ক্যাটেগরিঃ রাজনীতি

 
সৈয়দ আশরাফুল ইসলামকে কেন এভাবে বিদায় নিতে হলো? তাঁকে কেনই বা এতটা বিব্রত হতে হলেন? হঠাৎ গুঞ্জন উঠলো সাধারন সম্পাদক পদে সৈয়দ আশরাফের স্থলে ওবায়দুল কাদের আসছেন। এই গুঞ্জনটা শুরু হয় গত বুধবার রাত থেকেই। এর মধ্যে বৃহস্পতিবার ওবায়দুল কাদের নিজে গণমাধ্যমকে জানান, দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনা তাঁকে সাধারণ সম্পাদকের পদের জন্য প্রস্তুতি নিতে পরামর্শ দিয়েছেন।
তিনি আরো বললেন, ‘আকাশে চাঁদ উঠলে সবাই দেখতে পাবে।’ এ কথা বলার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক রসাত্মক আলোচনা শুরু হয়। এ আলোচনায় দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ এতটাই বিব্রত হলেন শেষ পর্যন্ত গণমাধ্যমকে বলেই ফেললেন, ‘সকল জল্পনাকল্পনা ভুয়া প্রমাণিত হবে। কি চমক থাকবে সেটা আমি আর নেত্রী ছাড়া কেই জানেন না।’
তারপর সবশেষে প্রতীয়মান হলো সৈয়দ আশরাফ নিজেই জানতেন না চমক সম্পর্কে। জানলে হয়ত উনাকে এতটা বিব্রত হতে হতো না। তাহলে প্রশ্নটা হলো সৈয়দ আশরাফকে কেন এতটা বিব্রত হতে হলো? কেনই বা তাঁকে এভাবে বিদায় নিতে হলো?
এই প্রশ্নের উত্তর শুরু করছি আওয়ামী লীগের প্রবীন একজন নেতার বক্তব্য দিয়ে। “নাম প্রকাশ না করার শর্তে দলের একজন প্রবীণ নেতা প্রথম আলোকে বলেন, সৈয়দ আশরাফের মতো নেতাকে আরেকটু সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়া যেত। নেতাদের মুখে, গণমাধ্যমে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেভাবে বিষয়টি আগেভাগে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, তাতে আশরাফ কিছুটা বিব্রত হয়েছেন।” (প্রথম আলো ২৪.১০.২০১৬)
সৈয়দ আশরাফকে অন্তত আরেকটু সম্মানজনকভাবে বিদায় দেয়া যেত কি না? হয়ত অবশ্যই যেত। কিন্তু কেন সেটা করা গেল না? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে হলে নিম্নের এই বিষয়গুলোকে বিশ্লেষণ করে একটা উত্তর পাওয়া যেতে পারে।
প্রথমত, মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়ালকে দুই আনার মন্ত্রী বলে উপহাস করে সমালোচনার মুখে পড়েন। এ ছাড়া সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনাকেও সৈয়দ আশরাফ ‘কাজের বুয়া মর্জিনা’ বলে উপহাস করেন।
দ্বিতীয়ত, চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ সফরে তাঁর অগ্রণী ভূমিকা ছিল।
তৃতীয়ত, চীনের প্রেসিডেন্ট এর সাম্প্রতিক এই সফর এবং দ্বিপক্ষীয় চুক্তি দুটি দেশের পছন্দ হয় নি। পরে সৈয়দ আশরাফকে ব্যখ্যা দিতে হয়েছে এভাবে, ‘আমরা শুধু চীনের সাথে নয় ভারতের সাথেও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বৃদ্ধি করতে চাই।’
চতুর্থত, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল—জাসদের ভূমিকা নিয়ে গত আগস্টে দেওয়া সৈয়দ আশরাফের বক্তব্যে। তিনি বলেছিলেন, ‘জাসদ বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরিবেশ তৈরি না করলে দেশ অনেক আগেই উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত হতো। জাসদ থেকে মন্ত্রী করায় আওয়ামী লীগকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে বলেও মত দেন তিনি।’
পঞ্চমত, ২০১৩ সালের ৫ মে ঢাকার শাপলা চত্বরে অবস্থান নেওয়া হেফাজতে ইসলামের উদ্দেশে সৈয়দ আশরাফ ঘোষণা দেন, ‘এই হেফাজতিদের কোনোভাবেই ওখানে থাকতে দেওয়া হবে না।’ ৬ মে ভোররাত থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপারেশন চালিয়ে হেফাজতে ইসলামকে উৎখাত করে।
প্রচলিত আছে, সৈয়দ আশরাফই হেফাজতের উৎখাতে সবচেয়ে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলো। কিন্তু তাঁর এই ভূমিকা একটি প্রভাবশালী মুসলিম দেশসহ আরো কয়েকটি ‘মাতব্বর দেশের’ পছন্দ হয় নি। তারা হয়ত চেয়েছিলো আরেকটু খেলা দেখতে।
ষষ্ঠত, এক-এগারোর কুশীলবদের দৃশ্যমান ভূমিকা এখানে প্রত্যক্ষ করা গেছে। যারা গত কয়েকদিন বাংলাদেশের একটি প্রভাবশালী পত্রিকার ভূমিকা খেয়াল করেছেন তারা বিষয়টি বুঝতে পারবেন খুব সহজেই। এই সরল বিশ্লেষণীটা ভালভাবে খেয়াল করলে উপর্যুক্ত প্রশ্নটির উত্তর পাওয়া খুবই সহজ।
সৈয়দ আশরাফ, এ এইচ এম খাইরুজ্জামান লিটন, সোহেল তাজরা রাজনীতিতে কিছুটা ‘আনস্মার্ট’ হতে পারেন বা ছোটখাটো বেশ সমালোচনা থাকতে পারে, তবে অাওয়ামী লীগের জন্য তাঁরাই সবচেয়ে নিরাপদ। এটা পরীক্ষিত। তাদের পূর্বপুরুষরাও এই পরীক্ষায় সফলভাবে উত্তীর্ন হয়েছেন।
তারপরও কর্মদ্যোমী নতুন সাধারন সম্পাদকের প্রতি শুভেচ্ছা। পেশাগত কারনে দু-একবার উনার সাথে কথা বলার সুযোগ হয়েছিলো। তাঁর কর্মস্পৃহা সম্পর্কে কোন সন্দেহ নেই। নি:সন্দেহে একজন কর্মঠ মানুষ। তাই তাঁর প্রতি মানুষের প্রত্যাশাও বেশি।
আর এত বড় একটি দলের সাধারন সম্পাদকের প্রতি মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি থাকাটাই স্বাভাবিক। আশাকরি অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে দলে, সরকারে এবং সর্বোপরী মানুষের জন্য কাজ করবেন।
এম.এ.সাঈদ শুভ
২৪.১০.২০১৬
ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com

slide