ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
কে হচ্ছেন অাওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারন সম্পাদক? সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম না ওবায়দুল কাদের? এই প্রশ্নটি শুধু আওয়ামী রাজনীতি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মাথায়ই ঘুরপাক খাচ্ছে না। এই প্রশ্নটি বিএনপি এবং অন্যান্য রাজনৈতিক দল সংশ্লিষ্ট লোকজনসহ অনেক রাজনীতি সচেতন সাধারন নাগরিকদেরও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
কারনটা হলো বর্তমানে আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের সবচেয়ে বৃহত্তম একটি রাজনৈতিক দল। আবার ক্ষমতাসীন দলও। যেহেতু দলটির সর্বোচ্চ শীর্ষ পদটির বিকল্প এখন পর্যন্ত কেউ নেই সেহেতু ঐ পদ সম্পর্কে সবাই নিশ্চিত। সেক্ষেত্রে দলটির দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদটি নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকবে সেটাই স্বাভাবিক।
এবার মূল আলোচনায় আসা যাক। আশরাফ না কাদের? একটু পেছনের ইতিহাসটা দেখে আসি। ওয়ান-ইলেভেনের পর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০০৯ সালের ২৪ জুলাই অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে প্রথম সাধারণ সম্পাদক হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এমনিতে ‘তথাকথিত মাঠের রাজনীতি বা মিডিয়া রাজনীতিতে’ তাঁর তেমন ভূমিকা নেই, তবে ওয়ান-ইলেভেনের সময় জিল্লুর রহমানের পাশে সৈয়দ আশরাফের অনমনীয় ভূমিকা অনেক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করে আওয়ামী লীগকে। তাই তার সাধারণ সম্পাদক হওয়াটা অনেকটা শেখ হাসিনার সভাপতি হওয়ার মতই নিশ্চিত ছিল।
তবে ২০১২ সালের কাউন্সিলে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সৈয়দ আশরাফের পাশে উঠে আসে ওবায়দুল কাদেরের নাম। তবে সৈয়দ আশরাফই টানা দ্বিতীয়বার সাধারণ সম্পাদক হন। এবারও কাউন্সিলের আগেও উঠে আসে ওবায়দুল কাদেরের নাম। ওবায়দুল কাদের কৌশলে প্রায় প্রতিদিনই নিজের নামটি আলোচনায় রাখেন। প্রতিদিনই তিনি বলছিলেন, আমি প্রার্থী নই, কাউকে প্রার্থী বানাবেন না.. ইত্যাদি ইত্যাদি।
তিনি বলেছেন পদ নিয়ে তাঁর কোন মাথা ব্যথা নেই কিন্তু আবার প্রধানমন্ত্রীর সবুজ সংকেতের কথাও বললেন। এটা অনেকটা মিডিয়া রাজনীতির বড় একটা চাল। এতকিছুর পরও সৈয়দ আশরাফই আবার সাধারণ সম্পাদক হচ্ছেন, এমনটাই ছিল সবার ধারণা। কিন্তু শেষ মুহূর্তে পাল্টে গেছে হাওয়া। কাউন্সিলের দু’দিন আগে বুধবার সন্ধ্যায় গণভবনে শেখ হাসিনার সাথে ওবায়দুল কাদেরের একান্ত বৈঠকের পর বাতাসে ভাসতে থাকে, ওবায়দুল কাদেরই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক।
ওবায়দুল কাদের ক্যারিয়ার পলিটিশিয়ান। ছাত্রজীবন থেকেই তিনি রাজনীতিতে সক্রিয় থেকেছেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময় আটক অবস্থায় শেখ হাসিনার বিপক্ষে কথা বলে একটু পিছিয়ে পড়েছিলেন। ২০০৯ সালের প্রথম মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পাননি। তবুও লেগেছিলেন। ফল পেয়েছেন।
পরে হলেও মন্ত্রিসভায় ঠাঁই পেয়ে সক্রিয়তায় সবাইকে ছাড়িয়ে যান। যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে নানা অভিযানে এক ধরনের চমক তৈরি করেন, যা অনেকে পছন্দ করেছেন। তার চেষ্টায় দেশের অবকাঠামো খাতে বৈপ্লবিক উন্নতি হয়েছে, হচ্ছে। দলের নেতাকর্মীদের সাথে তার যোগাযোগ দীর্ঘদিনের নিবিড়। দলে তার দারুণ জনপ্রিয়তাও আছে।
তবে সৈয়দ আশরাফ অন্য ঘরানার মানুষ। সাধারণ আওয়ামী লীগারদের মত নন। তিনি অনেকটা প্রচারবিমুখ তো বটেই, কর্মীদের অভিযোগ তিনি কর্মীবিমুখও। সারাবছর তার বিরুদ্ধে সবাই সোচ্চার, তিনি সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দলকে যথেষ্ট সময় দেন না, মন্ত্রী হিসেবে সরকারেও সরব নন। তবে সৈয়দ আশরাফের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি , তিনি অন্যদের মত দিনরাত পড়ে না থাকলেও দরকারি সময়টুকু ঠিকই দেন, দরকারি কাজটা সময়মতই করেন, তার মন্ত্রণালয়ে কোনো ফাইল আটকে থাকে না। কিন্তু অপ্রয়োজনে দলের অফিসে বা সচিবালয়ে গিয়ে তদবিরবাজদের ভিড় সামলানো তার কাজ নয়।
তার গুটিয়ে থাকা নিয়ে সমালোচনা থাকলেও; তার যোগ্যতা নিয়ে, দক্ষতা নিয়ে, সততা নিয়ে, আনুগত্য নিয়ে, বিশ্বস্ততা নিয়ে, দৃঢ়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। ওয়ান-ইলেভেনের সময় বা হেফাজতের ৫ মের তাণ্ডবের সময় তার দৃঢ়তায় দেশ ও দল বেঁচে গেছে বার বার। আসলেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফের মত চরিত্র বিরল, হয়তো কারো কারো জন্য ‘বেমানানও’। সৈয়দ আশরাফের পিতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম জীবন দিয়েছেন দলের জন্য, বঙ্গবন্ধুর জন্য তার ভালোবাসার প্রমাণ দিয়ে গেছেন। শুধু সৈয়দ নজরুল নন, ৭৫’র ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার পরিবারই পরীক্ষিত।
সৈয়দ আশরাফ ছোট বেলা থেকেই দেখেছেন রাজনীতির জন্য কিভাবে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়। পিতাকে দেখে তিঁনি বুঝেছিলেন সততা আর বিশ্বাস কখনও পরাজিত হয় না। পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করেই রাজনীতিতে অভিষেক হয় সৈয়দ আশরাফের। ছাত্রলীগেই তার রাজনীতির হাতেখড়ি। স্বাধীনতার পর তিঁনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক, পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক হিসাবেও দায়িত্ব পালন করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
জেলখানায় সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ জাতীয় চার নেতাকে হত্যার পর লন্ডনে চলে যান সৈয়দ আশরাফ। আর সেখানেও আওয়ামী লীগে সক্রিয় ছিলেন তিঁনি। পরে ১৯৯৬ সালে দেশে ফিরে কিশোরগঞ্জ-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার ওই সরকারে বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী হন শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম।
তিঁনি পুনরায় ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত পররাষ্ট্র বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন। ২০০৮ সালের সাধারণ নির্বাচনেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী ২০১৪ সালে টানা দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠনের পরও দলে নিজের সবচেয়ে বিশ্বস্থ হিসেবে পরিচিত আশরাফকে সরকারের একই দায়িত্ব দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা।
২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বন্দি হওয়া এবং প্রভাবশালী কয়েকজন নেতার উল্টোযাত্রা ও দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল জলিলের কারাবন্দির মধ্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে বর্ষিয়ান নেতা তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত সভাপতি জিল্লুর রহমানের পাশে থেকে সহযোগিতা করেন এবং শক্ত অবস্থান নিয়ে দলের ভেতরের ও বাইরে সংকটময় পরিস্থিতি মোকাবেলা করেন। বিরূপ পরিস্থিতি সামাল ও দলের ক্রান্তিকালে অসাধারণ রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়ে দলীয় সভানেত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পূর্ণ আস্থা অর্জন করেন সৈয়দ আশরাফ।
দেশে বিডিআর বিদ্রোহ, হেফাজতে ইসলামের উত্থান-বর্বরতা সামাল দেওয়া এবং বিএনপিকে বাদ দিয়েই নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়ার ক্ষেত্রে আশরাফের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা শুধু আওয়ামী লীগেই আলোচিত নয়, গোটা রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের মেধা, প্রজ্ঞা আর বিচক্ষনতায় উচ্চ শিখরে নিয়ে গেছেন নিজেকে। সুতরাং সৈয়দ আশরাফরা পরিক্ষীত। ধীরে ধীরে দলের জন্য হয়ে উঠলেন একজন ক্রাইসিস ম্যান।
এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, অভিমান করে সোহেল তাজের সরে যাওয়া যেমন দলের জন্য ভালো হয়নি, তেমনি সৈয়দ আশরাফকে সরিয়ে দিলেও ভালো থাকবে না আওয়ামী লীগ। হয়তো হাইব্রিড, ধান্দাবাজ নেতাকর্মীদের একটু অসুবিধা হবে; তবে সৈয়দ আশরাফ-সোহেল তাজরা পাশে থাকলে শেখ হাসিনা নিশ্চিন্তে থাকতে পারেন।
 তবে কে হচ্ছেন অাওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারন সম্পাদক? এই প্রশ্নের উত্তর জানা খুবই সোজা তাদের পক্ষে যারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনীতির গতি প্রকৃতি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল। শেখ হাসিনা তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বেশ কয়েকবার হোঁচট খেয়েছেন। বড় বড় ধাক্কা সামাল দিয়েছেন। শুধু বাংলাদেশের নয়, শেখ হাসিনাকে দক্ষিন এশিয়ার একজন পরিপক্ক রাজনীতিবিদ হিসেবে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকগণ।
তাঁর বাবার মতই শেখ হাসিনা অাওয়ামী লীগকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি ভালবাসেন। তার নজির ইতোমধ্যেই স্থাপন করেছেন। আর সেই দলের সাধারন সম্পাদকের পদটি কার কাছে বেশি নিরাপদ সেটা অাওয়ামী লীগের আর কেউ না জানলেও শেখ হাসিনা ভাল করেই জানেন। সেদিক থেকে বিবেচনা করলে সৈয়দ আশরাফের চেয়ে সৎ, বিশ্বশ্ত এবং নিরাপদ কেউ আছেন বলে মনে হয় না।
তবে নি:সন্দেহে গত কয়েক বছরে ওবায়দুল কাদেরও সাংগঠনিকভাবে বেশ শক্তি-সামর্থ্য অর্জন করেছেন। জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। মিডিয়া রাজনীতিতেও এগিয়ে। আওয়ামী লীগ-ছাত্রলীগ-যুবলীগে বিরাট একটি বলয় গড়ে তুলেছেন। এই বলয়কে কাজে লাগিয়ে তিনিও সাধারন সম্পাদকের পদটি অলংকৃত করতে চাইবেন সেটিই স্বাভাবিক।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তিনি কি তা পারবেন? তাঁর এক-এগারোর বিতর্কিত ভুমিকা কি তাঁকে পেছন থেকে টেনে ধরতে চাইবেন না? আর শেখ হাসিনা কি আস্থা রাখতে চাইবেন কাদেরের উপর? উত্তর সম্ভবত না। কারনট হলো আশরাফ পরিক্ষীত। হয়ত তাঁকে নিয়ে ছোট-খাটো কিছু সমালোচনা থাকতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগের প্রতি অকৃত্রিম ভালবাসা আর বিশ্বস্ততার প্রশ্নে সৈয়দ আশরাফ অনেক এগিয়ে।
এক্ষেত্রে এটা সহজেই অনুমেয় যে, সৈয়দ আশরাফই হচ্ছেন আওয়ামী লীগের পরবর্তী সাধারন সম্পাদক! তারপরও অপেক্ষা করতে হবে আনুষ্ঠানিক ঘোষনা পর্যন্ত। কারন রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এখানে সম্স্ত হিসেব-নিকেশ মুহূর্তের মধ্যেই উল্টে যেতে পারে! আর এত জাঁকজমকের কাউন্সিলের আগেই যদি সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক ঠিক হয়ে যায়, তাহলে আর কাউন্সিলের দরকার কি?
এম.এ. সাঈদ শুভ
সাংবাদিক ও গবেষক
ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com