়োজন করে। ১৯৫৩ সালে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সম্মেলন ছিল নির্বাচন সামনে রেখে। ওই সম্মেলনে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ‘যুক্তফ্রন্ট’ গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং ২১ দফা কর্মসূচির খসড়া চূড়ান্ত হয়। ১৯৫৫ সালে তৃতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলররা ঠিক করেন, রাজনৈতিক দল হবে সব ধর্মের মানুষের জন্য। তাই ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ হয়ে ওঠে ‘আওয়ামী লীগ’।
চতুর্থ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৫৭ সালে, টাঙ্গাইলের কাগমারিতে। তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায়। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রথম সম্মেলনেই কাউন্সিলররা সিদ্ধান্ত নেন– দলের কোনো নেতা একই সঙ্গে দলের কর্মকর্তা ও মন্ত্রিত্বে থাকতে পারবেন না। দল চালাবে এক গ্রুপ, আরেক গ্রুপ চালাবে সরকার।
’৬৪ সালে আইয়ুব খানের সামরিক শাসনামলে আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। ১৯৬৬ সালের ষষ্ঠ সম্মেলনে বাঙালির স্বাধীনতার সনদ ৬ দফার পক্ষে রায় দেন কাউন্সিলররা। এই সম্মেলনেই শেখ মুজিবুর রহমান সভাপতি নির্বাচিত হন। ’৭০ সালে অষ্টম সম্মেলনে ৬ দফা ও ১১ দফা গ্রহণ করে আওযামী লীগের কাউন্সিলরা দলকে নির্বাচনের জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন এবং বিজয়ী হয়ে স্বাধীনতার দিকে আরেক ধাপ এগিয়ে যান।
নবম সম্মেলনটি হয় স্বাধীন বাংলদেশে, ১৯৭২ সালে। অর্থমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ায় সাধারণ সম্পাদকের পদ ছেড়ে দেন তাজউদ্দীন আহমদ। বঙ্গবন্ধুর জীবনের শেষ সম্মেলনটি হয় ১৯৭৪ সালে। দশম এ সম্মেলনে সভাপতি পদ ছেড়ে দেন ‘বঙ্গবন্ধু’ থেকে ‘জাতীর জনক’ হয়ে ওঠা শেখ মুজিব।
বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেনারেল জিয়ার সামরিক শাসনামলে আওয়ামী লীগকে পুন:জ্জীবিত করতে দুই বার সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ১৯৮১ সাল থেকে আওয়ামী লীগে শুরু হয় শেখ হাসিনার আমল। ’৮১ সালে ১৩তম সম্মেলনে দলের অনেকেরই ধারণা ছিল আওয়ামী লীগ দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবে। সম্মেলনের শেষ দিনে দলীয় প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার নাম প্রস্তাব করা হলে কাউন্সিলররা সর্বসম্মতভাবে তা গ্রহণ করেন।
জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনামালে একবারই আওয়ামী লীগ সম্মেলন করেছে, ১৯৮৭ সালে। সেটা ছিল ১৪তম সম্মেলন। দ্বিতীয় দফায় গণতন্ত্রে উত্তরণের পর অর্থাৎ, সামরিক একনায়ক জেনারেল এরশাদের পতনের পর বিএনপির আমলে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত হয় ১৫তম সম্মেলন। এ সম্মেলনে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পটভূমিতে আওয়ামী লীগ সমাজতন্ত্র থেকে সরে এসে ‘মুক্তবাজার অর্থনীতি’ গ্রহণ করে এবং ঘোষণাপত্র ও গঠনতন্ত্রে সংশোধনী আনে।
আওয়ামী লীগের জন্মের পর তৃতীয় দফা এবং স্বাধীন দেশে দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে ১৬তম সম্মেলন করে ১৯৯৭ সালে। এরপর বিএনপির আমলে ২০০২ সালে হয় ১৭তম সম্মেলন। আবারও ক্ষমতাসীন হয়ে সাত বছরের মাথায় আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ১৮তম এবং ২০১২ সালে ১৯তম সম্মেলনের আয়োজন করে।
এই ১৯টি সম্মেলনের কার্যক্রম সংক্ষিপ্তভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর জোর দিয়ে ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে দলটি। তখন দলটির প্রধান দাবি ছিল, রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার প্রবর্তন, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং দুই পাকিস্তানের বৈষম্য দূরীকরণ।
মূলত আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিলো দেশে একটি বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তার তাগিদ থেকে। ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগের একদল নেতাকর্মীই উপলব্ধি করেন, দেশে একটি বিরোধী দল প্রয়োজন। একটি কার্যকর বিরোধী দল যে গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত, সেটি ’৪৯ সালে কারাগারে বসেই বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন।
তিনি আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন প্রসঙ্গে আত্মজীবনীতে লিখেছেন–
“আমার সাথে যোগাযোগ করা হয়েছিল, আমার মত নেওয়ার জন্য, আমি খবর দিয়েছিলাম, আর মুসলিম লীগ করে লাভ নাই, এ প্রতিষ্ঠান এখন গণবিচ্ছিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এরা আমাদের মুসলিম লীগে নিতে চাইলেও উচিত হবে না। কারণ, এরা কোটারি করে ফেলেছে, একে আর জনগণের প্রতিষ্ঠান বলা চলে না। এদের কোন কর্মপন্থা নাই। আমাকে আরো জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আমি ছাত্র প্রতিষ্ঠান করব নাকি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন হলে তাতে যোগদান করব? আমি উত্তর পাঠিয়েছিলাম, ছাত্র রাজনীতি আমি করব না, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানই করব। কারণ, বিরোধী দল সৃষ্টি করতে না পারলে এ দেশে একনায়কত্ব চলবে।”
৬৭ বছর আগে বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন, বিশেষ করে দল ক্ষমতাসীন হলে যে গণবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে এবং এর পরিনতি কী হতে পারে। একই সঙ্গে বিরোধী দল গঠন না হলে যে একনায়কত্ব চালু হয়ে যেতে পারে, সেটাও তিনি পরিস্কার ভাষায় বলে দিয়েছেন। আজকের আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এ দুটি বিষয় অনুভব করেন কি না, সে প্রশ্ন যে কেউ তুলতেই পারেন।
দ্বিতীয় সম্মেলনে (১৯৫৩ সালে) যে ২১ দফার অনুমোদন আওয়ামী লীগের কাউন্সিল থেকে করা হয়েছিল, তা না হলে মুসলিম লীগকে তাড়ানোই সম্ভব হত না। ওই ২১ দফা যে কতটা তাৎপর্যপূর্ণ ছিল সেটা পরবর্তী ইতিহাসই বলে দেয়। তৃতীয় সম্মেলনে ১৯৫৫ সালে আওয়ামী লীগ রাজনীতি থেকে সাম্প্রদায়িকতার বিদায় দেয়। কিন্তু আজ এত বছর পর ধর্মের মঞ্চে যেমন রাজনৈতিক বক্তৃতা দেওয়া হচ্ছে তেমনি রাজনৈতিক মঞ্চে ধর্মের বয়ান দেওয়া হচ্ছে।
এখনকার আওয়ামী লীগকে মাঝে মাঝেই ধর্মকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। তার জ্বলজ্যান্ত উদাহরণ ওলামা লীগ। এছাড়াও মূল আওয়ামী লীগও ধর্মকে নিয়ে বেশ রাজনীতিতে মেতে উঠেছে যা অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগের চরিত্রের সাথে সাংঘর্ষিক।
উল্লেখ্য যে, ১৯৫৭ সালে চতুর্থ সম্মেলনে যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেন আওয়ামী লীগের কাউন্সিলররা-“যারা দলের কর্মকর্তা হবেন তারা সরকারে থাকতে পারবেন না।” এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩৭ বছর বয়সী শেখ মুজিব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালনকেই গুরুত্বপূর্ণ মনে করেন।
৬০ বছর আগে আওয়ামী লীগ যে সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছিল আজকের বাস্তবতায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া কেন সম্ভব না, তার নানাবিধ কারণ থাকতে পারে। যদিও দলের প্রধান বঙ্গবন্ধুরই কন্যা শেখ হাসিনা একাধিকবার বলেছেন, নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করলে তিনি খুশিই হবেন।
’৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু যেমন মন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিয়ে দল গঠনে ব্যস্ত হন, তেমনি ’৭৪ সালে দশম সম্মেলনে দলের পদ ছেড়ে দিয়ে তিনি দেশ গঠনেও ব্যস্ত হন। বর্তমানে সেই রকম চিন্তা আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব করতে চাইলেও দলের নেতাকর্মীরা তা মানবেন কি না, সেটাও দেখার বিষয়। দলের ২০তম সম্মেলনে গঠনতন্ত্রে ওই ধারা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব করার দুঃসাহস হয়তো কোনো কাউন্সিলর দেখাবেন না। আর এমন ধারা যুক্ত করতে হলে শেখ হাসিনার ইঙ্গিতেই করতে হবে, এটাই এখন বাস্তবতা।
আবার ’৬৬ সালের ষষ্ঠ সম্মেলনে ব্যাপক প্রচার ছিল ৬ দফার বিপক্ষে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলররা শেখ মুজিবের ৬ দফার পক্ষেই সায় দেন। দলের অনেক বড় বড় নেতা প্রচার চালিয়েছিলেন ৬ দফার বিপক্ষে, কিন্তু সঠিক পদক্ষেপই নেন কাউন্সিলররা। সেই সম্মেলনে যদি দলের সিনিয়র অনেক নেতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে কাউন্সিল ৬ দফার অনুমোদন না দিতেন তাহলে স্বাধীনতার আন্দোলনও যে পিছিয়ে যেত। ওই সম্মেলনই শেখ মুজিবকে সভাপতি নির্বাচিত করে। এবং তিনি সারা দেশে ৬ দফার পক্ষে প্রচার শুরু করেন, যা হয়ে ওঠে বাঙালির স্বাধীনতার সনদ।
ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা আন্দোলনে আওয়ামী লীগের কাউন্সিলররা সবসময় সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। আবার সামরিক শাসনের জাঁতাকলে যখন দল ভেঙে যায় যায় তখনও আওয়ামী লীগের কাউন্সিলররা নেতৃত্ব নির্বাচনে ভুল করেননি। বঙ্গবন্ধু ’৫৩ সাল থেকে ’৬৬ সাল এই ১৩ বছর সাধারণ সম্পাদক এবং ’৬৬ থেকে ’৭৪ সাল এই আট বছর দলের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন।
তাঁরই কন্যা শেখ হাসিনা ’৮১ সালে দলের হাল ধরার পর ১৯৮৭, ১৯৯২, ১৯৯৭, ২০০২, ২০০৯ এবং ২০১২ সালের সম্মেলনে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আওয়ামী লীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। কাউন্সিলররা সবাই তাঁর হাতেই সর্বময় ক্ষমতা তুলে দেন। এই ৩৫ বছর একই পদে থেকে তিনি এখন বলতে শুরু করেছেন, “আর কত? এবার নতুন নেতা নির্বাচিত করুন।”
দলের ২০তম সম্মেলনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বের প্রশ্নে কোনো চমক দেবেন কি না, সেটাই দেখার বিষয়। তবে শীর্ষ নেতৃত্বে চমক দেয়ার মত কোন বিষয় রয়েছে বলে মনে করার কোন কারন নাই। একানব্বইয়ের মতই এই সময়েও শেখ হাসিনার রিপ্লেসমেন্ট কেউ আছে বলে বিশ্বাস করার মত কোন উপাদানও নেই। দলে শেখ হাসিনা এখনো পর্যন্ত অদ্বিতীয়। আর এজন্যই আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার কাছে এই দলের সাধারন কর্মীদের আর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার কাছে সাধারন মানুষের প্রত্যাশার শেষ নেই। শেখ হাসিনা কি পারবেন দলীয় প্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হিসেবে আলাদা আলাদা করে সাধারন কর্মী এবং সাধারন মানুষের প্রত্যাশাগুলোকে অ্যাড্রেস করতে?
এক্ষেত্রে কোন কোন রাজনৈতিক বোদ্ধা হয়ত দলে শেখ হাসিনার ‘একচ্ছত্র আধিপত্যকে’ নেতিবাচকভাবে ব্যাখ্যা করতে চাইবেন। কিন্তু পাশাপাশি এটিও মনে রাখা জরুরী যে এখনও পর্যন্ত দলের যে অবস্থা তাতে শেখ হাসিনা ছাড়া দলের ঐক্য হুমকির মুখে পড়তে পারে। তবে শেখ হাসিনাকে এটিও মনে রাখতে হবে নেতৃত্বের বিকাশ না হলে আওয়ামী লীগ মুখ থুবড়ে পরবে। শেখ হাসিনার অবর্তমানে বিকল্প নেতৃত্বের ইঙ্গিত এই সম্মেলনের মাধ্যমেই দিতে হবে।
আবার দলটি যে নীতি আদর্শের ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল সেখান থেকে কিছুটা দূরে সরে গেছে বলেই প্রতীয়মান হচ্ছে।সেদিকেও মনযোগ দিতে হবে। বর্তমানে খুব শক্তিশালী অবস্থান থাকা দেশের প্রাচীন এই দলের ২০তম সম্মেলনে প্রত্যাশা থাকবে– মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা, সব ধর্ম, বর্ণ ও নৃ-গোষ্ঠীর সমান অধিকার নিশ্চিত করে অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পদক্ষেপ গৃহীত হবে। আরও প্রত্যাশা থাকবে মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করে নাগরিকদের মানবিক মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর পাশাপাশি উদার গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে জোরালো ভূমিকা রাখবে আওয়ামী লীগ। এটি গেল একজন সাধারন মানুষ হিসবে আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে প্রত্যাশার কথা।
আর এদেশের বেশীরভাগ মানুষের আরেকটি বড় দাবী হলো অসাম্প্রদায়িক আওয়ামীগকে অবশ্যই মৌলবাদ আর জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘস্থায়ী লড়াইয়ের একটি পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে। শুধুমাত্র পুলিশ আর র্যাব দিয়ে জঙ্গীবাদ রুখা যাবে না। এক্ষেত্রে দীর্ঘস্থায়ী একটি লড়াইয়ের সূচনা করতে হবে। সেক্ষেত্রে দেশের বড় আরেকটি রাজনৈতিক দল বিএনপিকে আস্থায় নিতে হবে যেকোন মূল্যে।
আদর্শিক দিক থেকে বিএনপি কখনোই জঙ্গীবাদী দল নয়। হয়ত ভুল রাজনৈতিক চালে পড়ে কাঁটা খেয়ে কাঁটা হজম করতে চেয়েছিলো। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা পারে নি। হয়ত এখন সে ভুলটা ভেঙেছে। এমতাবস্থায় বিএনপিকে আস্থায় নিতে পারলে বিএনপিও হয়ত একটি বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হবে না। আমার ধারনা বিএনপিও প্রস্তুত জঙ্গীবাদকে লড়াই করতে।কারন এই ভূখন্ডে জঙ্গীবাদ আওয়ামী লীগ বা বিএনপি কারো জন্যই সুখকর হবে না। আর এই মুহূর্তে এই লড়াইটা আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি মিলে শুরু করতে পারলে সাম্প্রদায়িক আর জঙ্গীবাদী গোষ্ঠীগুলোর ভিত্ততে বড় একটি ধাক্কা হবে বলে মনে করেন এদেশের  শান্তিপ্রিয় সমস্ত মানুষ।
তবে সবশেষে যদি সম্মেলনকে ঘিরে অাওয়ামী লীগের বর্তমান রাজনীতির গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে একটু আলোকপাত করি সেখানে একটি হতাশাজনক চিত্র ফুটে উঠতে পারে। এবং এই মুহুর্তে আওয়ামী লীগ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য এটি সবচেয়ে বড় চ্যালেন্জও বটে। সমস্যাটা হলো এই মুহুর্তে  ‘আওয়ামী লীগে’ ভরে গেছে  সারা দেশ। মাঠে ঘাটে বন-বাদারে যেখানে সেখানে অাওয়ামী লীগ আর অাওয়ামী লীগ। এক একজন নিজেদের বড় বড় নেতাও দাবী করছেন।
বিভিন্ন কমিটিতে পদ পদবী তৈরী করে নিচ্ছেন নিজেরাই! অার এদের দাপটে অভিমানে দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন বা নিজেকে গুটিয়ে ফেলছেন শত শত ত্যাগী কর্মী যাঁদের ভিত্তির উপরে দাঁড়িয়ে আজকের আওয়ামী লীগ এবং অাজকের বিশ্ব পরিমন্ডলে গুরুত্বপূর্ন নেতা শেখ হাসিনা। এই সম্মেলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ বা শেখ হাসিনা কি পারবেন এই আগাছাগুলো ছেঁটে ফেলতে বা ত্যাগী অভিমানী মুখগুলোকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে কোন কর্মকৌশল গ্রহন করতে? সেটা না পারলে আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনাকে ভবিষ্যতে চরম মূল‌্য দিতে হতে পারে! সুতরাং সাধু সাবধান!
লেখক
এম.এ.সাঈদ শুভ
গবেষক, ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ সটাডিজ
ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com

slide