ক্যাটেগরিঃ ব্যক্তিত্ব

 

পেরিয়ে যাবার একটি ব্যাকরণ আছে, অতিক্রম করে যাবার একটি নিয়ম আছে। আবার কখনো কখনো এমন হয়েছে অতিক্রম করে গিয়েও নিজেকে ধরে রাখা যাচ্ছে না। ফিরে আসতে হচ্ছে গান গাইতে গাইতে। ওই যে গান আছে না- ‘ফিরে চল্ ফিরে চল্ মাটির টানে.. ..’।

কয়েকটি সত্য আছে, মুখোমুখি হওয়া যায় না। তখন আমরা বলি- ওভাবে নয়, একটু অন্যভাবে উপস্থাপন করতে হবে। অন্যভাবে উপস্থাপিত হয় সত্য- বুকের কাছে তবুও খামতি পড়ে থাকে। মনে হয়- জানা তো হয় নাই।

আমি যে সত্যটির কথা বলবো- সেটি ঘটেছিলো ১৯০৮ সালে। তারিখ ছিলো ১১ আগস্ট। সেই হিসেবে লেখাটি প্রকাশিত হচ্ছে একদিন পর। এই বিলম্বের কারণ হলো- আমি সত্যটি নিয়ে দ্বিধায় ছিলাম। আমার বারবার মনে হয়েছে, এতো সহজ দাবির জন্য এমন নির্মম সত্য? এর চেয়েও ভয়ঙ্কর কথা বলে লোকে তো নোবেল পুরস্কার পেয়েছে- কিন্তু এতো সহজ একটা দাবির জন্যে আমার ভাইটাকে ওরা একেবারে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলো?

এসব ভাবতে ভাবতেই সময় পেরিয়ে গেলো। ১১ আগস্টের লেখা তাই প্রকাশিত হলো ১২ আগস্টে।

আমি বার্নার্ড শ’ এর কথা বলছি। না, ভদ্রলোক আমার ভাই নন, আমার ভাই ফাঁসির দড়িতে লটকে আছেন- এখনও আসেননি, তবে কথা দিয়েছেন আসবেন। তবে বার্নার্ড শ’ এর সঙ্গে আমার ভাইয়ের একটা অসাধারণ মিল আছে। শ বিখ্যাত হয়েছেন ইংরেজদের গাল দিয়ে, যদিও থেকেছেন লণ্ডনে এবং অভিযোগ আছে ইংরেজদের খাসলৎ তাঁর মধ্যেও ঢুকে পড়েছিলো। মারপ্যাঁচে তিনি দুনিয়া জয় করেছেন। সারা জীবন তাঁর অসংখ্য নাটকে একের পর এক তীক্ষ্ম ভাষায় ইংরেজদের সমালোচনা করেছেন। তবুও ইংরেজরা তঁকে মাথায় তুলে রাখতো। ‘এণ্ডোক্লিস এ- দি লায়ন’ নাটকের ভূমিকায় তিনি ইংরেজ সভ্যতাকে পর্যন্ত গাল দিয়েছিলেন- তবুও হলভর্তি ইংরেজরা তাঁর নাটক দেখে হাততালি দিলো।

আর আমার ভাই কেবল ‘স্বাধীনতা’র কথা বলেছিলো। তাঁকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিলো? এখন বুঝে গেছি বার্নার্ড শ ছিলেন ইউরোপের একজন ফার্স্ট ক্লাশ ঈষড়হি, সাদা বাঙলায় ভাঁড়। শ’ এর Seven pillers of wisdom এর চেয়ে আমার ভাইয়ের ‘বন্দে মাতারম্’ সারা ইউরোপকে কাঁপিয়ে তুলেছিলো। তাই শ পেয়েছিলেন নোবেল, আর আমার ভাই ফাঁসির দড়ি।

আমার ভাইয়ের নাম ক্ষুদিরাম বসু। হাসিমুখে ফাঁসির দড়ি গলায় জগৎবাসীকে দেখিয়ে গেলো মায়ের জন্যে ভালোবাসা কোথায় থাকে। ‘সভ্য ইংল্যান্ড-বাসী’কে হত্যার দায়ে ক্ষুদিরামের ফাঁসি হলো। এ কেবল আত্মদানই নয়, এ হলো সর্ব-কনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা; ‘স্বাধীনতা’ শব্দের চারটি অক্ষরে যাঁর রক্ত এক রঙিন ক্যালিওগ্রাফি।

ক্ষুদিরামের জন্ম হয় ১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর। অবিভক্ত বাঙলার মেদিনীপুর জেলার বহুভাইনি গ্রামে। ত্রৈলোক্যনাথ বসু নাদাজোলের স্থানীয় জমিদারের তহশীলদার ছিলেন। ক্ষুদিরামের মাতার নাম লক্ষীপ্রিয়া দেবী। অপরূপা, সরোজিনী, ননীবালা তিন বোনের নাম। ক্ষুদিরামের জন্মের পূর্বে দুই ভাই মারা যায়। ছেলে সন্তান না বাঁচার কারণে লক্ষ্মীপ্রিয়া দেবী ক্ষুদিরামের জন্মের পর তাঁকে তিন মুঠো চালের ক্ষুদের বদলে অন্যের কাছে ঠেলে দেন। অল্প বয়সেই মাতাপিতাকে হারিয়ে বড়ো বোনের কাছে লালিত পালিত হন ক্ষুদিরাম। শিক্ষা জীবন শুরু করেন তমলুকের হ্যামিল্টন স্কুলে। হ্যামিল্টন স্কুলের পাট চুকিয়ে শুরু করেন মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুল জীবন। এই কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সান্নিধ্য লাভ করেন। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ছিলেন তৎকালীন বিপ্লবীদের সংগঠন ‘যুগান্তর’ এর অন্যতম এক সদস্য। ক্ষুদিরামের সেই অল্প বয়সী মনের মধ্যেই সত্যেন্দ্রনাথ বসু খুঁজে পান বিপ্লবী চেতনাবোধ। ১৯০২ সালে নিতান্ত বালক বয়সেই ভগবদ গীতা পড়ে ক্ষুদিরাম যোগ দিলেন বিপ্লবীদের দলে।

বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও স্বদেশি আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন ক্ষুদিরাম বসু। এ বছর ক্ষুদিরাম সত্যেন বসুর নেতৃত্বে গুপ্ত সংগঠনে যোগ দেন। এখানে তাঁর শারীরিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক ও রাজনৈতিক শিক্ষা হয়। এখানে পিস্তল চালনার শিক্ষাও হয়। এই গুপ্ত সংগঠনের কর্মসূচীর অংশ হিসেবে ক্ষুদিরাম ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় জ্বালিয়ে দেন এবং ইংল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত লবণবোঝাই নৌকা ডুবিয়ে দেন। এসব কর্মকান্ডে তাঁর সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় পাওয়া যায়। ফলে ধীরে ধীরে গুপ্ত সংগঠনের ভেতরে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

১৯০৬ সালের মার্চ মাসে মেদিনিপুরে আয়োজিত হয় কৃষি ও শিল্পমেলা। এ মেলায় সমবেত মানুষের মধ্যে ইংরেজবিরোধী ইশতেহার বিলি করতেন ক্ষুদিরাম। এখানে ইশতেহার বিলি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম। এই তাঁর প্রথম গ্রেপ্তার হওয়া। তবে বুদ্ধি খাটিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন তিনি। এ বছরের এপ্রিল মাসে লবণবোঝাই নৌকা ডুবানোর মামলায় গ্রেপ্তার হন ক্ষুদিরাম। তাঁকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়। আদালত তাঁকে দোষী হিসেবে দন্ডিত করেন। তবে অল্প বয়স বিবেচনায় তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়।

১৯০৭ সালে ক্ষুদিরাম হাটগাছায় ডাক বিভাগের থলি লুট করেন। এ ঘটনায় তাঁর অসীম সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। এ বছরের ৬ ডিসেম্বর ক্ষুদিরাম নারায়ণগড় রেলস্টেশনের কাছে বঙ্গের ছোটো লাটের বিশেষ রেলগাড়িতে বোমা হামলা করেন। এ সময় কোলকাতার প্রধান প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ছিলো কিংসফোর্ড। সে বঙ্গভঙ্গবিরোধী ও স্বদেশী আন্দোলনের কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলো। ভারতীয়দের ঘৃণা করতো। সুযোগ পেলেই সে ভারতীয়দের দন্ড দিতো। বস্তুত কিংসফোর্ড এদেশীয়দের কাছে মূর্তিমান ত্রাসে পরিণত হয়।

গুপ্ত বিপ্লবী সংগঠন ‘যুগান্তর’ ১৯০৮ সালে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার পরিকল্পনা করে। কিংসফোর্ডকে হত্যা করার দায়িত্ব দেয়া হয় প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসুকে। দুই তরুণ যখন কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে যান, তখন কিংসফোর্ড সেশন জজ হিসেবে বদলি হন মুজাফ্ফরপুরে। ৩০ এপ্রিল প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম বসু স্থানীয় ইউরোপীয় ক্লাবের গেটের কাছে রাতের অন্ধকারে অ্যাম্বুশ করার অপেক্ষায় থাকে। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর কিংসফোর্ডের গাড়ির মতো একটি গাড়ি আসে। তাঁরা ওই গাড়িকে লক্ষ্য করে বোমা হামলা করেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য, ওই গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। ছিলেন ইংরেজ এক মহিলা ও তাঁর মেয়ে। তাঁরা বোমার আঘাতে মৃত্যুবরণ করেন। বোমা হামলার পর ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল পালিয়ে যান।

ওই রাতে পুলিশ সব স্থানে তল্লাশি করে। অবশেষে ওয়ানি রেলস্টেশনে ক্ষুদিরাম অস্ত্রসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। ক্ষুদিরাম বোমা হামলার সব দায় নিজের কাঁধে নেন। সহযোগীদের কথা বলেন না। ফলে বোমা হামলা ও দুজনকে হত্যার অপরাধে ক্ষুদিরামের ফাঁসির আদেশ হয়।

ক্ষুদিরামের ফাঁসি কার্যকর হয় ১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট। সময়ের ঘড়িতে তখন ভোর ৪টা। সে সময় ক্ষুদিরামের পক্ষের আইনজীবি ছিলেন শ্রী উপেন্দ্রনাথ সেন। তার ভাষ্য মতে – “ফাঁসির মঞ্চে ক্ষুদিরাম নির্ভিকভাবে উঠে যান। তাঁর মধ্যে কোন ভয় বা অনুশোচনা কাজ করছিল না। এদেশের নবীন যৌবনের প্রতীক হয়ে হাসিমুখে তিনি উঠে যান ফাঁসির মঞ্চে।”
ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়ে গেলো শতবর্ষও পেরিয়ে গেছে। এরপর বাঙালির দুর্বার আন্দোলনে গড়ে উঠে স্বাধীনতার জয়স্তম্ভ। এখনো এদেশের মুক্তিকামী জনতার কাছে ক্ষুদিরাম এক অনন্য পোট্রেট।

সেদিন সভ্য জাতি নামে স্বীকৃত যে ইংরেজরা আমার ভাই ক্ষুদিরামকে ফাঁসিতে ঝুলিয়েছিলো, সেই ব্রিটেনে এখনও পাতা ঝরার শীত আসে। শুনেছি এদের সূর্য নাকি কোনোদিন অস্ত যায় না। সাহিত্যিক সোমনে চন্দ অক্সফোর্ডের বারান্দায় পায়চারি করতে করতে লিখতে চেয়েছিলেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের জন্য সাহিত্য। লিকতে পারেননি, কিন্তু যা লিখে গেছেন- তাতে ব্রিটিশ সরকার খুশি হয়নি তাঁর উপর। সভ্য জাতির বিরুদ্ধে এমন লেখা কারো কাম্য নয়। অন্তত সভ্যদের তো নয়ই।

লণ্ডনের সাম্প্রতিক দাঙ্গায় জ্বলছে চারপাশ। আমি সাম্প্রদায়িকতা আর মনুষ্যত্ব বিবর্জিত কর্মকাণ্ডকে ঘৃণা করি- কারণ আমার রক্তে শেক্সপীয়র না থাকলেও রবীন্দ্রনাথ আছেন। আমি দাঙ্গাকে পৃথিবী থেকে নির্বাসন দিতে চাই কারণ ‘সূর্য অস্ত না যাবার ইতিহাস’ আমার রক্তে না থাকলেও সূর্যাস্তের রক্তিম আভার মতো সৌন্দর্য আছে।

ডেভিড ক্যামেরুন, একবার ইতিহাস বইটা খুলুন। পড়ে দেখুন কী করে গেছে আপনার পূর্ব-পুরুষরা। আমি আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছি না। আমি জানি- এই মুহূর্তে আপনার একজন অসাম্প্রদায়িক ক্ষুদিরামকে খুব দরকার।

আমি আপনাকে কথা দিলাম- ক্ষুদিরাম বসু আসবে আপনার ল-নে- কারণ ক্ষুদিরাম মানুষের জন্য দশ মাস দশদিন পরে মাসির ঘরে জন্ম নিয়েছিলো।

ক্ষুদিরাম আসছে আপনার শহরে। মানুষের পাশে দাঁড়াতে। ইংল্যাণ্ডের ‘সভ্য পতাকাটা’ অর্ধেক নামিয়ে রাখুন। ক্ষুদিরামের জন্য নয়, শোকাহত ইংল্যাণ্ডবাসীর জন্য।

ক্ষুদিরাম বসুদের কিছুই লাগে না- অজস্র মানুষের ভালোবাসায় তাঁরা আজীবন ঋদ্ধ।

ডেভিড ক্যামেরুন- আপনি কিংবা আপনার পার্লামেন্টেরিয়ানরা এ সত্যটি জানেন না। দুঃখজনক হলেও সত্য- আপনারা কেউ মানুষের ইতিহাস পড়েনি।

২৮ শ্রাবণ, ১৪১৮