ক্যাটেগরিঃ আইন-শৃংখলা

 

ক্ষমতাসিন দলের একজন রাজনৈতিক নেতার স্বেচ্চাচারিতা আর দখলদারিত্বের মহা উৎসব চললেও মুখে কুলুপ এঁটে আছে নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীর গণমাধ্যম কর্মীরা। সম্প্রতি জেলা শহর মাইজদীর সংস্কৃতি কর্মীদের চারণক্ষেত্র- কচি কাঁচার মেলা সংলগ্ন এলাকাটিতে যখন বাণিজ্যিক পার্ক স্থাপনের কাজ চলছে, তখন স্বাভাবিক ভাবেই এলাকার সংস্কৃতি কর্মী এবং সচেতন নাগরিক মাত্রই প্রতিবাদে সোচ্চার, তখন সেই সংবাদ প্রকাশে অনীহা এবং নির্লিপ্ততা প্রকাশ করছেন এখানকার সাংবাদিকেরা। শোনা যায় ওই দখলদার আর কেউ নন, তিনি সরকার দলীয় স্থানীয় সংসদ সদস্য। বিগত নির্বাচনে জয়ী হওয়ার আগ পর্যন্ত তাঁর একটা ক্লিন ইমেজ থাকলেও নির্বাচিত হওয়ার পর থেকে বদনামের শেষ নেই। বলা হয়ে থাকে যে- পুরো জেলার সুইপার, ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে এমন কোনো নিয়োগ নেই, যেখানে তাঁকে ঘুষ দিতে হয়না। সরকারি বিভিন্ন বরাদ্দ থেকে শুরু করে টেন্ডার, সরবরাহ, নিয়োগ-বদলী সব কিছুতেই তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য।

বিগত সরকারের এক রাজপুত্রের বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ উঠেছিলো, যিনি ‘হাওয়া ভবন’ খুলে সমগ্র দেশে লুটপাটের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। কে জানতো- যে দল হাওয়া ভবনের বিরুদ্ধে লড়াই করে ক্ষমতায় এসেছে, সেই দলেরই কারো কারো মধ্যে একই প্রেতাত্মা ভর করবে?

শোনা যায়- তিনি ক্রমশঃই মূতির্মাণ আতঙ্কে পরিণত হচ্ছেন। যার সাথে ফেনীর জয়নাল হাজারি কিংবা নারায়নগঞ্জের শামীম ওসমানের তুলনা করা চলে। তাঁর এমনি আগ্রাসি ক্ষমতা যে- যার বিরুদ্ধে কলম ধরতে সাহস পাননা মাইজদীর সাংবাদিকেরা। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন যে- তিনি মাইজদীর স্বঘোষিত ডনে পরিণত হয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে যে-ই কথা বলবে, তাঁর লালিত পেটুয়া বাহিনী নাকি গলা টিপে ধরবে।

নিজ দলের অনেকেই তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করে রাজনীতি থেকে নির্বাসিত এবং কোনঠাসা। এমনই একজন রাজনৈতিক কর্মীর সাথে আমার কথা হয়েছে- যিনি এমপির ভয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় এসে আত্মগোপন করে আছেন এবং চার-চারবার তাকে গুলি করে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিলো। ভাগ্যগুণে তিনি বেঁচে গেছেন।

নোয়াখালীর ওই স্থানীয় সাংসদের এতোই ক্ষমতা যে পারতপক্ষে তাকে কেউ ঘাটাতে চায়না। বলা হয়ে থাকে- নোয়াখালীর এমন কোনো খাস জমি নেই যেটা তাঁর নিজের কিংবা অনুসারিদের দখলে যায়নি, এক ইঞ্চি সরকারি খালি জায়গা নেই যেটা বেদখল হয়নি। এই সর্বগ্রাসি নেতার বক্তব্যের বিপরীত রিপোর্ট হওয়ার পর একটি টিভি চ্যানেলের জেলা প্রতিনিধির অফিসে বোমা হামলা পর্যন্ত হয়েছিলো। এক কথায় গণমাধ্যম কর্মীরা সেখানে সন্ত্রস্ত এবং জিম্মি বলেই অনুমান করা যায়। যে কারণে গণপূর্ত বিভাগের জায়গা দখল করে যখন স্থানীয় পৌরসভাকে ব্যবহার করে তিনি বাণিজ্যিক পার্ক নির্মাণ করছেন, তখন স্থানীয় পত্রিকাগুলোতে এক কলাম নিউজও হচ্ছেনা এবং জাতীয় পত্রিকাতে কিংবা টিভি চ্যানেলে রিপোর্ট করতে ভয় পাচ্ছেন তাঁরা।

নোয়াখালী জেলা শহরের বড় দীঘি চত্বর শুধু এখানকার সংস্কৃতি কর্মীদের লালন ভূমিই নয়, নগরীর ফুসফুসও বটে। এখানকার পরিবেশগতো কারণেও এটি খোলামেলা রাখা প্রয়োজন। শহরে একটি শিশুপার্ক খুব জরুরী। হোকনা, তবে সেটা বিনামূল্যের, উন্মুক্ত এবং সার্বজনীন হওয়া চাই। সেখানে শিশুরা বিনা বাধায় নির্মল আনন্দ উপভোগ করবে। কিন্তু চারপাশে উঁচু দেয়াল উঠাতে হবে আর টিকেট কেটে ঢুকতে হবে কেন?

 

12833419_1164539270237995_2069456734_n_18457

জেলা শহর মাইজদীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত কচি কাঁচার মেলা, শহীদ মিণার, বিজয় মঞ্চ, স্মৃতি সৌধকে ঢেকে ফেলছে এমুজমেন্ট পার্কের উঁচু দেয়াল।

 

এমুজমেন্ট পার্ক যদি করতে হয় তাহলে সেটা শহর থেকে দুরে সূবর্ণচরেওতো হতে পারে। সেখানে লোকজন বাসে করে যাবে। ঢাকার মানুষ নরসিংদীর ‘ড্রিমপার্কে’ কিংবা ‘ফ্যান্টাসী কিংডমে’ যায়। মাইজদীর মানুষও নিশ্চয়ই যেতে পারবে। শহরের বাইরে দূরে কোথাও পার্কটি হলে ওই এলাকায় নগরায়ন হবে, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। ছোট্ট এই শহরে এতো ঠেলাঠেলি কেন?

নোয়াখালী জেলা শহরের সংস্কৃতির চারণভূমি বেদখলের প্রতিবাদে স্থানীয় মিডিয়া এগিয়ে না আসলেও সমস্যা নেই কিংবা প্রবীণেরাও বসে বসে লাভ-ক্ষতির হিসাব নিকাশ কষতে থাকুন। তরুণ প্রজন্ম কিন্তু থেমে নেই এবং থেমে থাকবেওনা। এক সোস্যাল মিডিয়ার কারণে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সচেতন নাগরিকমাত্রই এই প্রশ্নে সংক্ষূব্ধ এবং প্রতিবাদ মূখর। সোস্যাল মিডিয়াকে এতো হালকা করে দেখার কিছু নেই । ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলো এই সোস্যাল মিডিয়া থেকেই, বিএনপি জামাতের মতো বৃহত রাজনৈতিক শক্তি তাকে রুখতে পারেনি। সাকা চৌধুরীর হাজার কোটি টাকা আর আর্ন্তজাতিক প্রভাব তাকে ফাঁসির দড়ি থেকে বাঁচাতে পারেনি। নিজামী, গোলাম আজম, সাঈদীকেও একসময় কেউ কেউ অপার ক্ষমতাধর মনে করতো। কিন্তু তারা এখন ইতিহাস। তরুণ প্রজন্ম একদিন ক্ষমতায় অন্ধ ওই সিপাহসালারকেও গদিচ্যুত করবে, যদি তিনি এখুনি সংযত না হন।

এলাকার নাগরিক সমাজের প্রতিবাদ কিংবা সংস্কৃতিকর্মীদের আবেগকে মূল্যায়ন না করে তিনি যদি গোঁয়ারতুমি করে আমাদের বুকের উপর দেয়াল তুলতেই থাকেন। তবে তুলুন। আমরা বলছি এই দেয়াল বেশীদিন টিকবেনা। কারণ বার্লিনের প্রাচির মানুষ বেশীদিন সহ্য করেনি, এখনও করবেনা। ইতিহাস সেরকমই স্বাক্ষ্য দেয়।