ক্যাটেগরিঃ সেলুলয়েড

 

এমন একটি লেখা লেখার ইচ্ছে আমার ছিলো না। নিঃসঙ্গ বাতায়নের সাথে গুবাক তরুর সারির কথোপকথন আর কখনো হবে না। এ-ও এক ট্র্যাজেডি- গ্রীক ট্র্যাজেডির সাথে সামঞ্জস্য; কেবল ভাগ্য দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়- কিংবা এরও বাইরের কিছু।

আমি জানি না, ক্যামেরার কোন অ্যাঙ্গেলে কথা বলতে ভালোবাসতেন আশফাক মুনীর মিশুক। জীবনের ভিউ ফাইন্ডারে চোখ রেখে তিনি কী কোনোদিন অ্যাপারচারের হিসেব নিয়েছিলেন? জানা হয়নি- কেবলই জানি, আজকের পর থেকে তিনিই এক পোট্রেট- বিষন্ন নীলিমার ধারে যে পোর্ট্রেটের ফ্রেমে নিবেদিত হয় পিতার পংক্তিমালা।

তিনি নেই- আসবেন না আর ফিরে। আলোর সরণি ধরে পথ হাঁটতে হাঁটতে আশফাক মুনীর মিশুক পথ হারিয়ে ফেললেন?

কোথায় গেলেন?

কোনো উত্তর নেই- শ্রান্ত গাঙচিলের মতো প্রশ্নগুলো মুখ চেয়ে থাকে। বিষন্ন, বড্ডো বেশি মলিন। কখনো শোকাহত। এবং প্রতিবাদী।

আমাদের দেশটা বামনের দেশ, এখানে মহাকায়ের সংখ্যা খুব বেশি নয়। পলিমাটির ক্ষুদ্র ব-দ্বীপে গর্বিত হবার মতো মানুষ খুব বেশি নেই। এখানে স্বপ্ন মানেই উঁচু তলার অ্যাপার্টমেন্টের ছাদ আর মিহিন শাড়ির কোলবালিশ।

কিন্তু এর মাঝেও আকাশটা আমাদের ছিলো। কখনো কখনো সেই আকাশের দিকে তাকিয়ে আমরা আলোর পাণিপ্রার্থী হতাম। সেই আলোর নানা নামের মাঝে একটি নাম ছিলো আশফাক মুনীর মিশুক। ‘ক্যামেরা ডিরেক্টর’ হিসেবে কাজ করে যে বাঙালিরা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিতি পেয়েছেন, তাঁদের মধ্যে তিনি ছিলেন অন্যতম।

শহিদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে আশফাক মুনীর মিশুক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বিবিসির ভিডিও গ্রাহক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। সবার কাছে মিশুক মুনীর নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন তিনি। ‘মিশুক মুনীর’- কী আশ্চর্য ব্যাতিচার এই নামের মধ্যে। কিন্তু মানুষটা ব্যাতিচারিক ছিলেন না নিশ্চয়ই। তাঁর ক্যামেরার কাজ দেখে মনে হতো- তিনি আলোকে ভালোবেসেছিলেন। মায়া-পার্বণে তাই আলোর সাথে মিশে গেছেন মিশুক; তিনি চলে গেছেন- এ আমি মিথ্যে বলেছিলাম। তিনি আছেন, আলোর বারান্দায় স্মৃতির ডেপথ অব ফিল্ডে তাঁকে খুঁজে পাওয়া যায়।

বাঙলাদেশের প্রথম ব্যক্তিমালিকানাধীন টেলিভিশন একুশে টিভিতে হেড অব নিউজ অপারেশনস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মিশুক মুনীর। দীর্ঘদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতাও করেছেন তিনি। বাবার সাথে এইখানে বুঝি তাঁর সন্ধি ছিলো? আদরের সুতোয় তাই বাবার মতোই তিনি দিতে চেয়েছিলেন আদর্শ- কোনো পুস্তক থেকে নয়; জীবন থেকে, জীবনের আয়না থেকে। সান্ধ্যভাষার আলোকচিত্রে তিনি শেখাতে চেয়েছিলেন- জীবন মানেই ওয়াইড অ্যাঙ্গেলের ল্যান্ডস্কেপ। কী জানি, তাই বুঝি ক্যাম্পাসে আসলেই অপরাজেয় বাঙলার দিকে তাকিয়ে থাকতেন সূর্যাস্তের চোখে। কলাভবন তখন ব্যাকগ্রাউণ্ড নয়, জীবনের ফোরগ্রাউণ্ডে নেমে আসতো।

২০০৭ সালে প্রতিষ্ঠিত The Real News Network এর ছিলেন Director of News Operations। চলচ্চিত্রের মাঝে আলোকচিত্র এবং ভিডিওগ্রাফির যে অপূর্ব সমন্বয় ঘটাতে হয়- তা করে দেখিয়েছিলেন এই মানুষটি। সর্বশেষ গত বছর তিনি এটিএন নিউজে প্রধান নির্বাহি কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে যোগ দেন। বাঙলাদেশের খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের ছবি রানওয়ের প্রধান চিত্রগ্রাহক হিসেবে কাজ করেন মিশুক। এছাড়াও ‘রিটার্ন টু কান্দাহার’, ‘ওয়ার্ডস অব ফ্রিডম’ প্রামাণ্যচিত্রগুলোতেও কাজ করেছেন তিনি। তারেক মাসুদের যে ছবিটির আত্মপ্রকাশ ঘটতে যাচ্ছিলো সে-ই ‘কাগজের ফুল’ নির্মাণের জন্য প্রি-প্রডাকশন পর্যায়ের কিছু কাজ চুড়ান্ত করতে আজ (১৩ আগস্ট, ২০১১) সকাল ৬ টায় ঢাকা থেকে তারা মানিকগঞ্জের শ্যুটিং স্পটে গিয়েছিলেন। আবহাওয়া প্রতিকূলে ছিলো। কাজ শেষে যখন তাঁরা ঢাকায় ফিরছিলেন তখন, সকাল সোয়া ১১ টার দিকে, মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার জোখা নামক স্থানে তাদের বহনকারী ঢাকাগামী মাইক্রোবাসের (ঢাকা মেট্রো-চ-১৩-০৩০২) সাথে বিপরীতমুখী পাটুরিয়াগামী একটি বাসের (ঢাকা মেট্রো-ব-১৪-৪২৮৮) সংঘর্ষে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান আশফাক মুনীর মিশুক (মিশুক মুনীর) ও চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদসহ ৫ জন। আহত হয়েছেন চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের জীবনসঙ্গী চলচ্চিত্রকার ক্যাথরিন মাসুদ এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক ঢালী আল মামুন ও তার স্ত্রী দিলারা বেগম জলি।

মিশুক মুনীরের অনেক বড়ো একটি অংশগ্রহণ ছিলো যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবির আন্দোলনে। তিনি এ বিষয়ে নানা ধরণের প্রতিবেদনও প্রচার করেছিলেন সম্প্রচার মাধ্যমে। কিন্তু আজ আর এই মিছিলে তিনি থাকবেন না। কেবল মিশুক মুনীর নামের এক অখণ্ড অনুপ্রেরণা উজ্জল হয়ে থাকবে আমাদের সে-ই প্রত্যয়ী মিছিলে।

লেখার শুরুতে বলেছিলাম- এ হলো গ্রীক ট্র্যাজেডি, ভাগ্যের নিয়ন্ত্রণে পরাহতের মানচিত্র। কিন্তু এবার ভেতরটা বিদ্রোহী হয়ে উঠলো। এর সাথে ভাগ্যের যোগ নেই। যোগ আছে অব্যবস্থাপনার, এর সাথে যোগ আছে অসচেতনতার। সারা বাঙলাদেশের দিকে তাকালে এই কথাটি যেন বারবার স্পষ্ট হয়ে উঠে। মিশুক মুনীর চলে গেলেন- নির্মম সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনি চলে গেলেন আমাদের ছেড়ে। খবরে দেখলাম সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শোক জানানো হলো। এরই নাম বুঝি শুভঙ্করের ফাঁকি! এ শোকের মূল্য কি? এ শোক কী পারবে, যে অনুপ্রেরণার সৃষ্টি হয়েছিলো, তাকে ফিরিয়ে দিতে? আমাদের ভবিষ্যত কী তবে নেমেসিসের হাতের মুঠোয়?

বধির হয়ে কেবলই ঘুমাই, চেতনার দরজায় কড়া নাড়ে বিবর্ণ ফুটেজ। জেগে উঠি। ট্রাইপডের উচ্চতা বাড়িয়ে চেষ্টা করি আকাশ দেখার।

আকাশ তখন রোদন করে- ‘মিশুক মুনীর আর নাই’।

২৯ শ্রাবণ, ১৪১৮