ক্যাটেগরিঃ পাঠাগার

 

মধ্য-গগন পর্বের দীপ্ত রবীন্দ্রনাথ

যে বছর (১৮৬১) নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে ‘কাপুরুষ’ লক্ষ্মণের হাতে মেঘনাদ বধ হলেন, সে বছরেই জোড়াসাঁকোতে জন্ম নিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই রবীন্দ্রনাথ- যাঁকে আমি চিনি এবং মনের মাঝে নিজের অজান্তেই যাঁর জন্য রচনা করি স্বপ্ন ও সুখ। রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টি সম্বন্ধে আলোচনা অনেক বড়ো বিষয়। এ বড়ো বিষয়টির সম্পাদনা হয়তো সম্ভব কিন্তু সম্পন্ন খুব কঠিন।

তাছাড়া রবীন্দ্র পাঠের একটি প্রাথমিক সমস্যা আছে। রবীন্দ্রনাথ ছিলেন মূলত উপনিষদের দর্শনকেন্দ্রিক মানব। তাঁর লেখার সামগ্রিকতায় এক অনাবিল সৌকর্য ধরা পড়ে, যা পাঠক মাত্রেই মোহনীয় প্রপাতের ধারা। তাই একবার পুরো রবীন্দ্রনাথ পাঠে তাঁকে আত্মস্থ করা খুব কঠিন, প্রায় অসম্ভব। কেননা পড়ার প্রথম ধাপটাই এগিয়ে যায় বিস্ময়াভিভূত এক দোলাচলে।

পুরো রবীন্দ্রনাথ পড়ে নেয়া একটি গর্ব- সত্যি বলতে একটি অহঙ্কারও। ‘কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে কতোটুকু বোঝা গেলো?’- এ প্রশ্নটি যখন আসবে তখনই অহঙ্কারের সৌধ ভেঙে পড়ে। রবীন্দ্রনাথ তাই ‘শেষ হইয়াও হইলো না শেষ’- এর এক মূর্ত প্রতিবিম্ব।

রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য-সৃষ্টিকর্ম

রবীন্দ্র সাহিত্য সমাজ বা সংস্কারের নীতি পাঠ নয়। সত্য ও সুন্দরই তাঁর সাহিত্যের মৌল বিষয়। সাহিত্য ও শিল্পকলাকে তিনি নীতি আদর্শ ও তত্ত্ব প্রচারের বাহন করে তোলেননি। পাঠকের মন যুগিয়ে লেখার চেষ্টা বা সাহিত্যকে হাটে বিকিয়ে দিয়ে খ্যাতি অর্জনের চেষ্টাও করেননি। সাহিত্য ও সৌন্দর্য তত্ত্বের উপর তিনি অনেক প্রবন্ধ লিখেছেন। ভাষণও দিয়েছেন। এমনকি কোনো কোনো কবিতায় এ সম্বন্ধে তিনি মতামতও ব্যাক্ত করেছেন।

সংসার ধূলি জালে গীতিরস সিঞ্চন করে দিয়ে আজীবন তাঁর সৌন্দর্যপিপাসু মন ছুটেছে সৌন্দর্যের ‘নিরুদ্দেশ যাত্রায়’। ছিন্নপত্রের অনেক চিঠিতেও তিনি বারবার তা উল্লেখ করেছেন। সত্য ও সুন্দর বলতে কি বোঝায় তাও তিনি ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। একথাও শোনা যায়- প্রচলিত সৌন্দর্য ধারা সম্বন্ধে তিনিই প্রথম আমাদের ভুল ভাঙিয়েছেন। তাঁর কাব্যে প্রথম সৌন্দর্যের ধারা উদঘাটিত হয় ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ তে। তিনি বলেছেন,

“একদিন সকালে বারান্দায় দাঁড়াইয়া আমি সেই দিকে (ফ্রি স্কুলের বাগানের গাছের দিকে) চাহিলাম। তখন সেই গাছগুলির পল্লবান্তরাল হইতে সূর্যোদয় হইতেছিলো। চাহিয়া থাকিতে থাকিতে হঠাৎ এক অপরূপ মহিমায় বিশ্ব সংসার সমাচ্ছন্ন; আনন্দ ও সৌন্দর্য সর্বত্রই তরঙ্গিত। আমার হৃদয়ের স্তরে স্তরে যে একটা বিষাদের আচ্ছাদন ছিলো তাহা এক নিমেষেই ভেদ করিয়া আমার সমস্ত ভিতরটাতে বিশ্বের আলোকে একেবারে বিচ্ছুরিত হইয়া পড়িলো। সেই দিনই ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটি নির্ঝরের মতোই উৎসরিত হইয়া বহিয়া চলিলো। লেখা শেষ হইয়া গেলো। কিন্তু জগতের এই আনন্দরূপের ওপর তখনো যবনিকা পড়িয়া গেলো না। এমনি হইলো আমার কাছে তখন কিছুই অপ্রিয় রহিলো না। আমি বারান্দায় দাঁড়াইয়া থাকিতাম- রাস্তা দিয়া মুটে-মজুর যে-কেহ চলিত, তাহাদের গতিভঙ্গী, শরীরের গঠন, তাহাদের মুখশ্রী, আমার কাছে ভারি আশ্চর্য বলিয়া বোধ হইতো। সকলেই যেনো নিখিল সমুদ্রের উপর দিয়া তরঙ্গলীলার মতো বহিয়া চলিয়াছে। শিশুকাল হইতে কেবল চোখ দিয়া দেখাই অভ্যস্ত হইয়া গিয়াছিলো, আজ যেনো একেবারে সমস্ত চৈতন্য দিয়া হাসিতে হাসিতে অবলীলাক্রমে চলিয়া যাইতো, সেটাকে আমি সামান্য ঘটনা বলিয়া মনে করিতে পারিতাম না। বিশ্বজগতের অতলস্পর্শী গভীরতার মধ্যে যে অফুরান রসের উৎস হাসির ঝরণা ঝরাইতেছে সেটাকে যেন দেখিতে পাইতাম”।

এই তো রবীন্দ্রনাথের প্রাথমিক সৌন্দর্যবোধের উন্মেষ।

রবীন্দ্রনাথ শিল্পী। রবীন্দ্রনাথ সৌন্দর্য-শিল্পী। যতোই তিনি আকণ্ঠ সৌন্দর্যের ঝর্ণাধারা পান করেছেন, ততোই তাঁর সৌন্দর্যতৃষ্ণা বেড়েছে। তিনি বলেছেন- ‘নীলিমারে লইতে চাহি আকাশ ছাকিয়া’।

কী আশ্চর্য সৌন্দর্য তৃষ্ণা!

কবির প্রথম জীবনেই সৌন্দর্যের প্রতি ছিলো দুরন্ত অভিসার। তাঁর ভাষায়-

আমার শিশুকালেই বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে আমার খুব একটা সহজ এবং নিবিড় যোগ ছিলো। বাড়িঘর, ভিতরের নারিকেল গাছগুলি প্রত্যেকে আমার কাছে অত্যন্ত সত্য হইয়া দেখা দিতো। সকালে জাগিবা মাত্রই সমস্ত পৃথিবী জীবনোল্লাসে আমার মনে তাহার খেলার সঙ্গীর মতো ডাকিয়া বাহির করিতো। মধ্যাহ্নে সমস্ত আকাশ এবং প্রহর যেনো সুতীব্রভাবে আপন গভীরতার মধ্যে আমাকে বিরাগী করিয়া দিতো এবং রাত্রির অন্ধকার যেনো মায়াপথের গোপন দরজাটা খুলিয়া দিতো তা সম্ভব-অসম্ভবের সীমানা ছাড়াইয়া রূপকথার অপরূপ রাজ্যে সাত সমুদ্র তেরো নদী পার করিয়া লইয়া যাইতো। এবং গঙ্গার পাল তোলা নৌকায় যখন তখন আমার মন বিনা ভাড়ায় সওয়ারি হইয়া বসিতো এবং সে সবদেশে যাত্রা করিতে বাহির হইতো। ভূগোলে আজ পর্যন্ত তাহার কোনো পরিচয় পাওয়া যায় নাই।”

এই সৌন্দর্য তত্ত্বের আলোকে আমরা যে রবীন্দ্র-সাহিত্য পাই, তা অপ্রতিহত ও অনতিক্রম্য এক দুর্ভেদ্য প্রাচীর। তবে এ দুর্ভেদ্যতার শরীর কবিতা এবং নাটকে যতো প্রভাবশালী, ছোটগল্প এবং উপন্যাসেও তেমনি প্রতাপময়। কিন্তু এ প্রভাবও ভেঙেছিল। বাঙলা সাহিত্যের আকাশে ঝড় হয়ে এসেছিলো ‘কালি-কলম’, ‘কল্লোল’ ও ‘পরিচয়’ গোষ্ঠীর মাধ্যমে বাঙলা সাহিত্যের হলো পালাবদল।

একবার এক পরিসংখ্যানবিদ রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতিভার আর-একটি অভ্রান্ত প্রমাণ পেয়েছিলেন দুই শতাব্দীতে প্রায় সমান ভাগে বিভক্ত আয়ুষ্কালের অঙ্কে। লিখিতভাবে কথাটা অবশ্য প্রথম বরেছিলেন বুদ্ধদেব বসু। ১৯০১ অবশ্যই এক কালফলক রবীন্দ্রজীবনে। সম্পত্তির পুনর্বিন্যাস, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য উৎকণ্ঠা- এমনই নানা কারণে শিলাইদহ থেকে তাঁকে চলে আসতে হলো। কোলকাতায় ফিরলেন না তিনি।

তবে এইসময়টাতে রবীন্দ্রজীবনে ঘটে যায় নানা ধরণের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। ১৯০২ থেকে ১৯০৭ এর মধ্যে তিনি হারালেন তাঁর ভ্রাতুষ্পুত্র নীতীন্দ্রনাথ (মৃত্যু: ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯০১), স্ত্রী মৃণালিনী দেবী (মৃত্যু: ২৩ নভেম্বর, ১৯০২), কন্যা রেনুকা (মৃত্যু: ১৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০৩), পিতা দেবেন্দ্রনাথ (মৃত্যু: ১৯ জানুয়ারি, ১৯০৬) ও পুত্র সমীন্দ্রনাথকে (মৃত্যু: ১৮ নভেম্বর, ১৯০৭)। কিন্তু এ সময়টাতে তাঁর কাব্য প্রতিভা যেনো নিঃসঙ্গ হলেও আঘাতে আঘাতময়। ব্যক্তিজীবনে যেখানে চলছে বিপর্যয়ের আঘাত, কবিজীবনে তখন রাজসুয়ের অশ্বমেধিক পর্ব। নিরুদ্দেশ যাত্রায় গিয়েছিলো যে সোনার তরী, একদিকে নির্বস্তুক কিন্তু সংরক্ত সৌন্দর্যের, অন্যদিকে অতীতের বস্তুময় স্মৃতির দুই প্রান্তপথ অতিক্রম করে সেই তরণীহিরণ এসে পৌঁছেছিলো এক প্রার্থণাময় নৈবেদ্যের উপাচার নিয়ে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠা বিগ্রহের পূজা উদ্দিষ্ট নয় তার। হৃদয়ে যার অনাবৃষ্টি দীর্ঘকাল, অতিদীর্ঘকাল, বাইরে ‘সভ্যতা-নাগিনী’র ‘কুটিল ফণা’, তিনি আজ দাঁড়াতে চান অন্তর্যামী জীবনস্বামীর সামনে। খেয়ার নেয়ে দেয় সে পথেরই সন্ধান, যে- অন্তরযাত্রার তিনটি বয়ান একই বছরে প্রকাশিত; ‘গোরা’, ‘রাজা’ ও ‘গীতাঞ্জলি’ (১৯১০)।

শতাব্দীর প্রথম দশকটিতেই, যখন চল্লিশ থেকে পঞ্চাশে পৌঁছাবেন রবীন্দ্রনাথ, পঁচিশে পৌঁছানোর আগেই যাঁকে ‘শিক্ষিত বাঙালির কবি’ বলে বরণ করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র, ততোদিনে হয়ে উঠেছেন সমাজের নেতৃত্বস্থানীয় অগ্রগণ্য। প্রায় পারিবারিক প্রতিষ্ঠান আদি ব্রাক্ষ্ম সমাজের সম্পাদক হবার (১৮৮৪) কথা ছেড়ে দিলেও, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাকাল (১৮৯৪) তেকেই তিনি সহ-সভাপতি, ১৯০৫ এ বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী আন্দোলনের অধিনায়ক, ১৯০৬ ও ১৯০৮ এ বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মিলন ও বঙ্গীয় প্রাদেশিক সম্মেলনের সভাপতি। বস্তুত এই ধারটি তাঁর সাহিত্য জীবনের জন্য এক স্রোত-যার প্রতিস্রোত তখনও পুরো সমাজে একেবারেই অবর্তমান।

রবীন্দ্রসাহিত্যের একটি অন্যতম দিক হলো উপমা। উপমা প্রয়োগের তাৎপর্যে রবীন্দ্রনাথ যেনো সঁপে দিয়েছিলেন নিজেকে। এই উপমার প্রয়োগে রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কাব্যগ্রন্থ ‘সন্ধ্যাসংগীত’ থেকে আরম্ভ করে ‘শেষলেখা’ পর্যন্ত বিভিন্ন কাব্যগুলো আলোচনার দাবি রাখে। এতো দীর্ঘ আলোচনায় না গিয়ে আমরা যদি তার মর্মমূলে দৃষ্টিপাত করি, তবে দেখতে পাবো পুরো কাব্যগ্রন্থের শরীরেই কবি ব্যবহার করেছেন কিছু আশ্চর্য উপমা। রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিকের কবিতায় উপমা চয়নে সচেতনতা লক্ষ্যণীয়, রূপকেরও- প্রতীকের ভাব-সংকেতের জন্ম তখনও হয়নি। অবশ্য এটা স্বাভাবিক, কারণ কবিমানস তখন গঠনধর্মী- বিহারীলাল ও মাইকেলের প্রভাব ডিঙিয়ে নিজস্ব সুর আবিস্কারের চেষ্টা তখন চলছে এবং সেটা যখন সফল হয়েছে, রবীন্দ্রনাথ তখন উপমা ব্যবহারে স্বাভাবিকতা ও নিজস্বতা অর্জন করেছেন। তাঁর গদ্য কাব্যগুলোতেও উপমা চয়নের বিষয়ে সচেতনতা লক্ষ্যণীয়।

তাঁর গদ্য-কাব্যগুলোর উপমা অনেকটা প্রাত্যহিক ধুলিলিপ্ত অনাবৃত জীবনের প্রান্তর থেকে নেয়া। লক্ষ্য করলে দেখা যায় ‘প্রভাত সংগীত’ থেকে ‘শেষলেখা’ পর্যন্ত অতি প্রলম্বিত কবিজীবনে রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রাচুর্যের মহিমাতেই উপমা সৃষ্টি করেননি, এগুলোকে বৈচিত্র্যে করে তুলেছেন অনন্য। তাঁর উপমা মূলত বাঙলাদেশের প্রাকৃতিক দৃশ্যপট নির্ভর; তাই এতে গতানুগতিকতার প্রশ্রয় থাকলেও উপমা-বৈশিষ্ট্যে এটি সমুজ্জ্বল। এই সমুজ্জ্বলতার প্রকাশ ঘটেছে প্রকৃতি নির্ভর উপমায়, পুরাণ জগত নির্ভর উপমায়, ক্ল্যাসিক ও দীর্ঘোপমায় বা বিভিন্ন ইমেজে।

রবীন্দ্র সাহিত্যের উপমা মূলত দুই ধরণের। এক, রোম্যান্টিক, দুই ক্ল্যাসিক। কিন্তু রবীন্দ্র-উপমার আসল স্বরূপ রোম্যান্টিকতায় ধরা পড়েছে। বোধ করি তাই অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ রবীন্দ্রনাথকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ রোম্যান্টিক কবি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা ছোটগল্পের বয়স কমপক্ষে একশো কুড়ি বছর, আর প্রথম দু’টো গল্পকে (‘ঘাটের কথা’ ও ‘রাজপথের কথা’) পাসমার্ক দিলে একশো সাতাশ বছর। লেখা হয়ে যাবার পর, অনেক পরেও তাঁর গল্পের প্রকাশনা অব্যাহত রচনাবলীতে আছে, গল্পগুচ্ছে আছে, আছে নানান বিষয়কেন্দ্রিকতায়। এছাড়া বিশ্বময় অনূদিত হয়েছে এবং হচ্ছে তাঁর ছোটগল্পসমূহ। কিছুকাল আগে উইলিয়াম রাদিচের অনুবাদে বেরিয়েছে রবীন্দ্র-গল্পের নির্বাচিত সম্ভার এবং তা দ্বিতীয়বার। রাদিচে তার এক প্রবন্ধে বাঙলা ভাষাকে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষার মর্যাদা দিয়েছিলেন। সে-ভাষার এক শ্রেষ্ঠ বা সর্বশ্রেষ্ঠ লেখক রবীন্দ্রনাথের গল্প-উপন্যাস এভাবেই ছড়াতে-ছড়াতে এসে পৌঁছেছে অনেক দূর। এখন যদি এ-পরিস্থিতিতে রবীন্দ্র-কথাসাহিত্যের ভবিষ্যতের কথা ওঠে তাহলে বুঝতে হবে, বাঙলা ভাষায় তাঁর কথাসাহিত্যের ভবিতব্যের কথা-ই উঠছে। রবীন্দ্রনাথের পর প্রচুর বাংলা-গল্প-উপন্যাস লেখা হয়েছে, লিখেছেনও অনেকেই। অর্থাৎ বাঙলা কথাসাহিত্যের এলাকা মোটামুটি বহুস্বর-পরিকীর্ণ। এমতাবস্থায় জন্ম তো বটেই মৃত্যুরও প্রায় পৌনে এক শতাব্দী কাল দূরত্বে এসে রবীন্দ্রনাথ কোন অভিমুখে যেতে পারেন সে-প্রশ্ন ওঠাটা অস্বাভাবিক নয়।

এখানে রবীন্দ্রনাথের সমান্তরালে রুশ গল্পকার আন্তন চেখভের উত্থাপন করা যায়। দু’জনের কথাসাহিত্যের সূত্রপাত খুব কাছাকাছি সময়ে, চেখভের ১৮৮৩ এবং রবীন্দ্রনাথের ১৮৮৪। অনেকে অবশ্য দু’জনের মধ্যে মিলের প্রসঙ্গ টানেন এবং কেউ-কেউ রবীন্দ্রনাথের ওপর চেখভের প্রভাবের দিকটিকেও গুরুত্বারোপ করেন। প্রসঙ্গত বলা দরকার একই সমকালে একেবারে একই প্রারম্ভিক রেখায় সূচিত দুই বিদেশী-বিভাষী লেখকের পারস্পরিক প্রভাবের অনুষঙ্গ কতটা যৌক্তিক সে-প্রশ্ন আমরা ওঠাতে পারি। বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথ রুশ ভাষা জানতেন না এবং চেখভের গল্পের ইংরেজি অনুবাদ ভারতবর্ষে পৌঁছাবার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনেকগুলো বিখ্যাত ছোটগল্প লিখে ফেলেছেন। চেখভের গল্প এক সময় রাশিয়া থেকে প্রকাশিত হতো, এখন বেরোয় বিশ্বখ্যাত পেঙ্গুইন কিংবা পাশ্চাত্যের নামকরা প্রকাশনী থেকে। চেখভের পাঠক না থাকলে পেঙ্গুইন তাঁর বই ছাপাতো না। কাজেই ১৯০৩-এ রচিত সর্বশেষ গল্পটিও চেখভ-পাঠক পড়ছেন ২০১১-য়। নিজের গল্প সম্পর্কে খুব সুন্দর মন্তব্য করে ছিলেন তিনি

‘আমি শুধু খোলাখুলিভাবে, অকপটে মানুষকে বলতে চেয়েছিলাম : নিজেদের দিকে একবার তাকিয়ে দেখ, দেখই না কী বিশ্রী আর বিবস জীবন যাপন করছ তোমরা! সবচেয়ে বড় কথা, লোকে যেন এটা বুঝতে যখন পারবে তখন অবশ্যই তারা নিজেদের জন্য গড়ে তুলবে আরেক জীবন, আরও ভালো এক জীবন। আমি তা দেখতে পাব না, কিন্তু আমি জানি তা হবে সম্পূর্ণ অন্য রকম—যেমন আছে তার মতো নয়।’

সত্যি কথা, চেখভ নেই কিন্তু তাঁর প্রতিনিধিত্ব আছে তাঁর গল্প।

যাই হোক, কথা হচ্ছিলো রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্প প্রসঙ্গে। নিজের ছোটগল্পের ভবিষ্যত প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে নিজের ওপর খানিকটা অবিচারই করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বলেছিলেন,

‘আমার আশঙ্কা হয়, এক সময়ে গল্পগুচ্ছ বুর্জোয়া লেখকের সংসর্গ দোষে অ-সাহিত্য বলে অস্পৃশ্য হবে।’

দেখা গেছে তাঁর এ মূল্যায়ন অমূলক। বস্তুত সাহিত্য বিষয়টাই হচ্ছে একটা বুর্জোয়া মাধ্যম এবং যে-কৃত্রিম আঙ্গিক বা মাধ্যমগুলো আত্মপ্রকাশের জন্য যুগে-যুগে রচয়িতারা নির্মাণ করেন তাদের অধিকাংশের অবস্থানই বিত্তহীন-নিম্নবিত্ত শ্রেণীর বিপরীত মেরুতে। এমনকি সাহিত্যের যে-চিরায়ত ভাব ও রসের কথা বলা হয় তাতেও বুর্জোয়া দৃষ্টিভঙ্গির লিপ্ততাকে অস্বীকার করা যাবে না। কথাসাহিত্যিকের সার্থকতা তাঁর সাহিত্যে তাঁর সময় ও পরিপার্শ্ব চিত্রণে রচয়িতার আন্তরিকতা, নিষ্ঠা, উপলব্ধি, দর্শন এবং গভীরতার ছোঁয়াতে। সেদিক থেকে বিচার করলে রবীন্দ্রনাথের সাফল্য বিস্ময়কর। লক্ষ্য করতে হয় তাঁর প্রকাশ সাহিত্যের নানা আঙ্গিকে ঘটলেও এসবের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য ঐক্যের প্রবাহ। ফলে ‘ঘরে বাইরে স্রষ্টাকে খুঁজে পাওয়া যাবে কালান্তরের প্রবন্ধাবলীতে; একইভাবে ‘গোরা’র নির্মাতাকে আবিষ্কার করা যাবে ‘স্বদেশ’ ‘মানুষের ধর্ম’ কিংবা ‘সভ্যতার সংকট’-এ। এমনকি যদি পাঠ করা যায় ‘কল্পনা’ কাব্যের ‘স্বপ্ন’ কবিতাখানি (দূরে বহুদূরে/স্বপ্নলোকে উজ্জয়িনীপুরে…ইত্যাদি) তখন এ-কবিরই গদ্য-উক্তি মনে পড়ে যাবে ‘শতাব্দীর পর শতাব্দী যাইতেছে কিন্তু রামায়ণ-মহাভারতের স্রোত ভারতবর্ষে আর লেশমাত্র শুষ্ক হইতেছে না।’ (‘প্রাচীন সাহিত্য’) উজ্জয়িনীপুরে কবি ধারণ করতে চেয়েছেন ‘ভারতবর্ষের সহস্র বৎসরের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন। তখন বুঝতে হয় রবীন্দ্রনাথ ‘পরিপূর্ণ পরিণামের মধ্যে সমস্ত খণ্ডতার সুষমা’ এবং ‘সমস্ত বিরোধের শান্তি’র সাধনাই করেছেন। কাজেই রবীন্দ্রনাথের গল্পের অনুষঙ্গে তাঁর উপন্যাস, প্রবন্ধ, কবিতা, গান সবই এসে যাবে একে-একে। রবীন্দ্রনাথ প্রচুর লিখেছেন, পেয়েছেন আয়ত জীবন কিন্তু নিরর্থক লেখা বলতে গেলে লেখেননি তিনি। রবীন্দ্রনাথের জীবন-দর্শনের এটাও এক উচ্চতার দিক।

সময় এবং স্থানের স্থির চিত্র আঁকায় সীমাবদ্ধ না থেকে জীবনপ্রবাহে চলমান মানুষের মূর্তি গড়েছেন রবীন্দ্রনাথ। মানবের পূর্বতন, সমকালীন এবং কালোত্তরের ত্রিমাত্রায় কথাসাহিত্যের সম্ভাব্যতার যাচাই হয়েছে তাঁর গল্পে, উপন্যাসে। দৃষ্টান্ত দিলে দেখা যাবে পূর্বসুরি বঙ্কিমের সামাজিক মানুষ বদলে গেছে রবীন্দ্রনাথে এবং সেই বদলের হেতুটিকে তিনি ব্যাখ্যাও করেছেন ‘সাহিত্যের নবপর্যায়ের পদ্ধতি হচ্ছে ঘটনা পরম্পরার বিবরণ দেয়া নয়, বিশ্লেষণ করে তাদের আঁতের কথা বের করে দেখানো। এ-পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত আকস্মিকতাযুক্ত নয়, এরও একটা পূর্বাপর নির্মিত হয়েছে রবীন্দ্রনাথেরই হাতে। ‘অপরিচিতা’, ‘স্ত্রীর পত্র’, ‘নষ্টনীড়’, ‘পয়লা নম্বর’, এবং ‘চোখের বালি’ ইত্যাকার ব্যাপ্তিতে একটি সামগ্রিক অবয়বের মধ্য দিয়ে আমরা বঙ্কিম পেরিয়ে উপনীত হই রবীন্দ্রনাথে।

আধার এবং আধেয়র পারস্পরিক সহযোগ মহৎ ও চিরায়ত সাহিত্যের একটা বড়ো গুণ। গিলগামেশে যেমন আজও প্রাচীন ব্যাবিলনীয় সভ্যতার প্রচ্ছায়া তার জলবায়ু, তার ভূগোল তার নদীমৃত্তিকাসহ প্রাণবন্ত তেমনি বেউষ্ফ, ইলিয়াডেও তাই। সাহিত্য তার ভাববস্তুর মধ্য দিয়ে কখনও-কখনও বিমূর্তায়নের অপূর্ব লোকের অনুগামী হলেও একটা নির্দিষ্ট সময়ের নির্দিষ্ট আধারের তৎপরতাকে কোনভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। রবীন্দ্রনাথের ‘ছুটি’, ‘অতিথি’ কিংবা ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ ইত্যাদি গল্পের মধ্যে বস্তুর বর্ণের মতো বস্তুর গায়ে এর স্থানিকতা এমনভাবে প্রলিপ্ত যে একে বাদ দিলে এসব গল্প হয়ে পড়ে বিবর্ণ। প্রকৃতি, প্রকৃতির আলোছায়া, এর রঙ-রূপ, পরিবর্তমান পরস্পর এসব উপাদান রবীন্দ্র গল্পে অসংখ্য স্থির চিত্রের মতো সজ্জিত রয়ে গেছে আজও। পোল্যান্ডের গ্রামগুলো বাস্তবে এখন আর পূর্ববত না থাকলেও আইজাক সিঙ্গার কিংবা শোলেম অ্যালাইখেমের গল্প-উপন্যাস অনুসরণ এসব গ্রামের পুনর্গঠন সম্ভব সমালোচকদের এমন মূল্যায়ন রবীন্দ্র ছোটগল্পের ক্ষেত্রে অনিবার্যরূপে প্রযোজ্য। আকস্মিক দৈবের ফলে বাঙলা অঞ্চল মানচিত্র থেকে সহসা উধাও হয়ে গেলেও এর ভূগোল এবং এর স্থানিক মাত্রার উদ্ধরণ সম্ভব রবীন্দ্র-গল্পের সূত্রে। ‘শাস্তি’, পোস্টমাস্টার’, ‘সমাপ্তি’, ‘অতিথি’, ‘মেঘ ও রৌদ্র,’ ‘সুভা’, ‘খোকাবাবুর প্রত্যাবর্তন’ প্রভৃতি গল্প এবং ছিন্নপত্রাবলীর যাদুস্পর্শে পুনর্নির্মিত হতে পারে রবীন্দ্রনাথের বাঙলাদেশ। স্থান এবং সময়ের এমনই এক চিরায়ত গ্রন্থনা রবীন্দ্রনাথের ছোটোগল্প।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, রবীন্দ্র-যুগের ভাষার প্রভাবের কালবলয় কতোখানি বিস্তৃত। এতোদিন পরে এসেও রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের, রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের ভাষার কার্যকারিতা কতোটুকু। এটা তো সত্য, প্রতিটি সাহিত্য মাধ্যমের এবং প্রতিটি সাহিত্যযুগের একটি যুগাপেক্ষ মাত্রা থাকবে। সাহিত্য কীর্তিটি বিশেষ একটি যুগায়তনে একবারই উদ্ভাসিত হয় এবং এর আভায় সূর্যালোকের শক্তি থাকলে দীর্ঘ পরিব্যাপ্তি লাভ করে। যুগের পর যুগ ধরে ভাষার নানা চরিত্র তৈরি হয়, নানা বদলের মধ্য দিয়ে ভাষার সংক্রমণ ঘটে কিন্তু ভাষাকে শেষ পর্যন্ত সাহিত্য মাধ্যমের অনিবার্য সত্তা হিসেবেই গণ্য করা হয়। রবীন্দ্রজীবনী পড়ে এবং রবীন্দ্রসাহিত্য হৃদয়ঙ্গম করে যে-রবীন্দ্রনাথকে আমরা সামনে দেখতে পাই তিনি কখনও হারান না। আমরা হয়তো নিখিলেশের মধ্যে, হয়তো গোরার কথায়, হয়তো ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধের বক্তায় রবীন্দ্রনাথকেই কথা বলতে দেখি এসবই এখনকার সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সূত্র। কথা হচ্ছে এই সূত্র কতখানি মজবুত, কতখানি অটুট। ভাষা এবং কথাবস্তু এ দু’য়ের মধ্য দিয়েই আজও প্রাসঙ্গিক হয়ে আছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। গিরিবালা, সুরবালা, মৃন্ময়ী, অপূর্ব, চারু, তারাপদ, দামিনী, মহেন্দ্র, কুমুদিনী, বিনোদিনী, এলা, গোরা, পোস্টমাস্টার এ রকম অসংখ্য ও বিচিত্র মানুষজন রবীন্দ্রনাথের ভাষার ভেতর দিয়েই আজও আমাদের কাছে এসে পৌঁছেছে এবং সে-ভাষাকে বদলাবারও উপায় থাকে না। বদলালে চন্দনা চন্দনা থাকে না, মৃণালের মৃণালত্ব হারিয়ে যায় এবং সন্দ্বীপও হয়ে যায় অন্য কেউ। কিংবা ধরা যাক রহমতের সংলাপ ‘খোঁখী, তোমি সসুরবাড়ি যাচ্ছিস?’ বদলে সেখানে এ-যুগের সংলাপ বসিয়ে দেয়া গেল।

তাহলে কি ঘটবে? রহমত চরিত্রের মাহাত্ম্যটাই আর থাকবে না। এভাবেই রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিপুল-বিচিত্র ছোটগল্পের পৃথিবীকে বাঁধাই করে রাখেন বহুখাঁজ স্ফটিকাধারে।

রবীন্দ্রনাথের গান

যদিও বাঙলা গানের সৃজন পর্ব আরম্ভ হয়েছিলো রামপ্রসাদ ও নিধুবাবুর (রামনিধি গুপ্ত) হাতে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দশকগুলোতে। কিন্তু এ সময়ই বাঙলা গানের ক্ষেত্রে নবীন ভাবনা ও উদ্যোম দেখা দিয়েছিলো। এ সময় সঙ্গীতের সংরক্ষণ, নবরূপ প্রণয়ন ও প্রচার, প্রাতিষ্ঠানিক ও ব্যক্তিগত উদ্যোগে ব্যাপকভাবে প্রচার লাভ করেছিলো। সমাজ পরিবর্তনের বা সমাজ রূপান্তরের প্রেক্ষাপটে এই নবজাগরণ ছিলো অনস্বীকার্য।

সুর ও ছন্দের সম্মিলিত রূপই সঙ্গীত। এই সঙ্গীত স্বর-সমাহারের মধ্য দিয়ে আমাদের সুন্দর ও আনন্দের দিকে নিয়ে যায়, অনুভব করা যায় অসামান্যতাকে। এই ধ্বনিশিল্পই হলো সঙ্গীত। রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন

“মানুষের যে আনন্দ ও আত্মপ্রকাশ মৃত্যুকে অতিক্রম করে সঙ্গীত তার শ্রেষ্ঠ বাহন”।

নাগরিক বাঙলা গানের মৌলিক উপাদান হলো সাধারণ হিন্দুস্তানী রীতির রাগরাগিনীর সুর, পাশ্চাত্যের সুর, বাউল কীর্তনের সুর এবং লোকায়ত সুর।

কথা, সুর ও ছন্দের এক আশ্চর্য সমন্বয় ঘটেছিলো রবীন্দ্রনাথের গানে। এই গানই হয়ে উঠলো রবিবাবুর গান। ১৯৩১ সালে দীনেন্দ্রনাথ এই গানকে নামাঙ্কিত করলেন ‘রবীন্দ্রসঙ্গীত’ বলে।

http://www.youtube.com/watch?v=tsQuZ8m7YPQ&feature=related

রবীন্দ্রনাথের পূর্ব-পুরুষদের সংগীতচর্চা, পৃষ্ঠপোষকতা ও পারিবারিক পরিবেশ রবীন্দ্রনাথকে সংগীতে উৎসাহী করে তুলে। ঠাকুর পরিবারের বসবাস যে জোড়াসাঁকোতে ছিলো অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে এর নাম ছিলো মেছুয়াবাজার। রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষ রামলোচন জোড়াসাঁকো ভবনে যে পেশাদার গায়ক-গায়িকারদের সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করতেন সে বিষয়ে বিবরণ পাওয়া যায়-

“রামলোচনের সময় বাঈনাচ ও কালোয়াতী গান ভিন্ন অন্য কোনো মজলিসী আমোদ ছিলো না। মহারাজা নবকৃষ্ণের কবি ও হাফ আখড়াই বেশ জমে উঠেছিলো বটে কিন্তু বেশি বিস্তৃত হয় নাই। রামবসু, হরঠাকুর প্রভৃতি তখন বাঁচিয়াছিলেন বটে কিন্তু তাঁহাদের আদর তখনও সর্বজনীন হয় নাই। রামলোচন ঠাকুরই এইসব কবি ও কালোয়াৎগণকে আহবান করিয়া নিজ বাড়িতে মজলিসী এইসব বৈঠক করতেন এবং আত্মীয় স্বজনকে নিমন্ত্রণ করিয়া শুনাইতেন। এইরূপে রামলোচন হইতেই সংগীতজ্ঞের আদর সাধারণের মধ্যে বিস্তুত হইয়া পড়ে”।

এ থেকে বোঝা যায়- রামলোচন কেবল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতেই নয়; সমগ্র কোলাকাতার বিত্তবানের মাঝে বৈঠকী সংগীতচর্চার আদি পৃষ্ঠপোষক ছিলেন।

এ থেকেই বোঝা যায় পারিবারিক আবহ রবিঠাকুরের সংগীত ভাবনায় একটি বিশেষ রেখাপাত করেছিলো। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথের (১৮১৭-১৯০৫) সংগীত ভাবনা ছিলো মূলত রাগকেন্দ্রীক। এই রাগ কেন্দ্রীকতার জন্যেই মূলত রবীন্দ্রনাথের রাগ পর্যায়ের গানগুলোতে একটি অতিমাত্রার চিন্তার দেখা আমরা পাই- যার কোনো শিরোনাম দেয়া সম্ভব নয়। এরপর তিনি আলোড়িত হন তাঁর সংগীত শিক্ষক বিষ্ণুচন্দ্রের দ্বারা। তাঁর শিক্ষাদানে তিনি গভীরভাবে আকর্ষণ বোধ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথেন গানের নানা দিক রয়েছে। তবে ব্যক্তিগতভাবে শনিবারের চিঠি খানিক একাকীত্ব বিলাসী এবং দুঃখবাদী। তাই তাঁর আধ্যাত্মিক ভাবনার একটি বিশেষ স্থান জুড়ে থাকা ‘দুঃখ’ বোধ কেন্দ্রীক গানগুলো নিয়েই আমি আলোচনা করতে চাই শুরুতে। পূজা পর্যায়ের গানে একটি উপ-বিভাগ আছে, যার নাম দুঃখ। এতে ৪৯টি গান অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। দুঃখের কথা, এর বাইরেও নানা গানে ছড়ানো থাকলেও এই উপবিভাগের গীতসংখ্যা দ্বারাও বোঝা যায় যে বিষয়টিকে রবীন্দ্রনাথ কত গভীরভাবে গ্রহণ করেছিলেন। গ্রহণ করাও স্বাভাবিক। দুঃখ চিরকালই ভাবুকদের অতি প্রিয় বিষয়, প্রিয় এজন্য যে, এর চেয়ে তীব্র আর কোন ব্যাপার জীবনের সীমার মধ্যে নেই। দুঃখ কি, দুঃখ কেন, কেমনে দুঃখের নির্বাণ; এসবই দার্শনিকদের গভীরভাবে আন্দোলিত করেছে।

রবীন্দ্রনাথ এই দুঃখবোধের গানগুলো সম্বন্ধে যে ধারণ দিয়ে গিয়েছেন তাতে স্পষ্ট হয়, দুঃখবোধ তাঁকে আলোড়িত করেছিলো নানাভাবে। তিনি বলেছিলেন,

“দুঃখবোধ এক অমোঘ বোধ। এই জন্যই পুষ্পের পক্ষে পুষ্পত্ব যত সহজ, মানুষের পক্ষে মনুষ্যত্ব তত সহজ নহে। মনুষ্যত্বের মধ্য দিয়া মানুষকে যাহা পাইতে হইবে, তাহা নিদ্রিত অবস্থায় পাইবার নহে। এই জন্যই সংসারের সমস্ত কঠিন আঘাত আমাদিগকে এই কথা বলিতেছে: উঠ, জাগো, যথার্থ গুরুত্বকে প্রাপ্ত হইয়া বোধ লাভ করো, সেই পথ শাণিত ক্ষুরধারের ন্যায় দুর্গম, কবিরা এই বলেন।”

গীতবিতানে দুঃখ উপ-বিভাগের যে ৪৯টি পূজার গান তাদের প্রতিটির বিষয়বস্তু অভিন্ন নয়, হওয়া সম্ভবও নয়, তবে একটি সাধারণ বোধ প্রায় সব গানের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত, তা হচ্ছে দুঃখের ভেতর দিয়েই প্রবাহিত, তা হচ্ছে দুঃখের অপরপারে দুঃখহীন বিরাজিত, সেখানে যাবতীয় দ্বন্ধ ও বৈপরীত্যের অবসান। দুঃখের ভেতর দিয়েই তাঁকে তীব্রভাবে পাওয়া যায়। দুঃখের ফেনিল অশান্তির পরপারেই বা তার অন্তরেই রয়েছে সুমহান শান্তি।

রবীন্দ্রনাথের ‘গোরা’ উপন্যাসটি যাঁরা পড়েছেন তাঁরা দেখবেন লালনের একটি গান দিয়ে তার সূচনা হয়েছে। বাস্তবিক ঘটনা হলো- বাউল সংগীত রবীন্দ্রনাথের মননে এক সুর ফেলেছিলো নীরবে। তবে অনেক রবীন্দ্র গবেষকই মনে করেন, রবীন্দ্রনাথের সামগ্রিক ধ্যান-ধারণায় বাউলতত্ত্বের একটি প্রভাব ছিলো। কিন্তু বিষয়টি ঠিক নয়, কেননা ‘বাউলতত্ত্ব’ একটি দর্শন চেতনার নাম আর রবীন্দ্রনাথ সেই দর্শনকে গ্রহণ করেননি, যদিও এ দর্শন প্রসূত স্বপ্নে তিনি অবগাহন করেছেন বারংবার।

মোটাদাগে বললে রবীন্দ্রনাথই পয়লা লালন গানকে প্রাজ্ঞসমাজে এনে হাজির করান। কুড়িটি গান এনে ছেপে দেন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার ‘হারামণি’তে। এ তথ্যটি আমরা পাই লালনের প্রথম জীবনীকার বসন্ত কুমার পালের কাছ থেকে।

এ প্রসঙ্গে আরও একটি মজার তথ্য আছে। কবিগুরুর ছোটোভাই জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর একদিন বোটে বসা ভ্রমণরত ফকির লালনের একটি স্কেচ করে ফেলেছিলেন। পরে নন্দলাল বসুও ভাব মিশিয়ে কল্পনায় ঝুঁটিবাঁধা লালনের মুখ এঁকেছিলেন বটে। তবে রবীন্দ্রভারতীতে রাখা সে স্কেচটিই আজ পর্যন্ত লালন ছবির প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রাহ্যতা পেয়ে আসছে।

শিলাইদহে গগন হরকরা, কাঙাল হরিনাথ, গোঁসাই রামলাল, সর্বক্ষেপী বোস্টমী ও লালনের শিষ্য সম্প্রদায়ের সাথে রবীন্দ্রনাথের দেখা সাক্ষাৎ ও ভাব বিনিময় ছিলো। শিলাইদহেই তিনি লালন গান সংগ্রহের উদ্যোগ নেন এবং আখড়া থেকে লালন শিষ্য মনিরুদ্দিনের দু’টো হাতখাতা সংগ্রহ করেন। সংগৃহীত এসব বাউল গান তিনি সুধীসমাজে যেমন প্রচার করেন এবং অন্যদিকে নিজ থেকেই লালন গানের প্রথম সংকলন প্রকাশ করেন। শুধু গান সংগ্রহ-সংকলন নয়; বাউলদের প্রতি আলাদা দরদ এবং মার্জনা পোষণ করতেন তিনি। যে কারণে গ্রাম্য বাউলরাও কোন কোন সময় মর্যাদাবান হয়ে উঠে এসেছেন তাঁর কলমে,

‘তাঁরা (বাউলরা) গরীব। পোশাক-পরিচ্ছদ নাই। দেখলে বোঝবার জো নাই তারা কত মহৎ। কিন্তু কত গভীর বিষয় কতো সহজভাবে সহজভাবে তারা বলতে পারত’।

মুহম্মদ মনসুর উদ্দিনের সম্পাদনায় রচিত ‘হারামণি’তে আশীর্বাদের বরাতে লেখা ভূমিকাতে বৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ গ্রাম্য গগন হরকরার সম্পর্কে নিজের মতো করে বলেছেন,

“আমার মনে আছে, তখন আমার নবীন বয়স, শিলাইদহ অঞ্চলেরই এক বাউল কলকাতায় একতারা বাজিয়ে গেয়েছিলো, ‘কোথায় পাবো তারে/ আমার মনের মানুষ যেরে।/ হারায়ে সেই মানুষে তার উদ্দেশ্যে/ দেশ বিদেশে বেড়াই ঘুরে’। কথা নিতান্ত সহজ কিন্তু সুরের যোগে এর অর্থ অপূর্ব জ্যোতিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিলো। এই কথাটিই উপনিষদের ভাষায় শোনা গিয়েছে, ‘তং বেদ্যং পুরুষং বেদ মাবো মৃত্যুঃ পরিব্যথা- যাঁকে জানবার সেই পুরুষকেই জানো, নইলে যে মরণ বেদনা। অপণ্ডিতের এই কথাটিই শুন্লুম, তার গেঁয়ো সুরে, সহজ ভাষায়-যাঁকে সকলের চেয়ে জানবার তাঁকেই সকলের চেয়ে না জানবার বেদনা- অন্ধকারে মাকে দেখতে পাচ্ছে না যে শিশু, তারই কান্নার সুর তার কণ্ঠে বেজে উঠেছে। ‘অনন্তর যদয়মাত্মা’ উপনিষদের এই বাণী এদের মুখে যখন ‘মনের মানুষ’ বলে শুনলুম, আমার মনে বড় বিস্ময় লেগেছিলো। ভাষার সরলতায়, ভাবের গভীরতায়, সুরের দরদে যার তুলনা মেলেনা, তাতে যেমন জ্ঞানের তত্ত্ব তেমনি কাব্যরচনা, তেমনি ভক্তির রস মিশেছে। লোকসাহিত্যে এমন অপূর্বতা আর কোথায় পাওয়া যায় ব’লে বিশ্বাস করিনে।’

শুধু ‘আমার সোনার বাংলা’ নয়, রবীন্দ্রনাথের নানাবিধ গানে বাউলদের ভাব এবং সুর সহজভাবে এসে মিশে গেছে। যেমন ‘মিলন হবে কত দিনে আমার মনের মানুষের সনে (লালন)’ গানটির মূলভাবই প্রকাশিত হয়েছে ‘আমি তারেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে আমার’ (রবীন্দ্রনাথ)।

তবে যুগ-পরিবর্তনের হাওয়ায় রবীন্দ্রসংগীত নিয়ে একটি সংকট তৈরি হয়েছে বলে মনে হয়। মূলত রোমান্টিক কবি-শিল্পী রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের, বিশেষ করে তাঁর গানের কাব্য রচিত হয়েছে গ্রামীণ প্রকৃতির পটভূমিতে। প্রকৃতিপর্বের গানে যে ঋতুবৈচিত্র্য বর্ণিত হয়, তার প্রেক্ষাপট পল্লি বাঙলা। কেবল প্রকৃতি নয়, প্রেম, পূজা, স্বদেশ, এমনকি বিচিত্র ও আনুষ্ঠানিক পর্বাঙ্গের গানেও এ বৈশিষ্ট্য লক্ষণীয়। আমরা কয়েকটি দৃষ্টান্ত এখানে তুলে ধরতে পারি

১. পূজা: আজ সকালে মেঘের ছায়া লুটিয়া পড়ে বনে/জল ভরেছে ঐ গগনের নীল নয়নের কোণে। (গানের সুরের আসনখানি)
২. প্রেম: শরত-আকাশ হেরো ম্লান হয়ে আসে/বাষ্প-আভাসে দিগন্ত ছলোছলো। (আরো কিছুখন না হয় বসিয়ো কাছে)
৩. প্রকৃতি: জামের বনে ধানের ক্ষেতে আপন তালে আপনি মেতে/নেচে নেচে হল সারা। (বাদল বাউল বাজায়)
৪. স্বদেশ: তোমার ওই শ্যামল বরণ কোমল মূর্তি মর্মে গাঁথা। (ও আমার দেশের মাটি)
৫. বিচিত্র: রৌদ্র মাখানো অলস বেলায় তরুমর্মরে ছায়ার খেলায়/ কী মুরতি তব নীল আকাশে নয়নে উঠে গো আভাসি। (আমি চঞ্চল হে)
৬. আনুষ্ঠানিক: আকাশে আকাশে বনে বনে তোমাদের মনে মনে/ বিছায়ে বিছায়ে দিব গান। (সবারে করি আহ্বান)

রবীন্দ্রনাথ অনেককাল আগে পশ্চিমের সভ্যতাকে কায়াবহুল আখ্যা দিয়েছিলেন। পশ্চিম দেশের ‘কায়াবহুল অসঙ্গত জীবনযাত্রা’ দেখে ক্ষুব্ধ কবির মনে হয়েছে পশ্চিমের সমকালীন সাহিত্য ‘

বিশ্বাসহীনতার কঠিন জমিতে উৎপন্ন বলে এতে বিকার ও হলাহলই বেশি। তাদের জীবনে বাস্তব ও বস্তুরই গুরুত্ব বেশি, যখন আমাদের ছিলো অন্তরের ও অলৌকিকের প্রতি টান। ওদের গান বহির্মুখী, আমাদের অন্তর্মুখী।

তবে পাশ্চাত্য ধারাও রবীন্দ্রনাথের গানকে আলোড়িত করেছিলো। তবে এর অতীতটাও মনে রেখেছিলেন তিনি। ওয়ারেন হেস্টিংস (১৭৭২-১৭৪৫) এর আমল থেকে কোলকাতায় পশ্চিমা সংস্কৃতি প্রবলভাবে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। ১৭৭৫ সালে পশ্চিমা থিয়েটার মঞ্চায়ন শুরু হয়। বিলেত থেকে অনেক সময় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা কলকাতায় আসতেন। মফস্বলে য়ুরোপিয়ান ক্লাবগুলোতেও শখের নাটক অভিনীত হতো। আগেই বলেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর ও পিতা দেবেন্দ্ররাথ ঠাকুর শিক্ষকের কাছে য়ুরোপীয় সঙ্গীতের তালিম নেন। রবীন্দ্রনাথের দাদা জ্যোতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের সংগীত রচনায় য়ুরোপীয় সংগীতের প্রভাব ছিলো।

রবীন্দ্রনাথের বাল্যকাল প্রসঙ্গে যে কথাটি বলা হয়নি, তা হলো- বাল্যকালেই সোপ্যাঁ-র সংগীতের সঙ্গে পরিচয় ঘটে রবীন্দ্রনাথের। পিয়ানোর সংগীত আকর্ষণীয় মনে হলেও তিনি তার ভেতরে প্রবেশ করেনি। ইংল্যান্ডে তাঁর প্রথম ও দ্বিতীয় যাত্রায় তিনি যেসব গানের সাথে পরিচিত হন তার প্রভাব পড়ে তাঁর গীতিনাট্যের মধ্যে।

২০ সেপ্টেম্বর, ১৮৭৮ সালে রবীন্দ্রনাথ প্রথম ইংল্যান্ডের পথে যাত্রা করেন এবং সেখানে প্রায় সতেরো মাস অবস্থান করেন। ১০ আগস্ট ১৮৯৪ ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী এক পত্রে রবীন্দ্রনাথকে বলেন,

‘আমার মনে হয়, দিনের জগৎটা য়ুরোপীয় সঙ্গীতের, সুরে-বেসুরে খণ্ড অংশে মিলে একটা গতিশীল প্রকা- হার্মনির জটলা- আর রাত্রের জগৎটা আমাদের ভারতবর্ষীয় সংগীত, একটি বিশুদ্ধ করুণ গম্ভীর অমিশ্র রাগিণী। দুটোই আমাদের বিচলিত করে, অথচ দুটোই পরস্পর বিরোধী। .. .. আমাদের নির্জন এককের গান, য়ুরোপের সজন লোকালয়ের গান। আমাদের গানে শ্রোতাকে মনুষ্যের প্রতিদিনের সুখদুঃখের সীমা থেকে বের করে নিয়ে নিখিলের মূলে যে-একটি সঙ্গীহীন বৈরাগ্যের দেশ আছে সেইখানে নিয়ে যায়, আর য়ুরোপের সঙ্গীত মনুষ্যের সুখদুঃখের অনন্ত উত্থান-পতনের মধ্যে বিচিত্রভাবে নৃত্য করিয়া নিয়ে চলে।’

১৮৯০ সালে রবীন্দ্রনাথ মাসখানেকের জন্যে আবার বিলেত যান। সমুদ্রপথে তাঁর টেনর কণ্ঠস্বরের কারুকার্যে অনেকেই মুগ্ধ হন। রবীন্দ্রনাথের ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরা দেবী আমাদের বলেছেন, ১৮৮১ থেকে ১৮৯০ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথ একাধিক ইংরেজী গান সোৎসাহে গাইতেন।

আনেকটি চিঠি থেকে এ সম্বন্ধে ধারণা পাওয়া যাবে। ধূর্জটিপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখিত এই পত্রে বেটোফেনের সোনাটা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেন,

‘আর্টে আয়তনটা গৌণ; রূপটা বড়ো আয়তনেরও হতে পারে, এবং অরূপ বা বিরূপ ছোটোর মধ্যেও থাকে, বড়োর মধ্যেও। বেটোফেনের সোনাটা যথেষ্ট বহরওয়ালা জিনিস। কিন্তু বহরের কথাটাই যার সর্বোপরি মনে পড়ে, জীবে দয়ার খাতিরেই সভা থেকে তাকে যত্ন সহকারে দূরে সরিয়ে রাখাই শ্রেয়’।

সংগীতশিল্পী দীলিপ কুমার রায়ের সঙ্গে এক আলাপ-আলোচনায় রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজের গানে গায়কের স্বাধীনতা সম্পর্কে বলেন,

‘ইংরেজী ইম্প্রভাইজেশন কথাটির তুমি বাঙলা করেছো সুরবিহার-(বেশ তর্জমা হয়েছে) এও আমি ভালোবাসি। এতে যে গুণী ছাড়া পায় তাও মানি। আমার অনেক গান আছে যাতে গুণী এরকম ছাড়া পেতে পারেন অনেকখানি। আমার আপত্তি এখানে মূলনীতি নিয়ে নয়, তার প্রয়োগ নিয়ে। কতোখানি ছাড় দেবো? আর কাকে? বড়ো প্রতিভা যে বেশি স্বাধীনতা দাবি করতে পারে এ কথা কে অস্বীকার করবে? কিন্তু এক্ষেত্রে ছোটো বড়োর তফাৎ তো আছেই যে কথা সেদিন বলেছিলাম।’

তবে ইউরোপীয় সঙ্গীতে তিনি বেশিদিন ভালোলাগা ধরে রাখেননি। এরও প্রমাণ মেলে ১৪ ফেব্রুয়ারি, ১৯৩৯ সালে অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা এক চিঠিতে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-

“আজকাল য়ুরোপে হয়তো সুরের ঘাড়ে বেসুর চড়ে বসে ভূতের নৃত্য বাঁধিয়ে দিয়েছে। আমাদের আসরে এখনো এটা পৌঁছায়নি- কেননা আমাদের পাঠশালায় য়ুরোপীয় গানের চর্চা নেই। নইলে এতোদিনে বেতালের দল কানে তালা লাগিয়ে দিতে কসুর করতো না।”

নৃত্যকলার রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৯ সালের ৫ নভেম্বর বুধবার সিলেট ভ্রমণে আসেন। সৈয়দ মুর্তাজা আলীর ভাষায়

‘কবিকে রাজোচিত সংবর্ধনা দেওয়া হয়’।

সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে কবির আসনের সামনে টেবিলে মোড়ানো ছিল মণিপুরী মেয়েদের তৈরি টেবিল ক্লথ। বয়ন নৈপুণ্যের জন্য টেবিল ক্লথখানা কবির খুব ভালো লাগে। তখনই তিনি মণিপুরীদের তাঁত ও জীবনযাত্রা দেখতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কথা প্রসঙ্গে এ নৃত্য সম্পর্কে তিনি বলেন—‘

graceful best form of physical exercise’

সিলেট ভ্রমণ শেষে কবি ত্রিপুরার মহারাজা বীরেন্দ মাণিক্য বাহাদুরের আমন্ত্রণে আগরতলায় ক’দিনের জন্য আতিথ্য গ্রহণ করেন। আগরতলার শিলচরে কবি আবারও মণিপুরী নাচ দেখেন। তিনি মহারাজাকে অনুরোধ করেন, শান্তি নিকেতনের ছাত্রদের মণিপুরী নাচ শেখাতে একজন শিক্ষক দেওয়ার জন্য। ১৯২০ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ত্রিপুরার মহারাজা, মণিপুরী নৃত্যগুরু বুদ্ধমন্ত্র সিংহকে শান্তিনিকেতনে পাঠিয়েছিলেন। ওই বছর শান্তিনিকেতন বিদ্যালয়ে ও বিশ্বভারতীতে প্রথমবারের মতো নৃত্যকে শিক্ষণীয় বিষয় হিসেবে গ্রহণ করা হয়।

শান্তিনিকেতনের শিল্পচর্চা বিশেষত নৃত্যকলা চর্চা সম্পর্কে কবির স্নেহধন্য শান্তিদেব ঘোষ বলেন

‘১৯১৯ সালে ‘শারদ্যোত্সব’ নাটকের পূর্বে, ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যলন্ত পরপর ‘অচলায়তন’, ‘ফাল্গুনী’ ও ‘ডাকঘর’ নাটক কয়টির কতকগুলো গানের সঙ্গে যে ধরনের নাচ হতো, তা শেখানো-পড়ানো কোনো প্রকার ধ্রুপদী নাচ নয়। প্রত্যেকেই গানের ছন্দের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নিজেরা স্বাধীনভাবে পদচালনা করতেন, মনের আনন্দে। যাদের কোনো ছন্দবোধ ছিল না সেইরূপ বে-তালারা এই দলে স্থান পেত না। ‘অচলায়তন’ নাটকের শোনপাংশুরা যখন যে যার নিজের মতো নেচে যেতেন, তখন পিয়ারসন তাঁর দেশজ নাচের ঢঙে ওই দলের সঙ্গে নাচে যোগ দিয়েছিলেন। ১৯১৪ সালে প্রথম যখন ‘ফাল্গুনী’ নাটকের অভিনয় হয় তখন যুবক দলকে কয়েকটি উল্লাসের গানের সঙ্গে নাচতে হয়েছিলো। কিন্তু এই নাটকের ‘অন্ধ বাউল’-এর চরিত্রে গান গেয়ে গুরুদেবকে যে ক’টি গানে নাচতে হয়েছিলো, তা ছিলো ওই নাটকের উল্লেখযোগ্য ঘটনা।’ রবীন্দ্রনাথের পৃষ্ঠপোষকতায় বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে নৃত্যকলা পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯২৬ সালে।

শান্তিদেব ঘোষের সাক্ষ্যে জানা যায়, তিনি ‘নৃত্যকে শিক্ষণীয় বিদ্যা হিসেবে বিদ্যালয়ে এবং বিশ্বভারতীতে স্থানদানের ইচ্ছায় মণিপুরী নাচ শেখানোর ব্যবস্থা প্রথম গ্রহণ করেন ১৯২০ সালে বুদ্ধমন্ত্র সিংহকে এবং ১৯২৫ সালে নবকুমার সিংহকে আগরতলা থেকে আনিয়ে।’ রবীন্দ্রনাথ বাঙালির নৃত্যকলা উন্নয়নে ভারত ও বহির্ভারত থেকে নৃত্যগুরুদের নিয়ে আসেন শান্তিনিকেতনে। তিনি রচনা করেন নৃত্যনাট্য ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘মায়ার খেলা’, ‘চণ্ডালিকা’, ‘শ্যামা’, ‘নটীর পূজা’ নৃত্যনাট্য। এসব নৃত্যনাট্য উপস্থাপনায় ভারতবর্ষের বিভিন্ন ধ্রুপদী নৃত্য, গুজরাটের গরবা, শ্রীলঙ্কার ক্যান্ডি, যবদ্বীপের নৃত্য, জাভাবালির নাচ প্রভৃতির সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন। অন্যদিকে বাঙলাদেশের মণিপুরী নৃত্যের ধ্রুপদী আঙ্গিক প্রতিষ্ঠার প্রয়াস নেন। ১৯২৫ সালে ইতালি থেকে অধ্যাপক জোসেফ তুচ্চি এবং কার্লো ফার্মিকি অনেক বইপত্রসহ শান্তিনিকেতনে আসেন। ওই বছর শ্রাবণ মাসে ‘বর্ষামঙ্গল’ অনুষ্ঠানে কবির কিছু গানের সঙ্গে একক ও দলবদ্ধ নাচ প্রদর্শিত হয়। অরূপরতনের পর ‘শেষবর্ষণ’ শান্তিনিকেতনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অনুষ্ঠান, যার মধ্য দিয়ে নৃত্যভিত্তিক মূকাভিনয় প্রবর্তিত হয়। ১৯২৬ সালে মাদ্রাজ থেকে বাসুদেবন পড়তে আসেন শান্তিনিকেতনে। তিনি এবং দক্ষিণ ভারতের ই.কৃষ্ণ আয়ার ছেলেমেয়েদের ভরতনাট্যম নৃত্য প্রশিক্ষণ দেন। আর এ নৃত্যের পূর্ণ প্রয়োগ হয় ১৯৩৮ সালে ‘শ্যামা’ নৃত্যনাট্যে। ১৯২৭ সালে ‘নটীর পূজা’ অভিনয় হয় কোলকাতায় জানুয়ারি মাসে। পরের ফেব্রুয়ারি মাসে বসন্তোৎসব উপলক্ষে ‘নটরাজ’ নামে আবৃত্তি ও নৃত্যগীতপূর্ণ নাটিকার অভিনয় হয়। ডিসেম্বর মাসে নটরাজ-এর অদলবদল করে ফেব্রুয়ারি মাসে কলকাতায় যখন নৃত্যগীতি ও আবৃত্তিসহযোগে সেটি অভিনীত হয়, তখন তা পরিবর্তিত হয়ে নতুন নাম হয় ‘ঋতুরাজ’। এই নাটিকায় নেচেছিল ছাত্রীরা নবকুমার সিংহের কাছে শেখা মণিপুরী আঙ্গিকে। ‘ফাল্গুনী’ নাটক এবং বর্ষামঙ্গলের গীতিনৃত্য ছিল মনোমুগ্ধকর। ১৯২৯ সালে কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়িতে ১১ মাঘ উৎসব উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ ও দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ একদল গানের শিক্ষার্থী সেখানে পৌঁছেন। সেখানে ‘নটরাজ’ ও ‘ঋতুরঙ্গ’-এ ছাত্রীরা নেচেছিলো মণিপুরী ও গরবা নাচের ঢঙে। ওই সময় জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে মাঘ উৎসবের নৃত্য প্রদর্শনী দর্শকরা টিকিট কিনে দেখেছিলো। এসব নৃত্য বিন্যাসের ক্ষেত্রে নৃত্যগুরু বুদ্ধমত্ত সিংহ ও নবকুমার সিংহের অবদান স্মরণীয়। রবীন্দ্রনাথের আমন্ত্রণে ১৯৩০ সালে শান্তিনিকেতনে আসেন নৃত্যাচার্য উদয়শঙ্কর। তাঁর পরিবেশনা এবং নৃত্যবিন্যাস কবিকে অনুপ্রাণিত করেছিলো। সে প্রভাব দেখা যায় কবির ৭০তম জন্মজয়ন্তীতে ‘নটীর পূজা’ প্রযোজনায়। সেখানে প্রতিমা দেবীর নেতৃত্বে ভারতবর্ষের নৃত্য আদর্শের সম্মিলন ঘটিয়েছিলেন হাঙ্গেরির লোকনৃত্য এবং ইউরোপের মডার্ন ড্যান্সের। রবীন্দ্রনাথ নৃত্যের সঙ্গে অভিনয়কেও গুরুত্ব দিয়েছেন। দৈহিক সঞ্চালনের সঙ্গে মূকাভিনয়, আবৃত্তির সঙ্গে নৃত্যাভিনয় ও যোজন-বিয়োজন তার কাছে মূল্যবান ছিলো। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় ‘শাপমোচন’ যুগ। ইতোমধ্যে ১৯৩৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ‘তাসের দেশ’, ‘চণ্ডলিকা’ রচনা করেন গীতিনাট্যের আদলে। ওই বছর ‘বিদায়-অভিশাপ’ নাট্যকাব্য আবৃত্তি ও নৃত্য প্রয়োগে পরিবেশিত হয়। তাঁর ‘চিত্রাঙ্গদা’, ‘শ্যামা’ পরবর্তীকালে ‘চ-ালিকা’ নৃত্যাভিনয়ে পশ্চিমা ব্যালের আদর্শ অনুসৃত হয়েছিলো। নৃত্যনাট্যগুলো ভারতীয় পুরাণ ও বিভিন্ন ধ্রুপদী নৃত্যের [ভরতনাট্যম, কথাকলি, মণিপুরী, কত্থক] ব্যাকরণ ব্যবহার থেকে বিচ্যুত থাকেনি। ১৯৩৪ সালে শান্তিনিকেতনে এসেছিলেন কল্যাণী আম্মা। তিনি আশ্রমে ছিলেন মাত্র তিন মাস। তাঁদের কেউই নিয়মিত শিক্ষাদান করার জন্য না থাকায় শান্তিনিকেতনে স্বাভাবিকভাবে ধ্রুপদী নৃত্য শিক্ষায় বারবার ছেদ পড়ে। ১৯৩৫ সাল থেকে প্রকৃতপক্ষে শান্তিনিকেতনে নিয়মিতভাবে নৃত্যশিক্ষা এগুতে থাকে। ১৯৩৬ সালে বিশ্বভারতীতে সংগীত ও নৃত্যের একটি পাঠক্রম প্রস্তুত হয়। বলা যেতে পারে ১৯৩৬ সালের আগ পর্যবন্ত কলকাতায় সেই অর্থে ধ্রুপদী নৃত্যের চর্চা হতো না। কবির উদ্যোগে ধ্রুপদী নৃত্যচর্চার দুয়ার খুলে যায়।

রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা

রবীন্দ্রনাথ সাতষট্টি বছর বয়স থেকে চিত্র রচনা শুরু করেন। ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ এই ১২ বছর গভীর নিষ্ঠার সঙ্গে শিল্পচর্চা করে গেছেন এবং এরপর থেকে আজীবন চিত্রকর্মে নিয়োজিত ছিলেন। তিনি প্রায় আড়াই হাজার ছবি এঁকেছিলেন এবং এর ভেতরে প্রায় দেড় হাজার ছবি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের রবীন্দ্রভবনে সযতনে রক্ষিত আছে। ১৯২৮ সালে আর্ট স্কুলের অধ্যক্ষ মুকুল দের সঙ্গে ছাত্রদের তীব্র দ্বন্ধ শুরু হয়েছিল, তখন মুকুল দে’কে মানসিকভাবে সাহায্য করার জন্য অধ্যক্ষের বাসায় প্রায় দেড় মাস অবস্থান করেছিলেন তিনি। এই সময় প্রতিদিন নিয়মিতভাবে বিভিন্ন আঙ্গিকে গভীর অভিনিবেশ সহকারে চিত্রশিল্প সৃষ্টি করে গেছেন। ১৯৩০ সাল থেকে আর্জেন্টিনার ভিক্টোরীয় ওকাম্পোর সহায়তায় সর্বপ্রথম প্যারিস তারপর পর্যায়ক্রমে বার্লিন, মস্কো এবং নিউইয়র্কে তাঁর একক চিত্র প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা হয়। পরে ১৯৩২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি আর্টস্কুলে তাঁর একটি চিত্রপ্রদর্শনীর ব্যবস্থা হয়েছিলো।

রবীন্দ্রনাথের মতে স্বশিক্ষিত, প্রকৃতিজাত, প্রাকৃতিক স্বয়ংক্রিয়ভাবে সৃষ্ট শিল্পক্ষমতাপ্রাপ্ত শিল্পীর ‘নাঈভ’ শিল্পী হিসাবে পরিচিত। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে কালে কালে এমন ধরনের প্রাকৃতিক ক্ষমতা নিয়ে বিশেষ শিল্পবৈশিষ্ট্য বিশিষ্ট প্রতিভার শিল্পীদের দেখতে পাওয়া যায়, যাদের কাজ প্রচলিত বহমান শিল্পধারার বাইরে অন্য একটি নিজস্ব ধারাতে প্রবাহিত এবং উজ্জ্বল এক ব্যতিক্রমী শিল্প বৈশিষ্ট্যের পরিচয়ে পরিচিতি পায়। এই ব্যক্তিগত বহমান শিল্পধারায় স্বয়ম্ভু, স্বগত এবং স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিল্পী এখানে সৃষ্টির নেশায় বুঁদ হয়ে তার মনে যা আসে তা প্রকাশের জন্য নিজস্ব রচিত পদ্ধতিতে একের পর এক ছবি সৃষ্টি করে যান সম্মোহনী শক্তি দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে এক ঘোরের মধ্যে।

আগেই বলেছি সাহিত্য রচনাতে তাঁর দর্শন ছিলো উপনিষদের দর্শন। মানবপ্রেম, উদারনৈতিক মননচর্চা, ঈশ্বর প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, শান্তি ও কল্যাণজাত এক শুভ্র পবিত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষার চিরায়ত বিশ্ববোধ। সুন্দর ও মনোরম ছবির পাশাপাশি আপাত অসুন্দর ও বিসদৃশ ছবি যার মধ্যে মানুষের মনোজগতের বোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ বা মাত্রা বিরাজমান সে টিকে রবীন্দ্রনাথ সেই সময়ে প্রথমবারের মতো আবিষ্কার করেছিলেন যা আধুনিক চিত্রকলার অন্যতম উপাদান। তাই তাঁর ছবির গভীরতা অতলস্পর্শী ও বহুতল বিশিষ্ট। বহুদেশ ভ্রমণকারী বহু চিত্রশালা প্রদক্ষিণকারী দেশ-বিদেশের বহু ছবির দর্শক রবীন্দ্রনাথ এর পরেও দেশি-বিদেশি কোনও শিল্পী দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে এমনকি বাড়ির মধ্যের অগ্রজ যতিরীন্দ্রনাথ এবং ভ্রাতুষ্পুত্র গগনেন্দ্রনাথ, অবনীন্দ্রনাথকে পাশ কাটিয়ে এক নিজস্ব রীতির মৌলিক শৈলী ও আঙ্গিকে চিত্র সৃষ্টি করে গেছেন। শিশুসুলভ দুর্বল অঙ্কন পদ্ধতি ও অপরিণত চিত্রশৈলীর মধ্যে পরিণত বয়সের পরিণত শিল্পরূপ তিনি অনায়াসলব্ধ সাবলীলভঙ্গিতে রূপারোপ করতে সক্ষম হয়েছেন। ছবিগুলোর সৃষ্টি এক প্রবাহিত জলস্রোতের মতো তাই তাঁর ছবির কোন শিরোনাম নেই, যেন একটিই ছবির দীর্ঘ মিছিল। খণ্ড খণ্ড রূপে প্রতিভাত। শিল্পজ্ঞানহীন শিশুরা যেমন শিশুচিত্র রচনা করে এক প্রকৃতিজাত সাবলীলতার রবীন্দ্রনাথের ছবির সঙ্গে। সেইসব ছবির একটি মিল খুঁজে পাওয়া যায় যেখানে সৃষ্টিসুখের ভিতর টানই মুখ্য। তিনি ছবির রচনা আঙ্গিক শৈলী ও বিষয়ে যেমন বানান পরীক্ষা নিরীক্ষার পরিচয় দিয়েছেন তেমনি সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিষয় ছাড়া অন্য কিছুতে পরিলক্ষিত হয় না। তাঁর ছবিতে বাইরের আকৃতিতে সৌন্দর্য্য অনুপস্থিত, বদলে আছে রহস্যময়তাপূর্ণ প্রতীক এবং ইঙ্গিত। কবিতার পান্ডুলিপির অপ্রয়োজনীয় ও বাতিল করা লাইনের অক্ষরগুলিকে আঁকা আঁকি কাটাকুটি করে বন্দী করতে গিয়ে নিজেই সেই শিল্পের ঊর্ণনাভজালে আটকিয়ে গিয়েছিলেন এবং তা থেকে তিনি মুক্তি চাননি বরং সেই বন্দিত্বকে তিনি উপভোগ করেছিলেন যা তাঁকে পেয়ে বসেছিল এবং চিত্রশিল্পে এইভাবে উড়ে এসে জুড়ে বসেছিলেন। এই প্রেক্ষিতে ১৯৪১ সালে উদয়ন থেকে বিশু মুখোপাধ্যায়কে তাঁর ছবি সম্বন্ধে এক চিঠিতে লিখেছিলেন যে প্রচলিত শিল্পজগতে তিনি এক স্বৈরাচারী শিল্পী।

শিল্প ও শিল্পী শীর্ষক তিন খণ্ডের গ্রন্থের গ্রন্থকার এককালের সন্দ্বীপবাসী শিল্পী শিক্ষক কৃষ্ণলাল দাস রবীন্দ্রনাথের চিত্রকলা সম্বন্ধে বলেছেন,

‘রবীন্দ্রনাথের চিত্রগুলিকে সনাতনী দৃষ্টিকোণ দিয়ে দেখতে গেলে বিরাট দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হবে। কারণ সর্বদেশের চিত্রশিল্পী নিজ নিজ দেশের সনাতনী ব্যাকরণসম্মত পথে দীর্ঘদিন ধরে যেভাবে চিত্রদর্শনে তাদের দেশবাসীকে অভ্যস্থ করেছেন জনসাধারণও সেভাবে চিত্রদর্শনে অভ্যস্থ হয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের চিত্র এর সম্পূর্ণ ব্যতিক্রমরূপে আত্মপ্রকাশ করায়, লৌকিক দৃষ্টিতে অভিনব বলে মনে হওয়া কিছুমাত্র আশ্চর্য্য নয়। সনাতনী ভাষ্যে রবীন্দ্রনাথের চিত্রকে চিত্র বলা যায় না বা নক্সাও বলা যায় না এগুলি নক্সা বা চিত্রকে আড়াল করে একটা নতুন বিস্ময়কর সৃষ্টি। স্থুল রূপ পাওয়া যাবে না-যে রূপে মনের বিভিন্ন দিক চঞ্চল ও আকৃষ্ট করে ভোগের ইচ্ছা জাগিয়ে শিল্পীকে বিভ্রান্ত করতে পারে। সনাতনী মনে যে রেখা চিত্রকে সরস ও ইন্দ্রিয়সুখকর করে তোলে সেই ভাবের রেখাবিন্যাস রবীন্দ্রনাথের চিত্রে করা হয়নি। কারণ যে বয়সে কবি শিল্পচর্চা আরম্ভ করেছিলেন সেই বয়সে দীর্ঘ সময় নিয়ে সনাতনী পদ্ধতিতে চিত্রবিদ্যা অনুশীলন করার সময় তার গত হয়ে গিয়েছিল। গিরিপ্রাচীরে বদ্ধজলস্রোতে যেমন মুক্তির আনন্দে নিজ শক্তিতে পথ রচনা করে দুর্বার গতিতে ছুটে চলে, রবীন্দ্রনাথের শিল্পসৃষ্টিও তেমনি গতানুগতিক খাতে প্রবাহিত হওয়ার জন্য অপরের সাহায্যের প্রতীক্ষায় না থেকে বিরাট আবেগে নতুন পথ রচনা করে মহানন্দে ছুটে চলেছিল। তাতে শিল্পজগতের প্রচলিত প্রথার সমস্ত বাধা শিল্পীর বিপুল সৃজনীশক্তির চাপে ভেঙ্গে চুড়মার হয়ে গিয়েছিলো’।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন-

আপন হতে বাহির হয়ে বাইরে দাঁড়া
বুকের মাঝে বিশ্বলোকের পাবি সাড়া।

এইখানে একটু ঘুরিয়ে বলা যায় বুকের মাঝে বিশ্বলোকের সঙ্গে চিত্রলোকেরও বিপুল সাড়া তিনি পেয়েছিলেন সে সবের উজ্জ্বল নিদর্শন তার ব্যতিক্রমধর্মী চিত্ররচনাসমূহ।

রবীন্দ্রসৃষ্টি- মানবতার সাথে আরও কিছুর মণিকাঞ্চণ

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন,

“যতোক্ষণ লোভ আছে ততোক্ষণ জগতে শান্তি আনে পীস-কনফারেন্সের এমন সাধ্য নেই”

বস্তুত এ বক্তব্যের আড়ালেই রবীন্দ্রনাথ ফুটে উঠেন তাঁর সকল মানবতাবাদী রচনার এক অবিনাশী মূর্তি হয়ে। তাই রবীন্দ্রনাথ ১৯১৯-এ রঁলা প্রমুখের আন্তর্জাতিক দলিল তথা ‘চিন্তার স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে’র সঙ্গে একাত্ম হলেন। সেখানে একটা বড়ো কথা ছিলো আমরা মানবজাতির কল্যাণ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নেবো না। তার জন্যে আমরা সংগ্রাম করবো, সংগ্রাম করবো ঐক্যবদ্ধভাবে। ‘আমরা বিশ্বজনীন জনসমষ্টির অংশ, যে জনসমষ্টি অত্যাচারিত হয়, সংগ্রাম করে, পরাভূত হয়; কিন্তু আবার মাথা তুলে দাঁড়ায়।

বিষ্ময়কর যে- এই মানবমুক্তির জন্য সংগ্রামী গোষ্ঠীর সংস্থা ‘ক্লার্ত’-এর নেতৃত্বে ছিলেন মাকর্সবাদী বুদ্ধিজীবী আঁরি বারবুস। ক্লার্ত ঘোষণাপত্রটি ছিলো শ্রেণিসংগ্রামের আলোকে মানবমুক্তির লক্ষ্যে রচিত। এর পনেরো দফায় শ্রেণীসংগ্রামের কথাও ছিলো, ছিলো জনগণের অভ্যুত্থানের কথা। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিদ্বির্ধায় ঐ ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন, যেমন করেছিলেন রলাঁ, আনতোল ফ্রাঁসসহ বার্নাড শ, এইচ জি ওয়েলস প্রমুখ।

এ ঘটনার অনেক পরে স্পেনের গৃহযুদ্ধে ফ্যাসিস্ট শক্তির বর্বরতার বিরুদ্ধে রবীন্দ্রনাথের আবেদন কেবল মানবিকই ছিলো না, সেখানে ছিলো সংগ্রামের আহবান, প্রতিরোধের ডাক। তাই ঐ আবেদনে বলতে পেরেছেন: মাদ্রিদে এখন আগুন জ্বলছে। নারী ও শিশুদের হত্যা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাসীবাদের এই উপপ্লাবী তরঙ্গ প্রতিরোধ করতেই হবে। স্পেনীয় জনগণের এই চরম দুঃখ-দুর্দশার দিনে আমি বিশ্বমানবের বিবেকের নিকট আবেদন জানাই। স্পেনের গণফ্রন্টকে সাহায্য করুন, জনগণের সরকারকে সাহায্য করুন। রলাঁ একটা কথা বলেছিলেন, ‘নীরবতার অর্থই পাপ’। রবীন্দ্রনাথ এ বক্তব্যটি একেবারে হৃদয়ে ধারণ করে তার উত্তাপ অনুভব করেছিলেন।

তাছাড়া রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ‘জাতি’র পরিচয় দিতে গিয়ে ফরাসি দার্শনিক রেনাঁর ওপর ভরসা করেছেন; আর ‘জাতি’ অর্থ জ্ঞাপন করার জন্য যথাযথ মনে করেছেন ‘নেশন’ শব্দটিকেই। ব্রিটিশ-উপনিবেশিত ভারতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ ‘নেশন’ বলতে আদতে কী বুঝিয়েছিলেন? বর্তমান বাঙলাদেশের ‘বাঙালি’র জন্য এই শব্দটি কি ভিন্ন সংজ্ঞা ও তাৎপর্যে হাজির হবে? আবার কালে কালে জাতির পরিচয় পাল্টে যায় কি-না, কিংবা কিসের ঐক্যসূত্রে গ্রথিত থাকে একটি জাতি, অথবা এর সঙ্গে ধর্ম-ভাষা ও ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্রের সম্পর্ক কতটুকু রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য থেকেই বাঙালির আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা যেতে পারে।

‘নেশন কী’, ১৯১৫ সালে লেখা এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি’ অর্থে নেশন শব্দটি ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। গবেষক গোলাম মুরশিদ তাঁর এক লেখায় বলেছিলেন- রবীন্দ্রনাথের এই নেশন শব্দটি গ্রহণের কারণ হলো তখন নেশনের বাঙলা অর্থ হিসেবে ‘জাতি’ প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

কিন্তু এটি ভুল ধারণা। ‘জাতি’ শব্দের ক্ষেত্রে তার আপত্তির কারণ হলো : চলিত ভাষায় সাধারণত জাতি বলতে ‘বর্ণ’ বোঝায়। রবীন্দ্রনাথ ‘জাতি’ শব্দটি ইংরেজি ‘রেস’ শব্দের প্রতিশব্দরূপেই ব্যবহার করতে চান। আর নেশনকে ‘নেশন’ই বলতে চান। তার মতে, ‘নেশন’ ও ‘ন্যাশনাল’ শব্দ দুটিকে বাংলা হিসেবে গ্রহণ করলে অর্থদ্বৈধ ও ভাবদ্বৈধের হাত থেকে বাঁচা যায়। রবীন্দ্রনাথ যে-সময়ে ‘নেশন কী’ এ প্রবন্ধ লিখছেন, তখন বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি হাজির। কিন্তু সমকালীন রাজনীতি কিংবা পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে গ্রহণ করে ‘নেশন’ শব্দের সংজ্ঞার্থ তিনি নির্মাণ করেননি। সোস্যুরীয় [১৯১৬] বর্ণনায় দ্যোতক হিসেবে ‘নেশন’ শব্দটি যে ধারণাকে দ্যোতিত করে, আজকের বাঙলাদেশে সেই শব্দটিকে ‘জাতি’ শব্দ দিয়ে প্রতিস্থাপিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। শব্দের প্রতিস্থাপন কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমতা-বিধানের কাজ করতে পারে বটে, কিন্তু বাঙলা ভাষায় রবীন্দ্রনাথের প্রস্তাব সত্ত্বেও ‘নেশন’ শব্দের বদলে কেন ‘জাতি’ শব্দটিই মূলত উচ্চারিত হয়ে আসছে এ প্রশ্ন উঠতে পারে। ‘নেশন’ শব্দটা ইংরেজি; একে অবিকৃতভাবে গ্রহণ করতে রবীন্দ্রনাথের কিছুমাত্র সংকোচ নেই। ভাবটা আমরা ইংরেজের কাছ থেকে পেয়েছি, অতএব ভাষাটাও ইংরেজি রেখে ঋণ স্বীকার করতে তিনি প্রস্তুত।

রেনাঁকে উদ্ধৃত করে রবীন্দ্রনাথ বলেন, প্রাচীনকালে ‘নেশন’ ছিলো না। ইজিপ্ট, চীন, প্রাচীন কালডিয়া ‘নেশন’ জানত না। আসিরীয়, পারসিক ও আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্যকে কোনো নেশনের সাম্রাজ্য বলা যায় না। রোম-সাম্রাজ্য নেশনের কাছাকাছি গিয়েছিল। কিন্তু সম্পূর্ণ নেশন বাঁধতে-না-বাঁধতে বর্বর জাতির অভিঘাতে তা ভেঙে টুকরা হয়ে যায়। এসব টুকরা বহু শতাব্দী ধরে নানা প্রকার সংঘাতে ক্রমে দানা বেঁধে নেশন হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং ফ্রান্স, ইংল্যান্ড, জার্মানি ও রাশিয়া সব নেশনের শীর্ষস্থানে মাথা তুলেছে। কোনগুলো নেশন নয়, কোনগুলো নেশন এই উদাহরণ টানার পর রবীন্দ্রনাথ প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু এরা নেশন কেন? সুইজারল্যান্ড তার বিবিধ জাতি ও ভাষাকে নিয়ে কেন নেশন হলো? অস্ট্রিয়া কেন কেবল রাজ্য হলো, নেশন হলো না? এসব প্রশ্নের মাধ্যমে রবীন্দ্রনাথ এবার নেশন হওয়ার শর্তগুলো চিহ্নিত করতে চান।

কোনো কোনো রাষ্ট্রতত্ত্ববিদ বলেন, নেশনের মূল হলো রাজা। কোনো বিজয়ী বীর প্রাচীনকালে লড়াই করে দেশ জয় করেন এবং দেশের লোক কালক্রমে তা ভুলে যায়। সেই রাজবংশ কেন্দ্ররূপী হয়ে নেশন গড়ে তোলে। ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, আয়ারল্যান্ড আগে এক ছিল না, তাদের এক হওয়ার কারণও ছিল না, রাজার প্রতাপে ক্রমে তারা এক হয়ে এসেছে। নেশন থেকে ইতালির এত বিলম্বের কারণ তার অনেক ছোট ছোট রাজার মধ্যে কেউ একজন মধ্যবর্তী হয়ে সমস্ত দেশে ঐক্য বিস্তার করতে পারেননি। বাঙালি জাতির জন্য উপরের ‘রাজা’তত্ত্ব খাটবে না। এ কথা ঠিক, এই অঞ্চলে একাধিক রাজবংশ কেন্দ্ররূপী হয়ে বছরের পর বছর শাসন করেছে, কিন্তু তাদের কেউই জাতিসত্তা নির্মাণকারী হয়ে ওঠেনি যদিও তাদের অনেকেই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন। সুতরাং জাতি হিসেবে বাঙালির অভ্যুদয় নিশ্চয় আরও আগে। ‘বঙ্গ’ জনপদের মানুষ এই জাতির আদি জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে। রবীন্দ্রনাথ নিজেও অবশ্য ইংল্যান্ড-স্কটল্যান্ড-আয়ারল্যান্ডের তত্ত্বকে সর্বক্ষেত্রে প্রযুক্ত বলে মনে করেননি। সুইজারল্যান্ড ও আমেরিকার ইউনাইটেড স্টেটসের দৃষ্টান্ত টেনে বলছেন, এরা ক্রমে ক্রমে সংযোগ সাধন করতে করতে বড় হয়েছে তারা সাহায্য পায়নি রাজবংশের। রাজশক্তি নেই, নেশন আছে; রাজশক্তি ধ্বংস হয়ে গেছে, নেশন টিকে আছে এমন নমুনা বিরল নয়। রাজার অধিকার সব অধিকারের ওপরে এ কথা এখন আর প্রচলিত নয়। এখন স্থির হয়েছে, ন্যাশনাল অধিকার রাজকীয় অধিকারের ওপরে। এই ন্যাশনাল অধিকারের ভিত্তি কী, কোন লক্ষণের মাধ্যমে তাকে চেনা যাবে?

অনেকে বলেন, জাতির অর্থাৎ তদুপেক্ষা-এর ঐক্যই তার লক্ষণ। রাজা, উপরাজ ও রাষ্ট্রসভা কৃত্রিম এবং অধ্রুব। জাতি চিরদিন থেকে যায়; সুতরাং তার অধিকারই অধিক। কিন্তু জাতিমিশ্রণ হয়নি ইউরোপে এমন দেশ নেই। ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ইতালি কোথাও বিশুদ্ধ জাতি খুঁজে পাওয়া যায় না। কে টিউটন, কে কেল্ট, এখন তার মীমাংসা করা নিষ্প্রয়োজন। রাষ্ট্রনীতিতন্ত্রে জাতিবিশুদ্ধির প্রশ্ন অবান্তর। রাষ্ট্রতন্ত্রের বিধানে যে জাতি এক ছিল তারা ভিন্ন হয়েছে, যারা ভিন্ন ছিল তারা এক হয়েছে। তাহলে পরাধীন ভারতের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে রবীন্দ্রনাথ কিসের ভিত্তিতে এক করতে চেয়েছিলেন? স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিসত্তাকে বিবেচনায় রেখেও বলা যায়, আমরা মূলত বাঙালি। পার্শ্ববর্তী স্বাধীন রাষ্ট্র ভারতের একটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের মানুষও নিজেদের বাঙালি মনে করে। ১৯৪৭-এর রাষ্ট্রীয় বিভাজন এক বাংলাকে দুই বাঙলায় খণ্ডিত করার প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত করেছে। কিন্তু কিসের জোরে উভয় অংশের মানুষই এক জাতি বলে দাবি করতে পারে? ভূখণ্ডগত সংযোগ, কিংবা ভাষা, অথবা সংস্কৃতি? ভূখণ্ডগত সংযোগ তো এখন আর প্রধান বিবেচ্য নয়। তাহলে ভাষা আর সংস্কৃতির ভিত্তিকে আমরা আলোচনায় আনতে পারি।

রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ভাষার ঐক্যে ন্যাশনাল ঐক্যবন্ধনের সহায়তা করে সন্দেহ নেই। কিন্তু তাতে তাদেরকে এক করবেই, এমন কোনো জবরদস্তি নেই। ইউনাইটেড স্টেটস ও ইংল্যান্ডের ভাষা এক স্পেন ও স্প্যানীয় আমেরিকার ভাষা এক; অথচ তারা এক নেশন নয়। অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডের তিন-চারটা ভাষা আছে, তবু সেখানে এক নেশন। তাহলে জাতিতে এক করার জন্য ভাষার চাইতেও শক্তিশালী কিছু আছে যা তাদেরকে এক করে গেঁথে রাখে। রবীন্দ্রনাথ জানাচ্ছেন, ভাষা অপেক্ষা মানুষের ইচ্ছাশক্তি বড় : ভাষাবৈচিত্র্য সত্ত্বেও সমস্ত সুইজারল্যান্ডের ইচ্ছাশক্তি তাকে এক করেছে। তাছাড়া ভাষায় জাতির পরিচয় পাওয়া যায় এ কথাও ঠিক নয়। প্রুসিয়া আজ জার্মান বলে, কয়েক শতাব্দী আগে স্লাভোনিক বলত; ওয়েল্স ইংরেজি ব্যবহার করে; ইজিপ্ট আরবি ভাষায় কথা বলে। তাহলে বাঙালি জাতি কি সংস্কৃতির ভিত্তিতে নিজেদের স্বকীয় করে তুলেছে? এ প্রশ্নের জবাবের আগে ‘সংস্কৃতি’র সংজ্ঞায়ন করা দরকার।

নৃবিজ্ঞানী ভ. কেল্লে এবং ম. কোভালসন সমাজ ও সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্যতার বৈশিষ্ট্যকে স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছেন। তাদের মতে, ‘সংস্কৃতি অন্যান্য সামাজিক ব্যাপার থেকে স্বতন্ত্র কিছু নয়, তেমনি সেগুলোর সঙ্গে অভিন্নও নয়।’ সংস্কৃতির উপাদান হিসেবে যুক্ত থাকে দীর্ঘদিনের জীবনাচরণ, পোশাক-পরিচ্ছদ, খাদ্যাভাস, বিয়েশাদি; এমনকি ধর্মও। নেশন ধর্মমতের ঐক্যও মানে না। ব্যক্তিবিশেষ ক্যাথলিক, প্রটেস্টান্ট, ইহুদি অথবা নাস্তিক যাই হোক না কেন, তার ইংরেজ, ফরাসি বা জার্মান হতে কোনো বাধা নেই। সংস্কৃতির অন্য উপাদানগুলোর মধ্যে দুই বাংলার ‘বাঙালি’র সাদৃশ্য সন্ধান করাও সহজ নয় : ১৯৪৭ থেকেই রাষ্ট্রনৈতিকভাবে প্রভেদ-প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গিয়েছে; বোধকরি, ১৯০৫-এর বঙ্গভঙ্গের পূর্বাপর কাল থেকেই তার বিভেদ জল দুই ধারায় গড়াতে শুরু করেছে।

বৈষয়িক স্বার্থের বন্ধন দৃঢ় বন্ধন, সন্দেহ নেই। কিন্তু রেনাঁর মতে, সে-বন্ধন নেশন গড়ার পক্ষে যথেষ্ট নয়। রবীন্দ্রনাথ বলছেন, ‘ন্যাশনালত্বের মধ্যে একটা ভাবের স্থান আছে তাহার যেমন দেহ আছে, তেমনি অন্তঃকরণেরও অভাব নাই।’ এরপর ভৌগোলিক বিভাজনের প্রসঙ্গ টেনেছেন রবীন্দ্রনাথ। তিনি বলেন, ভৌগোলিক বা প্রাকৃতিক সীমা বিভাগ নেশনের ভিন্নতা সাধনের একটা প্রধান কারণ, সে-কথা স্বীকার করতেই হবে। পরক্ষণে তিনি বলছেন, কেউ ম্যাপে এঁকে দেখিয়ে দিতে পারবে না ঠিক কোন্ পর্যন্ত কোন্ নেশনের অধিকার নির্দিষ্ট হওয়া উচিত। মানুষের ইতিহাসের প্রাকৃতিক সীমাই চূড়ান্ত কথা নয়। ভূখণ্ডে, জাতিতে, ভাষায় নেশন গঠন করে না। ভূখণ্ডের ওপর যুদ্ধক্ষেত্র ও কর্মক্ষেত্রের পত্তন হতে পারে; কিন্তু নেশনের অন্তঃকরণটুকু ভূখণ্ডে গড়ে ওঠে না।

দেখা গেল; জাতি, ভাষা, বৈষয়িক স্বার্থ, ধর্মের ঐক্য ও ভৌগোলিক সংস্থান নেশন-নামক ‘মানস পদার্থ’ সৃজনের মূল উপাদান নয়। তবে এর মূল উপাদান কী? এতক্ষণে রবীন্দ্রনাথ নেশনের সংজ্ঞার্থ প্রদান করছেন : ‘নেশন একটি সজীব সত্তা, একটি মানস পদার্থ। দুইটি জিনিস এই পদার্থের অন্তঃপ্রকৃতি গঠিত করিয়াছে। সেই দুটি জিনিস বস্তুত একই। তাহার মধ্যে একটি অতীতে অবস্থিত, আর-একটি বর্তমানে। একটি হইতেছে সর্বসাধারণের প্রাচীন স্মৃতিসম্পদ, আর-একটি পরস্পরের সম্মতি, একত্রের বাস করিবার ইচ্ছা যে অর্থ উত্তরাধিকার হস্তগত হইয়াছে তাহাকে উপযুক্তভাবে রক্ষা করিবার ইচ্ছা।’

রবীন্দ্রনাথ- কতোটা রোম্যান্টিক কতোটা আধুনিক

সুধীন্দ্রনাথ জানতেন- রবীন্দ্রসাহিত্যে যে-দেশ ও কালের প্রতিবিম্ব পড়ে তার সঙ্গে আজকালকার পরিচয় এতো অল্প যে তাকে পরীর দেশ বললেও, বিস্ময় প্রকাশ অনুচিত। তার মানে রোমান্টিকতার জগতকে তাঁরা ‘পরীর দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত করেও সেখানেই অবগাহন করার ফলে তাঁদের দ্বন্ধের ধারাটিই যে-অনেকটা ভোঁতা হয়ে রইলো, সেটাকে অতিক্রম করে শেষ পর্যন্ত আধুনিক বাঙলা কবিতার প্রলয়-পুরুষেরা একটি স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর সৃষ্টি করতে সক্ষম হলেন বটে, তবে সেই কণ্ঠস্বরের প্রবলতর কৃতিত্ব যতোটা জীবনানন্দের, ততোটা অন্য কবিদের নয়। আর সেটা সৃষ্টি হয়েছে তাঁর মধ্যে কোনো স্ববিরোধিতা ছিলো না বলে। জীবনানন্দ আধুনিক কবিদের স্বাতন্ত্রের কথা বলেছেন, কিন্তু কখনো সংঘাতের সীমারেখা অতিক্রম করে যাননি। অবশ্য বুদ্ধদেব বসুও তাঁর শেষের দিকের কবিতা, বিশেষত মিথ ও পুরাণের সফল প্রয়োগে নির্মিত কবিতাসমূহের মধ্যে ইউরোপীয় কবিতার সঙ্গে বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গম-সাধনার মাধ্যমে নিজেকে জীবনানন্দীয় ধারার অনুসারী করে তুলতে সক্ষম হয়েছেন। তার ফলে তাঁর কবিতাও ভিন্ন সুরের ব্যঞ্জনা নিয়ে বাঙালি পাঠককে এক ধরনের বিস্ময়ের মধ্যে আবিষ্ট করতে পেরেছে। বিষ্ণু দে শেষপর্যন্ত বস্তুবাদকেই জীবনের একমাত্র অন্বিষ্ট বিবেচনায় আধুনিক ধারার নতুন পথে হাঁটতে শুরু করলে তাতেও এক ধরনের স্বাতন্ত্রের ছোঁয়া লাগে। আর অমিয় চক্রবর্তী অবকাঠামোর ভিন্নতর প্রতিভাসে কবিতাকে মেদবিহীন করে তুলে নগরকেন্দ্রিক জীবনের অনুভবকে চূড়ান্ত বলে বিবেচনা করলে সেখানেও রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার বিপরীত মেরুতে অবস্থান করার দক্ষতা অর্জনে সক্ষম হন। একমাত্র ব্যতিক্রম সুধীন্দ্রনাথ দত্ত। তিনি রবীন্দ্রনাথকে পরীর দেশের মানুষ বলে দূরে ঠেলে দেয়ার চেষ্টা করে এবং ‘নিখিল নাস্তি’র কথা বলে চিরকাল নিজেই সে-জগতের বাসিন্দা হয়ে রয়েছেন। তাই রবীন্দ্র-রোমান্টিকতার ভাববাদী অনুষঙ্গের বাইরে আমরা তাঁকে আধুনিক রোমান্টিকতার কবি হিসেবে বিবেচনা করতেই বেশি ভালোবাসি।

তবে এ বহু যুক্তি তর্কের কথা। অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ স্যার আধুনিক কবিদের তালিকায় রবীন্দ্রনাথকে ঠাঁই দেননি। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথকে তিনি যে রোম্যান্টিকতার তালিকায় রেখেছেন, সেখানে অন্য কাউকে রাখতে চাননি। বস্তুত এখানেই রবীন্দ্রনাথের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। আধুনিকতার যে ধারায় কবিতা কিংবা সাহিত্য সৃষ্টি তার সাম্য সৃষ্টি করেছে- সে ধারাটি রবীন্দ্রনাথের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলো না। তিনি সাহিত্যকে যতোটা নন্দনতত্ত্বের বিষয় ভেবেছেন, ততোটা ভাবেননি আর কেউ; যদিও সাহিত্যের ধারায় এই নন্দনতত্ত্বটি প্রাণময় হয়েছে অনেকের কবিতাতেই।

তবে আধনিক কবি হবার একটি বাসনা সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের ছিলো। কারণ তাঁর শেষের দিকের কাব্যগ্রন্থগুলোতে আমরা অনায়াসে খুঁজে পাই গদ্য ছন্দের সার্থক মুক্তি, আমাদের প্রাণের কাছে ঢেউ খেলে যায় কয়েকটি অসামান্য ছোটোগল্প- যেমন, ল্যাবরেটরি, একরাত্রি ইত্যাদি এবং সর্বোপরি ‘শেষের কবিতা’র যে কনসেপ্ট; তাতে রবীন্দ্রনাথ এক অসামান্য আধুনিক কবি হবার একটি রাস্তা খুঁজেছিলেন, এবং বলা বাহুল্য পেয়েও ছিলেন।

তাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সম্বন্ধে এই কথাটি হয়তো বলা যায়- তিনি রোম্যান্টিকতার সমুদ্রে অবগাহন করে আধুনিকতার চৌরাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন- দেখেশুনে পথ পার হবেন, কিন্তু তার আগেই পথ ‘পথের কথা’ জানিয়ে দিয়ে গেলো।

তথ্যসূত্র:

১। আত্মপরিচয়: রবীন্দ্র রচনাবলী
২। গ্রন্থ পরিচয়: রবীন্দ্র রচনাবলী
৩। বাংলা নব্য লেখকদের প্রতি নিবেদন, বঙ্কিম রচনাবলী (২য় খণ্ড)
৪। মনে মনে জিয়নকাঠি, অন্নদাশঙ্কর রায়
৫। বাংলা সাহিত্যে প্রগতি: সাহিত্যের ভবিষ্যৎ, বিষ্ণু দে
৬। কথা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ, ভবানী ভট্টাচার্য
৭। রবীন্দ্রকাব্য পরিক্রমা,উপেন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য
৮। বাংলার কথার আভিজাত্য, নরেশচন্দ্র সেনগুপ্ত
৯। সাহিত্যের নবত্ব, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
১০। বৃত্তাবদ্ধ রবীন্দ্রনাথ, ড. সফিউদ্দিন আহমদ
১১। মৃত্যুচিন্তা রবীন্দ্রনাথ ও অন্যান্য জটিলতা, হায়াৎ মামুদ

২১ শ্রাবণ, ১৪১৮