ক্যাটেগরিঃ খেলাধূলা

 

সকাল বেলা হিটলার তার কোনো এক কাজে স্টেডিয়ামের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। অধিনস্তকে জিজ্ঞেস করলেন- এখানে কি খেলা হচ্ছে? অধিনস্ত বললেন- ক্রিকেট। বিকেল বেলা হিটলার আবার একই পথে ফিরছিলেন- তখনো স্টেডিয়ামে খেলা চলছে। হিটলার জিজ্ঞেস করলেন- কি ব্যাপার, এখনো খেলা হচ্ছে নাকি? অধিনস্তের উত্তর। জ্বী স্যার। হিটলারের খুব রাগ হলো। তিনি ভাবলেন- ‘লোকজন সারাদিন যদি স্টেডিয়ামে পড়ে থাকে। তখন কাজ করবে কখন?’ তিনি  হুকুম দিলেন। ‘আজ থেকে জার্মানীতে ক্রিকেট খেলা বন্ধ।’ সেই থেকে জার্মানিতে খুব একটা ক্রিকেট খেলা হয়না। হিটলার ফুটবল খেলা খুব পছন্দ করতেন। কারণ এটি খুব তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যায়। স্টেডিয়ামে ফুটবল খেলার সময় তাকে বেশ উত্তেজিতভাবে  উপভোগের দৃশ্য আমরা সাদা-কালো ভিডিওতে দেখেছি। এই কারণেই হয়তো ফুটবলে জার্মানী এতো এগিয়ে।

আইসিসি ট্রফি জেতার আগ অবদি ক্রিকেটে বাংলাদেশের অবস্থান খুব নীচে ছিলো। রেডিওতে বিশ্বের বিভিন্ন দলের সাথে বাংলাদেশ দলের লজ্জ্বাজনক হারের ধারাবিবরনী শুনতে শুনতে আমরা ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। মনে পড়ে আইসিসি ট্রফি জেতার সেই বিকেলটার কথা। বন্ধুর বাসায় রেডিওতে খেলা শুনছি আর বুকের নীচে বালিশ চাপা দিয়ে শুয়ে আছি। টেনশনে দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিলো। ক্রিজে বাংলাদেশের সম্ববতঃ শেষ উইকেট পাইলট। বাংলাদেশ ধুকে ধুকে শেষ উত্তেজনাকর মূহুর্তে উপনীত। হাতে বল একটা, রানও দরকার একটা। পাইলট ছিলেন উইকেট কিপার। সুতরাং তার কাছ থেকে ব্যাটিং এ ভালো কিছ ‍আশা করা যায়না। এই একটি রান পেলে বাংলাদেশ আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি পাবে আর টেস্ট প্লেয়িং কান্ট্রির মর্যাদা পাবে। খেলতে পারবে বিশ্বের সব সেরা দলগুলোর সাথে। এটা খুব জরুরি, কেননা ভালো দলের সাথে খেলতে না পারলে খেলায় অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়না, বিশ্বকাপ খেলারও সুযোগ নেই। সুতরাং মরি আর বাঁচি আমাদের জিততে হবে। সেদিন নাইরোবির মাঠে শুধু বাংলাদেশের ১১ জন প্লেয়ার ছিলোনা। ছিলো পুরো বাংলাদেশের ১১ কোটি মানুষ। বল হাতে কে ছিলো মনে নেই, এখান থেকেই মনে হচ্ছিলো সেটি ছিলো একটা আগুণের গোলা। আর এই গোলাটিকে পিটিয়ে নিতে হবে একটি মাত্র রান। যেহেতু পাইলট ছিলো দুর্বল ব্যাটসম্যান, আউট হয়ে যাওয়ার ও সম্ভাবনা ছিলো প্রচুর। এর আগের বেশ কিছু বল সে ডট দিয়েছে। টেনশনে হার্ট এটাক হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। অবশেষে বলটি ছুটে এলো দূরন্ত গতিতে আর পাইলটও ব্যাট হাঁকালেন। কিন্তু বল তার ব্যাটে লাগেনি, লেগেছিলো প্যাডে। বলও গড়িয়েছিলো বড়জোর ৫ গজ। কিন্তু পাইলট ততক্ষণে ক্রিজের অপর প্রান্তে। জিতে গেলো বাংলাদেশ। জিতে গেলো ১১ কোটি মানুষের স্বপ্ন।

সেই টান টান উত্তেজনার দিনটি আবারও যেন ফিরে এলো ২০১৬ সালের মার্চের ২ তারিখ। মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ২৫ হাজার দর্শকের সাথে গোটা বাংলাদেশের 16-১৭ কোটি মানুষ। আমার বেশী টেনশন লাগছিলো যখন দেখি গ্যালারীতে দেশের প্রধানমন্ত্রী। টিভিতে মাঝে মাঝেই তার শট দেখাচ্ছিলো। তাঁকে তখন আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মনে হয়নি। ক্রিকেট অন্তপ্রাণ এক বাঙ্গালি নারীর মতোই মনে হচ্ছিলো তাঁকে।  খেলোয়াড়রা ভালো করলে আনন্দে হাততালি দিচ্ছেন, আবার ক্যাস মিস করলে বিমর্ষ হয়ে যাচ্ছেন। মিরপুর স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রধানমন্ত্রী আর দর্শকদের সাথে যেন সমগ্র বাংলাদেশ সব ভেদাভেদ ভুলে একাকার।

এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে শ্বাসরূদ্ধকর ক্রিকেট ম্যাচে বাংলাদেশ দলের জয়লাভের পর আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ছবিঃ এশিয়া কাপের সেমিফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশ দলের জয়লাভের পর আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

অফিসে বসে ডেস্ক পিসিতে বসে খেলা দেখছিলাম। শেষ দিকে যখন বাংলাদেশ দলের হারি হারি অবস্থা- ডেস্ক থেকে উঠে গিয়েছিলাম। বিশেষ করে, মুশফিক, সাকিব আউট হওয়ার পর ভীষণ হতাশ হয়ে পড়েছিলাম। ভাবছিলাম প্রধানমন্ত্রী গ্যালারীতে, মার্চ মাসে খেলা হচ্ছে পাকিস্তানের সাথে, আর পোলাপান যদি এখন হারে, লজ্জ্বার আর সীমা-পরিসীমা থাকবেনা। যদিও খেলা আর রাজনীতি এক কথা নয়। তথাপি ভারত-পাকিস্তান, কিংবা বাংলাদেশ – পাকিস্তান খেলা হলেই সেটা একটা আলাদা মাত্রা পায়। বাঙ্গালীর কাছে সেটি আর ব্যাটে বলের লড়াই থাকেনা। হয়ে যায় পাক বাহিনী আর মুক্তিযোদ্ধার লড়াই। ঠিক তেমনি একটা লড়াই ই হয়েছিলো সেদিন। মিরপুর স্টেডিয়াম পরিণতঃ হয়েছিলো একাত্তরের রণাঙ্গণে। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে মার খেয়েছিলা বাংলাদেশ। সেদিন খেলার শুরুটাও ছিলো অনেকটা সেরকম। পর পর কয়েকটি উইকেট পড়ে গেলো। মুক্তিযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে বোঝা যাচ্ছিলোনা যুদ্ধের পরিণতিটা কি হচ্ছে। খেলার মাঝখানটাও প্রচন্ড টেনশনে কেটেছে। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে  মার খেতে শুরু করে পাক বাহিনী এবং শেষে এলো বিজয়, বাঙালির স্বাধীনতা। আর ২ মার্চের মাঠেও ঘটেছিলেও তাই। মাহমুদুল্যার বুদ্ধি দীপ্ত ব্যাটিংয়ে জয় পেলো বাংলাদেশ। পিসির সামনে বসে আনন্দে কেঁদে ফেলেছিলাম, তারপর বিডি নিউজের স্ত্রীণে ভেসে উঠলো আনন্দাশ্রু বিজড়িত বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ছবি।

এদেশের ক্রিকেটের উল্লেখযোগ্য অগ্রসরতার পেছনে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যথেষ্ঠ অবদান রয়েছে। ক্রিক্রেটের উন্নয়নে যা যা করার দরকার তাই করছে বিসিবি। বাংলাদেশ এখন আর্ন্তজাতিক ভ্যেনু। এদেশে কোনদিন বিশ্বকাপ ক্রিকেটের আসর বসবে, এটা কি কেউ কোনদিন ভেবেছিলো? আমাদের ছেলে বিশ্বমানের অলরাউন্ডার , বিশ্বের বড়ো বড়ো দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে আমাদের ছেলেরা গিয়ে খ্যালে, এমনটাতো ভাবাই যেতোনা। একটা সময় ছিলো যখন বাংলাদেশের খেলোয়াড়েরা বড়ো কোনো দল কিংবা ক্রিকেটারের সামনে দাঁড়াতে ভয় পেতো। এখন তাবৎ বিশ্বের সেরা দলগুলো আমাদের সমিহ করে। আমরা যে কোনো দলকে হারাবার সামর্থ রাখি।

শুধু এশিয়া কাপ নয়, আগামি দিনে আমরা বিশ্বকাপ জয় করবো, এটা এখন আর কোনো স্বপ্ন নয়, এটি বাস্তবতা। আমার মনে বিশ্বাসটা এই কারণে -যে দেশের মানুষ ক্রিকেটকে এতো ভালোবাসতে পারে, যে দেশের প্রধানমন্ত্রী গ্যালারীতে বসে নিজ দলের খেলোয়াড়দের চার ছক্কা পেটাতে দেখলে কিশোরীর মতো আনন্দ প্রকাশ করেন, সাধারণ দর্শকের মতো পতাকা নাড়িয়ে উৎসাহ যোগান আর জয়লাভের পর আনন্দাশ্রু বর্ষণ করেন, সেদেশের ক্রিকেটের উন্নয়ন না হয়ে কার হবে? হতে বাধ্য।