ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

আদমকে সৃষ্টি করার সময় ফেরেস্তারা সৃষ্টিকর্তাকে জিজ্ঞেস করলেন- `হে রাব্বুল আলামিন- আদমকে কী কী গুণ দিবো?’ সৃষ্টিকর্তা বলেছিলেন-`ওর মধ্যে আমার গুণ সঞ্চারিত কর।’ মহান স্রস্টার অসংখ্য গুণ বা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে একটা হচ্ছে নিজেকে প্রকাশ করা। তাঁর সৃষ্টির মাঝেই তিনি প্রকাশিত। যুগে যুগে যতো নবী-রসুলের আবির্ভাব হয়েছে, সকলের প্রচারকাজের একটা বড়ো অংশে ছিলো সৃস্টিকর্তার মাহাত্ম ও পরমতম বৈশিষ্ট্যসমূহ প্রচার করা।

বস্তুত মানুষের মধ্যেও এই আকাঙ্খা রয়েছে, সে নিজেকে প্রকাশ করতে চায়, স্বীয় গূণাবলী অন্যদের মাঝে প্রকাশ করে সে আত্মতৃপ্তি লাভ করে থাকে। সেই প্রকাশের নানা বিষয় থাকে, থাকে বৈশিষ্ট্য, বৈচিত্র, আঙ্গিক।

নিজেকে প্রকাশ করা মানবের সহজাত বৈশিষ্ট্য। কেউ লেখে, কেউ ছবি এঁকে, কেউ গান গেয়ে, অভিনয় করে, খেলাধূলা, রাজনীতি কিংবা নানা পেশাগত কাজের মধ্যেও আত্মপ্রকাশের একটা নিরন্তর প্রচেষ্টা করে থাকে। যে লোকটি সারাজীবন শুধু টাকা কামানো ছাড়া আর কিছুই ভাবেনি, সে একটা সুন্দর বাড়ি করে, দান খয়রাত করে, টাকা খরচ করে সভা-সমাবেশে প্রধান কিংবা বিশেষ অতিথি হয়ে ঘুরে ফিরে সেই ঈশ্বরের বৈশিস্ট্যই পূর্ণ করে চলেছে।

নিঃসন্দেহে চলচ্চিত্র নানাবিধ শিল্প প্রকাশের সর্বোৎকৃষ্ট ভাষা বা মাধ্যম। যাকে ‘মাদার অব অল আর্ট’ বলা হয়ে থাকে। শিশুবেলায় বিছানায় শুয়ে পা দুটো জানালার গ্রিলে উপরের দিকে ঠেকিয়ে সুর করে যখন গান করতাম, বাড়ির সবাই ভাবতো বড়ো হয়ে বুঝি সঙ্গীত শিল্পী হবো। মুখে আটা মেখে কচুরিপানার কালো অংশ দিয়ে দাঁড়ি-গোঁফ লাগিয়ে কাঠের তলোয়ার দিয়ে যখন অন্যদের সাথে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেলতাম, তখন আম্মা বলতেন, বড়ো হয়ে আমি অভিনেতা হবো। ছবি আঁকায় ঝোঁক ছিলো সুতরাং চিত্রশিল্পী হওয়ারও একটা চান্স ছিলো, কিন্তু বাৎসরিক শিক্ষা সপ্তাহে যখন বংশী বাদন প্রতিযোগিতায় ন্যাশনাল পর্যন্ত এলাম, তখন আমি নিজেই ভ্যাবাচ্যাকা খেলাম, আসলে আমি কোন দিকে যাচ্ছি। ৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে স্কাউট আন্দোলনে যুক্ত হওয়ার পর বিজয় দিবসের ডিসপ্লে কিংবা তাবু জলসায় দম ফাটানো হাসির প্লট লিখে, পরিচালনা এবং অভিনয় করার পর মনে হতো সেটাই হয়তোবা আমার নিজেকে প্রকাশের বাহন হবে। কিন্তু বয়স ২ কি ৩ থেকে মায়ের কোলে বসে বসে সিনেমা দেখতে দেখতে কখনযে সিনেমার পোকা মাথায় ঢুকে পড়েছে, সেটা টের পেলাম যখন আমি নোয়াখালী জিলা স্কুলের ছাত্র।

শুটিং লোকেশনে গান শুট করার আগে।

কক্সবাজারে গান শুট করার আগে।

স্কুলে যাওয়া আসার পথে মাইজদী রৌশন বাণী সিনেমা হল। মাঝে মাঝেই বারান্দা শো দেখতাম। বারান্দা শো বলতে হলের সামনে লাগানো পোস্টার, স্টিকার ঘুরে ফিরে দেখা। ওইসব ছবি দেখে সিনেমার গল্প সম্পর্কে একটা ধারনা করার চেষ্টা করতাম। তারপর টিফিনের পয়সা জমিয়ে কিংবা বাজারের টাকা বাঁচিয়ে ফ্রন্ট স্টল, বড় জোর মিডেল স্টলে ছবি দেখা। তখন রৌশনবাণীতে ফ্রন্ট স্টল টিকেটের মূল্য ছিলো আড়াই টাকা, মিডল স্টল সাড়ে তিন টাকা, রিয়ার স্টল পাঁচ টাকা। ওপরে ছিলো ডিসি, যে টিকিটের মূল্য সম্ভবতঃ আট থেকে দশ টাকা হবে। টিফিন পিরিয়ডে অসুস্থতা কিংবা বাসার জরুরি কাজের অজুহাত দেখিয়ে আমরা ক’বন্ধু হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। ঘটনাটা একসময় টের পেয়েছিলেন আমাদের বাংলার টিচার নুরুল্লাহ স্যার। তিনি জামাতের রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন।আমাদেরকে সিনেমা বা চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করলেন। তাঁর ভাষায় চলৎ + চিত্র = চলচ্চিত্র নয়। এটা হচ্ছে ছল + চিত্র = ছলচ্চিত্র। তাঁর ভাষায় নানা ছলা-কলার সমাহার বলেই এটি ছলচ্চিত্র। কেননা এখানে সত্য বলতে কিছু নেই। পাত্র-পাত্রীর অভিনয়, পরিবেশ, আলো, শব্দ সবই কৃত্রিম। সুতরাং এই মিথ্যা ছলচাতুরিতে ডুবে সময় নষ্ট করার কোনো মানে নেই। তার চেয়ে মহৎ নভেল পাঠ উত্তম।বলা বাহুল্য, তাঁর কথা আমরা রাখতে পারিনি, ওই ছলচ্চিত্রের ছলনার নেশায় পেয়ে বসেছিলো আমাদের। হলে নতুন ছবি আসলেই যে কোনো মূল্যে দেখা চাই। স্কুল ফাঁকি দেয়ার বিষয়টি ধরা পড়ার পর জুম্মার দিন বাসা থেকে দুপরের খাবার খেয়ে বেরুতাম। তারপর মসজিদ থেকে বেরিয়ে পকেটে টুপিটা রেখে ঢুকতাম সিনেমা হলে।

শিশুবেলায় মায়ের কোলে বসে দেখা ‘বধু বিদায়’ ‘আশার আলো’ প্রভৃতি সিনেমার কথা মনে পড়ে। এরপর ‘নিশান’, ‘বাহাদুর’, ‘আঁখি মিলন’, ‘আলিফ লায়লা’, ‘কাঁচ কাটা হিরে’র মতো অসাধারণ কিছু বাংলা চলচ্চিত্র মনে দাগ কেটে আছে। নোয়াখালীর চৌমুহনীতে তখন দুটি হল ছিলো। একটি রূপসা, অন্যটি রূপভারতী। একদিন পাড়ার বন্ধুদের সাথে ফ্রি ট্রেনে চেপে রূপসা সিনেমা হলে ‘ভেজা চোখ’ দেখতে গিয়ে চোখ ভিজে উঠেছিলো। সাথে সাথে ঘাঁড়ও ব্যাথা হয়ে গিয়েছিলো, কারণ আমাদের সিট পড়েছিলো ফ্রন্ট স্টলের একদম সামনের কাঠের বেঞ্চিতে। সুতরাং উপরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে যা হবার তাই হয়েছিলো।

এরপরতো থিয়েটারের সাথে জড়িয়ে পড়লাম। একদিন স্কাউট টিমের ছোট ভাই এহতেশামুল হক বিপু, যে এখন রাজস্ব বোর্ডের বড় কর্মকর্তা, তার বাসায় এসেছিলো তখনকার সময়ে ইত্তেফাক ‘তরুণ কন্ঠ’ পাতার দু’জন রিপোর্টার। শহরে মঞ্চ নাটক রচয়িতা আর পরিচালক হিসেবে বেশ পরিচিতি ছিলো। তারা আমার একটা ইন্টারভিউ করলেন। সেখানে আমাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো ‘ভবিষ্যতে আমি কি হতে চাই?’ বলেছিলাম ‘চলচ্চিত্র পরিচালক।’

10551092_241285696066600_3586229153556172221_n

ইনডোর লোকেশনে।

সময়টা বোধ হয় ১৯৯৪-৯৫ হবে। সেই হিসেবে এখন থেকে ২২ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, চলচ্চিত্র পরিচালক এখনও হতে পারিনি। তবে একটা চেষ্টা হয়েছিলো, সেই চেষ্টা আমার জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে অনেক কিছুই। বলা যায় জীবনের বাঁকই পরিবর্তন করে দিয়েছিলো।

২০০০ সালের শেষের দিকের কথা।আমি তখন চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ কমার্স কলেজ রোডে এক্সপোলংকা নামক একটি ফ্রেইট ফরোয়ার্ডিং কোম্পানীতে চাকুরী করি।আমার স্ত্রী জিইসি এলাকার বাওয়া স্কুলের টিচার।দু’জনার আয়ে ভালোই চলছিলো দিনগুলো।চিটাগাং পোর্টে যাওয়ার জন্যে অফিস থেকে নেমে একটি পত্রিকা কিনলাম। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাতা উল্টাচ্ছিলাম। চোখে পড়লো ‘জাতীয় গণমাধ্যম ইন্সটিটিউট’ কর্তৃক প্রকাশিত একটি বিজ্ঞাপন। যেখানে ‘চলচ্চিত্র নির্মাণঃ চিত্রনাট্য ও পরিচালনা’ শীর্ষক একটি কর্মশালার বিজ্ঞাপন মূদ্রীত ছিলো। বিজ্ঞপ্তিটি পড়ার পর থেকেই আমার বুকের ভেতর ডিপ ডিপ আরম্ভ হয়ে গেলো। অফিস শেষ করে বাসায় এসে বৌ্কে বিজ্ঞপ্তিটি দেখালাম। বললাম- ‘আমার জন্ম চিটাগাং পোর্টের জাহাজ আর লোহা লক্কড় গোণার জন্যে হয়নি। ছোটবেলা থেকেই আমার স্বপ্ন একজন চিত্রপরিচালক হওয়ার। সুতরাং আমি এখানে কোর্স করবো। কোর্স শেষ করে ছবি বানাবো।’ আমার স্ত্রী অবাক হয়ে আমার দিকে তাকালো, কিছুক্ষণ ভেবে তারপর বললো- ‘আমিও চাই তুমি ছবির পরিচালক হও। তার আগে ইন্টারভিউ দিয়ে দ্যাখো টিকো কীনা।’

আমি ঢাকায় এলাম। ভাইবা বোর্ডে প্রয়াতঃ পরিচালক শিবলী সাদিক, মহিউদ্দিন ফারুক। ফারুক স্যার আমাকে বললেন- ‘তুমি একটা ভালো জায়গায় চাকুরি করছো, তোমার সংসার আছে। কিন্তু এই পথতো বড়োই অনিশ্চিত এবং অমসৃণ। ভেবে দ্যাখো করবে কীনা?’ বললাম- ‘আমি চাকুরি ছেড়ে দিবো। ঢাকায় এসে থাকবো, তবুও আমাকে চিত্র পরিচালনার কাজ শিখতে হবে’ ‘মনের জোর দেখেই হয়তোবা তাঁরা আমাকে সিলেক্ট করলেন।

image_4364

সেই মেয়েটি ছবিতে নায়িকা তানিশা মির্জা ছোটবেলায় ডাব চুরি করতে গিয়ে ধরা খেলেন।

অফিস থেকে বলে কয়ে একমাসের ছুটি নিলাম।একমাস নির্বিঘ্নে ক্লাস করলাম। তারপর ছিলো ঈদের বন্ধ। চিটাগাং গিয়ে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলামনা। একটা দোলাচলে পড়ে গেলাম। স্ত্রীর পেটে প্রথম সন্তান। তাকে বোঝালাম, আমি না থাকলে তোমার সেবা যত্ন করবে কে? তারচেয়ে তুমি বাড়ি চলে যাও। আমি গুছিয়ে উঠতে পারলে ওখানে নিয়ে যাবো তোমাকে। বউ-জামাই দুজনেই চাকুরি ছাড়লাম। দীর্ঘ ৬ মাস ধরে চললো প্রশিক্ষণ কোর্স।এর মধ্যে থিউরি এবং প্রাকটিক্যাল। ক্লাস নিলেন প্রয়াতঃ তারেক মাসুদ, শিবলী সাদেক, মহিউদ্দিন ফারুক, মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল, ক্যাথরিন মাসুদ, সাইদুল আনাম টুটুলসহ আরও অনেকে। আমাদের ফিল্ম ক্লাসের ছাত্রদের মধ্যে তখন দুই ধরণের চিন্তাগত টানাপোড়েন। ছবিতো বানাবো, কিন্তু সেট কি ধারার হবে? মেইনস্ট্রিম নাকি অফট্র্যাক?

থার্টি ফাইভ ফরমেটে ২২ মিনিটের একটা শর্ট মুভি বানালাম আমরা, যেখানে দুই ধারাই পরিস্ফুট।স্ক্রিপ্ট ডিরেকশনের পাশাপাশি সেখানে অভিনয়ও করলাম। সার্টিফিকেট নিয়ে যখন এনআইএমসি থেকে বের হলাম, তখন চোখে ঘোর অন্ধকার। কিছুদিন এফডিসিতে ঘুরলাম। কোনো ঠাঁই নাই।একজনের পরামর্শে নায়ক উজ্বলের সাথে দেখা করলাম। তিনি তখন ছবি পরিচালনা করছেন, সহকারি নিবেন। সকাল দশটায় আমাকে বসিয়ে সেইযে গেলেন, রাত ১০টা পর্যন্ত তাঁর কোনো খবর নেই। আমি চলে এলাম। পরে জানলাম, এটাই নাকি আমার পরীক্ষা ছিলো। মনে মনে ভাবলাম- খুব সম্ভবত আমি যদি ভোর পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলে আসতাম, তিনি এই কথাই বলতেন।

তারপর নানা চড়াই উৎরাই।সিনেমার পরিচালক হওয়াতো দুরের কথা, জীবন ধারনই কঠিন হয়ে গেলো।টেলিভিশন নাটকের জগতে প্রবেশ করলাম। সেখানেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারলামনা। মাস তিনেক তেল মাখার পর প্রযোজক একটা নাটকের জন্যে বাজেট দেন, তারপর নানা শর্ত। নিজে অভিনয় করবেন, বউ করবে, শালা-শালীতো আছেই, সেই সাথে পাড়া প্রতিবেশীও। এক প্রযোজকতো শুটিং স্পটে বাস ভাড়া করে এলাকার সব লোকজন নিয়ে গেছেন। শেষে স্পটে থাকার সব ঘর পূরণ হয়ে কেউ বসে, কেউ দাঁড়িয়ে ঘুমিয়েছেন।দিনের বেলায় খাওয়ার জন্যে দীর্ঘ লাইন। একসময় পরিচালকের জন্যেই খাবার নেই।সেই নাটক এডিট করার পর টিভি চ্যানেলের নানান কেরামতি।প্রিভিউ হতে ৬ মাস, প্রিভিউর পর প্রচার তারিখ পেতে ৩ মাস। প্রচারের ৩ মাস পরে অর্ধেক পেমেন্ট। বাকিটা পেতে আরও এক বছর, কোনো কোনো ক্ষেত্রে কয়েক বছর, অনেক চ্যানেল থেকে পুরো টাকা মেরে দেয়ার ঘটনাও আছে।

২০১৫ সালে সেন্টমার্টিন গেলাম নাটকের শুটিং করতে। সেখানে গল্পচ্ছলে আমার নবাগতা নায়িকা বললো- আমার কাজ তার খুব পছন্দ। আমাকে দিয়ে ছবি বানাতে চায়।আমি ভাবলাম-যাক এতোদিন পর বুঝি বিধাতা মুখ তুলে চেয়েছেন। গল্প নায়িকার, নায়িকা চরিত্রে অভিনয়ও তার, গানও করবেন তিনি। আবার নাকি কস্টিউম ডিজাইন এবং কোরিওগ্রাফিও করবেন। আমি প্রমাদ গুণলাম।মনে মনে ভাবলাম প্রজেক্টটাকে একটা টিউটোরিয়াল হিসেবে ভাবা যাক। চুক্তি হলো- আমি কোনো পারিশ্রমিক পাবোনা, তবে ছবি রিলিজ হলে লভ্যাংশের ৫০% পাবো। তারপর এক বছর ধরে চললো মল্ল যুদ্ধ।যুদ্ধটা ছবির সাথে আমার হওয়ার কথা ছিলোনা, হয়ে গেলো এই কারণে যে- নায়িকা এবং তার বয়ফ্রেন্ডের প্রেম-রোমান্স শেষ পর্যন্ত যখন কুরুক্ষেত্রে পরিণতঃ হলো। ছবি নির্মাণের পেছনের সেই গল্পে রোমান্স, এ্যাকশন, মেলো্ডি, কমেডি, সাসপেন্স- কোন কিছুরই অভাব ছিলোনা।

আমার চলচ্চিত্র ‘সেই মেয়েটি’র একটি গান।

একটি ঘটনা বলি। হোতাপাড়ায় গিয়েছি মুভির গান শুট করতে। সেটলাইট ফ্রেম সব ওকে করে বসে আছি, রোদে ঘেমে নায়কের কস্টিউম ভিজে যাচ্ছে, কিন্তু নায়িকার দেখা নেই। গ্রীন রুমে লোক পাঠাচ্ছি, সে আবার ফেরত আসছে, নায়িকা নাকি এখনও রেডি হননি। অগত্যা রেগেমেগে গিয়ে দেখি সেখানে চরম এক রোমান্টিক এ্যাকশন সিকোয়েন্স চলছে। মেকাপ রুমের দরোজা লাগানো। বাইরে মেকাপম্যান পায়চারি করছে। দরোজা ঠেলে ভিতরে গিয়ে দেখি সেখানে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছে। নায়িকা ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছেন, আর ফুঁপিয়ে কাঁদছেন। এখানে সেখানে এটা সেটা ছড়ানো, একটা ট্যাব ভেঙ্গে চৌচির, পুরো কক্ষে যেন ভূমিকম্প হয়ে গেছে। অদূরে নায়িকার বয়ফ্রেন্ড চেয়ারে বসে হাঁফাচ্ছে, ঘামে একাকার। নায়িকা আমাকে দেখে উঠে এসে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন- ‘সাজ্জাদ ভাই, আমার ছবিটা আর করা হলোনা। আমাকে মাফ করে দিয়েন।’ নায়িকার বয়ফ্রেন্ডকে হুমকি ধামকির অভিনয় করে, নায়িকাকে নানারকম বুঝিয়ে সেদিনের মতো শুটিং হলো।

ইতিমধ্যেই তাদের মধ্যে মিল মহব্বত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, নায়িকার বয়ফ্রেন্ড গেছে বিদেশে। ছবির এডিটিং, ডাবিং, কালার গ্রেডিং, মিউজিক শেষ। এখন শুধু একদিনের একটা প্যাচিং শুট আর টাইটেল বাকি।এক বিকেলে আমার মোবাইলে নায়িকার মেসেজ -‘সাজ্জাদ ভাই, আমাকে মাফ করে দিবেন, আমার আর বেঁচে থাকা হলোনা। আমি পৃথিবী ছেড়ে চলে যাচ্ছি।’ ছুটে গেলাম তার বাসায়, ভেতরে থেকে দরোজা্ বন্ধ। কোনো সাড়া নেই। বাসার দারোয়ান এবং অন্যান্যদের ডেকে দরোজা ভাঙ্গা হলো। ড্রয়িংরুমের সোফায় নায়িকার শিথিল দেহ, মুখ দিয়ে ফেনা বেরুচ্ছে। সবাই মিলে ধরাধরি করে হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। পেট ওয়াশ করার পর জ্ঞান ফিরলো নায়িকার। সেখানেও আরেক করুণ দৃশ্য, কেঁদেকেটে নায়িকার ডায়লোগ- ‘আমিতো মরতে চেয়েছিলাম, কেন তোমরা আমাকে বাঁচালে?’

মূলতঃ সেইদিন কিংবা তারও আগে আমার নিজের অজান্তে ওই ছবির অপমৃত্যু হয়েছিলো, কিন্তু সেটা আমি জানতামনা। জানলাম ধীরে ধীরে। যখন নায়িকা এবং তার বয় ফ্রেন্ডের চূড়ান্ত ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে।ছবি সেন্সর করতে টাকা লাগবে, রিলিজ দিতেও লাগবে টাকা, কিন্তু মূল টাকাটা যেহেতু নায়িকার বয়ফ্রেন্ডের কাছ থেকে আসতো, সুতরাং সে টাকা বন্ধ করে দেয়ায় ছবি আর এগুলোনা। আমার এতো ত্যাগ আর কষ্টের ফসল সেই ছবির লাশ আজও পড়ে আছে এডিটিং প্যানেলের হিম ঘরে।

পাদটীকাঃ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সমস্যা-সঙ্কট নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। সেদিকে আমি আর গেলামনা। আমি শুধু চলচ্চিত্র নিয়ে আমার ব্যক্তি জীবনের অভিজ্ঞতাটা পাঠকের সামনে তুলে ধরলাম। সামগ্রিক বিষয় নিয়ে আরেকদিন লেখার ইচ্ছাটা থাকলো।

লেখকঃ গণমাধ্যম কর্মী।