ক্যাটেগরিঃ শিল্প-সংস্কৃতি

 

সময়টা ১৯২৯।

ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিচারে ভারতীয় উপমহাদেশ তখন নানা ঘাত-প্রতিঘাতে উচ্চকিতো। চেতনার শানিত অস্ত্রে একে একে তৈরি হচ্ছে ভারতবর্ষের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি পরিবার। ইংরেজ শাসনের করালগ্রাস থেকে মুক্ত হবার এক দুর্দমনীয় আকাক্সক্ষা সারা ভারতীয় উপমহাদেশকে তখন মাতিয়ে রেখেছে নানা তরঙ্গে। সেই উদ্বেল তরঙ্গের দোলাতেই গুনে গুনে আঠারো বছর পর, অর্থাৎ ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ স্বাধীন হয়। এরপরের ইতিহাস চৈতন্যলোকের বৃত্তে বৃত্তাবদ্ধ আর মানবপ্রেরণার মশালে উজ্জীবিত আর এক কিংবদন্তীর ইতিহাস। সে ইতিহাসের বাতায়ন আজ না হয় রুদ্ধই থাকলো।

বলছিলাম ১৯২৯ সালের কথা। এ সময় আরও দুটো ঘটনা ঘটেছিলো সারা পৃথিবীজুড়ে। একটি ঘটনায় প্রকম্পিত হয়েছিলো দশদিক- আর্তনাদ করেছিলেন অনেকেই; আর অন্য ঘটনায় তেমন কোনো সারা পড়েনি- কেবল নীরব এক আবির্ভাব, অনেকটা হেমন্ত ঋতুর মতো।

পৃথিবী কাঁপানো ঘটনাটি ছিলো মার্কিন চিত্রশিল্পী রবার্ট হেনরির মৃত্যু; আর সে বছরই নিরবে নিভৃতে পৃথিবীর আলোতে চোখ মেলেছিলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া।

১৯২৯ সালের পহেলা জানুয়ারিতে তাঁর জন্ম। পশ্চিম বাঙলার বীরভূমে, সিঁউড়ী নামের এক গ্রামে। কালের হিসেবটা যদি কষতে যাই, তাহলে লিখতে হবে মৃত্যু ৭ জুন, ২০১১- মঙ্গলবার। কিন্তু সৃষ্টিকর্মের আরশিতে চোখ ফেরাই যদি- মৃত্যু তখন তুচ্ছ গাঙচিল, মোহাম্মদ কিবরিয়া অমর এক কিংবদন্তী। বাস্তবিকই তাই। তাঁর যে সৃষ্টি সম্ভার তিনি রেখে গেছেন- যে ধারা তিনি দিয়ে গেছেন আমাদের সৃজনশীল আঁকিয়ে মাধ্যমে, তার নাগপাশেই তিনি জীবন্ত চিরকাল- চারুকলা ইনিস্টিটিউটের প্রিয় কিবরিয়া স্যার হয়ে, জীবনের মায়াশূন্য উঠোনে এক অবিশ্রান্ত চিত্রশিল্পী হয়ে।

তাঁর পিতা মোহাম্মদ রফিক এবং মাতা সায়েরা বেগম৷ বড়ো ভাই মোহাম্মদ আরিফ৷ তিনি বাবাকে হারিয়েছেন খুব অল্প বয়সে৷ একটি ছোটো প্রেস ছিলো কিবরিয়ার বাবার৷ তাঁর মৃত্যুর পর কিবরিয়ার বড়ো ভাই সেটি চালাতেন৷ মা বা বড় ভাই কেউ-ই কিবরিয়ার শিল্পী হওয়ার ইচ্ছায় কোনো বাধা দেননি৷ পরিবারের পরিবেশটি ছিল খোলামেলা, আন্তরিক৷

তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয় বীরভূমে। সেখানেই তাঁর ছবি আঁকার হাতেখড়ি। বীরভূমে প্রতিবছর কৃষি মেলা হতো। সে মেলায় আঁকিয়েরা ছবি নিয়ে যেতেন৷ বীরভূম জেলা স্কুলের শিক্ষার্থীরাও ছিলেন এই দলে। সে সুবাদে মোহাম্মদ কিবরিয়াও কয়েকবার অংশ গ্রহণ করেছেন মেলায়৷ এ মেলার তাৎপর্য ছিলো বেশ। মৃত্যুর মাস ছয়েক আগে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এসেছিলেন এই মেলায়। তিনি আসায় ওই কৃষি মেলাটি অনেক বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে৷ মোহাম্মদ কিবরিয়া তখন ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণীতে পড়তেন৷ রবীন্দ্রনাথের সৌম্য শান্ত মূর্তি তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করেছিলো৷ বীরভূম জেলা স্কুল থেকে হাতে লেখা ম্যাগাজিন প্রকাশিত হতো তখন। সেই ম্যাগাজিনে আঁকতেন কিবরিয়া৷ তাঁর ছবি আঁকার আগ্রহ তৈরি করে দিয়েছিলেন স্কুলের শিক্ষকরা৷ বীরভূম জেলা স্কুল শেষ করে যখন কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হলেন, তাঁর পেছনে অনুপ্রেরণা এসেছিলো সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওয়াজেদ আলী চৌধুরীর কাছ থেকে৷ তিনি স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে কথা বলেছিলেন কিবরিয়ার পরিবারের সঙ্গে৷ ফলে তিনি ১৯৪৫ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন৷ তখন তাঁর বয়স ষোলো বছর।

এই আর্ট স্কুল তাঁর সৃষ্টির দরজাটা প্রসারিত করে দিয়েছিলো। নিজস্ব একটি ধারার খোঁজ তিনি এখান থেকেই লাভ করলেন; সেই সঙ্গে পেলেন নিজেকে মেলে ধরার প্রেরণা। সমকালীন চিত্রকলার জন্য মোহাম্মদ কিবরিয়া যে ভাষা ও শৈলী গড়ে দিয়েছেন, তার ভিত রচিত হয়েছিলো মূলত এই আর্ট স্কুল থেকেই।

১৯৫০ সালে কলকাতার স্কুল অফ আর্টস অ্যান্ড ক্রাফটস থেকে পেইন্টিংয়ে স্নাতক হন৷ এরপর ১৯৫১ সালের শেষের দিকে চলে এলেন ঢাকায়৷ ঢাকায় এসে তিনি নওয়াবপুর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে ড্রয়িং-শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন৷ ততোদিনে জয়নুল আবেদিন তাঁর কয়েকজন সতীর্থের সহায়তায় ঢাকায় আর্ট ইনস্টিটিউট খুলেছেন, এবং এর অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়েছেন৷ জয়নুল আবেদিন কিছু সময়ের জন্য লন্ডন গেলে কিবিরিয়া আর্ট ইনস্টিটিউটে শিক্ষকতার সুযোগ পান, জয়নুল আবেদিন ফিরে এলে তিনিও ফিরে যান নওয়াবপুর স্কুলে৷ তবে ১৯৫৪ সালে পাকাপাকিভাবে আর্ট ইনস্টিটিউটে (বর্তমান চারুকলা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) যোগ দেন৷ ১৯৮৭ সালে চারুকলা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক হিসাবে নিয়োগ পান৷ ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন৷

এরই মধ্যে ১৯৫৯ সালে বৃত্তি নিয়ে জাপানের টোকিও ইউনিভার্সিটি অফ ফাইন আর্টস অ্যান্ড মিউজিক থেকে পেইন্টিং ও গ্রাফিকসে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন৷

বাঙলাদেশের শিল্পকলার বর্তমান অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে তাঁর যে অবদান এবং পশ্চিমা আধুনিকতার নানান ধারার সঙ্গে দেশজ চেতনা ও ঐতিহ্যের একটি অপূর্ব মনিকাঞ্চণে তাঁর যে মুন্সিয়ানা- তা নিঃসন্দেহে আমাদের চিত্রশিল্প জগতে অনন্যতার দাবিদার। বিমূর্ত প্রকাশবাদী চিত্রকলার চর্চায় এবং ছাপচিত্রে মোহাম্মদ কিবরিয়া যে মৌলিকত্ব, সৃজনপ্রতিভা এবং দেখিয়েছেন, তা তুলনারহিত।

কলকাতা আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন রমেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী৷ জয়নুল আবেদিন ছিলেন সেখানকার জনপ্রিয় শিক্ষক। আরও ছিলেন আনোয়ারুল হক, মণিভূষণ দাশগুপ্ত৷ আরও একজন শিক্ষক ছিলেন, বসন্ত গাঙ্গুলি৷ তিনি কিবরিয়াকে প্রভাবিত করেছেন শিল্পের প্রকরণ ব্যবহারে সৃজনশীল হওয়ার ক্ষেত্রে৷ বসন্ত গাঙ্গুলি নিজে এসব প্রকরণ-রঙ, প্যাস্টেল, কাঠকয়লা-খুবই দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করতে পারতেন৷ আবার ছবির ভেতরেও যে একটি কাঠামো থাকে, যার সঙ্গে উপরিতলের থাকে একটি দ্বান্দিক সম্পর্ক, সেটি তিনি চমৎকারভাবে চিহ্নিত করতে পারতেন৷ ছবির কম্পোজিশনে কোথায় কোন দৃষ্টিক্ষেত্রকে কীভাবে প্রভাবিত করতে পারে, বসন্ত গাঙ্গুলি তা-ও ভালো জানতেন৷ কিবরিয়ার মধ্যে তিনি এসব গুণের উন্মেষ ঘটাতে পেরেছিলেন৷ তার কাছ থেকে কিবরিয়া জেনেছিলেন, প্রতিটি ছবির একটি কেন্দ্রবিন্দু থাকে এবং ছবির কাঠামোকে সেই বিন্দুর চারদিকে সাজাতে হয়৷ এই সাজানোটি যে সব সময় একটি পূর্ব পরিকল্পনা থেকে করতে হয়, তা নয়, বরং ছবি আঁকার সময় (অথবা ছাপাই ছবিতে রেখার সূক্ষ ও জটিল প্রয়োগের সময়) একটি স্বতঃস্ফুর্ততা থেকে, একটি অনিবার্যতা থেকে সেই ছবির ফর্মগুলো যেনো একটি কেন্দ্রাভিমুখ বিন্যাসে গ্রন্থিত হয়ে যায়৷ এই কেন্দ্রটি নান্দনিক অনুভূতির, আবেগের, সৃজন কল্পনার অথবা বিচারবুদ্ধির৷ কিবরিয়ার ছবিতে (আধা-বিমূর্ত, আধা-অবয়বধর্মী অথবা বিমূর্ত) এই কেন্দ্রিকতার বিষয়টি একটা গতিশীলতা সৃষ্টি করে৷ এমনকি, যে ছবিতে অবয়বটি শনাক্তযোগ্য, সেখানেও৷

১৯৫৯ সালে আঁকা তাঁর ‘ফুল হাতে বালক’ ছবিটি নিয়ে বিভিন্ন চিত্রসমালোচকের মন্তব্য বিশ্লেষণে কয়েকটি বিষয় ফুটে উঠে। এ ছবিতে দর্শকের প্রধান অনুভূতিটি কি বালক সম্পর্কিত, নাকি ফুল সম্পর্কিত? খানিকক্ষণ তাকালে দেখা যাবে বালক ও ফুল- এ দুয়ের পেছনে আছে এক ধরনের বিষন্নতা৷ বালকের চোখে যেমন নেই উচ্ছ্বাস, তেমনি ফুলও ঠিক ফুল হয়ে ধরা দেয় না৷ এই ছবিতে ফুল সম্পর্কিত প্রথাগত রোমান্টিকতা নেই, আছে বিষন্নতা, অথবা অনিষ্পাপতা (বালকের ফিগারকে তুলে ধরে যে রঙ তা ওই অনিষ্পাপতার ইঙ্গিতবহ)। এই ছবির কেন্দ্র কোথায়? কেন্দ্র আছে ওই বিষন্নতা/অনিষ্পাপতার অনুভূতিতে, যেখানে এই ছবির অভিজ্ঞতা আমাদের নিয়ে যায়৷ অথবা ছাপাই ছবিতে (যেমন, ১৯৬০-তে করা ‘দুটি ফুল’, লিথোগ্রাফ) ফর্মগুলো পরস্পর সম্পর্কিত হয়, নিষিক্ত হয়, বিকর্ষিত হয়, কিন্তু ছবিতে একটা ভারসাম্য সব সময় বজায় থাকে৷ ‘দুটি ফুল’-এ ফুলের দুই প্রতিরূপ, বিমূর্ত দুটি ফর্ম, একটি পরিব্যাপ্ত পরিসরে স্থাপিত৷ তাদের ভিতরে মিল আছে, অমিল আছে৷ কিন্তু এক সময় বোঝা যাবে, এই দুটি ফর্ম আসলে সম্পর্কের অনিবার্যতার একটা চিন্তাকেই জাগিয়ে দেয়৷ এ ছবির কেন্দ্র কোথায়? কেন্দ্রটি উপস্থিত একটি বোধে, একটি অনুভূতিতে, একটি বিচারে, যাতে পৌঁছানোর জন্য দুটি ফর্মের আন্তঃসম্পর্ককে বুঝতে হবে৷ কলকাতা আর্ট স্কুলে যখন পড়তেন কিবরিয়া, পশ্চিমা ধাঁচের অ্যাকাডেমিক চর্চাটাই তখন প্রবল ছিলো৷ তাতে একটি পর্যায়ের দক্ষতা সবাই অর্জন করতে পারতেন৷ কিন্তু শুধু এই চর্চায় মননশীলতার বিকাশটি ছিলো কঠিন৷ কিবরিয়া অবশ্য অ্যাকাডেমিক চর্চার মাধ্যমে ভিত্তিটি তৈরি করেছেন৷ কাজের যে একটি শৃঙ্খলা, একটি নিষ্ঠা থাকা প্রয়োজন, সেটুকুও উপলব্ধি করতে পেরেছেন তিনি এই অ্যাকাডেমিক চর্চার মাধ্যমে৷

কিবরিয়ার অ্যাকাডেমিক চর্চায় জলরঙ ও তেলরঙের ব্যবহার ছিলো৷ ভারতীয় ঐতিহ্যে ঘন ও অনচ্ছ জলরঙ ব্যবহার করা হতো৷ কিন্তু তার তুলনায় তেলরঙে চিত্রতলে অনেক বেশি গভীরতা আনা সম্ভব এবং টেক্সচারের উপযুক্ত ব্যবহারের মাধ্যমে ক্যানভাসকে গতিশীল করা যায়, এরকম একটি সিদ্ধান্ত থেকে অ্যাকাডেমিক চর্চা রঙ ও অন্যান্য প্রকরণ ব্যবহারে যেমন পশ্চিমকে অনুসরণ করেছে, তেমনি বিষয়বন্তুতেও বৈচিত্র্য আনতে তা সচেষ্ট ছিলো। কিবরিয়া অ্যাকাডেমিক কাজ করেছেন, কিন্তু ইমপ্রেশনিজমের দ্বারস্থ হয়েছেন ক্যানভাসকে নির্ভার ও স্পন্দমান করতে। আলোর প্রতি এবং খোলা জায়গার প্রতি ইমপ্রেশনিস্টদের পক্ষপাতিত্ব আর্ট স্কুলের শিক্ষার্থীদের প্রকৃতিমুখী করতে প্রণোদনা যুগিয়েছে। ইমপ্রেশনিস্টদের মতো কিবরিয়া একদিকে ছবিতে নিজেকে প্রকাশের একটি সুযোগ এবং পৃথিবীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার উপায় হিসেবে দেখেছেন, অন্যদিকে প্রকৃতির ভিতরের জীবনকে তুলে আনার চেষ্টা করেছেন।

আর্ট স্কুল থেকে পাশ করে বেরুনোর পর কিবরিয়া যামিনী রায়ের ছবির, বিশেষ করে তাঁর রঙ ব্যবহারের গুণগ্রাহী হয়ে পড়েন৷ কিবরিয়া নিবিষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করলেন যামিনী রায়ের কাজ৷ পটুয়াদের বিষম বর্ণলেপনের পরিবর্তে সুষম বর্ণলেপনের প্রতি যামিনীর পক্ষপাতিত্ব, ছবিতে গড়নের পরিবর্তে দ্বিমাত্রিকতার উদ্ভাস, রেখা ও রঙের সাযুজ্য ও সংহতি- এ-সবই কিবরিয়াকে আকর্ষণ করল৷ তাছাড়া ইউরোপের পোস্ট ইমপ্রেশনিস্ট ধারায় আঁকা যামিনী রায়ের কিছু নিসর্গচিত্রও তাঁকে এরকম ছবিতে আলোর খেলার বাইরে ছবির নিজস্ব বাস্তবতাকে আলাদা করে দেখতে অনুপ্রাণিত করেছে৷ নিসর্গ কিবরিয়ার ছবিতেও মূর্ত হয় নানান আবহে, নিসর্গের সঙ্গে ছড়িয়ে থাকে নানা বোধ এবং অনুভূতি, আনন্দ এবং বেদনা, বাস্তবতার অভিঘাত ও নস্টালজিয়ায়৷ এ সময় স্পেসের ব্যবহারে তিনি উদার হয়েছেন, যাতে ক্যানভাসের ভেতরে পরিসরের একটি পরত খুলে যায়; বস্তুর পেছনে গিয়ে ভিন্ন একটি মাত্রায় স্থিত হয় চিত্রতল৷ নিসর্গের পাশাপাশি ব্যক্তির ওপর তিনি দৃষ্টি দিয়েছেন, বুঝতে চেয়েছেন ব্যক্তির ভেতরের জগত ও তার নানা বিন্যাসকে৷ তিরিশের দশকের বাঙলা কবিতা পশ্চিমা আধুনিকতা, এবং পশ্চিমা আধুনিকতার শৈলীগত লক্ষণগুলো আত্মস্থ করে যেরকম ব্যক্তির বিষন্নতা, বিকার, পারক্যবোধ এবং তার সংক্ষুব্ধ চিত্তের নানা আখ্যান রচনা করেছিলো, যার প্রভাবে বাঙলা কবিতায় ঘটে যায় এক কালান্তর, তেমনি পঞ্চাশ-ষাটের দশকে বাংলাদেশের চিত্রকলায় ব্যক্তির ওপর সন্ধানী আলো পড়ে৷ কিবরিয়ার ছবিতে এই ব্যক্তি উদ্ভাসিত হয়েছে অবশ্য কিছুটা আত্ম-অবলোকনের আলোতে৷ বালকবেলা থেকেই পারিবারিক আবহ কিবরিয়ার জন্য সৃষ্টি করেছে নিঃসঙ্গতা এবং একাকীত্ববোধ৷ হয়ত অনিশ্চয়তার অস্বস্তিরও৷ এই অনিশ্চয়তার উৎপত্তি তাঁর পরিপার্শ্বকে নিজস্ব করে নিতে না পারার, অথবা জীবনের রীতিবদ্ধ প্রবাহে নিশ্চিত পা রাখতে না পারার অসফলতা থেকে৷ কিবরিয়া কখনও উচ্চকিত হতে পারেননি তাঁর চিন্তা নিয়ে, দ্বন্ধ নিয়ে, ক্রোধ নিয়ে; আত্মমগ্নই থেকে গেছেন বরাবর৷ তাঁর চিত্রস্বভাবও তাই অন্তর্গামী৷ সেজন্য দ্বন্ধকে তিনি সাজান রঙ ও ফর্মের একটি অন্তর্কাঠামোয়৷ বস্তুর বহিরাঙ্গ তাঁকে আকৃষ্ট করে, কিন্তু শীঘ্রই তিনি দৃষ্টি ফেলেন এর ভেতরের বিন্যাসে, এর অন্তর্কাঠামোয়৷

একটি ছবি শুরু করতে গিয়ে কিবরিয়া অনুভব করেন, তাঁর ছবি শুধু একটি চিন্তা অথবা অনুভূতিকেই প্রকাশ করবে না, বরং তা ব্যক্তির নিগূঢ় মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন ঘটাবে৷ ছবির পেছনে চেতন-অবচেতনের একটি যুগ ক্রিয়া থাকে, অচেতনের নানা ইঙ্গিত থাকে৷ সেগুলোর একটি ব্যাখ্যা না হলেও অন্তত প্রকাশটা থাকা দরকার৷ এই অবচেতন বিষয়টি কিবরিয়ার ছবির জন্য জরুরি৷ এক্সপ্রেশনিজম বা প্রকাশবাদী ছবি- ফিগারধর্মী অথবা বিমূর্ত, যে- কোনও শ্রেণিরই হোক- ব্যক্তির মনোজগতের যেসব টানাপোড়েন, তার সংক্ষুব্ধতা, হতাশা ইত্যাদির প্রকাশ ঘটায়, তার নৈর্ব্যক্তিক উপস্থাপনা একটি দুরুহ ব্যাপার৷ কিবরিয়া সে-কাজটি সফলভাবে করেছেন৷ তবে একটি বিশেষ রীতিতে চিত্রচর্চার সংকল নিয়ে এগিয়ে যাবার পেছনে কিছু কৃত্রিমতা থাকে, রিপ্রেজেন্টেশনটি তখন অপ্রকৃত হয়ে দাঁড়ায়৷ তাঁর ছবিতে এই সমস্যাটি নেই৷ প্রশান্তির বিষয়টি অবশ্য সহজেই বোঝা যায়৷ কিবরিয়ার ছবিতে প্রশান্তির মানসিক দিকটির বাইরেও একটি দার্শনিক, এমনকি অস্তিত্ব সূচক ইঙ্গিতও আছে৷ আগে ‘চন্দ্রাহত ঘোড়া’ বা ‘গোরস্তানে নৃত্য’- পর্যায়ে একটি পরিব্যাপ্ত বিষন্নতাবোধ ছিলো তাঁর কাজে, একটি পরাবাস্তব বিষাদের দ্যোতনা ছিলো এখন সেটি পেছনেই ফেলে এসেছেন তিনি৷ তবে বিষন্নতা যে নেই তা নয়, আছে৷ তাঁর নীল রঙ আছে, স্পেসের পরিচর্যায় একটি সূক্ষ অপ্রাপ্তিবোধের প্রকাশও আছে, অনুপস্থিতির একটি অনুভূতিও আছে৷ কিন্তু ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, কোথায় যেনো একটি প্রশান্তির ছোঁয়া লেগে আছে৷ সে-শুধু রঙ নয়, শুধু ফর্মের নান্দনিক সংস্থাপন নয়, বরং এসবের সম্মিলিত একটি ব্যঞ্জনা৷

কিবরিয়া একক এবং যৌথ অনেক প্রদর্শনী করেছেন৷ তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একক প্রদর্শনীগুলো হলো- ১৯৬০ সালে জাপানের টোকিওতে গ্যালারি ইয়োসিদো, ১৯৬৩ সালে একই শহরের বিজুতসু শিপ্পানশায়৷ দিল্লীতে দক্ষিণ এশীয় সাংস্কৃতিক উৎসবে ১৯৭৯ সালে কিবরিয়া ২০টি চিত্রকর্ম নিয়ে প্রদর্শনী করেন৷ ২০০০ সালে বেঙ্গল ফাইন আর্টসে একক প্রদর্শনী করেন৷ এছাড়া জাপানের মারুনিচি গ্যালারি, আর্ট ফ্রন্ট গ্যালারি এবং যুগোস্লাভিয়ার দ্য যোসেফ ব্রজ টিটো আর্ট গ্যালারিতে কিবরিয়ার একক চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে৷

যৌথ প্রদর্শনীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ১৯৫২ সালে দ্বিতীয় বার্ষিক প্রদর্শনী, ঢাকা আর্ট গ্রুপ, ঢাকা জাদুঘর৷ ১৯৫৪ সালে সর্ব-পাকিস্তান চারুকলা প্রদর্শনী, পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল, ঢাকা৷ ১৯৫৬ সালে এ ভিউ অব দ্যা নিউ আর্ট ইন পাকিস্তান, ইউসিস, ঢাকা৷ ১৯৫৭ সালে ৯ পূর্ব পাকিস্তানি চিত্রশিল্পীর প্রদর্শনী, ওয়াশিংটন ডিসি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র৷ ১৯৬০ সালে সর্ব-জাপান প্রিন্ট প্রদর্শনী, টোকিও, জাপান৷ ১৯৬১ সালে তয় জাতীয় চিত্রকলা ও ভাস্কর্য প্রদর্শনী, আর্টস কাউন্সিল অফ পাকিস্তান, করাচি, পাকিস্তান৷ একই বছর তিনি সমকালীন চিত্রকলা প্রদর্শনীর জন্য ইটালি এবং পাকিস্তানে প্রদর্শনী করেন৷ ১৯৬২ সালে ৫ম সমকালীন জাপানি চিত্র প্রদর্শনী, টোকিও,জাপান৷ ১৯৬৩ সালে জাতীয় চিত্রকলা প্রদর্শনী, পাকিস্তান আর্ট কাউন্সিল, লাহোর৷ ১৯৬৪ সালে শিক্ষার মাধ্যমে যোগাযোগ, লাহোর পাকিস্তান৷ ১৯৭৫-৯৮ সালে ১ম,২য়, ১১তম ও ১৩তম জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনী, বাঙলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, ঢাকা৷ ১৯৮১-২০০৩ সালে ১ম, ২য়, ৩য়, ৬ষ্ঠ, ৭ম, ১০ম এবং ১১তম এশীয় দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনী, ঢাকা৷ এছাড়া দেশে-বিদেশে তাঁর অসংখ্য চিত্রকর্ম প্রদর্শিত হয়েছে৷

কিবরিয়া ১৯৫৭ সালে ঢাকায় আয়োজিত জাতীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে চিত্রকলায় প্রথম পুরস্কার লাভ করেন৷ ১৯৫৯ সালে জাপানের টোকিওতে আয়োজিত প্রথম তরুণ শিল্পী প্রদর্শনীতে স্টারলেম পুরস্কার লাভ করেন৷ ১৯৬০ সালে জাপানে সর্ব-জাপান প্রিন্ট-প্রদর্শনীতে পুরস্কৃত হন৷ ১৯৬৯ সালে চিত্রকলায় বিশেষ অবদানের (প্রাইড অফ পারফরম্যান) জন্য প্রেসিডেন্ট পদক লাভ করেন৷ ১৯৮৩ সালে একুশে পদক লাভ করেন৷ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ-সম্মাননা লাভ করেন৷ ১৯৯৯ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার লাভ করেন৷ ২০০২ সালে জাপানী পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সম্মাননা লাভ করেন৷

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম রবার্ট হেনরীর কথা। যিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন মোহাম্মদ কিবরিয়া জন্মগ্রহণের বছরেই। রবার্ট হেনরী ছিলেন বস্তুবাদী চিত্রকলা আন্দোলনের এক অনন্য পথিকৃৎ। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নেই এ বিস্ফোরণোন্মুখ ধারা চিত্রশিল্পের জগতে নিয়ে আসে নিবিড় নৈবেদ্য। উইলিয়াম গ্ল্যাকেনস (১৮৮০-১৯৩৮), রবার্ট হেনরী (১৮৬৫-১৯২৯), জর্জ লাকস (১৮৬৭-১৯৩৩), অ্যাভারেট শিঈন (১৮৭৬-১৯৫৩), জন ফ্র্যাঞ্চ স্লোআন (১৮৭১-১৯৫১), আর্থার ভি ডেভিস (১৮৬২-১৯২৮), ইমেস্ট লওসন (১৮৭৩-১৯৩৯), মিউনিচ প্রিডানজাস্ট (১৮৫৯-১৯২৪)- এই আট শিল্পীর মিলিত প্রয়াস ছিলো সেই আন্দোলনের ফসল। সে সময়ের আবহে জন্মেই মোহাম্মদ কিবরিয়ার মাঝে কাজ করে এক অন্তিম একাকিত্ব; সম্ভবত সে কারণেই তিনি প্রকৃতির মধ্যে খুঁজেছেন প্রাণ, অথবা নিমগ্নতা, অথবা বিষাদ- তাতে আধুনিকতার ধারণাটি সপ্রাণ হয়ে দাঁড়িয়েছে৷ কিবরিয়ার কাজে আধুনিক নগরজীবনের নির্বেদ আর ক্লান্তিকে যতোটা পাওয়া যায়, তারও বেশি পাওয়া যায় প্রকৃতির ভিতরের সুর আর স্পন্দন এবং মানুষের ওপর এর ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াকে, তার নানা বোধ-অনুভূতিকে৷ এই বহু বোধ সঞ্চারী ছবি আঁকা খুব বেশি শিল্পীর পক্ষে সম্ভব হয় না৷

এ মানুষটি প্রকৃতির মতো নীরবেই চলে গেলেন। কাউকে জানালেন না তাঁর বেদনার কথা, আত্ম নৈকট্যের অভিধান থেকে তুলে দিলেন না কোনো শব্দ- কিংবা নিজস্ব ক্যানভাস থেকে কোনো রঙ। তবুও তাঁর সৃষ্টির মাঝেই তিনি চির অমর হয়ে থাকবেন- যুগে যুগে, কালে কালে।

***
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: কামরুন ঝুমুর এবং ডি. নেট