ক্যাটেগরিঃ নাগরিক মত-অমত

সুকৌশলে এদেশের ছাত্র রাজনীতির মেরুদন্ড ভেঙ্গে দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রীতিমত লালবাতি জ্বলছে। দিনে দিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা পুরোই অর্থহীন হয়ে যাচ্ছে। অযোগ্য, দলকানা, কাপুরুষ, ধর্মান্ধরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পবিত্র অঙ্গনগুলোর ‘অবৈধ ইজারা’ লাভ করেছে সুকৌশলে। জাতীয় রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়ন এক মহামারি আকার ধারণ করেছে। রাজনৈতিক দুর্বত্তায়নের কারণে সৎ, যোগ্য আর মেধাবীরা প্রতিনিয়ত ঝরে পড়ছে রাজনীতি থেকে। সরকারী, আধা সরকারী ও স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠানসমূহ দুর্নীতির করাল গ্রাসে জর্জরিত। আমলাতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে। আমলাদের অযোগ্যতা, কর্মে ফাঁকি, দুর্নীতির ফলশ্রুতিতে সাধারণ মানুষের প্রাণ প্রায় ওষ্ঠাগত। সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোও এখনো সেই অর্থে গড়েই ওঠে নি। দুর্বলতম গণতান্ত্রিক যে ব্যবস্থাটুকু টিকে ছিলো সেটিকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে এবং বিভিন্নভাবে। মুক্তমত-বাক স্বাধীনতা প্রায় বিদায় নিতে শুরু করছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যেটুকু গড়ে উঠেছিলো সেটুকুও ধ্বংসের পথে।

মুক্ত বুদ্ধি চর্চার পথ সংকুচিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিগত কয়েক বছরে অবলীলায় হত্যা করা হয়েছে মুক্তমনা লেখকদের। গনমাধ্যমের স্বাধীনতার চিত্র হয়েছে এমন যে কাউকে হাত-পা বেঁধে সাঁতার কাটতে বলার মতো। সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই করছে। রাজকোষ থেকে অর্থ চুরি হচ্ছে দেদারসে। এই রেশ কাটতে না কাটতেই বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেন কারেন্সি রিজার্ভ বিভাগে অগ্নিকান্ড। আর্থিক খাতে চলছে তুঘলকি কারবার। ভিন্নমতকে এখানে সহ্য করার কোন অবস্থাই নেই। বিরোধী মতের উপর স্ট্রীম রোলার এখানে ‘বৈধ’। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বেড়েই চলছে। দেদারসে তাদের ভিটা-মাটি দখল চলছে কৌশলে। হত্যা-ধর্ষণের মতো ঘটনাগুলোকেও বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে চিত্রায়িত করার হীন অপপ্রয়াস চলছে অহরহ।

উন্নয়ন বনাম গণতন্ত্র, ইসলাম বনাম মুক্তিযুদ্ধকে মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। রাজধানী ঢাকা বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। সুন্দরবনকেও ধ্বংস করার সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করা হয়েছে। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ গ্যাস-কয়লা হরিলুট হচ্ছে। বেকারত্বের হার হিমালয় পর্বত ছুঁই ছুঁই করছে। মাদকের ভয়াবহ কড়াল গ্রাসে এদেশের যুব-সমাজের বড় একটা অংশ হাবুডুবু খাচ্ছে। তরুণদেরকে সুকৌশলে ভুল পথে পরিচালিত করা হচ্ছে। অনেক কিছু থেকেই তাদের দৃষ্টি ফিরিয়ে রাখার সমস্ত কৌশলই প্রয়োগ হচ্ছে।

বিচার প্রার্থীদের আর্ত-চিৎকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। জুলুম, নির্যাতনের শিকার হয়ে সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচারালয় থেকেও অনেক ক্ষেত্রেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে বিচারপ্রার্থীরা। দরিদ্ররা হত-দরিদ্র হচ্ছে আর ধনীরা সম্পদের পাহাড় গড়ছে। ‘দেশ উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছে’ আর দু মুঠো অন্নের অভাবে বিদেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে মানব-পাচার কারীদের খপ্পরে পরে গণকবরে ঠাঁই মিলছে অনেক শ্রমিকের।

বিশ্বাস করুন, এটাই এই বাংলাদেশের চিত্র। আপনি যদি অন্ধ না হয়ে থাকেন, এই পরিস্থিতিকে অস্বীকার করার কোন সুযোগই নেই আপনার হাতে। তবে নিশ্চিত থাকুন, এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য ‘গায়েবী’ কোন ‘ওহী’ নাজিল হবে না! এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের নেতৃত্ব বীর দর্পে কাঁধে তুলে নিতে হবে আপনাকেই। কারণ এদেশের ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইল আপনার, আমার। এই ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সমস্ত সম্পত্তিতে অাপনার মালিকানা রয়েছে। এই সম্পদের একটি পয়সাও কিভাবে খরচ হয় সেই জবাবদিহিতার অধিকার রয়েছে আপনার। সুতরাং এখন সময় এসেছে এই পরিস্থিতির গভীরতা অনুধাবনের।

রাতারাতি এই পরিস্থিতির উত্তোরণ সম্ভব নয়। বছরের পর বছর সময় লেগে যেতে পারে। তবে শুরুটা তো করতে হবে। আর সেই উত্তোরণের প্রথম ধাপ হতে পারে ‘শুধুমাত্র আলোকিত মানুষ’ গড়ার সার্বজনীন একটা ‘শিক্ষা প্রতিষ্ঠান’ গড়ে তোলা। সেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন নির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে হতে হবে এমনটা নয়। অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে ভার্চুয়ালিও এটা গড়ে তোলা যেতে পারে। ব্যক্তি পর্যায়ে ৫/৭ জন শিক্ষার্থী নিয়েও এটা গড়ে তোলা যেতে পারে। এমনকি একজনকে নিয়েও এটা চলতে পারে। এই অবস্থা থেকে উত্তোরণের জন্য সত্যিকার সৎ, দক্ষ, চৌকশ, সাহসী ও নৈতিকতা সম্পন্ন মানব সম্পদের বিকল্প নেই।

আর এই প্রতিষ্ঠান গড়ার অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে আপনাকেই! আজকেই, এই মূহুর্ত থেকেই আপনাকে শপথ নিতে হবে যে। আপনারা যদি বিশ্বাস করেন এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ করা জরুরী, তাহলে আজই এই এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার উদ্যোগ নিন। এই কৌশলটা হবে সামাজিক জাগরণের মাধ্যমে ‘নীরব বিপ্লব।’ এই বিপ্লবের মাধ্যমে পৃথিবীর অনেক বিধ্বস্ত জাতিই আজ সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছে। সে সমস্ত জাতিই আমাদের প্রেরণা হতে পারে।

এম.এ. সাঈদ শুভ

গবেষক,

ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (আইবিএস)

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

ইমেইল: sayeedlaw@gmail.com