ক্যাটেগরিঃ স্বাধিকার চেতনা

এইমাত্র ফিরে এসেই লেখাটি শুরু করলাম।

ফিরে এসে। জানতে চাইবেন তো- কোথায় গিয়েছিলাম?

গিয়েছিলাম পিতার সঙ্গে দেখা করতে। কতোদিন তাঁকে দেখি না। ফেরার পথে মনে হচ্ছিলো পিতার সঙ্গে আমার এই কথোপকথন আপনাদের ভালো লাগতে পারে। বস্তুত সে কারণেই এই লেখাটির জন্ম।

আমি যাবার আগেই তিনি জানতেন, আমি আসবো। একজন অশরীরী তাঁর থাকার জায়গাটা আমায় দেখিয়ে দিলো। তখন সময় কতো ছিলো? মনে নেই।

দূর থেকে অনেকক্ষণ দেখলাম পিতার থাকবার জায়গাটি। কেমন যেনো হৃদয়ের মতো মানচিত্র। ঘরের ডান কোণে একটা হাসনাহেনার গাছ। শরত এসে গেলো, অথচ হাসনাহেনার গন্ধ এখনও ব্যাকুল। পিতার আবাসস্থলে দিনরাত্রি বোঝা যাচ্ছে না।

আমি এক পা দু’ পা করে এসে দাঁড়ালাম চৌকাঠের কাছে। দরজায় কড়া নাড়তে যাবো, অমনি খুলে গেলো দরজা। কিন্তু কেউ নেই। কেমন যেনো করে উঠলো বুকের ভেতরটা।

হঠাৎই পিতা সামনে এসে দাঁড়ালেন। হাতে রবীন্দ্রনাথের ‘পুনশ্চ’ কাব্যগ্রন্থটি। আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। তাড়া দিলেন ভেতরে যাবার জন্যে। আমিও হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকলাম। পিতা তখন পথ দেখিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন আমায়। ঠিক যেভাবে পথ দেখিয়েছিলেন সাতই মার্চে, সাত কোটি বিপন্ন সন্তানকে।

বারান্দায় দুটো চেয়ার। মাঝখানে একটা টেবিল। বেশ আটপৌরে। পিতাই প্রথম বসলেন। আমায় ইশারায় বললেন বসতে। কিন্তু আমি যেনো দেখতে পাইনি ইশারাটি। অপলক তাকিয়ে ছিলাম পিতার দিকে।

আমার পিতা। গা থেকে এখনও সাতই মার্চের সফেদ পাঞ্জাবি খুলেননি তিনি। সে-ই কাঁচা-পাকা চুল, গোঁফ। হাতে প্রিয়তম পাইপ। আমি নিষ্পলক তাকিয়ে রইলাম। অর্থহীন চাহনি। পিতার চোখ জোড়া তখন বাইরে কী যেনো খুঁজছে। চশমার ফ্রেমটা দেখে একটু হাসি পেলো আমার। এমন মোটা কালো ফ্রেমে চশমা পড়বো বলে কতো না চশমার দোকান ঘুরেছি আমি।

এবার পিতা তাকালেন আমার দিকে। দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটু আশ্চর্য হলেন। তারপর কণ্ঠে পায়রা উড়িয়ে আমায় বসতে বললেন। চেয়ারটা একটু ঘুরিয়ে বসলাম আমি। বসার পরেই শুরু হলো আমাদের কথোপকথন।

পিতা: তোর আসতে কোনো সমস্যা হয়নি তো? এখানে আসতে কোনো বাধা নেই, কিন্তু কেউ আসতে চায় না। তা, তুই হঠাৎ আজ কেনো? তোর তো শনিবারে আসা উচিত ছিলো।

শনিবারের চিঠি: আপনার কাছে কোনোদিনই কারো আসতে বাধা ছিলো না। এতোটাই কাছে ছিলেন আপনি, এমনকি ঘাতকেরও। প্রেসিডেন্ট হাউসে না থেকে, থাকলেন বত্রিশ নম্বরে।

পিতা তখন চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। ঈষৎ হেসে আমার চোখের দিকে তাকালেন। কী জানি কেনো, আমি চোখ তুলে রাখতে পারলাম না। তড়িতে নামিয়ে নিলাম। আমাদের বাঙালি ঐতিহ্যে পিতা-সন্তানের সম্পর্কটা আসলে এমনই।

পিতা: (হাসিটা ঠোঁটে রেখেই) তুই কি এসব বলার জন্যেই এখানে আসছিস?

শনিবারের চিঠি: (শব্দ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে) নাহ। আমি এসেছি আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আপনার সঙ্গে গল্প করতে। আপনি‘ পুনশ্চ’ পড়ছিলেন, কোন কবিতাটা বেশি ভালো লাগে?

পিতা: (বইটার দিকে তাকিয়ে) এর সবগুলো কবিতাই আমার ভালোলাগে। এ আমার বাঙলাদেশের মতো।

শনিবারের চিঠি: বাঙলাদেশের মতোন?

পিতা: (হাসিটাকে আরও একটু মায়াবী করে) জানিস না, রবিঠাকুরের গদ্যছন্দের সার্থক সূত্রপাতই হলো ‘পুনশ্চ’। সে হিসেবে চির নূতন, একেবারে সদ্য-স্বাধীন বাঙলাদেশের মতো।

শনিবারের চিঠি: (ঈষৎ হেসে) বাঙলাদেশ এখন আর শিশু রাষ্ট্র নয় পিতা। এর বয়স এখন চল্লিশ। আর যদি অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার করি, তবে আরও বেশি।

এ কথাগুলো শোনার পর পিতা খানিক বিষন্ন হয়ে গেলেন। তাঁর বিষন্নতাবোধ কাটানোর জন্যেই আমি প্রসঙ্গ বদল করলাম।

শনিবারের চিঠি: আপনার ছেলেবেলার গল্প বলুন।

শিশুর মতো হেসে উঠলেন পিতা। দূরে তাকিয়ে রইলেন- যেনো নস্টালজিয়ার সমুদ্রে মন্থন করবেন তিনি। তারপর বলতে শুরু করলেন.. ..

পিতা: আমাদের এখানে তাল আর নারকেল গাছ বেশি ছিলো। রাতের বেলায় তাল-নারকেল পাতার শর শর শব্দ হতো, বড়ো মধুর। আর মধুমতী নদী থেকে আসতো ভেজা বাতাস। আমার বড়ো দু’ বোনের পর আমি- চৈত্র্য মাসে জন্ম হয়েছিলো আমার। সারা বাড়িতে হৈ চৈ পড়ে যায়। আমার বাবা এন্ট্রান্স পাশ করেই ভাঙ্গা মুন্সেফ কোর্টে চাকুরি শুরু করেন। বাবার জন্যে সপ্তাহের শেষের দিনগুলোতে অধীর হয়ে থাকতাম, জানিস! বাড়ির নৌকা ভেড়ানোর ঘাটের কাছেই ছিলো একটা হিজল গাছ- সেখানে সময় মতো গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। কিন্তু অনেক সময়ই বাবা আসতেন না। তখন খুব খারাপ লাগতো।

তবে জানিস, আমার ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠতে বেশ লাগতো। আমাদের এখানে একটা তমাল গাছ ছিলো, সেখানে ভোররাত থেকেই একটা বউ কথা কও পাখি ডাকতো।

‘তমাল গাছটা আছে, কিন্তু বউ কথা কও পাখি আর ডাকে না’- বলেই, আমি পিতার কথার মাঝখানে একটা ফোঁড়ন কাটলাম। পিতা খানিক বিস্মিত হলেন। তারপর আবার বলতে শুরু করলেন।

পিতা: আমার বড়ো বোনের নাম ফাতেমা বেগম, মেজো বোন আছিয়া বেগম, সেজো বোন হেলেন ও ছোটো বোনটা ছিলো লাইলী; আর ছোটো ভাইয়ের নাম শেখ আবু নাসের। আমার স্কুলটার কথা খুব মনে পড়ে রে। ১৯২৭ সালে ভর্তি হলাম গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এখানেই পড়াশোনা শুরু করি। বয়স তখন কতো ছিলো? সাত বছর হবে। নয় বছর বয়সে মানে হলো ১৯২৯ সালে ভর্তি হলাম গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। এখানেই ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করি। ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মাথুরানাথ ইনিস্টিউট মিশন স্কুলে সপ্তম শ্রেণিতে ভর্তি হই। ১৯৩৪ থেকে চার বছর পর্যন্ত চোখের অসুখের জন্যে লেখাপড়া করতে পারলাম না। শেষে গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করলাম।

পিতা আরও বলতে চাচ্ছিলেন। কিন্তু আমার মুচকি হাসি দেখে থামলেন। চশমাটা চোখ থেকে খুলে তাকালেন আমার দিকে- তারপর বললেন,

পিতা: হাসছিস কেনো রে!

শনিবারের চিঠি: আপনি মেট্রিকুলেশন দিলেন, এন্ট্রাস পাস করলেন, বেকার হোস্টেলে থাকতেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেন.. ..এগুলো আমি জানি।

পিতা: (সজোরে হেসে) এইটা নিশ্চয়ই জানিস না যে বেকার হোস্টেলে আমার সঙ্গে সিরাজুদ্দীন হোসেনও ছিলো।

শনিবারের চিঠি: সিরাজুদ্দীন হোসেন!

পিতা: হুম। সিরাজ। ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদক ছিলো।

শনিবারের চিঠি: ও আচ্ছা।

পিতা: ‘ও আচ্ছা’ বলেই শেষ? তোদের ইতিহাস জানতে ইচ্ছে হয় না? ইতিহাসের বিষয়ে তোদের অনীহার কারণেই তো ইতিহাসের বিকৃতি ঘটে। ইতিহাস সম্বন্ধে সচেতন থাকলে, যতœ করলে, পাহারা দিলে এর কোনো বিকৃতি ঘটতো না।

শনিবারের চিঠি: জ্বি। সেই ইতিহাসটাই জানতে এসেছি।

পিতা এবার উঠে দাঁড়ালেন। মৃদু পায়ে হেঁটে এলেন বারান্দার শেষ সীমানাতে। তারপর ইতিহাসের ধ্রুবকগুলো ছড়িয়ে দিতে লাগলেন।

পিতা: সাতচল্লিশে কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে মাথা তুলে দাঁড়াবার জন্যেই তৎকালীন জনগণ পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেয়। দিন না যেতেই পাকিস্তানের মীর জাফরী চেহারা বের হয়ে আসে। কিন্তু পাকিস্তান নামক রাষ্ট্র গঠনের পর দীর্ঘ ২৩ বছরে বাঙলার মানুষ যে সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা-শোষণ-বঞ্চনা সহ্য করে, তার স্বাক্ষী কিন্তু কেবল আমি একা নই কিংবা আমার দল আওয়ামী লীগই নয়। সারা বাঙলার মানুষ ছিলেন সেই স্বাক্ষী।

এদেশের সাধারণ মানুষের সন্তানই ছিলেন সালাম-বরকত-রফিক-জব্বারসহ আরও শহিদগণ। আসাদ, মতিউর বাঙলার সাধারণ ঘরের মানুষ। এরাই বুকের রক্ত ঢেলে এ দেশকে স্বাধীনতার পথে এগিয়ে নিয়ে আসে। জনগণের নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রামের সৃষ্ট ফসল হিসেবে সত্তরের নির্বাচনে আমরা নিরঙ্কুশ জয় পাই। ফলে দেশের শাসনতন্ত্র রচনা করার ভার এই বাঙলার মানুষের উপরই- কোনো মিলিটারি গবর্নমেন্টের উপর ছিলো না। আসলে সত্তরের নির্বাচন ছিলো এক গভীর ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত হবার সন্ধিক্ষণ। কিন্তু পাকিস্তানিরা তা করতে দিলো না। বাঙালির অধিকার তারা বরাবরের মতো সেদিনও হরণ করেছিলো।

কিন্তু একটা বিষয় লক্ষ্য কর (এবার পিতা ঘুরে দাঁড়ালেন আমার দিকে)। শেষ পর্যন্ত জনগণের ইচ্ছাই হলো শেষ কথা। যদিও সে-ই শেষ কথায় পৌঁছোতে অনেক আত্মত্যাগ করতে হয়। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে কায়েমী স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের, মানে পশ্চিম পাকিস্তানের সামন্তবাদী নেতৃত্বের চক্র ও চক্রান্তের প্রতিভূ- স্থানীয় যে মুসলিম লীগকে বাঙলার বুক থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছিলো, বাঙলার কোন্ সে ছদ্মবেশী ‘সু-সন্তানরা’ সে-ই মুসলীম লীগ চক্রের সাথেই রাতারাতি হাত মিলিয়ে বাঙলার সাত কোটি মানুষের শাসনতন্ত্র রচনার কাজে মত্ত হয়েছিলেন, এটাও একদিন প্রকাশিত হলো। ইতিহাস এমনই প্রত্যয়- একে আড়াল করা যায় না।

সেজন্যই ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করলে দেখবি বাঙলা আর বাঙালির ইতিহাস সিরাজদ্দৌলা বনাম মীর জাফরের ইতিহাস, বাঙলার ইতিহাস- বাঙলার আপামর মানুষ বনাম মোনেম খাঁদের ইতিহাস। এ ইতিহাস বড়ো করুণ, বড়ো মর্মন্তুদ। তবে এই ইতিহাস আবার গৌরবদীপ্তও বটে। বাঙলার কচি প্রাণ সালাম –বরকতের তপ্ত তাজা রক্তের পিছিল পথে নূরুল আমীনের, আর সার্জেন্ট জহুর-মনুমিয়া-আসাদ-শম্ভু-আলাউদ্দীন আর আনোয়ারদের শোক সন্তপ্ত মাতা-পিতা-ভ্রাতা-ভগিনীর তপ্ত অশ্রুর রোষানলে মোনেম খাঁদের ক্ষমতার আসনচ্যুতিও এদেশের ইতিহাসেই লেখা আছে।

শনিবারের চিঠি: বাঙালির ‘ম্যাগনাকার্টা’ খ্যাত ঐতিহাসিক ৬ দফা সম্বন্ধে একটু বলবেন?

পিতা: (বেশ আশ্চর্য হয়ে) কেনো? তুই পড়িস নাই এগুলো?

শনিবারের চিঠি: পড়েছি, কিন্তু আপনার কাছ থেকে শুনতে চাইছি।

পিতা: (ঈষৎ হেসে) ওহ, তাই বল। এটা তো জানিস যে, স্বৈরশাসক আইয়ুব খান এদেশের গণতান্ত্রিক শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করে সংখ্যাগুরু বাঙালিকে শৃঙ্খলিত করার ষড়যন্ত্র করেছিলো। এর বিপরীতেই আসলো ছয় দফা। ১৯৬৬-এর ৫ ফেব্রুয়ারি লাহোরে সম্মিলিত বিরোধী দলসমূহের এক কনভেনশনে ছয় দফা উত্থাপন করা হয়। আমার মনে আছে ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ দেশে ফিরে ঢাকা বিমান বন্দরে সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরি এবং ২০ তারিখ আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠক ডেকে ৬ দফা অনুমোদনের সিদ্ধান্ত নিই। আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির বৈঠকে ৬ দফা দলীয় কর্মসূচী হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ৬ দফা প্রচার ও প্রকাশের জন্য ছয় সদস্যবিশিষ্ট উপকমিটি গঠন করা হয়, আমিই এর নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। একই বছর মার্চের ১৮, ১৯ ও ২০ তারিখ ছিলো আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশন। এদিন কাউন্সিল সভায় ছয় দফার সামগ্রিক বর্ণনাসহ একটি পুস্তিকা বিলি করা হয়। ছয় দফা সম্পর্কে আমি একটা কথা প্রায়ই বলতাম- “সাঁকো দিলাম, স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতায় উন্নীত হওয়ার জন্য”।

শনিবারের চিঠি: আপনি তো প্রায়ই স্বভাবসুলভ কণ্ঠে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে, তবে একলা চলো রে’ উদ্ধৃত করে বলতেন, ‘এই আন্দোলনে রাজপথে যদি আমাদের একলা চলতে হয় চলব। ভবিষ্যত ইতিহাস প্রমাণ করবে বাঙালির মুক্তির জন্য এটাই সঠিক পথ’। পরবর্তী সময়ে অবশ্য এটাই সত্য হলো। বাঙালি জাতির উপর এতোটা বিশ্বাস আপনি কী করে অর্জন করেছিলেন?

পিতা: কী বলছিস এটা! বাঙালি এমন একটা জাতি, আকাশ স্পর্শ করার ক্ষমতা যার আছে। মুক্তিযুদ্ধই তার সবচেয়ে বড়ো প্রমাণ।

আমি মাথা নিচু করে বসে রইলাম। কী জানি, নিজ জাতির প্রতি অতোটা বিশ্বাস হয়তো আমার নেই।

শনিবারের চিঠি: ১৯৬৯ সালে আপনিই তো এক জনসভায় বলেছিলেন, ভবিষ্যতে ‘বাঙলাদেশ’ নামেই অভিহিত হবে পূর্ব পাকিস্তান।

পিতা: তোর কী তারিখ মনে নেই?

শনিবারের চিঠি: না, তারিখ তো মনে পড়ছে না।

পিতা: এই বয়েসে তারিখ মনে রাখতে পারিস না। সেদিন ছিলো ৫ ডিসেম্বর, সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে এক আলোচনা সভায় বলেছিলাম- ” একটা সময় ছিলো যখন এই মাটি আর মানচিত্র থেকে “বাংলা” শব্দটি মুছে ফেলার সব ধরণের প্রচেষ্টা চালানো হয়েছিলো। “বাংলা” শব্দটির অস্তিত্ব¡ শুধু বঙ্গোপসাগর ছাড়া আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যেতো না। আমি পাকিস্তানের পক্ষ থেকে আজ ঘোষণা করছি যে, এখন থেকে এই দেশকে পূর্ব পাকিস্তানের বদলে “বাংলাদেশ” ডাকা হবে।

শনিবারের চিঠি: পাকিস্তানের কারাগারে বন্দী ছিলেন আপনি। একদিকে অবরুদ্ধ বাঙলাদেশ, অন্যদিকে অবরুদ্ধ বঙ্গবন্ধু।

পিতা: পঁচিশে মার্চেই তো গ্রেফতার করা হয় আমাকে। তারপর কুর্মিটোলার ক্যান্টনম্যান্টে। সেখান থেকে ঢাকা, ঢাকা থেকে করাচী। এরপরের দিনগুলো কাটাই মিয়ানওয়ালী কারাগারে। চারমাস পর লায়ালপুর কোর্টে আসামীর কাঠগড়ায়।

শনিবারের চিঠি: জ্বি, রবার্ট পেইন লিখেছিলেন, ‘টেনশনের অবরুদ্ধ দিন’।

পিতা: (বেশ শব্দ করে হেসে) যৌবনের দশ-দশটি বছরই তো কটালাম জেল থেকে জেলে। দেশদ্রোহিতার অভিযোগে শাসকদের সাজানো আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় অনেকদিন ঝুলেছি। আমাকে যেদিন গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, সেদিন, মানে পঁচিশে মার্চে আমি বার্ণার্ড শ এর সেন্ট জোয়ান বইটি পড়ছিলাম। পড়েছিস বইটা?

শনিবারের চিঠি: জ্বি। আর যতোবারই পড়েছি ততোবারই মনে হয়েছে ম্যাইড অব অরল্যান্সের সঙ্গে আপনার কী অদ্ভূদ সাযুজ্য।

পিতা: তখন ঘড়ির কাঁটায় মধ্যরাত ছুঁই ছুঁই। ঈমামের (টিক্কা খানের) আদেশে ক্যাপ্টেন ইস্কান্দার খানের নেতৃত্বে সৈন্যদের অপারেশন শুরু হলো।

এরপর অনেকক্ষণ থেমে রইলেন পিতা। কোনো কথা নেই তাঁর মুখে। পাইপের হোল্ডারে তামাক পুড়ে প্রায় শেষ। শেষ পর্যায়ের ধোঁয়া উড়ছে। পিতা আবার শুরু করলেন।

পিতা: টিএণ্ডটি’র কর্মচারীরা আমার স্বাধীনতার ঘোষণা তারে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। বেতার তরঙ্গেও ভেসে আসলো সেই ঘোষণা। তারপর রাত সোয়া একটায় আমার বাসার টেলিফোনটা বন্ধ হয়ে গেলো। পিলখানা, রাজারবাগের আর কোনো খবর আসে না। বিশ্ববিদ্যালয়ের খবর অবশ্য পেয়েছিলাম- কয়েকজন অধ্যাপকের মৃত্যুর সংবাদ শোনার পরই টেলিফোনটা মৃত হয়ে রইলো। রাত দেড়টায় চারটি মিলিটারি জিপ আসে। একই সাথে জলপাই রঙের একটা টয়োটা ল্যা- ক্রুজার। আমি খুব অবাক হয়েছিলাম ওদের এলোপাতাড়ি গুলি বর্ষণে। কোনো কারণ ছাড়াই একটা ছোট্ট ঘরকে লক্ষ্য করে এভাবে গুলি চালানোটা রীতিমতো হাস্যকর।

রাত সোয়া দুইটায় আমাকে নিয়ে আসা হয় আদমজী ক্যান্টনম্যান্ট স্কুলে।

শনিবারের চিঠি: এখানেই আগড়তলা ষড়যন্ত্র মামলার জন্য আটক রাখা হয়েছিলো?

পিতা: হুম। একাত্তরের দু’বছর আগে। একাত্তরের ২৬ মার্চ রাত আটটায় ঢাকা এয়াপোর্টে পিআইএ-র ৭০৭ বোয়িং বিমানে করে আমাকে করাচী নেয়া হয। আমিই একমাত্র যাত্রী। বস্তুত আমার পাকিস্তানের কারাজীবনের প্রায় সময়টাই কেটেছে মিয়ানওয়ালী কারাগারে।

তবে একাত্তর সালেই ডিসেম্বরের ২৭ তারিখে আমাকে নিয়ে আসা হয় মিয়ানওয়ারী কারাগারের জেলার হাবিব আলীর বাসায়। সেখানেও আমি ছিলাম গৃহবন্দী। খবরের কাগজটাও পড়তে দেয়া হতো না।

পিতার সঙ্গে আমার অনেক কিছু নিয়ে কথা বলার ইচ্ছে ছিলো। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, বাকশাল গঠন, পঁচাত্তরের শোক- এসব নিয়ে। কিন্তু কথোপকথনের এক পর্যায়ে পিতা রবীন্দ্রনাথের একটা লাইন শুনিয়েছিলেন। এক অসামান্য দৃঢ়তায় তিনি উচ্চারণ করেছিলেন লাইনটি। মানুষের উপরে বিশ্বাস হারানো পাপ।

এতো বছর পরেও যে পিতা এমন নিবিড় এক বিশ্বাসকে মনে লালন করে রেখেছেন, আমি কী করে তাঁকে হাজার অবিশ্বাসের প্রশ্ন করি?

তার চেয়ে বরং সময় নেই। নিজের হাতে জঞ্জাল পরিস্কার করে এক মুক্তচিন্তার সোনার বাঙলার বাঙালি হিসেবে না হয় তাঁর সামনে আবার দাঁড়াবো। মাথা উঁচু করে। পিতার যোগ্য সন্তানের মতোন।

পিতার সাথে কথোপকথন শেষ হলো। যখন ফিরে আসছি, পিতা আমার মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করলেন- তোর আকাশটা আলোয় ভরে উঠুক।

ফিরে আসার পথে আমি ভাবছি- আমার আকাশটা আলোতেই ভরে থাকবে, কারণ এ আকাশে একটাই নক্ষত্র। ধ্রুব, অবিনাশী আর শাশ্বত-চিরন্তন সেই সূর্যের নাম- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

তথ্যসূত্র:
১। সময় অসময়, কিরণ সেনগুপ্ত (সাহিত্যচিন্তা: শারদীয় ১৩৮৭)
২। চল্লিশের দশকের ঢাকা, সরদার ফজলুল করিম (দৈনিক সংবাদ, ১৪ জুন ১৯৮৪)
৩। জাতীয় রাজনীতি (১৯৪৫-১৯৭৫), অলি আহাদ, ঢাকা
৪। অভ্যুত্থানের উনসত্তর, মাহফুজউল্লাহ
৫। পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু, ওবায়েদুল কাদের।

১২ ভাদ্র, ১৪১৮