ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

শুরুতে আমি শুধু তাঁকেই চিনতাম। তিনি কোন বংশের সন্তান, তাঁর বাবা মা কে, শিক্ষাগত যোগ্যতা, পেশাও জানা ছিলোনা আমার। একজন সুন্দর মনের মানুষ। যিনি আমাকে ভালোবাসতেন এবং সেটা একজন সংস্কৃতি কর্মী হিসেবে। যেটা আমি খুব ভালো বুঝতে পারতাম।

আমি তখন সদ্য স্কুল পেরিয়ে কলেজে পা দিয়েছি। তরঙ্গিনী নাট্যকেন্দ্র নামে নাট্য সংগঠন গড়ে তুলেছি আমার প্রাণের শহর মাইজদীতে। বাবার জমিদারী ছিলোনা- সুতরাং দশজনের কাছে ভিক্ষা করেই সংগঠন চালাতে হতো। ওই ভিক্ষা চাইতে যেমন আমাদের লজ্জ্বা ছিলোনা- তেমনি কিছু  ঘর ছিলো যেগুলি ছিলো আামার পরম ভরসার স্থল, যেখান থেকে কোনদিন খালি হাতে ফিরে আসতাম না। এমনও দিন গেছে যে- তাঁর পকেটে টাকা ছিলোনা, মুখটা অন্ধকার হয়ে যেতো তখন। অপরাধী কন্ঠে বলতেন- কাল বিকেলে নক করো। পরের দিন দেখা হলে বলার আগেই পকেট থেকে একশো টাকার নোটটি বের করে দিতেন। এবং আমি লক্ষ্য করতাম টাকাটা দেয়ার পর তাঁর চেহারাটা উজ্জ্বল হয়ে উঠতো তখন, এক ধরণের তৃপ্তির আলো ছিলো সেখানে। প্রতিটি প্রোডাকশনে আমার জন্যে দাদার বাজেট ছিলো ওই একশো টাকা। এক টাকা বেশী নয়, কমও নয়।

কখনো কখনো বিজনদার সাথে দেখা হতো প্রেস ক্লাবে, কোনো সময় টাউন হলের আড্ডায়। অত্যন্ত শোভন, সুদর্শন, লম্বা। কোট প্যান্ট পরতেন। শার্ট, পাঞ্জাবী পরলেও তাঁকে বেশ ভালো লাগতো।  তাঁকে দেখলে সালাম দেয়ার পর তাঁর সালাম নেয়ার ভঙ্গিটিও ছিলো বেশ স্মার্ট। অনেকটা সেলুট রিসিভ করার মতো।

বিজন দা সম্পর্কে আমার তথ্য ভান্ডারে তিনটি শব্দ যোগ হলো। তিনি সাংবাদিক, ঠিকাদারী ব্যবসা করেন আর জেলার সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পৃষ্ঠপোষক। আমার জন্য প্রোডাক্সন প্রতি একশো টাকা বরাদ্দ থাকলেও বিজয় মেলা কি বৈশাখী মেলার মতো বড়ো আয়োজনে গুরুত্ব বুঝে তিনি ছিলেন উদার হস্ত।

শৈশবের কথা বাদ দিয়ে অস্টাশি থেকে ছিয়ানব্বই। এই আট বছর আমি জেলা শহর মাইজদীতে সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের পুরোভাগে ছিলাম। প্রতি বছর ৮-১০ টা প্রোডাক্সনের বেশী করতে পারতামনা। আর প্রতিবারই আমার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন বিজন দা। ৯৬ এ বিয়ে করে চাকুরি নিয়ে যখন চট্টগ্রামে চলে গেলাম। মাইজদীতে কম আসা হতো। আর তখন মাঝে মাঝেই দাদার সাথে দেখা হতো, বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন। দাদাকে লম্বা করে সালাম করতাম, খুব সল্প সময়ের জন্য কুশল বিনিময়। দাদার দেখা হলে আমি ক্ষণিকের জন্য নিজেকে ভুলে যেতাম, সেই ইন্টার পড়া মনে কিশোর গন্ধের ছেলেটির মতো হয়ে যেতাম আমি। বিয়ে করেছি, ছেলের পিতা হয়েছি, কিংবা বড়ো চাকুরি করি, চিটাগাং বেতারের নিয়মিত নাট্যকার, সব ভুলে যেতাম। আমার মনে হতো আমি সেই আগের মতোই ভিখারী। নিজের পকেটে যে দুই চার হাজার টাকা আছে, সেটাও ভুলে যেতাম। ভাবতাম কখন দাদা তাঁর পকেটে হাত দিয়ে একশো টাকার নোট টা বের করবেন..।

২০০১ থেকে চট্টগ্রামের চাকুরি ছেড়ে ঢাকায়। শৈশব কৈশোরে বিজন বাবুরা পিঠ চাপড়ে রক্তে যে দোষ ধরিয়ে দিয়েছিলেন এখনও সেই দোষে দুষ্ট। মঞ্চ ছেড়ে টিভি মিডিয়ায় কাজ করি। বয়স যাই হোক না কেন, মনে প্রাণে এখনো পোলাপান। মাঝে মাঝেই আবেগে ভেসে ফেসবুকে স্টাটাস লিখি। আমার ফ্রেন্ডদের মধ্যে পরিচিতজন ছাড়া বাকি সবাই তরুন। এর মধ্যে স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরীরাও আছে। আমি ওদের স্টাটাসে লাইক কমেন্ট করি। ওরাও করে। আমার ফ্রেন্ড লিস্টে নোয়াখালীর বেশ কিছু পুরনো সিনিয়র ভাই-বোন ছাড়াও দেশে এবং দেশের বাইরের অনেক বন্ধু আছে। আছে কিছু তরুণ বন্ধু। ওদের বেশীর ভাগই সাংবাদিক। সিনিয়রদের মধ্যে আবদুল আউয়াল, মাহমুদুল হক ফয়েজ, বখতিয়ার শিকদার, মিরণ     মহিউদ্দিন,কাজী খসরু,শাহেদা পারভিন, রফিক উল্লাহ,জসিম উদ্দিন খালেদ, মিন্টু সারেং, ডমিনিক ক্যাডেট, এমদাদ হোসেন কৈশোর, মোঃ নোমান, কবি মোস্তফা ইকবাল। জুনিয়র- জামাল হোসেন বিষাদ, নুরুল আলম মাসুদ, আবু নাসের মঞ্জু, হাবীব ইমন সহ জনা কয়েক। যাদের আমি জেলা শহরে থাকতে প্রত্যক্ষভাবে চিনি। ফেসবুকে নিয়মিত ঢুকি। সব কিছুর সাথে নোয়াখালীর বিষয়গুলো ওদের সুবাদেই নজরে আসে। এর মধ্যে নোয়াখালী বিভাগ আন্দোলন, অবৈধ শিশু পার্ক নিয়ে সংস্কৃতিকর্মীদের আন্দোলনে ওদের সাথে কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে আমিও সোচ্চার।

ক’দিন আগে থেকে অসুস্থ বিজন দা কে নিয়ে স্টাটাসগুলো আমারে নজরে আসে। প্রাণটা হু হু করে ওঠে। বিজন দাকে একটু দেখে আসা দরকার। যাবো যাবো কিন্তু আর সময় হয়ে উঠলোনা।

২২ সেপ্টেম্বর ভোরে ফজরের নামাজ পড়ে যথারীতি ফেসবুকে। একটি ফোক বেইজড মুভি তৈরীর আইডিয়া মাথায় ঘুরছে। ইউটিউভ থেকে কিছু গান ডাউনলোড করেছি। ফেসবুক চালাই আর সেগুলি শুনি। তার মধ্যে একটি যার মধ্যে একটি  গান- যারে ছেড়ে এলাম অবহেলেরে.. সেকি আবার আসবে ফিরে..।’ ওই গানটিই শুনছি আর ফেসবুকিং করছি, মাঝে মাঝে মুভির গল্পের প্লটগুলো মনে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। হঠাৎ দেখি পুরো ফেসবুক ছেয়ে গেছে- আমাদের সুদর্শন বিজন সেন এর ছবিতে। ‘ক্যান্সারে আক্রান্ত বিজন সেন আর নেই।‘

আমার দম বন্ধ হয়ে আসলো। নিজের অজান্তেই চোখ বেয়ে টপ ট্প করে পানি ঝরতে লাগলো। হায় বিজন দা! আমাদের বিজন দা! আমাকে অনুষ্ঠান প্রতি একশো টাকা দেয়া সেই সৌম্য কান্তি সুপুরুষ বিজন দা আর নেই!

এক ধরণের অপরাধবোধে মনটা আচ্ছন্ন হয়ে গেলো। আমি চাইলেই বিজন দার সাথে শেষ দেখাটা  করে আসতে পারতাম। অনুশোচনার ক্ষতে রক্তাক্ত হচ্ছি এখনও।

বিজন সেন সৎ সাংবাদিকতার প্রতিকৃতি পথিকৃৎ দুটোই ছিলেন। তাঁর চরিত্রে কোনো দাগ ছিলোনা। তিনি ছিলেন জেলা শহর মাইজদীর সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের অকুন্ঠ পৃষ্ঠপোষক।একজন স্বল্পভাষী, রাজনীতি সচেতন কিন্তু রাজনীতির বাইরে ছিলেন তিনি। তাঁকে কখনো পদ ও পদবীর জন্য দলাদলী করতে দেখিনি। দেখিনি অন্যের সমালোচনা করতে। তাঁর একটি বড় গুণ ছিলো- তিনি শুনতেন, কিন্তু বলতেন খুবই কম। একজন ভালো মানুষের সমস্ত গুণাবলী ছিলো তাঁর মধ্যে।

 জীবদ্দশায় তাঁর প্রাপ্য সম্মান আমরা দিতে পারিনি। আজ তিনি নেই বলে তাঁর জন্যে হাহাকার করছি। বাঙালি হিসেবে আমাদের একটাই দোষ- দাঁত থাকতে দাঁতের মর্যাদা দিতে পারিনা। হারালে হারানোর ব্যথাটা টের পাই। মনে তখন ওই গানটাই বাজে- ‘যারে হারায়েছি অবহেলেরে সেকি আবার আসবে ফিরে..।’

না, তিনি আর ফিরে আসবেননা। তিনিতো এখন না ফেরার দেশে। তাঁর জন্যে আমাদের এই আকুতি এবং তোড়জোড় দেখে হয়তো মুচকি হাসছেন, আর বলছেন- ‘জীবনে যারে তুমি দাওনি মালা, মরণে কেন তারে দিতে এলে ফুল…।’

https://www.facebook.com/kalerkantha

slide