ক্যাটেগরিঃ ক্যাম্পাস

 
ছবি, কাইয়ুম চৌধুরী

আজকাল আমাদের সমাজে নানা রকমের পণ্য কিনতে পাওয়া যায়। রকমারি এসব পণ্যের সাথে নানা কিছু বিনামূল্যেও দেয়া হয়। ফলে পন্যের পসার কতোটা বাড়ে জানি না- তবে বিনামূল্যের বিচরণে বিনা মানে নানা কিছু ঢুকে পড়ছে আমাদের প্রতিদিনের জীবনে। সে ঢুকুক! আপত্তি নেই। অনেকেরই হয়তো আপত্তি আছে, থাকবেও- কারণ গণতান্ত্রিক দেশে ভিন্ন মত থাকতেই পারে এবং তা প্রকাশেও কোনো বাধা দেখি না।
কিন্তু এ পণ্যের সমাহারে একটা বিষয় বেশ খটকা ঘটছে। এতোদিন বিষয়টা নিয়ে নানা জনে নানা কথা বলেছেন, কেউ কেউ বিষয়টি নিয়ে অনেক সেমিনার সিম্পোজিয়াম করেছেন। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। উল্টো অনেককেই বিষয়গুলো নিয়ে নানা রকম বাজে মন্তব্য করেছি।

কিন্তু এবার সলতে পুড়ে নিজের শরীরে আগুন লাগছে। বার্ন ইউনিটের ডাক্তার জানিয়েছেন- পুড়ে গেছে অধিকাংশ অঞ্চল, তবুও আমাদের হুঁশ হয়েনি। কারণ যা পুড়েছে তার পুরোটাই আমাদের বিবেক; বিবেক পুড়লে আমাদের তো কোনো ক্ষতি নেই। কিন্তু এখনো যদি সচেতন না হোন- তবে কিন্তু আসছে দিন বেশ খারাপ। এতটুকু নিস্তার পাবার জো নেই।

বিষয়টা কী? একটু খোলাসা করেই বলি। শিক্ষা। নিঃসন্দেহে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য চাহিদা। এতোটাই অপরিহার্য যে- শিক্ষার জন্য আমরা সুদূর চীন দেশে তো যাই-ই, কখনো কখনো নিজের দেশে থেকেই চীন দেশের সমান শিক্ষাব্যয় করে থাকি। সন্তান জন্ম নেবার পরই- বাবা মা অস্থির হয়ে যান- কোন স্কুলে পড়াবেন, ইঞ্জিনিয়ার না ডাক্তার হবেন তারপর কী হবেন- ইত্যাদি ইত্যাদি। তাই সন্তানদের নিয়ে চলে বাবা-মায়ের জোর প্রচারণা। কিন্তু আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে- এই জোর প্রচারণার পর সন্তান আসলে

কতোদূর এগোয়?

কয় কদম?

প্রকৌশলি, চিকিৎসক, বিবিএ, এমবিএ ডিগ্রিধারী কিংবা সরকারি উচ্চপদস্থ চাকুরে- কিন্তু তারপর কী? এরপর কী আর কিছুই লাগে না। সনদই যথেষ্ঠ? একজন ঘুষখোর প্রকৌশলি নিয়ে মায়ের এতো গর্ব? কসাই চিকিৎসককে নিয়ে বাবা কী সুখ পান? কিংবা অপোগণ্ড সরকারি কর্মকর্তা- যে নিজের সুখের বিনিময়ে (?) নিজের দেশ বিক্রি করে দিচ্ছে, তার কাছে কী প্রত্যাশা পরিবারের?

ভালো রেজাল্ট এখন সমাজের জন্য অপরিহার্য। আমি মানলাম- কিন্তু তারপর? তারপর কী হবে? ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষিকা রুমানা ম্যাডামকে নির্যাতন করা পিশাচ হাসান সাইদ- সে ও তো প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা। ভালো ছাত্র না হলে তো সেখানে ভর্তি হওয়া যায় না। তাহলে এই ভালো ছাত্র কী করলো? এরকম নির্যাতন তো আমাদের দেশের শিক্ষিত বা তথাকথিত অশিক্ষিত ত্রিচক্রযান চালকেরাও করেন না। অথবা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতারা- যাদের হাতে ন্যস্ত ছিলো দেশের ছাত্র রাজনীতির ঐতিহ্যকে আরো সুদৃঢ় করে জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রাখা- তারা তো টেন্ডারের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। হলে হলে অবৈধ সিট বাণিজ্য করে। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা না-ই বা বললাম। কিন্তু তাদের করুণ দশাও আমাদের সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য হতাশাব্যঞ্জক।

অথচ- যদি আগের ইতিহাস পড়ি; কী সুন্দরই না ছিলো সেই দিনগুলো। সেই ষাটের কিংবা সত্তর দশকের শিক্ষার্থীরা। যাদের সামনে হাজার প্রতিবন্ধকতা ছিলো, কিন্তু তারপরেও তারা স্বার্থান্বেষী হয়ে মনুষ্যত্বটাকে জলাঞ্জলি দেয়নি। আর এখন? আমরা তো এখনকার শিক্ষার্থী; আমাদের মনুষ্যত্ব কোথায়?

নেই- বিক্রি করে এসেছি। ছেলেবেলা শুনেছি, মনুষ্যত্ব থাকলে নাকি অনেক টাকার মালিক হওয়া যায় না। তাই সেটাকে নিয়ে আর ভার বাড়াইনি। মাঝে মাঝে ভাবি- এমন হলো কেনো? অনেক ভেবে ঘুরে ফিরে একটা চিন্তাতেই এসে মন আটকে যায়। মনে হয় সেই কথাটা ‘সুশিক্ষিত লোক মাত্রেই স্বশিক্ষিত’। তাহলে আমাদের সুশিক্ষা নাই? আমার মনে হয় নাই; এবং এই না থাকার জন্য প্রথমত আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো দায়ি, দ্বিতীয়ত দায়ি আমরা এবং আমাদের পরিবার। এখন শিক্ষা বলতে যা বোঝানো হয়- তার মধ্যে কোনো নৈতিকতা বোধ থাকে না। ছেলেবেলা থেকেই একজন শিক্ষার্থী তার সহপাঠীকে পরীক্ষা হলে ভুল উত্তরটি দিয়ে আসে, এটা করে মূলত হিংসা বশত- ভাবে ‘আমার চেয়ে নম্বর সে কম পাবে’। তারপর পরীক্ষার খাতায় থাকে মায়েদের নির্লজ্জ নম্বর বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। প্রশ্ন ফাঁস করে পরীক্ষা দেয়া তো এখন শহরের নামকরা স্কুলগুলোতে পানিভাত, আর সেই সাথে মেডিক্যাল কলেজের ভর্তি পরীক্ষায়- আহা, সেখানে প্রশ্ন তো আউটই থাকে। তার মানে হলো- অনৈতিকতা, মিথ্যা বলা আমাদের শৈশবের মজ্জাগত। বুদ্ধদেব বসু তাঁর শৈশবে পেয়েছিলেন ‘কমেডি অব এররস’ এর বই; আর আমরা শৈশবে লাভ করি মিথ্যা, দুর্নীতি আর শয়তানির শিক্ষা। ওটাও এখন শিক্ষা কার্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত। কিচ্ছু করার নেই।

তাহলে শিক্ষাটা দাঁড়ালো সনদ নির্ভর। বিশ্বের আর কোনো দেশে শিক্ষার এই সংজ্ঞা নেই। শিক্ষার সঙ্গে যে সংস্কৃতি এবং মানবিকতার একটা শক্ত যোগসূত্র আছে, সেটা আমাদের দেশের কেউ আর মানতে চায় না। একমাত্র আমাদের দেশেই সাহিত্য-দর্শন-ইতিহাস-বিজ্ঞান মানে ‘সিলেবাসের বাইরের বই’ কিংবা ‘আউট বই’। অথচ এসবের অভাবেই পুরো জাতিটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। উচ্ছন্নে যাচ্ছে আর সেই সাথে আমাদের সভ্যতাকে গিলে খাচ্ছে শয়তানের হিংস্রতা। আমরা এর কোনো প্রতিকার আশা করি না; কেবল আহ! উহ! শব্দ করেই আমাদের দিনযাপন হয়।

আমাদের দেশে যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, তারা আক্ষরিক অর্থে কেবল সনদের জোরেই টিকে থাকে। নিজস্ব বিবেক বা বোধ মর্যাদা তাদের নেই। এই না থাকার জন্য শিক্ষার্থীরা দায়ি; কিন্তু তার চেয়ে বেশি দায়ি এইসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কাঠামো। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকও এখন হয় মুদি দোকানদারের সেলসম্যান (মানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্ট টাইম খ্যাপ মারা) কিংবা রাজনৈতিক বচন বাজ (মানে লেজুড়বৃত্তি রাজনৈতিক কর্মকান্ড)। নিজস্ব রাজনৈতিক আদর্শ শিক্ষকের থাকতেই পারে, চাইলে তাঁরা রাজনীতিও করতে পারেন- কিন্তু কেনো তাঁরা তাঁদের শিক্ষার্থীদের মাঝে নৈতিক বোধের জন্ম দিচ্ছেন না? তাঁদের কীসের ভয়? কীসের লজ্জা? নাকি তাঁদের নিজেদের বিবেক আর নৈতিকতাবোধ নেই তাই কীভাবে শিক্ষার্থীর মাঝে সেই শিক্ষা জাগাতে হয়- সেটা তাঁরা জানেন না।

আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয়- বুয়েটের একজন শিক্ষক তাঁর শিক্ষার্থীদের কখনো প্রেমের গল্প বলেন কিনা, কিংবা কোনো মহৎ সাহিত্যের কথা বলেন কিনা। কখনো বলেন কিনা কোনো অপূর্ব কবিতার কথা। একাত্তরের কথা, কিংবা বাঙালির জাতীয়তাবাদ উন্মেষের সংগ্রামের সেই গৌরবগাঁথার কথা। যদি বলতেন, যদি শিক্ষার্থীদের অনুপ্রাণিত করতেন নিজস্ব হৃদয় শক্তি দিয়ে জেগে ওঠার- তাহলে তো এমন ঘটনা ঘটতো না। এমন নিষ্ঠুরতা এমন হীন স্বার্থপরতা শিক্ষার্থীদের মাঝে থাকতো না।

রুমানা ম্যাডাম যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন- এ রকম নির্যাতন ঘরে ঘরে ঘটছে। এখনো আমাদের দেশের নারীরা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নয়; আর হলেই বা কী- অর্থনৈতিক স্বাধীনতাই তো মূল কথা নয়- মূল কথা হলো আত্মার স্বাধীনতা। যেখানে আত্মা বন্দী দাসত্বের শিকলে সেখানে সবই অর্থহীন। একেবারেই নাজুক। আমি মনে করি এসব ঘটনা সমাজের প্রতি স্তরেই ঘটছে এবং কোনো স্তরেই এর কোনো প্রতিকার ঘটছে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে শিক্ষার অভাবই যদি এর প্রধান কারণ হয়- তাহলে পিশাচ হাসান সাইদ তো শিক্ষিত- লেবাস আর সনদ তো আছে; সে কেনো এমন করলো? তাহলে তাকে কী শিক্ষা দেয়া হলো?

আমি তো মনে করি বাঙলাদেশের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যদের এখন জরুরি বৈঠকে বসা উচিত। তাঁরা নাকে তেল দিয়ে ঘুমুচ্ছেন কীভাবে? তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কী শিক্ষা পাচ্ছে- যে তারা এমন করে পৈশাচিক কাজ সহজেই করতে পারে? তাহলে তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় গলদ আছে বলে মনে হয়। না হলে শিক্ষিত সমাজ কেমন শিক্ষা নেয়?

শিক্ষা এখন পণ্য হয়ে গেছে; হয়তো চাহিদার চেয়ে তার সরবরাহও কমে গেছে- তাই পণ্যের সঙ্গে মেশানো হচ্ছে ফাঁকিবাজি আর ভুয়া কিসিমের ফরমালিন। যা খুশি তাই, যেভাবে খুশি সেভাবে এই পণ্য গছানো হচ্ছে আমাদের হাতে। হায় রে- আমরা হতে চেয়েছিলাম উদ্ভাবনী ক্ষমতা সম্পন্ন, আর নৈতিকতা বোধসম্পন্ন উঁচু মানের মানুষ- আর আমাদের শিক্ষা আমাদের বানিয়ে দিলো হাবিয়া স্তরের পিশাচ?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে এক সময় কেবল জ্ঞান-বিজ্ঞানই নয়; সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের তীর্থকেন্দ্র বলা হতো। আর এখন- পুরোটাই হয়ে গেছে বাণিজ্যের তীর্থকেন্দ্র। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়- কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তা আয়োজন করে না, করে ছাত্রলীগের (বা ক্ষমতায় থাকলে ছাত্রদলের) মদদে একপাল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান- যাদের কোনো সাংস্কৃতিক জ্ঞান নেই। এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে কোনো সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা হয় না। হয় কেবল বিসিএস এর প্রতিযোগিতা, লাইব্রেরিগুলোতে বসার জায়গা থাকে না; কিন্তু লাইব্রেরিয়ান নাই- কারণ বই ইস্যু করতে হয় না। কেউ লাইব্রেরির বই পড়ে না, সবাই কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স আর বিসিএস পুস্তকে নিমজ্জিত কীট। আর বুয়েটের লাইব্রেরিতে তো টিউশনিও করানো হয়। হায় রে মেধাবীরা, তোরাই কিনা দেশের ভবিষ্যত! ধিক। এমন দেশের ভবিষ্যত তো কানা, চিরন্তন অন্ধ- অন্ধকারের চেয়েও গভীর অন্ধকার।

রুমানা ম্যাডামের উপর যা ঘটলো- তাতেই প্রমাণিত হয়, সনদ দিয়েই শিক্ষার মাপজোক করা যায় না। শিক্ষা হলো প্রকৃত মানবতার এবং ভেতরের নিজস্বতার উন্মোচন। এই উন্মোচন যদি না ঘটে- নিজস্ব সংস্কৃতির আলোকে, সাহিত্যের আলোকে- চেতনা আর ঐতিহ্যের আলোকে যদি আমরা না জাগি তাহলে আমাদের শিক্ষা সম্পূর্ণ নয়, অর্ধ-সম্পূর্ণও নয়- একেবারেই অসম্পূর্ণ। আমাদের মনের মধ্যে তাই সংস্কৃতির আলো ফেলতে হবে, নিরন্তর প্রবহমানতার আলো- একেবারে সৃষ্টির প্রথম সূর্যালোকের মতো- যে আলো জেগে উঠেছিল চর্যাপদের প্রথম অক্ষরে, সান্ধ্য-ভাষার ভাঁজে ভাঁজে। যে আলো নানা পথ আর গতির প্রবাহ ঘুরে অবশেষে আরও ঋদ্ধ হবার জন্যে এসে দাঁড়ালো বঙ্গ সমতটের বিস্তীর্ণ প্রাঙ্গনে। সেই আলো যদি গ্রহণ করতে না পারি, তাতে যদি নিজেকে উজ্জ্বল করতে না পারি তাহলে এমন শিক্ষিত হবার দরকার নেই। এমন শিক্ষিতদের মুখে থু দিতেও আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম লজ্জা পাবে। এ বিষয়গুলো যদি না দেখেন- তাহলে সময় আর বেশি নেই; মানুষের তালিকার শেষের দিকে তো চলেই এসেছি, এখন হয়তো পশুরাও তাদের তালিকায় আমাদের মতো শিক্ষিতদের (তথাকথিত) আর রাখতে চাইবে না।