ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন – ভূমিকা-পর্ব

প্রভাত-পর্বের স্নিগ্ধ সঙ্গীত

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে লিখতে গিয়ে প্রথমেই মনে পড়ে সে-ই সময়ের কথা, যে-সময়ের পরিস্থিতিতে বেড়ে উঠেছিলেন এই মানুষটি। কবিগুরু ছিলেন এক প্রাজ্ঞ সত্তা- যার সূচনা হয়েছিলো তাঁর পারিবারিক জীবনের মধ্য দিয়ে এবং সে-ই পরিবারের সামগ্রিকতাই তাঁকে অনেকাংশে নির্মাণ করে দিয়েছে।

এরপরের অধ্যায়টি অর্জণের। কবিগুরু জীবনের কাছে নিবেদন করেছিলেন তাঁর সৃষ্টিকে এবং সেই জীবনের সাথে তাঁর একটি একান্ত অনু-যোগাযোগ ছিলো, যার কোনো নাম হয় না। নিজস্ব কায়দায় তিনি ধারণ করেছেন সত্য আর স্বপ্নকে এবং সেই ধারণকৃত সত্য-স্বপ্ন আলোকে তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন চারিধারে, একেবারে আকাশগঙ্গার মতো- মহাতারকার শক্তি দিয়ে। তিনি দেশ-বিদেশে ভ্রমণ করেছেন এবং এরই মধ্য দিয়ে তাঁর আলোকিতো চেতনা লাভ করেছিলো এক মহার্ঘ্য জ্যোতি। তাকেও তিনি লালন করেছেন, বুকের তোরঙ্গে রেখে ভাষা দিয়েছেন এবং রেখে গেছেন আগামী সময়ের জন্যে।

এরপরেই আসে তাঁর রাজনৈতিক চিন্তাধারার ক্ষেত্র। কবিতার পর রবীন্দ্রনাথ যে কারণে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছিলেন, তা হলো তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক সময় তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শকে একটি নান্দনিক আদর্শে রূপদান করেন, যার মর্মমূলে আছে মানবতাবাদ।

সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা বিষয়ে তাঁর ভাবনা অতলান্তিক সমুদ্র মন্থনের মতোই। তিনি ভেবেছেন এবং সত্যিকার অর্থে অনেক ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্র বিষয় নিয়ে ভেবেছেন- যা সত্যিকার অর্থেই এক অনুপম ভাবনার ক্যানভাস।

রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত জীবন

ভোরের আলো আকাশের সীমা ছাড়িয়ে মাত্র নেমে আসে একটি বাড়ির ছাদে- একেবারে নববধূর মতো লজ্জাবনত মুখে; অন্ধকারের আবছা ওড়নাটা তখনও একেবারে সরে যায় না, শিশির ভেজা ঘাস মাড়িয়ে এলে চোখে পড়ে এক অনিন্দ্যসুন্দর স্থাপত্যশৈলী ঘেরা চমৎকার বাড়ি- ঠাকুরবাড়ি।

এ বাড়ির শরীর জুড়ে আছে এক আশ্চর্য মায়াপুরীর গল্প। জোড়াসাঁকোর কর্কশ হট্টগোলের মাঝখানে প্রায় হারিয়ে যাওয়া ছোট্ট একটা গলির শেষে যে সেকেলে মস্ত বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে, বাইরে থেকে তাকে বিশেষত্বহীন মনে হলেও বাঙলার নবযুগের বিকাশ হয়েছিলো এ বাড়ি থেকেই। আর বাঙলা সাহিত্য তো প্রাণই ফিরে পেলো এখানে।

হাজার বছর আগে বাঙলা কবিতা নাম্নী এক নারী মধ্যরাতে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে যেতো। কাউকে খুঁজতো, যে কিনা তাকে পরিপূর্ণরূপ সাজিয়ে দেবে, মনের মতো করে গড়ে তুলবে। চর্যাকারেরা তাকে মিতায়তনিক বন্ধনে মুক্তির ইশারাটুকু দিলো। প্রশস্তিকীর্তনের বাহুল্যে বড়ু তাকে প্রশস্ত করে দিলো। আবার নাতিদীর্ঘ নিবিড়তা ফিরিয়ে আনলো বৈষ্ণবেরা। আখ্যানভূমি মাড়িয়ে নগরের বাইরের কামিনীকে নগরে নিয়ে এলেন ঈশ্বর। দ্বৈত আগ্রহে মধুসূদন একবার তাকে মহাকাব্যের মহিমায় অলঙ্কৃত করলেন, আবার তাকে গীতিকাব্যের তন্বী মাধুর্য প্রদান করলেন। বিহারীলাল দিলেন আবেগের উষ্ণতা। পরক্ষণে হেম-নবীনের উচ্ছ্বাস আর উত্তেজনায় হতবিহ্বল হয়ে পড়লো বাঙলা কবিতার স্বপ্ন। কোন্ দিকে সে যাবে। নিজের অজান্তেই দাঁড়িয়ে জোড়াসংকটে। সেখানে অনতিবয়স্ক এক তরুণ। ৮৮ জন কবির ভিড়ে অখ্যাত একজন। কী করে যেনো টের পেলো, এই সেই নারী, যার মধ্য দিয়ে কথা বলতে চায় ‘মূঢ় ম্লান মুখ’ জনপদ। চন্দ্রকলার অস্থিতিশীল হ্রাসবৃদ্ধির মধ্যেও কবিতাকুমারীর মনপছন্দ আঙ্গিক সে তরুণ টের পেয়েছিলো। সেই অপরিণত, অস্ফুট, ভীরু, তরুণের নাম রবীন্দ্রনাথ- যাঁর বেড়ে উঠার ইতিহাস ঠাকুরবাড়ির এক নিবিড় আলিঙ্গন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেকে পরিচয় দিয়েছিলেন ‘ব্রাত্য’ বলে। সমাজে ব্রাত্য হওয়ার সুবিধা হচ্ছে, এখানে সমাজের আচারবিধির কঠোর অনুশাসন ও সংস্কার মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে না। কিন্তু সমাজের যা কিছু ভালো, তা দু’হাত ভরে গ্রহণ করে প্রতিভার স্পর্শে নতুন রূপ দেওয়ার সুযোগ থাকে অপরিমেয়। তিনি সেই কাজটি করে দেখিয়েছেন বারংবার। অবশ্য বৃহৎ পরিসরে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে বাঙলাদেশ, ঠাকুর বংশ, জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারও এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

বাঙলার ইতিহাসে দেখা যায়, খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মুসলমান আক্রমণের পরবর্তী সময়ে বাঙলার সমাজব্যবস্থায় একটা প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিলো। মুসলিম শাসকদের অত্যাচারে বহু ব্রাহ্মণ সামাজিক দিক দিয়ে অখ্যাতি লাভ করেছিলো। রবীন্দ্রনাথের পূর্বপুরুষরা এভাবেই ব্রাহ্মণ সমাজে একটা বিশিষ্ট ‘থাক’ভুক্ত হয়েছিলো, যার নাম ‘পিরালী থাক’। নগেন্দ্রনাথ বসুর ‘বঙ্গের জাতীয় ইতিহাস’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, যশোর জেলার চেঙ্গুটিয়া পরগনার জমিদার শুড়-বংশীয় দক্ষিণানাথ রায়চৌধুরীর চার পুত্র কামদেব, জয়দেব, রতিদেব ও শুকদেবের মধ্যে প্রথম দু’জন পীর আলি নামের একজন স্থানীয় শাসকের চক্রান্তে মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করে। তাদের কারণে অপর দু’জনও সমাজচ্যুত হয়ে ‘পিরালি থাকে’র অন্তর্ভুক্ত হন। স্বশ্রেণীর ব্রাহ্মণদের সঙ্গে পিরালিদের সব ধরনের আচারবিধি নিষিদ্ধ হয়ে যায়, এমনকি বিবাহাদিও বন্ধ হয়ে যায়। ফলে তারা পুত্র-কন্যাদের বিবাহে কৌশল ও প্রলোভনের জাল বিস্তার করতে থাকে। এভাবেই শুকদেবের কন্যাকে বিবাহ দেওয়া হয় পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারীর সঙ্গে। এই বিবাহের কারণে জগন্নাথ কুশারীকে পরিবার ও আত্মীয়দের দ্বারা পরিত্যক্ত হতে হয়।

এই জগন্নাথ কুশারীই ঠাকুর বংশের আদিপুরুষ। জগন্নাথ কুশারীর চার পুত্র প্রিয়ঙ্কর, পুরুষোত্তম, হৃষিকেশ ও মনোহর। পুরুষোত্তমের প্রপৌত্র রামানন্দের দুই পুত্র মহেশ্বর ও শুকদেব। অনুমান করা হয়, মহেশ্বর বা তার পুত্র পঞ্চানন জ্ঞাতি-কলহে দেশ ত্যাগ করে ভাগ্যান্বেষণে কলকাতায় উপস্থিত হন (সময় আনুমানিক সপ্তদশ শতাব্দীর শেষ ভাগ)। তিনি কোলকাতার দক্ষিণে গোবিন্দপুরে আদি গঙ্গা তীরে বসতি স্থাপন করেন। অবশ্য এ অঞ্চলে তার বহু পূর্ব থেকে পর্তুগিজ, ডাচ প্রভৃতি বিদেশি বণিকদের যাতায়াতে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রসার লাভ করেছিলো।

পঞ্চানন ও শুকদেব বিদেশি বণিকদের জাহাজে মালামাল সরবরাহের কাজ করে ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেতে থাকে। প্রতিষ্ঠিত হয়ে তারা এক পর্যায়ে তাদের পদবিও পরিবর্তন করে ফেলে। নিম্নশ্রেণির প্রতিবেশীরা তাদের ‘ঠাকুরমশাই’ সম্বোধন করতে থাকে। এদের দেখাদেখি সাহেবরাও তাদের ঠাকুর সম্বোধন শুরু করে। এভাবেই পঞ্চানন কুশারী হয়ে পড়ে পঞ্চানন ঠাকুর। এই পঞ্চানন ঠাকুরের হাতেই জোড়াসাঁকোয় ঠাকুর পরিবারের পত্তন।

পঞ্চানন ঠাকুরের দুই পুত্র জয়রাম ও রামসন্তোষের সঙ্গে ইংরেজ বণিকদের মেলামেশা থাকায় তারা কিছু কিছু ইংরেজি ও ফার্সি শিখেছিলেন। যে কারণে তারা ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসা করে প্রচুর টাকা জমিয়েছিলেন। জয়রামের চার পুত্রের মধ্যে নীলমণির আবার পাঁচ পুত্র ছিলো। যশোরের দক্ষিণডিহি নিবাসী রামচন্দ্র রায়ের দুই কন্যা অলকা ও মেনকাকে যথাক্রমে রামলোচন ও রামমণি বিবাহ করেন। মেনকা-রামমণির চার সন্তানের মধ্যে একজন দ্বারকানাথ ঠাকুর। দ্বারকানাথের জন্মের এক বছরের মধ্যে তার মা মারা যান। তখন রামলোচন দ্বারকানাথ ঠাকুরকে দত্তক নেয়।

এ সম্বন্ধে একটি কিংবদন্তি প্রচলিত আছে। একদিন একজন সন্ন্যাসী রামলোচনের গৃহে ভিক্ষা করতে এসে শিশু দ্বারকানাথকে দেখে অলকা দেবীকে বলেছিলেন,

সুলক্ষণাক্রান্ত এই শিশুটি থেকেই বংশের গৌরব ও ধনসম্ভ্রম বৃদ্ধি পাবে।

আনুমানিক ১৮০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে যশোরের নরেন্দ্রপুরের রামতনু রায়চৌধুরী ও আনন্দময়ীর কন্যা দিগম্বরীর সঙ্গে দ্বারকানাথ ঠাকুরের বিবাহ হয়। দিগম্বরী দেবী ছিলেন আশ্চর্য রকম সুন্দরী। দ্বারকানাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন ১৮১৭ সালে।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ি বাঙলার সমাজ ও সংস্কৃতি জগতে যে বিশিষ্ট স্থান দখল করে আছে তার পত্তন হয়েছিলো দ্বারকানাথ ঠাকুরের হাতে এবং পরবর্তী সময়ে তা আরও অগ্রসর হয় দেবেন্দ্রনাথ-রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে।

দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিয়ে হয় যশোরের দক্ষিণডিহি নিবাসী রামনারায়ণ চৌধুরীর কন্যা সারদাসুন্দরী দেবীর সঙ্গে। সারদাসুন্দরী দেবী নয়টি পুত্র ও ছয়টি কন্যা সন্তানের জননী। ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ সোমবারে জোড়াসাঁকোর ভদ্রাসন বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয়। রবীন্দ্রনাথ পিতা-মাতার চতুর্দশ সন্তান; পুত্রদের মধ্যে অষ্টম।

রবীন্দ্রনাথের বয়স যখন মাত্র তিন, তখনই তার মধ্যে বিদ্যালয় সম্পর্কে যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিলো, তা আর কখনও দেখা যায়নি। সোমেন্দ্রদাদা ও ভাগ্নে সত্য যখন স্কুল থেকে ফিরে মজার মজার গল্প বলতো, ছোট্ট রবির সেসব শুনে স্কুলের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। স্কুলে যাওয়ার জন্য কান্নাকাটি করে সবাইকে অস্থির করে তোলেন। সে সময়ের কবির গৃহশিক্ষক মাধব পণ্ডিত একদিন ভয়ানক অতিষ্ঠ হয়ে রবিকে চপেটাঘাত করে বলেন,

‘এখন স্কুলে যাওয়ার জন্য যে রকম কান্নাকাটি করছ, পরে না যাওয়ার জন্য আরও বেশি কাঁদতে হবে।’

গৃহশিক্ষকের এই ভবিষ্যদ্বাণী ফলতে শুরু করেছিলো অল্পদিনের মধ্যেই।

চার বছর বয়সেই রবীন্দ্রনাথকে ভর্তি করে দেওয়া হয় ‘ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমী’র শিশু শ্রেণিতে। এখানে তিনি কী শিক্ষা পেয়েছিলেন, সে বিষয়ে জানা না গেলেও সেখানকার শাসন প্রণালীর কথা তিনি যে ভোলেননি, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। ক্লাসে পড়া না পারলে ছাত্রকে বেঞ্চের ওপর দাঁড় করিয়ে ক্লাসের অনেকগুলো শ্লেট তার হাতে চাপিয়ে দেওয়া হতো। এ অবস্থায় বালক রবীন্দ্রনাথের মনে কেবল নিজেকে ছাত্র হয়ে থাকার দুঃখ মোচন করেছিলেন বাড়িতে কাঠের রেলিংকে ক্লাস বানিয়ে। ‘ক্যালকাটা ট্রেনিং একাডেমী’তে ছাত্রজীবনের আরম্ভ হলেও সেখানে অবস্থান করেন মাত্র ছয় মাস। তার পর তাকে ভর্তি করা হয় গভর্নমেন্ট পাঠশালায়। এখানেও সম্ভবত তাকে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি করা হয়েছিলো।

স্কুলে ভর্তি হলেও বাড়িতে পণ্ডিত রেখে শিক্ষার ব্যবস্থা বহাল ছিলো। এতোদিনে রবীন্দ্রনাথকে অন্দরমহল থেকে নির্বাসন দিয়ে বাড়ির বাইরে একেবারে চাকরদের মহলে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিলো। এটাই ছিলো তখনকার নিয়ম। রাতে শোয়ার সময় ছাড়া বাকি সময় কাটতো চাকরদের সঙ্গে। এমনকি স্নান, খাওয়া-দাওয়া পর্যন্তও চাকরদের হাতে সম্পন্ন করতে হতো। চাকররা বালকের সঙ্গে মোটেও ভালো ব্যবহার করত না। তারা তাদের কাজকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বালকের খেলাধুলা ও দৌড়-ঝাঁপ বন্ধ ঘোষণা করে এবং প্রহার দ্বারা সব রকম চাঞ্চল্যকে দমন করত। রবীন্দ্রনাথ অবশ্য এ অবস্থার মধ্যে থেকেও অনেক কিছু শিখেছেন, যা তার পরবর্তী জীবনে মানস গঠনে সহায়ক হয়েছে।

এ সময় জোড়াসাঁকোর অন্দরের অবস্থা ছিলো আনন্দরসে পরিপূর্ণ। বড়ো বড়ো ওস্তাদ আসরে গান করতেন এবং বড়ো বড়ো অভিনেতা এসে অভিনয় করতেন। এ বিষয়গুলো আবার রবীন্দ্রনাথকে বেশ আকৃষ্ট করেছিলো। এ সময়েই তাকে রামায়ণ ও মহাভারত পড়ে শোনানো হতো। এর পাশাপাশি অবশ্য ইতিহাস, ভূগোল, স্বাস্থ্যবিদ্যার প্রথম পাঠ ইত্যাদি পাঠ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়।

এরপর আবার রবীন্দ্রনাথের বিদ্যালয় পরিবর্তন হয়। তাকে ভর্তি করে দেওয়া হয় নরমাল স্কুলে। প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখায় রবীন্দ্রনাথ কখনও খুব কৃতিত্বের পরিচয় দেননি। প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় হয়ে পুরস্কৃত হওয়ার ঘটনাও তাই নেই বললেই চলে।
‘জীবনস্মৃতি’তে তিনি বলেছেন,

‘ইস্কুলে আমি কোনদিন প্রাইজই পাই নাই, একবার কেবল সচ্চরিত্রের পুরস্কার বলিয়া একখানা ‘ছন্দোমালা’ বই পাইয়াছিলাম। আমাদের তিনজনের মধ্যে সত্যই পড়াশুনায় সেরা ছিলো। সে কোনো একবার পরীক্ষায় ভালরূপ পাশ করিয়া একটা প্রাইজ পাইয়াছিলো। সেদিন স্কুল হইতে ফিরিয়া গাড়ি হইতে নামিয়াই দৌড়িয়া গুণদাদাকে খবর দিতে চলিলাম। তিনি বাগানে বসিয়াছিলেন। আমি দূর হইতে চিৎকার করিয়া ঘোষণা করিলাম, ‘গুণদাদা সত্য প্রাইজ পাইয়াছে’। তিনি হাসিয়া আমাকে কাছে টানিয়া লইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি প্রাইজ পাও নাই?’ আমি কহিলাম, ‘না, আমি পাই নাই, সত্য পাইয়াছে। ইহাতে গুণদাদা ভারি খুশি হইলেন।’

ধারণা করা হয়, এটি ১৮৬৮ সালের পরের ঘটনা। কেননা ‘ছন্দমালা’ নামক যে গ্রন্থটির কথা কবি উল্লেখ করেছেন, সেটি প্রকাশিত হয়েছিলো ১৮৬৮ সালে।

নরমাল স্কুলে ক্লাস শুরু হওয়ার আগে ছাত্রদের বসিয়ে কিছু কবিতা আবৃত্তি করানো হতো। সবাইকে সুর করে সে কবিতাগুলো আবৃত্তি করতে হতো। অর্থাৎ সুরেলা আবৃত্তি! কর্তৃপক্ষের চিন্তা ছিলো, এর মধ্য দিয়ে পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ছেলেদের কিঞ্চিৎ বিনোদনের ব্যবস্থা করা। সে কবিতাগুলো আবার ছিলো ইংরেজি। রবীন্দ্রনাথের কাছে অনেকটা মন্ত্রপাঠের মতো মনে হতো। এর মধ্যে তিনি কোনো বিনোদন খুঁজে পাননি; বরং অর্থহীন একঘেয়েমির মতো মনে হতো। তিনি বলেছেন,

“যে ইংরেজি বই হইতে তাহারা থিয়োরি সংগ্রহ করিয়াছিলেন, তাহা হইতে আস্ত ইংরেজি গানটা তুলিয়া তাহারা আরাম বোধ করিয়াছিলেন। আমাদের মুখে সেই ইংরেজিটা কী ভাষায় পরিণত হইয়াছিল, তাহার আলোচনা শব্দতত্ত্ববিদগণের পক্ষে নিঃসন্দেহে মূল্যবান। কলোকী পুলোকী সিংগিল মেলালিং মেলালিং মেলালিং। অনেক চিন্তা করিয়া ইহার কিয়দংশের মূল উদ্ধার করিতে পারিয়াছি। কিন্তু ‘কলোকী’ কথাটা যে কিসের রূপান্তর তাহা আজও ভাবিয়া পাই নাই। বাকি অংশটা আমার বোধ হয় Full of glee, Singing Merrily, merrily, merrily

নরমাল স্কুলে কবির মনোকষ্টের আরও কারণ ছিলো। সহপাঠীদের সঙ্গে হৃদ্যতার সম্পর্ক গড়ে ওঠার কোনো সুযোগ ছিলো না। অর্থাৎ মনের মিল বলতে যা বোঝায়, তা সম্ভব হয়নি। ফলে ছেলেদের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে উঠলে হয়তো স্কুলজীবন কবির কাছে এতোটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতো না। কবি শুধু মনে মনে দিন গুনতেন,

“এক বৎসর, দুই বৎসর, তিন বৎসর; আরো কত বৎসর এমন করিয়া কাটাইতে হইবে।”

নরমাল স্কুলের সেই কষ্টকর দিনগুলোতে বালক রবীন্দ্রনাথ বসতেন সকল ছাত্রের পেছনে। কারণ হরনাথ পণ্ডিত বলে তাদের যে শিক্ষক ছিলেন, তার কুৎসিত ভাষা কবিকে অত্যন্ত মর্মাহত করতো। রবীন্দ্রনাথ তার সঙ্গে কথাও বলতেন না, এমনকি পড়া জিজ্ঞাসা করিলেও তার কোনো উত্তর দিতেন না। এ জন্য মাঝে মধ্যেই তাকে কঠিন শাস্তিভোগ করতে হয়েছে, অনেক সময় উঠানে রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। সে আবার সোজা হয়ে দাঁড়ানো নয়, মাথা হেঁট করে পিঠ বাঁকা করে অনেকক্ষণ একভাবে থাকতে হতো। এতো কিছু করেও হরনাথ পণ্ডিত রবীন্দ্রনাথের মুখ দিয়ে কথা বা পড়া কিছুই বের করতে পারেননি। শেষ বেঞ্চটিতে বসে কবি শুধু এ অবস্থা থেকে মুক্তির উপায় খুঁজে বেড়াতেন। এভাবে এক বছর কেটে যাওয়ার পর বাঙলা বিষয়ে বার্ষিক পরীক্ষায় কবি প্রথম হন। কিন্তু সারা বছর ক্লাসের নীরব ও বেয়াড়া এই ছাত্রটির প্রথম হওয়ার খবরে ক্লাসের শিক্ষক সন্তুষ্ট হতে পারেননি। তিনি অভিযোগ করেন, এই ছাত্রের প্রতি পক্ষপাত করা হয়েছে। ফলে তাকে দ্বিতীয়বার পরীক্ষায় বসতে হবে। এবার স্বয়ং সুপারিন্টেনডেন্ট পরীক্ষকের সঙ্গে পাহারা দেন। কিন্তু এবারেও প্রথম হন কবি। হরনাথ পণ্ডিতের মতো শিক্ষক যেমন ছিলেন, তেমনি আবার সাতকড়ি দত্ত নামের বিপরীত মেরুর শিক্ষকও ছিলেন নরমাল স্কুলে। সাতকড়ি দত্ত মহাশয়ের কথা না বললেই নয়। তিনি কীভাবে যেনো জানতে পেরেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ কবিতা লিখতে পারে। একদিন সাতকড়ি মহাশয় রবীন্দ্রনাথকে কাছে ডেকে দুটি লাইন দিয়ে বলেন একটি কবিতা লিখতে।

‘রবি করে জ্বালাতন আছিল সবাই
বরষা ভরসা দিল আর ভয় নাই।’

বালক রবীন্দ্রনাথ এই চরণ দুটি নিয়ে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছিলেন; এর দুটি লাইন ছিলো-

‘মীনগণ দীন হয়ে ছিল সরোবরে
এখন তাহারা সুখে জলে ক্রীড়া করে।’

এ সময়ে রবীন্দ্রনাথের বয়স মাত্র আট বছর। বাঙলা পরীক্ষায় প্রথম হওয়া ও সাতকড়ি দত্তের মতো শিক্ষক পাওয়া নরমাল স্কুলের এক বছরের জীবনে রবীন্দ্রনাথের সুখস্মৃতি।

১৮৭৮ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে ব্যারিস্টার হবার উদ্দেশ্যে রবীন্দ্রনাথ পাড়ি দেন ইংল্যান্ডে। প্রথম দিকে তিনি ব্রাইটন ও হোভের মেদিনা ভিলায় ঠাকুর পরিবারের একটি বাড়িতে অবস্থান করেন। এখানে তিনি একটি স্কুলে পড়াশুনা করেছিলেন (যদিও দাবি করা হয় যে তিনি ব্রাইটন কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন; কিন্তু উক্ত কলেজের রেজিস্টারে তাঁর নাম পাওয়া যায় না)। ১৮৭৭ সালে সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পুত্র সুরেন্দ্রনাথ ও কন্যা ইন্দিরাকে তাদের মায়ের সঙ্গে ইংল্যান্ডে পাঠিয়ে দেয়া হয় রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে থাকার উদ্দেশ্যে। ১৮৭৮ সালে বড়ো দিনটি পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কাটানোর পর রবীন্দ্রনাথ দাদার এক বন্ধুর সঙ্গে চলে আসেন লন্ডনে। তাঁর আত্মীয়দের ধারণা ছিলো লন্ডনে থাকলেই পড়াশুনায় অধিক মনোযোগ দিতে পারবেন তিনি। সেখানে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনে ভর্তি হন তিনি। যদিও কোনো ডিগ্রি না নিয়েই এক বছরের মধ্যেই দেশে ফিরে আসেন রবীন্দ্রনাথ। তবে এই বিলেতবাসের সময় ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সুস্পষ্ট ধারণা পেয়েছিলেন তিনি, যা পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাটকে গভীর প্রভাব বিস্তার করে। যদিও রবীন্দ্রনাথ ইংরেজদের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা বা পারিবারিক রক্ষণশীল ধর্মমত কোনোটিকেই নিজের জীবন বা সৃষ্টিকর্মের মধ্যে সাগ্রহে গ্রহণ করেননি; বরং বেছে নিয়েছিলেন এই দুই জগতের কিছু শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতাকেই।

১৯০১ সালে রবীন্দ্রনাথ শিলাইদহ ত্যাগ করে চলে আসেন কোলকাতার প্রায় ১০০ মাইল উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত শান্তিনিকেতনে (বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বীরভূম জেলায় অবস্থিত)। ১৮৬৩ সালের রবীন্দ্রনাথের পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর শান্তিনিকেতন রুক্ষ অনুর্বর প্রান্তরের লাল কাঁকুড়ে মাটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে এখানে সাত একর জমি ক্রয় করেছিলেন আশ্রম স্থাপন করার মানসে। নির্মাণ করিয়েছিলেন একটি ভবন ও শ্বেতপাথরের মেঝে-বিশিষ্ট একটি প্রার্থনা মন্দির। এখানেই আম্রকুঞ্জ ও উদ্যানের মাঝে একটি গ্রন্থাগার সহ রবীন্দ্রনাথ স্থাপন করেন তাঁর পরীক্ষামূলক ব্রহ্মবিদ্যালয়। জীবনের এই পর্বেই কবিকে শোকাহত করে প্রয়াত হলেন কবিপত্মী মৃণালিনী দেবী (১৯০১), কন্যা রেণুকা (১৯০৩) ও পুত্র শমীন্দ্রনাথ (১৯০৭)। ১৯০৫ সালের ১৯ জানুয়ারি ৮৭ বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথের পিতৃদেব দেবেন্দ্রনাথ প্রয়াত হলেন। এরপর থেকে পৈত্রিক সম্পত্তির উত্তরাধিকার হিসেবে প্রতি মাসে ১,২৫০-১,৫০০ টাকা মাসোহারা পেতে শুরু করেন রবীন্দ্রনাথ। এছাড়া ত্রিপুরার মহারাজার কাছ থেকে পেতেন অনুদান স্বরূপ কিছু অর্থ। স্ত্রীর গহনা ও পুরীর সৈকতাবাসটি বিক্রয় করে কিছু অর্থ পান। আর পান তাঁর রচনার সহস্রাধিক কপি প্রকাশের সম্মানী স্বরূপ সামান্য কিছু অর্থ (২,০০০ টাকা)।

এই সময় চিত্রকর উইলিয়াম রোদেনস্টাইন প্রমুখ গুণমুগ্ধদের অনুরোধক্রমে রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি মুক্তছন্দে নিজের রচনা অনুবাদ করতে শুরু করেন। ১৯১২ সালে রচনার ইংরেজি অনুবাদের গুচ্ছ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ উপস্থিত হন ইংল্যান্ডে। সেখানে এই রচনা পাঠ করলে একাধিক বিশিষ্ট ইংরেজ ব্যক্তিত্ব তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। এঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিলেন ইংরেজ মিশনারি ও গান্ধীবাদী চার্লস এফ অ্যাণ্ড্রুজ, অ্যাংলো-আইরিশ কবি উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস, এজরা পাউন্ড, রবার্ট ব্রিজেস, আর্নেস্ট রাইস ও টমাস স্টার্জ মুর প্রমুখ। পরে ইয়েটস ইন্ডিয়া সোসাইটি প্রকাশিত গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থের ইংরেজি অনুবাদটির মুখবন্ধ রচনা করে দেন। অ্যাণ্ড্রুজ কবির সঙ্গে কাজ করার উদ্দেশ্যে চলে আসেন ভারতে।

১৯১২ সালের ১০ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের আরবানার একটি ইউনিটারিয়ান চার্চে বক্তৃতা দেন কবি। এই বছরই কবি যুক্তরাজ্য সফরে যান। এই সফরে উইলিয়াম রোদেনস্টাইন ও ইয়েটসের সঙ্গে আলাপ হয় কবির। এঁরা ততোদিনে তাঁর গীতাঞ্জলি পাঠ করেছিলেন। এই সফরে কবি স্ট্র্যাফোর্ডশায়ারের বাটারটনে অ্যান্ড্রুজের ধর্মযাজক বন্ধুদের সঙ্গে অবস্থান করেন। ১৯১৩ সালের ১৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ পান। গীতাঞ্জলি: দ্য সং অফারিংস (১৯১২) সহ তাঁর অনূদিত সামান্য যে কয়টি রচনা সেই সময় পাশ্চাত্য পাঠকমহলে সুপরিচিত ছিল তার ভূয়সী প্রশংসা করে সুইডিশ আকাদেমি।

তাঁর ভ্রমণ-বৃত্তান্ত
১৯১৩-এ নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর সারা বিশ্ব ভারতীয় কবি রবীন্দ্রনাথের ব্যাপারে বিশেষভাবে আগ্রহী হয়ে ওঠে। ফলে বিভিন্ন দেশ থেকে আসতে থাকে আমন্ত্রণের পর আমন্ত্রণ। অধিকাংশ আমন্ত্রণে সাড়া দিয়েছেন রবীন্দ্রনাথ ; জাহাজযোগে বহু দেশে গেছেন ; পরিচিত হয়েছেন বিভিন্ন দেশের বিদ্যজন ও রাজ-রাজড়াদের সাথে। বহু স্থানে, বহু বিদ্যায়তনে, বহু সভায় স্বকণ্ঠে কবিতা পাঠ করে শুনিয়েছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন। তাঁর জীবনোপলব্ধি ও দর্শন এবং তাঁর কাব্যের মর্মবাণী এভাবে কবি সরাসরি বিশ্বমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। প্রবাসের জীবনে তাঁর হাতে পূরবী’র মতো গুরুত্বপূর্ণ কাব্য রচিত হয়েছে। তাঁর সঙ্গে সাক্ষাতের ফলে বহুজন তাঁর কবিতা অনুবাদে উদ্যোগী হয়েছেন।

১৮৭৮ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পাঁচটি মহাদেশের তেত্রিশটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছিলেন। তবে ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাদ দিলে অন্যান্য দেশসমূহ ভ্রমণ করেছেন ১৯১৩-তে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর। দেশগুলো হলো: ফ্রান্স, হংকং, চীন, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড, জার্মানী, ডেনমার্ক, সুইডেন, অস্ট্রিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া, আর্জেন্টিনা, ইতালি, নরওয়ে, হাঙ্গেরী, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, গ্রীস, মিশর, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, জাপান, বার্মা, হল্যান্ড, সোভিয়েট রাশিয়া, ইরান, ইরাক ও শ্রীলংকা। ১৯৩৪ এ শ্রীলংকা (সিংহল) ভ্রমণ শেষে কবি শান্তিনিকেতনে ফেরেন ২৮ জুন। এরপর তিনি আর বিদেশভ্রমণে যাননি। এই ভ্রমণগুলির মধ্যে অনেকগুলিই রবীন্দ্রনাথের জীবনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। এর মাধ্যমে তিনি ভারতের বাইরে নিজের রচনাকে সুপরিচিত করে তোলেন এবং প্রচার করেন তাঁর রাজনৈতিক মতাদর্শ। একই সঙ্গে বহু আন্তর্জাতিক সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ হয়।

তাঁর বিদেশ ভ্রমণ শুরু হয় ১৮৭৮ সালে প্যারিস হয়ে লণ্ডন গমনের মাধ্যমে। বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থানকালে খুব ঘরকাতর হয়ে পড়েছিলেন বলে দীর্ঘকার আর বিলেত যাবার কথা ভাবেননি। তাঁর দ্বিতীয় লণ্ডন ভ্রমণ ১৮৯০-এ। ১৯১২ সালের ২৭ মে রবীন্দ্রনাথ যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য ভ্রমণে বের হন।

রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণগুলোর মাঝে অন্যতম ছিলো প্রাগে ভ্রমণ। তিনি প্রাগে গিযেছিলেন দু’বার। তবে সেখানে যাবার অনেক আগে থেকেই চেক বুদ্ধিজীবী ও পড়ুয়া সমাজের কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন অত্যন্ত সুপরিচিত একটি নাম। তাঁর সাহিত্যকর্ম সরাসরি বাঙলা থেকে চেক ভাষায় অনুবাদ হয়; ফলে চেকরা রবীন্দ্র দর্শন, চিন্তাধারা, বক্তব্যের সঙ্গে সরাসরি পরিচিত ছিলো। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরেরও নিঃসন্দেহে চেকদের সংস্কৃতি এবং চেক জাতীয় পুনর্জাগরণের ইতিহাস সম্বন্ধে ভাল জানতেন। কারণ পরবর্তী কয়েক বছরের মধ্যে মিউনিখ চুক্তিকে ঘিরে রবীন্দ্রনাথের সরব উদ্বেগ আমরা লক্ষ্য করি; এবং এই পর্বে তিনি চেকদের অতুলনীয় মানসিক সর্মথন দেন; চেক বুদ্ধিজীবীদের চিঠি লেখেন, ‘প্রায়শ্চিত্ত’ রচনা করেন, এদের প্রেসিডেন্ট ড. বেনেশকে টেলিগ্রাম পাঠান, চেকদের সমস্যা নিয়ে পণ্ডিত নেহরুর সঙ্গে দেখা করেন। জালিয়ানওয়ালাবাগের নিষ্ঠুরতার অনেকদিন বাদে রবীন্দ্রজীবনের এই পর্বে সচেতন আধুনিক গণতন্ত্রী রবীন্দ্রনাথের পরিচয় পাই আমরা।

‘মিউনিখ বিশ্বাসঘাতকতার’ প্রস্তুতিপর্বকে কেন্দ্র করে বিশেষ করে নাৎসি ও ফ্যাসিজমের ভয়াবহতার ওপরে প্রচুর লেখেন চেক বুদ্ধিজীবী ও লেখক চাপেক (যিনি রোবট শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন)। রবীন্দ্রনাথকে রেডিয়ো মেসেজ পাঠান সুদূর শান্তি নিকেতনে। অনেককেও পাঠান রেডিয়ো মেসেজ। সঙ্গতকারণে নাৎসি তালিকায় তাঁর নামটি ছিলো; তবে ভাগ্য ভালো যে গেস্টাপোর হাতে পড়ার আগেই, ১৯৩৮ সালে তিনি মারা যান। তাঁর ভাই জোসেফ চাপেক ছিলেন শিল্পী ও সাহিত্যিক, তিনি অবশ্য মারা যান জার্মান কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে। বার্লিন ও ড্রেসডেন সফর শেষ করে রবীন্দ্রনাথ প্রাগে আসেন, সঙ্গে কয়েকজনকে নিয়ে, যাঁদের মধ্যে কোলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘মডার্ণ রিভ্যু’র রামানন্দ চ্যাটার্জিও ছিলেন। এবার রবীন্দ্রনাথকে স্বাগতম জানানো হয় ‘কবি-প্রতিভা এবং চেকোস্লোভাকিয়ার বন্ধু’ হিসেবে। (উল্লেখ্য যে ইউরোপের রাজনৈতিক আবহাওয়া ১৯২৬ সালেই যথেষ্ট গোমট ছিল)। মিডিয়াতে অন্যান্য প্রসঙ্গ ছাড়াও রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে বলা হয়,

‘ফ্যাসিজমের প্রতিদ্বন্ধী এবং বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতির মধ্যে বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক স্থাপনের প্রচারক ও শান্তিদূত তিনি; যুদ্ধোত্তরকালীন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের বিখণ্ডায়নের এই সময়টিতে ইউরোপীয় অন্তর্জাগতিক জীবনের ওপরে তাঁর কাজের প্রকাণ্ড প্রভাব রয়েছে।’

মিউনিখ সঙ্কটের দিনগুলোতে রবীন্দ্রনাথের আরেক অজানা রূপ আমরা দেখি। আসন্ন মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে প্রতারিত হওয়ার গভীর আশঙ্কায় চেকোস্লোভাকিয়া যখন দুরূহ দুশ্চিন্তা উৎকণ্ঠায় জর্জরিত ও কঠিন অবমাননায় প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ছিলেন উপমহাদেশের প্রথম ব্যক্তিত্ব যিনি তার এই সঙ্কটের মুহূর্তে অকৃপণ সহানুভূতি জানান, দু হাত বাড়িয়ে বন্ধুত্বের বন্ধন ডেকে নেন ছোট্ট দেশ চেকোস্লোভাকিয়াকে, নিবেদন করেন পূর্ণ সমর্থন এবং মানসিক বল ও ধৈর্য্য। ইউরোপে যখন রাজনৈতিক উত্তেজনা ক্রমশ বাড়তেই থাকে, সেইসঙ্গে সঙ্কটও ঘনীভূত হতে থাকে এমন মুহূর্তে চেকোস্লোভাকিয়ার প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা বিদেশে তাঁদের বন্ধুবান্ধব ও সহকর্মীদের কাছে সমর্থন প্রার্থনা করে সনির্বন্ধ আবেদন করেন। বন্ধুতালিকায় অন্যান্য অনেক নামকরাদের মধ্যে যেমন ছিলেন এ্যালবার্ট আইনস্টাইন, ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও। এই পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৩৭ সালের বড়দিনের আগ মুহূর্তে ২৪ ডিসেম্বর কারেল চাপেক প্রাগ রেডিয়োর মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথের উদ্দেশে শান্তি ও ‘গুডউইলের’ বাণী সম্প্রচার করেন; প্রফেসর লেসনি চাপেকের বাণীর তাৎক্ষণিক ইংরেজি করে দেন। রবীন্দ্রনাথ তখন শান্তি নিকেতনে, রেডিয়োতে শোনেন চাপেকের পরিচিত গলা

‘ঠাকুর, তুমি মহৎ ব্যক্তিত্ব, প্রাচ্যের বৈরিতাহীন সুরেলা স্বর তুমি; আমরা তোমাকে তোমার শান্তি নিকেতনে শুভেচ্ছা জানাই। চেকোস্লোভাকিয়া থেকে তোমাকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছি; বরফপাত হচ্ছে এখন; ইউরোপে থেকেও এখন বড় একা আমরা; পাশ্চাত্যের বিশ্বে-সবচেয়ে উন্নত দেশগুলোও আর কেউ কাউকে ভ্রাতৃসুলভ হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে না। অথচ আমাদের এই দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব ও সাংস্কৃতিক পার্থক্য সত্ত্বেও আমরা আমাদের সৌভ্রাতৃত্বসুলভ হাত বাড়িয়ে দিচ্ছি তোমাকে, বিজ্ঞ ও বিচক্ষণ ভাবনার কবিকে, তোমার শান্তিময় শান্তি নিকেতনের উদ্দেশে, তোমার মহান ভারতবর্ষের, তোমার অপরিমেয় এশিয়ার এবং এশিয়ার উদ্দেশ্যেও যেখানটায়ও পশ্চিমের আবিষ্কৃত অসংখ্য অস্ত্রশস্ত্রের স্তূপীকৃত আবর্জনা ভরে একাকার হয়ে গেছে। এই মুহূর্তে আমাদের সবার এই মহাদেশের সর্বত্র যখন পূর্বাঞ্চলের ও পশ্চিমাঞ্চলের সর্বত্র, বন্দুকের বজ্রধ্বনি বাজছে, পশ্চিমা গণতন্ত্রের ক্ষুদ্র এক স্বর বছরের শেষপ্রান্তে তোমাকে ডেকে বলছে: পৃথিবীটা যদি বেঁচে যায়, তবে যেন হয় সমানাধিকারপ্রাপ্ত ও মুক্তস্বাধীন মানুষের পৃথিবী।’

রবীন্দ্রনাথ এই রেডিয়ো বাণী শোনেন বিশ্বভারতীতে বসে; শোনার কয়েকদিনের মধ্যেই পাঠিয়ে দেন উত্তর টেলিগ্রামে :

‘চেকোস্লোভাকিয়ার বন্ধুরা, মানবতার ওপরে ঘটমান প্রচ- ঘৃণা ও সহিংসতার ভয়ানক এই ঝড়ের দিনে বৃদ্ধ এক আইডিয়ালিস্ট, যে নাকি পূর্ব ও পশ্চিমের এবং গোটা পৃথিবীর সব মানুষের সাধারণ স্বাভাবিক নিয়তিতে গভীর বিশ্বাসে আস্থাশীল, তার বন্ধুত্ব ও সহমর্মতা গ্রহণ কর। রবীন্দ্রনাথ।’

প্রাগ থেকে পাঠানো এই রেডিয়ো বাণী কবি মনকে যথেষ্ট স্পর্শ করেছিল; তিনি লেসনিকে স্বরচিত একটি কবিতাও পাঠিয়ে দেন কবিতাটির প্রতিটি বাক্যে তাঁর অনুভূতি ও উদ্বেগ ছিল সুস্পষ্ট। পরবর্তী মাসগুলোতে রবীন্দ্রনাথ লেসনিকে যেসব চিঠি লেখেন তা থেকে স্পষ্ট ছিল যে ইউরোপের রাজনৈতিক পট ও প্রেক্ষাপটের পরিবর্তনের ধারা রবীন্দ্রনাথ খুব মনোযোগের সঙ্গে অনুসরণ ও পর্যবেক্ষণ করছেন এবং এই পরিপ্রেক্ষিতে চেকোস্লোভাকিয়ার রাজনৈতিক নিয়তির প্রশ্নে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন ছিলেন। ১৯৩৮ সালের আগস্ট মাসে লেসনিকে রবীন্দ্রনাথ লেখেন :

‘মধ্য ইউরোপের রাজনৈতিক অবস্থার যে প্রবাহ দেখছি তাতে আমরা সবাইই গভীরভাবে উদ্বিগ ও চিন্তাগ্রস্ত। বুঝতে পারি কি অসহায় অসহ্য দুশ্চিন্তাময় দিন তোমাদের কাটছে। তবে এইটুকু নিশ্চিতভাবে বলতে পারি যে, তোমার দেশের প্রতি এবং মানবতাবোধের পক্ষেই রয়েছে আমার হৃদয়ের সবটুকু সমবেদনা, সহানুভূতি আর দরদ।’

১৯৩৮ সালের হেমন্তকালে রবীন্দ্রনাথ প্রকাশ্যে মিউনিখ চুক্তির নিন্দা করেন; মিউনিখ চুক্তির বলে জার্মানি চেকোস্লোভাকিয়ার বিশাল এলাকাকে জার্মান সাম্রাজ্যভুক্ত করে নেয়। মিউনিখ চুক্তিকে বিশ্বাসঘাতকতার চুক্তিও বলা হয়; এই চুক্তি সইয়ের মাধ্যমে ফ্রান্স ও ইংল্যান্ড চেকোস্লোভাকিয়াকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি থেকে সরে দাঁড়ায়। এই প্রকাশ্য অবমাননা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসঘাতকতার বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছিলেন এবং চেকোস্লোভাকিয়ার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশে কার্পণ্য করেননি, রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদেরই একজন।

চেকোস্লোভাকিয়ার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথের এই মনোভঙ্গি জার্মান কর্তৃপক্ষের অজানা ছিলো না। ১৯৩৮ সালের মার্চ মাসে চেকোস্লোভাকিয়া জার্মান প্রটেকটরেটের অধীনে চলে আসার পরে যেসব কবি-সাহিত্যিককে নিষিদ্ধের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয় রবীন্দ্রনাথ ছিলেন তাঁদের অন্যতম। চেক ভাষায় অনূদিত তাঁর গল্প, কবিতা, রচনা, উপন্যাস, এমনকি নিষ্পাপ গীতাঞ্জলিসহ সবই নিষিদ্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধাবশেষে সেগুলো পুনর্মুদ্রিত হয় আবার। চেকদের জাতীয় ইতিহাসে ‘রেডিয়ো মেসেজ’ও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। তাই চেকদের জীবনে রবীন্দ্রনাথও বেঁচে আছেন।

ভারতে প্রত্যাবর্তনের অব্যবহিত পরেই ৬৩ বছর বয়সী রবীন্দ্রনাথ পেরু সরকারের কাছ থেকে পেরু ভ্রমণের একটি আমন্ত্রণ পান। পেরু থেকে তিনি যান মেক্সিকোতেও। উভয় দেশের সরকারই এই ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতে শান্তিনিকেতনের বিশ্বভারতী বিদ্যালয়ে ১০০,০০০ মার্কিন ডলার অর্থ দান করেন। ১৯২৪ সালের ৬ নভেম্বর আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনর্স এয়ার্সে উপস্থিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন রবীন্দ্রনাথ। এই সময় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর আতিথেয়তায় ভিলা মিরালরিওতে চলে আসেন কবি। ১৯২৫ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি যাত্রা করেন ভারতের উদ্দেশ্যে। ১৯২৬ সালের ৩০ মে ইতালির নেপলসে উপস্থিত হন তিনি। পরদিন রোমে সাক্ষাৎ করেন ফ্যাসিবাদী একনায়ক বেনিতো মুসোলিনির সঙ্গে। প্রথম দিকে উভয়ের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক থাকলেও, ১৯২৬ সালের ২০ জুলাই প্রথম মুসোলিনির বিরুদ্ধে বক্তব্য রাখেন রবীন্দ্রনাথ। তারপরই এই সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায়।

১৯২৭ সালের ১৪ জুলাই দুই সঙ্গীকে নিয়ে রবীন্দ্রনাথ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় চারমাসব্যাপী এক সফরে বের হন। এই সফরে তিনি ভ্রমণ করেন বালি, জাভা, কুয়ালালামপুর, মালাক্কা, পেনাং, সিয়াম ও সিঙ্গাপুর। ‘যাত্রী’ গ্রন্থে রবীন্দ্রনাথ এই ভ্রমণের বিবরণ লিপিবদ্ধ করেন। ১৯৩০ সালের গোড়ার দিকে প্রায় বর্ষব্যাপী এক সফরে তিনি বেরিয়ে পড়েন ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের উদ্দেশ্যে। যুক্তরাজ্যে ফিরে তিনি বার্মিংহামে একটি ভাতৃসংঘের আশ্রয়ে অবস্থান করেন। এই সময় লন্ডন ও প্যারিস নগরীতে তাঁর অঙ্কিত চিত্রের প্রদর্শনী হয়। বার্মিংহামে বসেই তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রদানের জন্য তাঁর হিবার্ট বক্তৃতামালা রচনা করেন। এই বক্তৃতাগুলির উপজীব্য ছিলো “আমাদের ঈশ্বরের মানবতাবোধ সম্পর্কে ধারণা, বা চিরন্তন মানবের দৈবসত্ত্বা”। এই সময় তিনি লন্ডনের বার্ষিক কোয়েকার সম্মেলনেও ভাষণ দেন। এখানে তাঁর ভাষণের বিষয়বস্তু ছিলো ভারতীয় ও ব্রিটিশদের সম্পর্ক। এই প্রসঙ্গে তিনি এক ‘নিরাসক্তির কৃষ্ণগহ্বর’-এর উল্লেখ করেন।

পরবর্তী দুই বছর এই বিষয় নিয়ে তিনি অনেক চিন্তাভাবনা করেছিলেন। পরে তিনি ডার্টিংটন হলে অবস্থান করে তৃতীয় আগা খানের সঙ্গে দেখা করেন। ১৯৩০ সালের জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত তিনি ডেনমার্ক, সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি পর্যটন করেন। এরপর যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। অতিন্দ্রীয়বাদী ফার্সি কবি হাফিজের কিংবদন্তি ও রচনার গুণমুগ্ধ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯৩২ সালের এপ্রিলে জীবনের শেষপর্বে তিনি তাই যান ইরানে। গ্রহণ করেন রেজা শাহ পাহলভির আতিথেয়তা। এই ভ্রমণের সময়ই তিনি সফর করেন ইরাক (১৯৩২) ও সিংহল (১৯৩৩)।

জীবনের শেষার্ধব্যাপী এই বিশ্বভ্রমণে রবীন্দ্রনাথ হেনরি বার্গসন, আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ফর্স্ট, টমাস মান, জর্জ বার্নার্ড শ, এইচ. জি. ওয়েলস ও রোমা রোঁলা প্রমুখ সমসাময়িক যুগের বিশিষ্ট বহু ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে পরিচিত হবার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরিচিত হয়েছেন অসংখ্য রাজন্যবর্গের সঙ্গে। এর ফলে জগৎব্যাপী মানব সমাজের নানা বিভাজন ও জাতীয়তাবাদের প্রকৃত স্বরূপটি অনুসন্ধান করতে সমর্থ হন কবি।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক মতাদর্শ, সমাজ, রাষ্ট্র ও শিক্ষা চিন্তা

১৮৭৭ সালে ইংলন্ডেশ্বরী ভিক্টোরিয়াকে ভারতেশ্বরী ঘোষণা দিয়ে দিল্লীতে যে দরবারের আয়োজন করা হয় তার বিরোধিতা করে ষোলো বছরের কিশোর রবীন্দ্রনাথ দিল্লীর দরবারে বলেন-

“ব্রিটিশ বিজয় করিয়া ঘোষণা, যে গায় গাক
আমরা গাবো না-
আমরা গাব না হরষ গান
এসো গো আমরা যে কজন আছি;
আমরা ধরিব আরেক তান।”

বস্তুত এর মধ্য দিয়েই রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারার একটি সার্থক প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করি। ইঙরেজ শাসনের যে অংশটি তিনি ধারণের কথা ভেবেছিলেন বা ব্যক্তিগতভাবে তিনি ধারণ করেছিলেন, তার সিংহভাগই ছিলো আমাদের সাংস্কৃতিক বাতাবরণের অংশ হিসেবে। বাঙলা ১৩০১ সালে ‘অপমানের প্রতিকার’- এ তিনি অবশ্য বললেন-

‘ইংরেজদের দ্বারা হত ও আহত হইবার মূল প্রধান কারণ আমাদের নিজেদের স্বভাবের মধ্যে। গবর্মেন্ট কোনো আইনের দ্বারা, বিচারের দ্বারা, তাহা দূর করিতে পারিবেন না’।

তবে ইংরেজদের বিরোধীতা করলেও রবীন্দ্রনাথ বা ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে ইংরেজদের সম্বন্ধ মোটেও খারাপ ছিলো না। এর নানা কারণ থাকতে পারে, তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক জমিদারি জীবনে একটি বৈষয়িক মনেবৃত্তি কাজ করেছিলো। তাই ইংরেজ প্রীতির কিংবা ইংরেজদের সাথে, আরও বিস্তৃত পরিসরে বললে- গভর্নমেন্টের সাথে একটি সামগ্রিক বিবেচনাধীন সম্পর্ক বজায় রাখার চিন্তা তাঁর কিংবা তাঁর পরিবারেরও ছিলো। তিনি তাঁর দাদাকে একবার লিখেছিলেন,

বাংলাদেশের জমিদারের চেয়ে বঙ্গ গবর্নমেন্টের বড়ো কর্মচারী আর কে আছে?”

কথাটা তাঁর ক্ষেত্রেও সত্য। ইংরেজ সরকার জমিদারদের প্রতি সাধারণভাবে এই নির্দেশ জারি করে যে, তাঁদের হাটবাজারে বিদেশী পণ্য কেনাবেচায় যাতে কোনো প্রকার বাধা দান না করা হয় সে বিষয়ে তারা যেনো সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। সকল জমিদারই সতর্ক থাকেন। স্বদেশী আন্দোলনের সময় জাতীয় তহবিলে তাঁরা তাঁদের প্রতিশ্রুত চাঁদা পর্যন্ত দেননি। বাঙলার ইংরেজ গভর্নদের সঙ্গে শান্তি নিকেতনের ভদ্র সম্বন্ধ চিরকাল অটুট ছিলো।

তবে ঠাকুরবাড়ির এই ভাবনার সাথে রবীন্দ্রনাথ বেশিদিন একাত্ম হতে পারেননি। এরও কারণ ছিলো। রবীন্দ্রনাথ আদতে ছিলেন সৌন্দর্য পিপাসু এক চিরন্তন সাধক। তাই সত্যটি তাঁর চোখের সামনে ধ্রুব হতে বেশি সময় নেয়নি। তাই স্বদেশের জন্য রবীন্দ্রনাথ নেশন নয়, সমাজ কামনা করতেন, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নয়, সমাজকে সেবা করার আত্মকর্তৃত্ব আত্মশাসন চাইতেন। বাঙলা ১৩১৩ সালে দেশনায়কে তিনি বলেন, স্বদেশের হিতসাধনের অধিকার কেহ আমাদের নিকট হইতে কাড়িয়া তো লয় নাই, তাহা ঈশ্বরদত্ত-স্বায়ত্তশাসন চিরদনিই আমাদের স্বায়ত্ত।

এ ধরণের মন্তব্যের একটি প্রাথমিক পর্ব থাকে, যেটা রবীন্দ্রনাথেও ছিলো। চারুচন্দ্র দত্তকে এক পত্রে ‘য়ুরোপ প্রবাসীর পত্র’ রচনা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন,

চিঠি যেগুলো লিখেছিলাম তাতে খাঁটি সত্য বলার চেয়ে খাঁটি স্পর্ধা প্রকাশ পেয়েছে প্রবলবেগে। বাঙালির ছেলে প্রথম বিলেত গেলে তার ভালো লাগবার অনেক কারণ ঘটে। সেটা স্বাভাবিক, সেটা ভালোই। কিন্তু কোমর বেঁধে বাহাদুরি করবার প্রবৃদ্ধিতে পেয়ে বসলে উল্টা মূর্তি ধরতে হয়। বলতে হয়, আমি অন্য পাঁচজনের মতো নই, আমার ভালো লাগবার যোগ্য কোথাও কিছুই নেই। সেটা যে চিত্তদৈন্যের লজ্জাকর লক্ষণ এবং অর্বাচীন মূঢ়ভার শোচনীয় প্রমাণ, সেটা বোঝবার বয়স তখনও হয়নি।

১৩৩৭ সালে রবীন্দ্রনাথ শ্রী নিকেতনের বাৎসরিক উৎসবে গ্রামবাসীদের প্রতি কথিত এক ভাষণে বলেন,

‘বঙ্গবন্ধু, আমি এক বৎসর প্রবাসে পশ্চিম-মহাদেশের নানা জায়গায় ঘুরে আবার আমার আপন দেশে ফিরে এসেছি। একটি কথা তোমাদের কাছে বলা দরকার- অনেকেই হয়তো তোমরা অনুভব করতে পারবে না কথাটি কতোখানি সত্য। পশ্চিমের দেশ বিদেশ হতে এতো দুঃখ আজ প্রকাশ হয়ে পড়েছে ভিতর থেকে এ রকম চিত্র যে আমি দেখবো মনে করিনি। সেখানে বিপুল পরিমাণ আসবাব পত্র, নানা রকম আয়োজন-উপকরণের সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু গভীর অশান্তি তার এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে, সুগভীর একটু দুঃখ তাদের সর্বত্র অধিকার করে রয়েছে। আমার নিজের দেশের উপর কোনো অভিমান আছে বলে এ কথাটি বলছি মনে করিও না। বস্তুত য়ুরোপের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা আছে। পশ্চিম মহাদেশে মানুষ যে সাধন করছে সে সাধনার যে মূল্য তা আমি অন্তরের সঙ্গে স্বীকার করি। স্বীকার না করাকে অপরাধ বলে গণ্য করি। সে মানুষকে অনেক ঐশ্বর্য্য দিয়েছে, ঐশ্বর্যের পন্থা বিস্তৃত করে দিয়েছে। সব হয়েছে। কিন্তু দুঃখ পাপে কলি এমন ছিদ্র দিয়ে প্রবেশ করে, তা প্রথমত চোখেই পড়ে না। ক্রমে ক্রমে তার ফল আমরা দেখতে পাই। আমি সেখানকার অনেক চিন্তাশীল মনীষীর সঙ্গে আলাপ করেছি। তাঁরা উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবতে বসেছেন এতো বিদ্যা, এতো জ্ঞান, এতো শক্তি, এতো সম্পদ- কিন্তু কেনো সুখ নেই, শান্তি নেই। প্রতি মুহূর্তে সকলে শঙ্কিত হয়ে আছে, কখন একটা ভীষণ উপদ্রব প্রলয়কান্ড বাঁধিয়ে দেবে।

রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারাটি অত্যন্ত জটিল। তিনি সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা করেন ও ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের সমর্থন করেন। ১৮৯০ সালে প্রকাশিত ‘মানসী’ কাব্যগ্রন্থের কয়েকটি কবিতায় রবীন্দ্রনাথের প্রথম জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিন্তাভাবনার পরিচয় পাওয়া যায়। হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র মামলা (হিন্দু-জার্মান ষড়যন্ত্র ছিলো ১৯১৪ হতে ১৯১৭ সালের মধ্যে সংঘটিত ষড়যন্ত্র, যাতে ব্রিটিশ ভারতের ঔপনিবেশিক সরকারের বিরুদ্ধে সর্বভারতীয় প্রতিরোধ ও বিদ্রোহ ঘটানোর পরিকল্পনা করা হয়েছিলো। এই ষড়যন্ত্রে অংশ নিয়েছিলো চরমপন্থী ভারতীয় জাতীয়তাবাদী বিপ্লবী সংগঠনসমূহ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘাদার দল, এবং জার্মানির ভারত স্বাধীন কমিটি। ষড়যন্ত্রের সূত্রপাত হয় ১ম মহাযুদ্ধের সূচনালগ্নে। আইরিশ প্রজাতন্ত্র আন্দোলন, জার্মান বৈদেশিক দপ্তর, এবং সান ফ্রান্সিস্কোর জার্মান দূতাবাস এই ষড়যন্ত্রে সহায়তা করে। এর পাশাপাশি তুর্কি অটোমান সাম্রাজ্যও এতে কিছু সাহায্য করেছিলো। ষড়যন্ত্রের একটি বড় পরিকল্পনা ছিলো পাঞ্জাব এলাকা থেকে সর্বভারতীয় বিদ্রোহের সূচনা করে সিঙ্গাপুর অবধি তা ছড়িয়ে দেয়া। ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সমাপ্তি ঘটানোর লক্ষ্যে ১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই বিদ্রোহ শুরু করার পরিকল্পনা করা হয়। ফেব্রুয়ারি মাসের এই ষড়যন্ত্র (যা ঘাদার ষড়যন্ত্র নামে খ্যাত) বিফল হয়, যখন ব্রিটিশ গোয়েন্দারা কৌশলে ঘাদার আন্দোলনের ভেতরে ঢুকে পড়ে সব তথ্য জেনে ফেলে। আন্দোলনের প্রধান নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়। ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থানের ছোটোখাটো সেনাদল ও সেনানিবাসের বিদ্রোহের পরিকল্পনাও বানচাল করে দেয়া হয়।) এর তথ্যপ্রমাণ ও পরবর্তীকালের বিভিন্ন বিবরণী থেকে জানা যায় যে রবীন্দ্রনাথ এ ষড়যন্ত্রের কথা শুধু জানতেনই না, বরং এই ষড়যন্ত্রে জাপানি প্রধানমন্ত্রী তেরাউচি মাসাতাকি ও প্রাক্তন প্রিমিয়ার ওকুমা শিগেনোবুর সাহায্যও প্রার্থনা করেছিলেন।

অন্যদিকে ১৯২৫ সালের একটি প্রবন্ধে স্বদেশী আন্দোলনকে ‘চরকা-সংস্কৃতি’ বলে বিদ্রুপ করে রবীন্দ্রনাথ কঠোর ভাষায় তার বিরোধিতা করেন। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ তাঁর চোখে ছিলো “আমাদের সামাজিক সমস্যাগুলির রাজনৈতিক উপসর্গ”। এই কারণে বৈকল্পিক ব্যবস্থা হিসেবে তিনি বৃহত্তর জনসাধারণের স্বনির্ভরতা ও বৌদ্ধিক উন্নতির ওপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করেন। ভারতবাসীকে অন্ধ বিপ্লবের পন্থা ত্যাগ করে বাস্তবসম্মত উপযোগমূলক শিক্ষার পন্থাটিকে গ্রহণ করার আহ্বান জানান।

এই ধরনের মতবাদ অনেককেই বিক্ষুব্ধ করে তুলেছিলো। ১৯১৬ সালের শেষ দিকে সানফ্রানসিকোর একটি হোটেলে অবস্থানকালে একদল ভারতীয় চরমপন্থী রবীন্দ্রনাথকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো। কিন্তু নিজেদের মধ্যে মতবিরোধের কারণে তাদের পরিকল্পনা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের গান ও কবিতার ভূমিকা অবশ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯১৯ সালে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তিনি নাইটহুড বর্জন করেন। লর্ড চেমস্ফোর্ডকে তিনি জানালেন, “আমার এই প্রতিবাদ আমার আতঙ্কিত দেশবাসীর মৌনযন্ত্রণার অভিব্যক্তি”।

রবীন্দ্রনাথের কবিতা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’ ও গান ‘একলা চলো রে’ রাজনৈতিক রচনা হিসেবে জনমানসে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ‘একলা চলো রে’ গানটি গান্ধীজির বিশেষ প্রিয় ছিলো। গান্ধীজির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্ক ছিল অম্ল-মধুর। অস্পৃশ্যদের জন্য পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে গান্ধীজি ও আম্বেডকরের মধ্যে যে বিরোধের সূত্রপাত হয় তার সমাধানেও রবীন্দ্রনাথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। ফলে গান্ধীজিও তাঁর ‘আমরণ অনশন’ প্রত্যাহার করে নেন।

রবীন্দ্রনাথের মধ্যে কলোনিয়াল অভিজ্ঞতা পুঞ্জীভূত, এই অভিজ্ঞতা তিনি ব্যবহার করেছেন সামাজিক সাহিত্যিক সম্পর্ক উন্নীত করার জন্য। কলোনাইজাররা হচ্ছে ব্রিটিশ, তাদের চেষ্টা নিরঙ্কুশ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং আধ্যাত্মিক ডমিনেশন তৈরি করা এবং সেই চেষ্টা তাদের মধ্যে তৈরি করে এক ধরনের ফিউডাল স্পিরিট। ব্রিটিশ কলোনাইজারদের মধ্যে কতগুলো বোধ ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে : শ্বেতাঙ্গদের শ্রেষ্ঠত্ব, তাদের মিশন হচ্ছে বাকি পৃথিবী সভ্য করা, নেটিভদের নিজেদের শাসন করার অক্ষমতা, নিজেদের সম্পদ পরিবৃদ্ধি করার অদক্ষতা, তারা বর্বর এবং কালা মানুষদের ডেসপট সহ্য করার প্রবণতা। এসব বাস্তবতার নিখুঁত মূল্যায়ন নয়, তবু বলতে হয় এসব হচ্ছে কলোনাইজারদের নিজেদের সম্বন্ধে ভাবনা প্রসূত। কনরাড এই অবস্থাটাকে বলেছেন, অন্ধকারের হৃৎমূল।

কলোনিয়াল অভিজ্ঞতার স্বরূপ এভাবে রবীন্দ্রনাথ বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর ত্রয়ী বিখ্যাত উপন্যাসে : গোরা, ঘরে-বাইরে এবং যোগাযোগে। রবীন্দ্রনাথ এই প্রশ্নটি ত্রয়ী উপন্যাসে বার বার করেছেন : আমি কে? আমাকে দেখতে কেমন লাগে?

তবে রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক চিন্তাধারাকে বিশ্লেষণের জন্যে অবশ্যই তাঁকে তাঁর স্বকালের পটভূমিতে বিচার করতে হবে। তাঁর জন্মটাই হয়েছিলো নানা দ্বন্ধে আলোড়িত ভারতবর্ষে। তখন সিপাহী বিদ্রোহের অবসান ঘটেছে, কোম্পানীর শাসনের সমাপ্তিতে পার্লামেণ্টের শাসন সূচনা। অর্তাৎ দেশ তখন কোম্পানীরাজের হাত থেকে ব্রিটিশদের হাতে এসে পড়ে। এই শাসনব্যবস্থার সাথে পরিবর্তিত হয় আরও কযেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যেমন; দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর তখন ব্রাক্ষ্ম ধর্ম প্রচারে নিবেদিত, বিদ্যাসাগর জড়িত শিক্ষা-বিধবা বিবাহ, এবং বহুবিবাহ বিষয়ক আন্দোলনে। অন্যদিকে নীলকরেরা গ্রামে গ্রামে অত্যাচারে লিপ্ত। সাহিত্যরাজ্যেও তখন ঋতুবদল ঘটেছে- ঈশ্বরগুপ্ত তিরোহিত, মধুসুদন আবির্ভূত। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ আবাল্য বর্দিত দেশপ্রেমে এবং পশ্চিমকে গ্রহণের মধ্যে। বাল্যে ‘ভৃত্যরাজকতন্ত্র’ চেয়েছিলো তাঁকে বৃত্তাবদ্ধ করতে, ওরিয়েন্টাল সেমিনার, নর্মাল উস্কুল তাঁকে আকৃষ্ট করেনি, এমনকি নিরুপদ্রব বেঙ্গল একাডেমীর দেয়ালগুলোও তাঁর মনে হতো পাহারাদারের মতো, আর ঘরগুলো নির্মম। এর মধ্যে মুক্তির স্বাদ এনেছিলো তিনটি বস্তু- উপনয়নের গায়ত্রীমন্ত্রটা, বাড়ির সাহিত্যিক আবহাওয়া, আর স্বাদেশিক সভা হিন্দুমেলা। এভাবেই রবীন্দ্রনাথের রাজনীতির ক্যানভাসে দেশপ্রেমের রঙটি ফুটে উঠে।

তবে রবীন্দ্রনাথ রাষ্ট্রতত্ত্ব বা সমাজতত্ত্ব বিষযক কোনো গ্রন্থ রচনা করেননি। তাঁর প্রবন্ধগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়- রাষ্ট্র ও সমাজের সংজ্ঞা নির্মাণের কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিলো না। রাষ্ট্র ও সমাজের পার্থক্য তাঁর কাছে নানা সময়ে নানা রূপে দেখা দিয়েছে। তিনি লক্ষ্য করেছেন, পশ্চিমের দেশগুলো রাষ্ট্রতন্ত্র নির্ভর, প্রাচ্যের দেশগুলোর নির্ভরস্থল হলো সমাজ। ১৮৯১ সালে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সংজ্ঞা দিতে গিয়ে তিনি ওই সভ্যতার প্রচণ্ড জীবনাবেগে বিমুগ্ধ হন। ‘নতুন ও পুরাতন’ (১২৯৮) প্রবন্ধে লক্ষ্য করেন, বর্তমানের নিদ্রালস পল্লীর জীবনহীনতার সাথে ওই জীবনময় সভ্যতার কোনো মিল নেই। তার মাঝে বিবিধ পরিবর্তন, সমাজ বিপ্লব ও বিরোধীশক্তির সমন্বয় সাধিত হয়েছিলো।

মহাভারত নির্ভর করে তিনি ১৮৯১ সালে তাঁর আদর্শ সমাজের রূপরেখা নির্মাণ করে নিলেন। এ মহাভারতীয় জীবনময় সমাজই তাঁর আদর্শ সমাজ। এ সমাজের পুনরুদ্ধারকল্পে তিনি পরবর্তীকালে বিপুল প্রয়াস প্রয়োগ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’ গল্পের উপজীব্য একটি খাঁচায় আবদ্ধ পাখি। পাখিটিকে প্রতিদিন বলপূর্বক পুঁথির শুকনো পাতা খাওয়ানো হতো। শেষ পর্যন্ত পাখিটি মারা যায়। এই গল্পে লেখক বিদ্রুপ করেন বিদ্যালয়ের মুখস্থ সর্বস্ব শিক্ষাব্যবস্থাকেই। ১৯১৭ সালের ১১ অক্টোবর ক্যালিফোর্নিয়ার সান্টা বারবারা ভ্রমণের সময় এই সব চিন্তাধারণার ফলস্রুতিতে রবীন্দ্রনাথ এক নতুন ধরনের বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিকল্পনা করেন।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা চেতনায় অহরহ যে মানবমনের সর্বব্যাপী, আকাশ থেকে ধুলো পর্যন্ত (‘আমার মুক্তি আলোয় আলোয়/ আমার মুক্তি ধূলায় ধূলায়’) মুক্তির কথা বলা হয়েছে, তাই যেনো বর্তমানে বাঙলাদেশের শিক্ষানীতির মূল প্রণোদনাই হওয়া উচিত ছিলো। এ কথার সঙ্গে দ্বিমত করার কোনো অবকাশ নেই। রবীন্দ্রনাথ প্রথাগত অর্থে কোনো শিক্ষক ছিলেন না কিন্তু মানবমনের মুক্তি নিশ্চিত করার জন্যে যে শিক্ষার দরকার তা রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ ঠিক মতো দিতে পারতেন কিনা, তা চিন্তার বিষয়। রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ তাঁর স্মৃতিকথামূলক ইংরেজি রচনা ‘ফাদার অ্যাজ আই নু হিম’-এ বলছেন,

শিলাইদহে রবীন্দ্রনাথ নিজে ছেলেমেয়েদের ইংরেজি-বাংলা পড়াতেন এবং অঙ্ক, বিজ্ঞান, ভূগোল ইত্যাদি পড়ানোর জন্য শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছিলেন, যাঁদের আগে তিনিই সবক দিয়ে নিতেন কীভাবে পড়াতে হবে। অর্থাৎ, রবীন্দ্রনাথও শিক্ষা গ্রহণকে একটি সুশৃঙ্খল চর্চা মনে করতেন, যেটার পাঠ গ্রহণের সঙ্গে বাস্তব জীবনের বেড়ে ওঠার সম্পর্ক থাকবে এবং সেটারই চিরকালীন সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভৌত রূপ হচ্ছে বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়।

তবে এর সার্থক রূপায়ন নিয়ে কবিগুরু চিন্তিত ছিলেন। ‘দেশ’-এর ‘রবীন্দ্রনাথ: সার্ধশতবর্ষ’ সংখ্যায় অরুণ নাগের ‘অপরিকল্পিত পরিকল্পনা: শান্তিনিকেতন-বিশ্বভারতী’ প্রবন্ধটিতে রবীন্দ্রনাথের এই ভাবনাটি ধরা পড়ে। কিছুদিন আগে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত এবং অধ্যাপক ফকরুল আলম ও রাধা চক্রবর্তী সম্পাদিত ‘দ্য এসেনশিয়াল শেক্সপিয়ার’ গ্রন্থটির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসেছিলেন বিশ্বভারতীর ইংরেজির অধ্যাপক সোমদত্তা মণ্ডল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে এক আলাপচারিতায় তিনি জানিয়েছিলেন, বিশ্বভারতীর পড়াশোনার মান খুব খারাপ পর্যায়ে আছে। কারণ, শান্তিনিকেতনের আশপাশের কলেজগুলো থেকে এতো নিম্নমানের শিক্ষার্থী ভর্তি হয় যে শিক্ষার মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। অরুণ নাগের প্রবন্ধও একই কথা স্বীকার করছে। তবে তাঁর ক্ষোভটা পশ্চিমবঙ্গ বা ভারত সরকারের ওপর, কেননা ১৯৫১ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের অধিভুক্ত হওয়ার পরও কেনো কবিগুরুর স্বপ্নানুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়টা রূপ পাচ্ছে না, সেটা হচ্ছে তাঁর অভিযোগ।

কিন্তু রবীন্দ্রনাথকেও জীবিতকালে তাঁর স্কুল এবং বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বারবার রফাদফার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। এক ছিলো অর্থায়নের সংকট, আরেক ছিলো সনদ স্বীকৃত করার সংকট। ১৯০১ সালে মাত্র পাঁচজন ছাত্র নিয়ে শান্তিনিকেতন ব্রহ্মাচার্যশ্রম বিদ্যালয়ের সূচনা হয়। পাঁচজন ছাত্রের মধ্যে দুজন ছিল রবীন্দ্রনাথের দুই ছেলে যথাক্রমে রথীন্দ্রনাথ ও শমীন্দ্রনাথ। কিন্তু প্রশ্ন উঠলো, যে স্কুল থেকে ডিগ্রি মিলবে না, সে স্কুলে ছাত্র ভর্তি হবে কেনো! তখন কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে বন্দোবস্ত করে প্রাইভেট ব্যবস্থায় ম্যাট্রিকুলেশন ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা হয়। পরে ১৯২১ সালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠা পেলে তখনো ডিগ্রি দেওয়া নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। প্রশ্ন ওঠে বিশ্বভারতী থেকে পাস করা শিক্ষার্থীদের চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে সনদের গুরুত্ব নিয়েও। কারণ চাকরির বাজারে বিশ্বভারতীর ডিগ্রির কদর ছিলো কম। তখন আবারও বিশ্বভারতী কর্তৃক কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় রচিত আইএ, বিএ এবং আইএসসি পাঠ্যসূচি অনুসরণ করার সিদ্ধান্ত হয়, এবং কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনেই পরীক্ষা পরিচালিত হওয়া ও ডিগ্রি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয় (১৯২৫)। এ ব্যবস্থা চলে ১৯৫১ সাল পর্যন্ত যখন কেন্দ্রীয় সরকার বিশ্বভারতীকে অধিগ্রহণ করে।

ওপরের তথ্যগুলো এ জন্য দিলাম যে যেকোনো স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে গেলে একটি পেশাগত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যেতেই হবে। মানুষের মনকে মুক্ত করতে হবে এটি একটি দর্শন, কিন্তু এটির সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবায়নে ঢুকে পড়ছে অগুনতি মানুষ, যাদের সঠিক কোনো স্বপ্ন নিয়ে মাথাব্যথা নেই, যাদের দরকার শিক্ষা শেষে জীবিকা। তখন না চাইলেও স্বপ্নের ইতরায়ন শুরু হয়, চলতে থাকে এর কদর্য কিন্তু সর্বজন অনুমোদিত ব্যবহার। বিশ্বভারতীকে সাধারণভাবে ডিগ্রি প্রদানের মতো আর দশটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে হলো। পরবর্তী সময়ে দেখা যায় ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি রচনাতে শিক্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের খেদোক্তি সম্পর্কে ওকাম্পো মন্তব্য করেছেন, মহৎ লোকদের স্বপ্ন যখন নিচের দিকের লোকের হাতে পড়ে, তখন তা অবক্ষয়িত হতে থাকে এবং তা-ই হয়েছে রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনকেন্দ্রিক স্বপ্নের।

তবে একথা ঠিক শিক্ষা বিষয়ক দর্শনের দিকে তাকালে রবীন্দ্রনাথ কেবল ১৯১৩ সালে এশীয়দের মধ্যে প্রথম নোবেল পুরস্কার জয়ীই নন, এশিয়াতে প্রথম একটি সার্থক শিক্ষাদান কেন্দ্রের প্রবক্তাও।

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনস্কতা ও বিজ্ঞানভাবনা

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞানমনষ্কতা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ ছিলো না, তবে তাঁর বিজ্ঞান বিষয়ক পড়াশুনা নিয়ে আমি কিছুদিন আগ পর্যন্তও বেশ সন্দিহান ছিলাম। সন্দেহটি দূরীভূত হয় কারণ- আইনস্টাইনের সঙ্গে তাঁর কথোপকথের সূত্র ধরে সামনে এগিয়ে এক আশ্চর্য বিজ্ঞানস্রষ্টাকেও আবিস্কার করি।

আইনস্টাইন : বিশ্বব্র্রহ্মার প্রকৃতি নিয়ে দুটো সম্পূর্ণ আলাদা ধারণা রয়েছে। একটা বলে বিশ্ব হল ঐক্যসঙ্গতি যা মনুষ্যত্বের ওপর নির্ভর করে আছে। আর অন্য মতে বিশ্ব হল এমন এক বাস্তবতা যা মানবসম্পর্ক নিরপেক্ষ, স্বাধীন, দাঁড়িয়ে আছে।
রবীন্দ্রনাথ : এই বিশ্ব তো মানুষেরই পৃথিবী। বিজ্ঞানদৃষ্টি দিয়ে যদি একে দেখতেই হয়, তো যিনি দেখবেন সেই মানুষটিকেও তা হলে বিজ্ঞানচিন্তা সম্পন্ন হতে হবে। তার মানে, আমাদের বাদ দিয়ে আলাদা কোন বিশ্বের অস্তিত্ব নেই : এ হল আপেক্ষিক বিশ্ব, এ যে কতখানি বাস্তব তা নির্ভর করছে আমাদের চৈতন্যের ওপর।
আইনস্টাইন : তা হলে, বলুন সত্য বা সৌন্দর্য্য এসবও মানবসম্পর্ক-নিরপেক্ষ স্বাধীন নয়?
রবীন্দ্রনাথ : নয়ই তো।
আইনস্টাইন : ধরা যাক, মানুষ বলে কোন কিছু আর নেই, তখনও কি এই সন্ধ্যাতারা এমনই সুন্দর দেখাবে না?
রবীন্দ্রনাথ : না।
আইনস্টাইন : সৌন্দর্যের ধারণার ব্যাপারে আপনার সঙ্গে আমি একমত; তবে, সত্যের ক্ষেত্রে আপনার কথা মানতে পারছি না।
রবীন্দ্রনাথ : কেন পারছেন না? সত্যও তো মানুষের ভিতর দিয়েই প্রকাশিত হবে।
আইস্টাইন : পিথাগোরাসের যুক্তি আমি মান্য করি যে সত্যের অস্তিত্ব মানুষের সম্পর্ক নিরপেক্ষ ব্যাপার।
রবীন্দ্রনাথ : পরম সত্য তো ব্যক্তি মানুষের ধ্যানের বাইরে ধরা দেয় না, সে অনুভব তো ভাষায় অবর্ণনীয়।
আইনস্টাইন : বাস্তবতা তো যা অস্তিত্ব তা-ই; মনের মানা-না মানার বাইরে স্বাধীন তার অস্তিত্ব। ধরা যাক, এই বাড়িতে জনপ্রাণী নেই, তার পরেও ঐ যে টেবিলটি সেটি এই রকমই থাকছে। টেবিল হল সেটাই যা আমাদের চৈতন্যের কোথাও কোনখানে তার অস্তিত্ব জানিয়ে দিচ্ছে।
রবীন্দ্রনাথ : হ্যাঁ, ব্যক্তিমনের স্বীকৃতি-অস্বীকৃতির বাইরে স্বাধীনভাবে সে থাকছে ঠিকই, কিন্তু তাই বলে সে বিশ্ব-মানসের বাইরে থাকছে এমন নয়।
আইনস্টাইন : বাড়িতে কেউ না থাকলেও টেবিলটা থাকছে, কিন্তু আপনার দৃষ্টিতে এর কোন বৈধত : নেই, কেননা আমাদের চৈতন্য-বহির্ভূতভাবে ঐ টেবিলের অস্তিত্বকে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারছি না। মনুষ্যত্ববোধের বাইরে সত্যের অস্তিত্ব সম্বন্ধে আমাদের স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ ব্যাখ্যা করে বোঝানো যাচ্ছে না, প্রমাণ করে দেখিয়ে দেয়াও সম্ভব নয়, তবে এ হল এক ধরনের বিশ্বাস যা আমরা সবাই লালন করি, এমনকি আদিম লোকজনও এর বাইরে পড়বে না। সত্যের ওপরে আমরা অতিমানবীয় (objectivity) আরোপ করে থাকি। আমাদের অস্তিত্ব নিরপেক্ষভাবে, অভিজ্ঞতা নিরপেক্ষভাবে এবং মানস সম্পর্ক রহিতভাবে এই যে স্বাধীন অস্তিত্ব রয়েছে বাস্তবের, এর যে ঠিক কী অর্থ আমরা বুঝিয়ে বলতে পারব না, অথচ আমাদের জন্য তা জরুরী।
রবীন্দ্রনাথ : যেভাবেই বলুন-না কেন, ব্যাপারটা আদতেই হচ্ছে মনুষ্যত্ববোধের সঙ্গে সম্পূর্ণ সম্পর্কশূন্য কোন সত্য যদি কোথাও থেকেও থাকে, তো আমাদের কাছে তার কোন অস্তিত্ব নেই।
আইনস্টাইন : তবে তো আমি আপনার চেয়ে বেশি ধার্মিক!

এই আলাপচারিতা (১৪ জুলাই ১৯৩০) সত্যিই ঘটে উঠেছিল বার্লিন নগরীর উপান্তে কাপুথ্-এ আইনস্টাইনের গ্রীষ্মাবাসে। সত্যের, সৌন্দর্য্যরে, সভ্যতার, বিশ্ববীক্ষার, যাবতীয় কিছুর তৌলমান হবে মানুষ রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বাস (যা আস্তিক্যবিশ্বাসের সমর্থক কিছু নিশ্চয়ই নয়) সময়ের স্রোতে তাঁর ক্রমপরম্পরাগত অর্জন। বিজ্ঞানীও ছিলেন কবির মতোই আদর্শিক, তার পরেও সায় দেন কবির কথায়?

‘This world is a human world the scientific view of it is also that of the scientfic man.

এই ঘটনার (১৯৩০) চুয়ান্ন বছর পরে নোবেল-বিজয়ী রসায়নবিদ ইলিয়া প্রিগোগিন মন্তব্য করেছেন :

‘আশ্চর্যের ব্যাপার, বর্তমানে বিজ্ঞানের বিবর্তন তো সেই দিকেই যাচ্ছে মহান ভারতীয় কবি যা বলে গিয়েছিলেন।

বিজ্ঞানের তত্ত্ব গভীরতর সত্যকে প্রকাশ করে কিনা, এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থাকতে পারে। কিন্তু বিজ্ঞানের উদঘাটিত সত্য যে কবির বক্তব্য থেকে ভিন্ন, এর বৈশিষ্ট্য ও প্রকাশের ভাষায়, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। বিজ্ঞানের পাঠ্যগ্রন্থে বিখ্যাত বিজ্ঞানীর কোনো তত্ত্বও হুবুহু তাঁর আপন কথায় স্থান পাবার দৃষ্টান্ত বড়ো দুর্লভ। আমার এই বিশ্লেষণ আপাত দৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের একটি উক্তির বিপরীত মনে হতে পারে, যেখানে তিনি বলেছেন-

‘তথ্যের যথার্থে এবং সেটাকে প্রকাশ করবার যথাযথ্যে বিজ্ঞান অল্পমাত্রায়ও স্খলন ক্ষমা করে না’।

তবে এখানে যে কোনো বৈপরীত্য নেই, সেটা ব্যাখ্যা করতে কোয়ান্টাম বলবিদ্যায় ব্যবহৃত হাইসেনবার্গের অনিশ্চয়তার বিধির সঙ্গে উপমা টানতে চাই। এই নীতির মূল কথা হলো, কোনো গতিশীল বস্তুর অবস্থান ও ভরবেগ একই সঙ্গে নির্ভুলভাবে জানা সম্ভব নয়।একটি নিশ্চিতভাবে জানতে গেলে অন্য তথ্যটি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, অর্থাৎ দুটো রাশির যুগ্ম ব্যবহারে কোনো ঘটনার পুরো তথ্য যেখানে নির্ণেয়, সেখানে দুটি রাশির পৃথকভাবে জানার যে অনিশ্চিয়তা তার গুণফল একটি ধ্রুব। সাহিত্যের ভাষার অন্তর্নিহিত যে দ্ব্যার্তবোধকতা অর্থাৎ অনিশ্চয়তা তা এর প্রয়োগকে কালনিরপেক্ষ করে।

বিজ্ঞানের সঙ্গে কবিতার এমন দুস্তর পার্থক্য আছে বলে; প্রশ্ন জাগে, রবীন্দ্রনাথের পক্ষে কবিতার জগতে বাস করে, বিজ্ঘানের দৃষ্টিভঙ্গী লালন করা কি সম্ভব হয়েছিলো?

রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাকে যদি খুব প্রখরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাঁর রচনার নিরিখে, তাহলে বোঝা যাবে রবীন্দ্রনাথ বিজ্ঞানে উৎসাহী ছিলেন গভীরভাবে। তিনি নিজেই বলেছেন, বিজ্ঞানের রস আস্বাদনে তাঁর লোভের অন্ত ছিলো না। অবশ্য সে লোভ পূর্ণ হয়নি তাঁর, এবং সেটা সম্ভবও ছিলো না। কারণ প্রত্যক্ষভাবে বিজ্ঞানের নানা অলিগলির সাথে পরিচয় না থাকলে বিজ্ঞানের সাধক হওয়া সম্ভব নয়। বিশেষত বিংশ শতাব্দীর বিজ্ঞান, কোয়ান্টাম তত্ত্ব ও আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিস্কৃত হবার ভেতর দিয়ে রবীন্দ্রনাথের যুগেই এতো জটিল, গভীর, জঙ্গম ও প্রভাব বিস্তারী হয়ে পড়েছিলো যে, ধারণার অভিনবত্ব, গাণিতিক দুর্গমতা ও পরিভাষার অপরিচয়তা অতিক্রম করে বিজ্ঞানের পাঠগ্রহণ শৌখিন পাঠাভ্যাসে সম্ভব ছিলো না।

তবুও বিস্ময়করভাবে তিনি বিজ্ঞান চেতনার ধারক ছিলেন। বিজ্ঞান সাহিত্য সৃষ্টি করে, বিজ্ঞান শিক্ষাদানে অংশ নিয়ে তিনি তাঁর বিজ্ঞান মনষ্কতার একটি সার্তক পরিচয় রেখেছিলেন। বিজ্ঞান শিক্ষাদানের সমস্যা ও গুরুত্ব তিনি তাঁর নানা লেখায় তুলে ধরেছেন। তিনি জগানন্দরায়ের মতো আদর্শ বিজ্ঞানের শিক্ষক তৈরি করেছিলেন।

তবে বিজ্ঞানের প্রতি আকর্ষণ তাঁর সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলো বাল্য বয়সে। এ সুযোগ তিনি লাভ করেছিলেন বিজ্ঞান শিক্ষায় সীতানাথ দত্তের সাহচার্যে। অত্যন্ত সহজ করে বিজ্ঞানের নানা তত্ত্বকে ব্যাখ্যা করার অদ্ভূদ কৌশল ছিলো তাঁর। এ কৌশল রবীন্দ্রনাথকে বিষ্ফারিত করেছে।

বারো বছর বয়সে রবীন্দ্রনাথ বাবার সঙ্গে ডালহৌসি পাহাড়ে বেড়াতে যান। সেখানে গিরিশৃঙ্গের বেড়া দেয়া নিবিড় নীলাকাশের স্বচ্ছ অন্ধকারে বাবার কাছ থেকে লাভ করেন নক্ষত্র ও গ্রহদের পরিচয়। সেইসঙ্গে সূর্যকে ঘিরে গ্রহদের পথের দূরত্ব এবং প্রদক্ষিণের বিবরণ। কিন্তু এসব ঘটনা রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাজীবনে বড়োজোর অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। তিনি নিজেই বলেছিলেন, শিক্ষার দায় তিনি নিজের হাতেই গ্রহণ করেছিলেন ছেলেবেলাতে। জ্যোর্তিবিজ্ঞানের উপর ইংরেজীতে লেখা বিচিত্র সব বই তিনি পড়েছেন। তাঁর নিজের কথায় গলধঃকরণ করেছেন শাঁসসুদ্ধ, বীজসুদ্ধ।

১৮৭৩ সালে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় ‘ভারতবর্ষীয় জ্যোতিষশাস্ত্র’ নামে তাঁর প্রথম প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। ১৮৮৫ সালে জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদিত ‘বালক’ পত্রিকয় নিয়মিত লিখেছেন তিনি- যেখানে জ্যোতির্বজ্ঞান, পদার্থবিজ্ঞান, ভূ-বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় স্থান পেয়েছে।
রবীন্দ্রনাথের জীবনের গুরুত্বপূর্ন ঘটনা হলো বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্রের সঙ্গে তাঁর বন্ধুত্ব। ১৯০০ সালে বোস মগ্ন হয়ে পড়েন, জৈব ও অজৈব পদার্থের ক্ষেত্রে অভিন্ন প্রতিক্রিয়া নিয়ে গবেষণায়। বস্তুত জগদীশ বসু বায়োফিজিক্সের অগ্রদূত, যার গবেষণায় তিনি তাঁর জীবনের শেষ ৩০ বছর ব্যয় করেছেন। জগদীশচন্দ্র বসুর কাজে অনুপ্রাণিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘বঙ্গদর্শনে’ একটি প্রবন্ধ লেখেন যার শিরোনাম ‘জড় কি সজীব?’। প্রবন্ধটি পড়ে জগদীশচন্দ্র মন্তব্য করেছিলেন,

রবীন্দ্রনাথ কবি না হলে শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী হতেন।

আইনস্টাইন একজন ‘রিয়েলিস্ট’ হিসেবে এই মত পোষণ করেন যে- ভৌত-বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ নিরপেক্ষ। এই কথাগুলো শুরুতেই আলোচনা হয়েছে। এই বিষয়টি নিয়ে নীলস্ বোরের সঙ্গে আইনস্টাইনের বিতর্ক চলেছে। এটি সেরা বুদ্ধিগত বিতর্ক বলে পরিচিত এবং এখনও এর কোনো মীমাংসা হয়নি। রবীন্দ্রনাথ যদিও নিজেকে স্পষ্টভাবে বস্তুবাদী বা ভাববাদীদের তালিকায় ফেলেননি, কিন্তু তিনি যখন বলেন, “আমারি চেতনার রঙে পান্না হলো সবুজ” তখন বোঝা যায়- তিনি আসলে নীলস বোরের কোপেনহেগেন ব্যাখ্যার সাথে একাত্ম হবার মনস্তাত্ত্বিক বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘পৃথিবী’ কবিতাটির দিকে তাকালে এক অনন্য বিজ্ঞান চেতার সন্ধান পাওয়া যায়। উপনিষদের চিন্তাকে ঊনিশ শতকের তিরিশের দশকে এসে জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় রূপ দিয়েছেন,

‘আগুন বাতাস জল : আদিম দেবতারা তাদের সর্পিল পরিহাসে
তোমাকে দিল রূপ-’

উপনিষদ আগুন, বাতাস ও জল তিনকে বিশ্ব সৃষ্টির উপাদান বলে স্বীকার করে। ভারতীয়রা তাই এই তিনকে দেবতা জ্ঞান করে নাম দেয় অগ্নিদেব, পবনদেব ও বরুণদেব। ভারতীয় ঋষিদের একাংশ মনে করতেন এই তিন থেকে পৃথিবী ও জীবের সৃষ্টি। গ্রীক ও রোমানরা সমুদ্র, সমুদ্রের অভ্যন্তরে পাতাল ও আগ্নেয়গিরি তিনকে নাম দেয় যথাক্রমে নেপচুন, প্লুটো ও ভালকান, যা থেকে উৎপত্তি হয় নেপচুনইজম, প্লুটোনিজম ও ভালকানইজম। পৃথিবী সৃষ্টির এই বিজ্ঞানভিত্তিক তত্ত্ব রোমান বা গ্রীক সকল দার্শনিক মেনে নিতে পারেননি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৬০০ হবে, এ সময়ে প্রথমে গ্রীক দার্শনিক থ্যালিস বললেন প্লুটোনিজমের কথা।

রবীন্দ্রনাথ ও ডারউইন একই শতাব্দীর। তাঁরা যখন এসেছেন, তখনও আগুন, বাতাস আর জল তত্ত্ব সকলের কাছে স্বীকৃত নয়। স্বীকৃত নয় আজও। আজও এক বিপুল শ্রেণীর চিন্তা প্রাকৃতিক এই সত্যের ওপর দাঁড়াতে পারেনি। তবে সব কালে রবীন্দ্রনাথের মতো অনেকের কাছে এ প্রশ্ন বড় ও রহস্য ঘেরা ‘এলেম আমি কোথা থেকে/কোনখানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে?’ খোকার মতো এই প্রশ্ন রবীন্দ্রনাথের কালে আজকের থেকে অনেক বেশি ছিল। মায়ের মুখের সহজ উত্তরে অর্থাৎ, ছিলি মনের মাঝারে- এতে খুশি নয় অনেকেই। এ জিজ্ঞাসা আজও যেমন সমাজ ও চিন্তাকে তাড়িত করে তখনও তাড়িত করেছিল। তবে দেখা যাচ্ছে এখানে কোন দ্বিধাদ্বন্ধ খুব বেশি দোলায়িত করতে পারেনি রবীন্দ্রনাথকে। হৃদয়ের কোন এক গভীর মর্মমূল থেকে তিনি পেয়েছিলেন সমাধান। তিনি সত্য বলে মানলেন, উপনিষদের ওই আগুন বাতাস জলকে। তাঁর বিজ্ঞান মনষ্কতা তাকে সহজ সমাধান দিল। তিনি সাবলীলভাবে বললেন,

‘অগ্নিতে বাষ্পেতে দুঃস্বপ্নে ঘুলিয়ে’ …….
স্নিগ্ধ তুমি, হিংস্ত্র তুমি, পুরাতনী তুমি নিত্য নবীনা,
অনাদি সৃষ্টির যজ্ঞহুতাগ্নি থেকে বেরিয়ে এসেছিলে
সংখ্যা গণনার অতীত প্রত্যুষ্যে।

সংখ্যা গণনার সেই অতীত প্রত্যুষ হয়ত চারশ কোটি বছর হয়ত তারও আগে, যা কিন্তু কোন দ্বন্ধে ফেলেনি রবীন্দ্রনাথকে। তাই তিনি সমাধান দিলেন সংখ্যা গণনার অতীত প্রত্যুষ বলে।

গ্রীক ও রোমানদের প্লুটোনিজম, নেপচুনইজম আর ভলকানিজম বা উপনিষদের আগুন, বাতাস আর জল যে নামেই বলা হোক, পৃথিবী সৃষ্টির এই প্রাকৃতিক সত্যের পথেই অবস্থান নেন রবীন্দ্রনাথ। জীব সৃষ্টির আদি ইতিহাসে রবীন্দ্রনাথ আর ডারউইন হাঁটলেন একই পথে। দুজনেই দেখলেন প্রাকৃতিক বিবর্তন। দুজনেই দাঁড়ালেন প্রাকৃতিক সত্যর নির্মম সুন্দর পাথরের ওপর। রবীন্দ্রনাথ সহজে বললেন, ‘তোমার ইতিহাসের আদিপর্বে দানবের প্রতাপ ছিলো দুর্জয়’ এই দানবের প্রতাপ যেন আমাদের সামনে সেই পাথর ও সমুদ্রের পৃথিবীতে ডারউনের খুঁজে পাওয়া অতিকায় জীবের পৃথিবীর কথা মনে করিয়ে দেয়। ডারউইন জীবের বিবর্তন খুঁজেছেন। তিনি খোকার মতো উত্তর খুঁজেছেন, মাতা পৃথিবীর কাছে। ‘এলেম আমি কোথা থেকে।’ কিন্তু রবীন্দ্রনাথ এখানেই শুধু নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। তিনি খোকার জীবন খুঁজেছেন, খোকার মনের বড় হওয়া খুঁজেছেন আবার গ্রীক, রোমান দার্শনিকদের ও আধুনিক বিজ্ঞানীদের সেই জড়ের যৌগ থেকে জীবনের স্পন্দনকেও সহজভাবে দেখতে পেয়েছেন। তিনি দেখলেন জড় থেকে জীব এল। তাই লিখলেন,

জড়ের ঔদ্ধত্য হলো অভিভূত
জীবধাত্রী বসলেন শ্যামল আস্তরণ পেতে।
উষা দাঁড়ালেন পূর্বাচলের শিখর চূড়ায়।

অর্থাৎ আগুন বাতাস আর জল মিলে জড় থেকে জীবের জন্ম দিল।

বিজ্ঞানের কঠিন সত্যের ওপরে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথকে তাই সমাজ বিবর্তন ও মানবিক বিবর্তনের ক্ষেত্রেও পাওয়া যায় এক বিজ্ঞান চেতনা সমৃদ্ধ মানুষ হিসেবে। যিনি মানুষের বিবর্তনকে দেখেছেন ডারউনের পথেই। তবে সমাজের বিবর্তন ও মানুষের মানবিক বিবর্তনকে যে গভীর অন্তর্দৃষ্টি থেকে তিনি উপলব্ধি করেছেন, তা শুধু মানুষকে ভাবায় না, মানুষের সমাজ ও সভ্যতাকে উপলব্ধি করার পথের দরজা খুলে দেয় না, মানুষকে নিয়ে যায় বাস্তবতার এক নির্মম সুন্দর পাদপীঠে। ভাবলে অবাক হতে হয় কি কঠিন সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে প্রকৃতি মাতাকে চিনেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। চিনেছিলেন, প্রকৃতির হাজার সন্তান থেকে আলাদা হয়ে আসা মানব সন্তানের সৃষ্ট সভ্যতা ও তার জয়মাল্যকে। হয়ত আমরা সবাই জানি শ্রেয়কে দিতে হয় দুর্মূল্য, কিন্তু এর পরে, কৃপা করো না কৃপাপাত্রকে বলে তিনি যেন সভ্যতার পথের যাত্রী মানুষকে আরও কঠিনতর বাস্তবতার মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। এই বাস্তবতায় না দাঁড়ালে মানুষ মনে হয় কোনদিনই হতে পারে না, সভ্যতার পথিক। সভ্যতার সঙ্গী যে বিনাশ এবং রুদ্রতা শুধু সুন্দর নয়, এ সত্য উচ্চারণে যে কোন জিভ কেঁপে ওঠে। কারণ, সভ্যতাকে সবাই তো সরস্বতী হিসেবেই দেখতে চায়। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ কোন মতেই কোন কল্পিত সুন্দরের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে চাননি কখনই। তাই ডান হাতে যেমন সুধা পূর্ণ পাত্র দেখেছেন, তেমনি বাম হাতে সেটাকে চূর্ণ করতে দেখেছেন। আর এর সকল কিছুই তিনি তুলে দিয়েছেন প্রকৃতির হাতে। তার বাইরে কোন কল্পনায়, কোন অলীক সত্যে তিনি যাননি। যেমন আজকের অনেক ধ্বংস, অনেক বিনাশের সময় আমাদের মনে পড়ে যায়, ‘তোমার নির্দয়তার ভিত্তিতে উঠেছে সভ্যতার জয়তোরণ,/ত্রুটি ঘটলে তার পূর্ণ মূল্য শোধ হয় বিনাশে /’ প্রকৃতির এই বাস্তবতার ওপরে দাঁড়ানো রবীন্দ্রনাথ তাই কখনই কোন স্রষ্টা পিতার উদ্দেশ্যে তিনি জীবনের সকল পথ চলার দায় তুলে দেননি। বরং প্রকৃতিসৃষ্ট পৃথিবী মাতাকেই বলেছেন,

‘জীবপালিনী, আমাদের পুষেছ
তোমার খন্ড কালের ছোট ছোট পিঞ্জরে,
তারই মধ্যে সব খেলার সীমা, সব কীর্তির অবসান ’

তথ্যসূত্র:
১। রবীন্দ্রজীবনী ও রবীন্দ্রসাহিত্য প্রবেশক, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
২। রবীন্দ্রজীবনকথা, প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়
৩। আত্মপরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৪। দ্বিভাষিক ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’
৫। ভারতী পত্রিকয় প্রকাশিত বিভিন্ন নিবন্ধ।
৬। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় সমাজচিন্তা, বুদ্ধদেব বসু
৭। রবীন্দ্রনাথের স্বাদেশিকতা, গোপাল হালদার
৮। রবীন্দ্রসাহিত্যের ভূমিকা, নীহাররঞ্জন রায়
৯। রাষ্ট্র বনাম সমাজ, শচীন সেন
১০। রবীন্দ্রনাথ ও অগ্রগতি, সুশোভন সরকার
১১। ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল, চিত্রা দেব
১২। রবীন্দ্রপ্রবন্ধ: রাষ্ট্র ও সমাজচিন্তা, হুমায়ুন আজাদ
১৩। বাঙলা ও ইংরেজী উইকিপিডিয়া

২০ শ্রাবণ, ১৪১৮