ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
Sust01

দেশে এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা নেই। পোশাক শিল্পের কল্যাণে চাঙ্গা অর্থনীতি, কৃষিতে সাফল্য, বিদ্যুৎ উৎপাদনে রেকর্ড, জাতীয় প্রবৃদ্ধি আমরা ধরে রেখেছি, নিজের টাকায় পদ্মা সেতুর মতো বৃহত স্থাপনা নির্মাণ করছি, যুদ্ধপরাধীদের বিচার করছি, সন্ত্রাস দমন করছি, আমাদের দেশ এখন গ্রোয়িং ইকোনোমির দেশ। কিন্তু সব অর্জন ফিকে হয়ে যায়- যখন আমরা দেখি সাগর রুনির হত্যাকান্ডের বিচার হয়না, কল্পনা রানী চাকমা হত্যার সুরাহা হয়না, তনু হত্যাকাণ্ডের মামলার গতি ঢিমেতালে চলে, নির্বাচনী সহিংসতায় বিপক্ষের লোকজনকে সদলবলে গরুপেটা করি প্রকাশ্যে, সব কিছু ছাপিয়ে যায়, যখন কিনা দেখি- সরকারের মিত্র দলীয় এমপি হয়ে  শিক্ষককে ধোলাই দিয়ে কান ধরে উঠ যখন বস করানো হয়।

আপনারা একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সারা জীবন জেল ‍জুলুম সহ্য করে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেছেন। যার মূল মন্ত্র শোষণ মুক্ত স্বনির্ভর সোনার বাংলা গড়ে তোলা। যে কারণে আমরা তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা করি, তার আদর্শ লালন করেন (?) বলে আমরা এই দলটিকে সমর্থন করি, আপনাদের ডাকে আমরা মাঝে মাঝে রাজপথে নামি, পুলিশের লাঠি পেটা খাই, গুলি খাই। আপনাদের সাথে ক্ষমতার দ্বন্ধে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠির ছুঁড়ে দেয়া পেট্রোল বোমার আগুণে আমাদের শরীর ঝলসে যায়, তবুও দেশের উন্নয়ন এবং সুশাসনের আশায় বরাবরই আমরা আপনাদের সমর্থন জানাই। তাই বলে আমরা সাধারণ মানুষ কাউকে দেশটাতো নিশ্চয়ই ইজারা দেইনি যে তারা যখন যা খুশী করে বেড়াবে।

আপনাদের দলের কিছু নেতা শূণ্য হাতে এমপি হয়ে রাতারাতি কোটি টাকার মালিক বনে যান, আগে এলাকায় বাসে কিংবা নিদেন পক্ষে প্রাইভেট কারে করে বাড়ি যেতেন, এখন তাঁরা হেলিকপ্টারে চড়ে যাতায়াত করেন। সরকারি সব খাস জমি এখন তাঁদের দখলে, পিয়ন ঝাড়ুদার, পুলিশের কনস্টেবল পদে লোক নিতেও কাড়ি কাড়ি টাকা ঘুষ খান। অনেকেই আছেন যাদের ছাত্রজীবনে মফস্বলে চাইনিজ কুড়াল আর হকিস্টিক হাতে মারামারি করতেন, তাঁরা এখন বিরাট নেতা, ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা কিংবা গুলশানে তঁদের কোটি টাকার বাড়ি, গাড়ি। দলের বড় পদ প্রাপ্তি ছাড়াও তাদের মধ্যে কেউ কেউ বিভিন্ন পদে নির্বাচনও করেন। এতোদিন যাঁরা টেন্ডার, সাপ্লাই, নিয়োগ, নির্মাণ থেকে কমিশন খেতেন, নির্বাচিত হলে সামনে আশা করি পুরো  তহবিল গিলে খাবেন- তাতে আর সন্দেহ কি?

আমরা সাধারণ মানুষ, আমাদের সেই একই দশা, নুন আনতে পানতা ফুরায়। সামান্য বেতনে হয়না বলে রাজধানী থেকে বউ বাচ্চাকে দেশে পাঠিয়ে দেই। আর  ছেলেবেলায় স্কুল কলেজে যাওয়ার পথে দেখে আসা যেসব ছিঁচকে মাস্তানদের দেখে ঘৃণা করে এসেছি, তাদের ছেলে মেয়েরা এখন দেশের বাইরে থেকে লেখাপড়া করে, আমরা সন্তানের স্কুলের বেতন দিতে পারিনা, শখ আল্লাদ বলতে কিছু নেই, দিন এনে দিন খাই। কারণ আমরা রাজনীতির নামে চাঁদাবাজি আর মাস্তানী করিনা, আমাদের বাবা –মা এবং শিক্ষকেরা এসব থেকে দূরে রেখেছেন, লেখাপড়া শিখে মানুষের মতো মানুষ হতে বলেছেন।

মানুষ হতে পেরেছি কিনা জানিনা, কিন্তু অমানুষ নিশ্চয়ই হইনি। জীবনে প্রতিষ্ঠার নামে কাড়ি কাড়ি টাকার মালিক না হওয়াকে আমরা নিয়তি বলে মেনে নিয়েছি, ভেবেছি- ‘সবাইকে দিয়ে সব কাজ হয়না।’

কিন্তু নিয়তি বলে মানতে পারিনা- যখন  জন্মের পর যেই শিক্ষক লেখাপড়া শিখিয়ে সভ্যতার আলো দেখিয়েছেন সেই সব শিক্ষককে – ‘কান ধরে উঠ বস’ করতে দেখি। তখন মনে প্রশ্ন জাগে- ওই সংসদ সদস্য কোনদিন স্কুলের চৌকাঠ মাড়িয়েছেন কিনা? তাঁর বাবা মা কোন শিক্ষকের কাছে পড়েছেন কিনা? কিংবা তার পুত্র  কন্যা স্কুল-কলেজে পড়েন কিনা। যদি তাই হতো, শিক্ষকের মর্যাদা তিনি বুঝতেন। ওই নেতার কর্মকান্ড দেখে আমার স্কুল-কলেজ জীবনের ঘৃণা ভরে দেখা সেই সব চাইনীজ কুড়ালধা্রী কুলাঙ্গারদের  কথাই মনে পড়ে যায়। যারা শিক্ষাঙ্গণে যেতো কেবল মারামারি করতে, না হয় মোড়ে দাঁড়িয়ে মেয়েদের উত্যক্ত করতে। ওদের কেউ শ্রেণীকক্ষে দেখেনি, তাই তারা শিক্ষক কিংবা শিক্ষকের প্রতি মর্যাদা কি জিনিস, সেটা আর বোঝেনি।

মাননীয় শিক্ষামন্ত্রী,
আপনার বেলায় ওইসব জঘন্য লোকেদের সাথে তুলনা চলেনা। কারণ আপনি ক্লাসে ভালো ছাত্র ছিলেন, তাই আপনি শিক্ষক হতে পেরেছিলেন। ক্লাসের বাইরে আপনি চাইনীজ কুড়াল বহন না করে প্রগতিশীল রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন। একজন ভালো মানুষ হিসেবে এলাকার মানুষ আপনাকে এমপি বানিয়েছে, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীর কল্যাণ সাধনে আপনি দক্ষ এবং সফল হবেন বলেই আপনি শিক্ষা মন্ত্রী হয়েছেন। একজন শিক্ষক হিসেবে কি জবাব আছে আপনার কাছে, যখন আপনার দলের এমপি একজন পিতৃতূল্য শিক্ষকের গায়ে হাত তোলে, তাকে কান ধরে উঠ বস করায়? কি প্রতিবিধান জানা আছে আপনার, যখন আপনার দলের ছেলেরা একজন  শিক্ষককে লাঞ্চিত করে বীরদর্পে মুক্তিযুদ্ধের সময় আমাদের সেই পবিত্র  ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের অপব্যবহার করে?

পুরো জাতি আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে । কারণ আপনি শিক্ষক, একই সাথে শিক্ষামন্ত্রী। একজন শিক্ষক হয়ে নিশ্চয়ই অপর একজন শিক্ষকের অপমান সহ্য করার কথা নয়। বরং শিক্ষা, শিক্ষক এবং শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় আপনি লড়াই করবেন। এ লড়াইয়ে যদি আপনি যদি হেরে যান, তবে করজোড়ে ক্ষমা চাইবেন, তাতে ইতিহাসে আপনার নামটা অন্তত ভালো মানুষের খাতায় লেখা থাকবে। তখন বিচারের ভার আসবে জনতার আদালতে। সে বিচার কি হবে, কিংবা কতদূর গড়াবে? সময়ের কাছে আছে সেই উত্তর।