ক্যাটেগরিঃ ব্লগালোচনা

 

কৈফিয়ত
আমি ব্যক্তিগতভাবে এ রকম একটি পোস্ট দেয়ার পক্ষপাতি নই। আমি বিশ্বাস করি লেখালেখির শক্তিটা ব্যবহার করা উচিত কেবলই সৃজনশীল ক্ষেত্রে। লেখালেখি কোনো মুদ্রাদোষ নয়; একে যেনো তেনো ভাবে ব্যবহার করাটা কোনো যুক্তিতেই পড়ে না। সেই বিবেচনায় এই ব্লগ হলো একটা অনন্ত ক্যানভাস- কারণ শিল্পীর এখানে নিরন্তর শিল্প সাধনা।

আমাদের বাঙলা ভাষায় যে ব্লগগুলো রয়েছে- তার একেকটির নীতি একেক রকমের। আমার ব্লগ হলো নো মডারেশন ব্লগ, সামহোয়্যার ইন ব্লগ লেখককে পর্যবেক্ষণে রাখে, বর্ণমালা, বকলমসহ আরও অনেক ব্লগ আছে যারা নিজস্ব নীতির মধ্যে পথ চলেন। প্রথম আলো ব্লগ তাদের নীতি মেনে চলে আর সেই সাথে বিডিনিউজ২৪ ব্লগও। মুক্তমনা, সচলায়তন কিংবা আরও কিছু ব্লগ আছে যেখানে লিখতে হলে অনেক সময় লাগে- এটাও তাদের নীতি।

আমি মনে করি যে কোনো ব্লগ কর্তৃপক্ষ তাদের নীতি মেনে যে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। এটা তাদের এখতিয়ার। আমি একজন ব্লগার হিসেবে চেষ্টা করবো সেই নীতির মধ্যে থেকে ব্লগিং করার। নীতি মানাটা কিন্তু একটা মননবোধের বিষয়- এটা সৌন্দর্যের বিষয়, এতে কোনো অসামঞ্জস্যতা নেই।

আমি প্রায় সবগুলো ব্লগেই লিখি। তবে তা সংখ্যায় কম। এর একটি কারণ হলো আমার লিখতে অনেক সময় লাগে। আমি মনে করি, মানসম্মত একটি লেখাই ব্লগে প্রকাশ করা উচিত- কেননা আমার লেখাটা অনেকেই পড়বেন এবং তাঁরা আমার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্বান এবং অনেক বেশি সংবেদনশীল হৃদয়ের অধিকারী। সুতরাং আমার লেখাটি যে তারা পড়বেন তার জন্যে একটি মান নির্ধারিত হওয়া বাঞ্ছনীয়। এই মানটি তৈরি করতে হলে লেখাটির জন্য তথ্য-উপাত্ত এবং তত্ত্ব সন্নিবেশ করা এবং তাকে যথাযোগ্য শৈলীর মাধ্যমে উপস্থাপন করাটা আমার কর্তব্য- অবশ্যই লেখক হিসেবে এ কর্তব্যটি আমি উপেক্ষা করতে পারবো না।

আমার প্রায় সব ব্লগেই একাউন্ট আছে এবং আমি একই লেখা প্রায় সব ব্লগে পোস্ট করতাম- এটা অনেক ব্লগের নীতি বিরোধী বলে এখন আর করি না। কিন্তু সকল ব্লগের কেবল নীতিমালা রক্ষাই নয়; আমার নিজস্ব সৃষ্টিশীলতাকে একটি নান্দনিক ফ্রেমে বন্দী করে উপস্থাপনটাও তো লেখকেরই প্রশান্তি।

আমার এই একটি লেখাই বিডিনিউজ২৪ এর ব্লগারদের জন্য। সত্যভাষী’র একটি ব্লগ পড়েই লেখাটি লিখতে বসি। ব্লগের পরিবেশ নিয়ে কথা উঠেছে। একজন ব্লগারের নিয়মভঙ্গ এবং ব্লগ কর্তৃপক্ষের দৃশ্য অবলোকন কারো কাছেই কাম্য নয়। আমি ফিদেল বিডি’র ব্লগটিও পড়েছি। লেখার বিষয়বস্তুকে অন্য একটি রাজনৈতিক দলের এজেণ্ডার মতো উপস্থাপন না করে সমালোচনার ভঙ্গীতে উপস্থাপন করা যেতো- এটা বোধ করি ফিদেল বিডিও বুঝেছে, এবং বুঝেই ঝোপে কোপ মেরেছে। তার বক্তব্য পরিস্কার, লেজুড়বৃত্তিপনাটাও প্রকট, দালালির ভঙ্গীমা ঈর্ষণীয়। এটা দেখেই মনে পড়ে যায় উননিশো একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে রাজাকার যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযমকে নরপিশাচ কসাই টিক্কা খান বলেছিলো, ‘You and your party have shown a better form of friendship to Pakistan army. উত্তরে রাজাকার গোলাম আযম বলেছিলো, ‘Our next generation will show the best one’।
ফিদেল বিডি’র পোস্ট পড়ে বোঝা গেলো- রাজাকাররা দূরদর্শি হয়।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মাঝে মাদকাসক্তি থাকতেই পারে, এবং ছাত্র রাজনীতির মাঝে এ সমস্যা থাকা আমাদের সবার জন্য দুশ্চিন্তার কারণ। সুতরাং এ নিয়ে ফিদেল বিডি চিন্তিত হতেই পারেন; যেমন আমি প্রায়শই চিন্তিত হই জামায়াতে ইসলামের নেতাদের অবৈধ ব্যবসা নিয়ে, ইসলামী ব্যাংকের সাথে জঙ্গীবাদের নিবিড় সম্পর্ক নিয়ে, ইসলামী ছাত্র শিবিরের নেতাদের ইসলামী ব্যাংকে নিশ্চিত চাকুরির বিধান দেখে এবং বাঙালি মুসলমানের ধর্মীয় মূল্যবোধকে পকেটে ভরে জামায়াতে ইসলামের রাজাকার নেতাদের রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে। অতএব চিন্তিত হওয়াটাতে দোষ নেই কিন্তু ফিদেল বিডি বোধ হয় অতিরিক্ত চিন্তায় মতিষ্ক বিহীন শূন্য মাথায় বেশি চাপ নিয়ে ফেলেছে। তাই মানসিক বিকৃতি ঘটেছে তার। একজন বিকৃত মানুষ তো আর অন্য বিষয় নিয়ে সমালোচনা করতে পারে না।

কর্তৃপক্ষের জন্য কয়েকটি কথা: এটা কি ‘হীরক রাজার দেশ’?
আমি জানি, আপনি খুব চাপে আছেন। এও জানি যে, আপনার ‘সরলেরে করো মডারেট’ নীতির চাকায় যদি আমার এ লেখা মডারেট না হয়- তবে আপনার প্রতি অন্য ব্লগারদের- বিশেষত যাঁরা আপনার প্রতি নানা কথা বলছেন, তাঁদের জন্য একটি শিক্ষামূলক লেখা উপহার দিতে পারবো।

দেখুন, এখানে যাঁরা লেখেন (অবশ্যই সেই সব লেখক যাঁরা নীতিমালা মেনে লেখেন) তাঁরা সবাই কিন্তু বিবেকবান। তাই যে কষ্টটা তাঁরা পাচ্ছেন- সেই একই কষ্টে আপনিও ব্যথিত। রুমানা ম্যাডামের দুটি চোখই নষ্ট হয়ে গেলো, অপরাধী অমানুষ সাইদের বিচার হতে না হতেই ব্লগের পাতায় ঘৃণার বৃষ্টি ঝরলো পাশবিক মানসিকতার বিকৃত রুচির পরিমলকে নিয়ে। তারপর মিরেরসরাই এ্র শিশুদের ঝরে যাওয়ার শোকের কালো পর্দায় ঢেকে গেলো বিডিনিউজ২৪ ব্লগ। এগুলো নিয়ে ব্লগারদের লেখা যে চেতনাভিত্তিক সুরের জন্ম দেয় তা সকল ব্লগের মতো বিডিনিউজ২৪ ব্লগেও সতত প্রবহমান।

এরপর আরও কয়েকটি প্রকট প্রচ্ছন্ন ঘটনা ব্লগের পাতায় ঠাঁই পেয়েছে- কিন্তু আলোচনার ডানা মেলেনি। এখন হঠাৎ ব্লগ জমে উঠেছে। ব্লগের সাথে গরম হয়ে উঠেছেন কর্তৃপক্ষও। এই উত্তাপটুকুর জন্যই কী ব্লগের নীতি না মানা একটি অর্বাচীন লেখা অনুমতি দিয়ে প্রকাশ করা হলো?

কী ভাবেন কর্তৃপক্ষ? কীসের পরীক্ষা নিলেন?

দেখতে চাইলেন আমাদের ধমনী-শিরায় আসলেই উনসত্তর একাত্তরের রক্ত আছে নাকি। পরখ করতে চাইলেন আমাদের ধৈর্য্যশক্তি কতোদূর? আমাদের অভিমানের রঙ কতোটা নীল- এটা দেখার এতো ইচ্ছে আপনার?

ওই ইস্যু প্রকাশ হওয়ায় ব্লগের পরিবেশ রক্ষায় কেবল বিঘ্নই ঘটলো না, ভালো লেখক- যাঁরা নিজেদের মেধা আর শ্রম দিয়ে প্রতিদিন নিটোল লেখাগুলো তুলে আনে আমাদের জন্যে- তাঁদের অপমান করা হয়। ইচ্ছে করলেই লেখাটি মডারেট করা যেতো।

আমাদের ইতিহাস কিন্তু প্রাঞ্জল। বুটের তলায় কৃষ্ণচূড়ার পাপড়ি হয়েছি আমরা, বন্দুকের নলের সামনে হয়েছি সাহসী পথিক- আমাদের অনেক পূর্ব-পুরুষরা জেলখানায় ফাঁসির আসামী হয়েও আবৃত্তি করতেন রবীন্দ্রনাথের কবিতা।

আমাদের সেই ইতিহাসের ধারক যাঁরা, তাঁরা ব্লগ ছেড়ে দেবার কথা বলছে। তাঁদের চলে যাওয়াটা কিন্তু আপনার লজ্জা। তাঁরা যদি না লেখেন, যদি ফিরে না আসেন- তবে আমি, একজন অতি সাধারণ ব্লগার, ঘৃণা করবো আপনাকে- যেমন ঘৃণা করেছিলেন নবারুন ভট্টাচার্য। আমি অভিশাপ দিবো আপনাকে, যেভাবে শামসুর রাহমান অভিশাপ দিয়েছিলেন।

আপনি কিন্তু তখন বিপদে পড়ে যাবেন। ‘হীরক রাজার দেশে’ রাজার কিন্তু কেউ থাকে না।

গোপী বাঘারা ফিরে আসুন
গোলাপের সাথে কেবল ‘সুন্দর’ বিশেষণটিই ভালো লাগে। অভিমানী গোলাপের অভিমান যতোই প্রকট হোক, তাতে সৌন্দর্যহানী ঘটে। ফিদেল বিডি’র অসুস্থ আচরণে অনেক মানসম্মত ব্লগারগণ চলে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কেউ কেউ শেষ পোস্টও দিয়েছেন, কেউ কেউ বলেছেন সাত দিন লিখবেন না।

আমি তো আপনাদের দেখে, আপনাদের লেখা পড়ে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আজ যদি দানবের হুঙ্কারে অভিমান করবেন তো আমাকে মিছিলে নামিয়েছিলেন কেনো? আমি তো অজস্র কীটের মধ্যে আপনাদের ক’জনকে দেখে ভাবলাম- অসুরের দিন বুঝি শেষ। এতো আমার বিশ্বাস, এ বিশ্বাস তো পরাজিত হবে না।

একাত্তরের রাজাকাররা তো এদেশীয় হয়েও দেশের সর্বনাশ করেছে; তাই বলে কী মুক্তিযোদ্ধারা দমে গেছেন, না আপনার মতো অভিমান করেছেন। আপনিসহ আরও সব প্রাণময় ব্লগাররা সবাই তো সে-ই মুক্তিযোদ্ধাদের মতোই। কুকুর এসেছে, সাঁড়াশি অভিযানে নামতে হবে। সবাই একযোগে এই স্বাধীনতা বিরোধীদের বিরুদ্ধে প্রাণান্ত মেধার লড়াই শুরু করবো।

আপনারা (প্রিয় সুখপাখি ব্লগাররা, যাঁদের থরোথরো লেখায় প্রাণ ফিরে আসে মরদেহে) কোথায়? আপনাদের অভাবে লড়াইটা শুরু করতে পারছি না।

প্রিয় নাহুয়াল মিথ, ফিরে আসুন। ভালোলাগার বারান্দায় গোলাপ চারা লাগিয়েছি। আপনাকে নূতন গোলাপে বরণ করবো বলে।

আমার মতো ছোটো মানুষের আপনাকে দেয়ার মতো কিছুই নেই। তবে একেবারেই নিঃস্ব নই আমিও। বাঙলা মায়ের ছেলে তো- নিঃস্ব হতে শিখিনি। প্রাণের পতাকাটা হাতে নিয়ে স্বাধীনতার প্রাণপ্রিয় সুখের কণাগুলো হাতের মুঠোয় পুরে সবার সাথে আমিও অপেক্ষায়- আপনি লিখবেন বলে।

আবার শুরু হবে
মুক্তিযুদ্ধের আরেকটি লেখা আসবে আইরিন সুলতানার, শ্রদ্ধেয় ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে মুশফিক ইমতিয়াজ চৌধুরীর লেখাটি নির্যাস ছড়াবে চারদিকে, মোসাদ্দিক উজ্জ্বল মাঝে মাঝে ক্ষেপে যাবেন- বিদ্রোহী পোস্টে আলোড়িত করবেন দশদিক, সত্যভাষীর সত্য কথনে টনক নড়বে ব্লগ-পোষকের, আমিন আহম্মেদ জিজ্ঞেস করবেন ফিচার পোস্টটি কার, ফিচার পোস্টের নান্দনিক মন্তব্য নিয়ে তখন ব্যস্ত থাকবেন আকাশের তারাগুলি, নাহুয়াল মিথ একাই হয়ে যাবেন এক অনন্য মিথোলজি, আব্দুল মোনেম সেই মিথোলজির ভাষা পড়বেন নিবিড় সান্নিধ্যে, আজাদী নেমে আসবেন সাম্প্রতিক বিভাগে, শুভ্র রহমানের তখন ব্লগীয় শুভ্রতায় বৃহস্পতি, রাগ ইমন চলে আসবে মতামত-বিশ্লেষণে, নুরুন্নাহার শিরীন খুঁজবেন নাগরিক সমস্যার পোস্ট, অলোকানন্দার জলে ভাসবেন রণদীপম বসু, ভালোবাসার দেয়াল তখন জহিরুল হক চৌধুরীর মতোন অ্যাথলেটের সামনে- পেরোতে বাধা নেই, গ্রুপ ক্যাপ্টেন ফজলুল হক ঘুরে আসবেন সরকারের পোস্ট থেকে, আজমল হোসেন মামুন জানাবেন নানা অনুষ্ঠানের খবর, যহরত তখন শাজাহানের থেকে দূরে, লুতফর ফরায়েজি অন্যমাত্রার পোস্ট দেয়ার চেষ্টা করবেন, অক্ষমের আর্তনাদে ম’ সাহিদ ডেকে আনবেন ইলিয়াস চৌধুরিকে, বলবেন, “ইলিয়াস ভাই, জানার মাঝে অজানারে করেছি সন্ধান”। আর যারা বাদ পড়ে গেলেন তারা হেলজিনোমকে গিয়ে প্রশ্ন করবেন- আমি কোন কাননের ফুল?
অতঃপর আমি শনিবারের চিঠি প্রিয় ব্লগারদের জীবনী নিয়ে দিবো জীবনী পোস্ট।

ভেবে দেখুন তো সেই দিনগুলি কতো সুন্দর হবে। আমাদের সৌন্দর্যের কাছে ম্লান হয়ে যাবে সকল অন্ধকার। বিডিনিউজ২৪ ব্লগ হয়ে উঠবে রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি কাব্যের মতো- একেবারেই ভালো না লাগা কবিতাটাও খুব ভালো লাগে।

১৫ শ্রাবণ, ১৪১৮